চাঁদপুর। বৃহস্পতিবার ১১ অক্টোবর ২০১৮। ২৬ আশ্বিন ১৪২৫। ৩০ মহররম ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪২-সূরা শূরা


৫৪ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৩০। তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদেরই হাতের কামাইয়ের ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন।


৩১। তোমরা পৃথিবীতে (আল্লাহকে) ব্যর্থ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, সাহায্যকারীও নেই।


৩২। তাঁর মহা নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত হলো পর্বত সদৃশ সমুদ্রে চলমান নৌযানসমূহ।


৩৩। তিনি ইচ্ছা করলে বায়ুকে স্তব্ধ করে দিতে পারেন; ফলে নৌযানসমূহ অচল হয়ে পড়বে সমুদ্র পৃষ্ঠে। নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্যে।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


 


প্রাচীন মহিলার দেহের গহনা অবশ্যই খাদবিহীন হবে।


-জুভেনাল।


 


 


ধরেন যদি সদ্ব্যবহার করা হয় তবে তা সুখের বিষয় এবং সদুপায়ে ধন বৃদ্ধির জন্য সকলেই বৈধভাবে চেষ্টা করতে পারে।


 


 


 


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
হিন্দুধর্ম ও পূজা উৎসব
তৃপ্তি সাহা
১১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


হিন্দু ধর্ম : বিশ্বে প্রচলিত ধর্মসমূহের মধ্যে হিন্দুধর্ম প্রাচীনতম। এ ধর্মের মূলে রয়েছেন স্বয়ং ভগবান। জগৎসৃষ্টির সঙ্গে এ ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। আর ভগবান পৃথিবীর সৃষ্ট প্রত্যেকটি বস্তুতে রয়েছেন। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রত্যেক পূজায় দেখা যায় তারা প্রকৃতিকেই পূজা করছেন। আর একথা তো সত্যি_প্রকৃতিই শক্তি, প্রকৃতিই সুন্দর এবং শাশ্বত। প্রকৃতি থাকলেই আমি



হিন্দুধর্মের আরেক নাম 'সনাতন ধর্ম'। এই সনাতন ধর্ম তথা হিন্দুধর্ম একাধারে প্রাচীন এবং নবীন। প্রাচীন এবং নবীন এ কারণে যে, সনাতন ধর্ম তার সনাতন ঐতিহ্য বজায় রেখেও এ ধর্ম যুগ-পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে চলছে সংঘাতবিহীনভাবে। এ ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে কোনো একক ব্যক্তিবিশেষকে চিহ্নিত করা যায় না। বরং বলা যায়, মানুষ সৃষ্টির পর তার পারিপাশ্বর্িক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বা সময়ের বিবর্তনের সাথে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে যে ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাগ্রহণ করেছেন, তা প্রতিদিনের অভ্যাসের ফলে ধর্ম হিসেবে রূপ লাভ করে। আর ধর্মের মূল বাণীই তো তাই_'যা আমাদের সুরক্ষা করে'। এ প্রসঙ্গে ছোট্ট একটি উদাহরণ যোগ করা যুক্তিসঙ্গত। প্রাচীনকালে মানুষের জীবনযাত্রা ছিলো অত্যন্ত বিপদসংকুল। নিজেকে সুরক্ষার জন্যে না ছিলো শক্ত হাতিয়ার, না ছিলো নিরাপদ বাসস্থান। বন্যপশুর হাতে যেমন মানবকূল ক্ষয় হতো তেমনি সর্পকূল থেকেও রক্ষা পেতো না। তাঁবুতে ছোট শিশু কিংবা বৃদ্ধকে ঘুম পাড়িয়ে আদিম মানুষ খাদ্যের অন্বেষণে বের হয়েছে। এসে দেখলো শিশু/বৃদ্ধটি সাপের দংশনে/কামড়ে মারা গেছে। কিন্তু একদিন দেখা গেলো ঘুমন্ত শিশুটির পাশে একটি পাত্রে দুধ-কলা আছে, সাপটি সেই পাত্রে দুধ-কলা খেয়ে চলে গেলো। বাচ্চাটি কিংবা বৃদ্ধাটিকে ছুঁয়েও দেখলো না। এরপর থেকে সাপের জন্যে দুধ-কলা বরাদ্দ হলো এবং দু হাত জোড় করে বললো, 'হে সর্প আমাদেরকে রক্ষা করো, তোমাকে দুধ-কলা দেবার দায়িত্ব আমি নিলাম, তুমি আমাদের মানবজাতিকে বাঁচাও'। আর এই হাতজোড় করে বলাটাই একদিন 'মনসাপূজা' নামে প্রচলিত বিশ্বাস হলো। এছাড়া সাপের বিষ আমাদের জীবন রক্ষাকারী ঔষধ শিল্পের বড় উপাদান। যা মানুষের জীবন রক্ষা ও নিরাপদ করে তাই তো ধর্ম।



এ প্রসঙ্গে দূর্বাঘাসের কথা না বললেই নয়। প্রাচীনকাল থেকেই দূর্বাঘাস এ ধর্মের একটি বিশেষ স্থানজুড়ে আছে। কোনো পূজা বা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান দূর্বাঘাস ছাড়া সম্পন্ন হয় না। কিন্তু কেনো? প্রাচীনকালের মানুষ নিজেদের সুরক্ষার জন্যে তেমন কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ করতে সক্ষম ছিলো না। মন্ত্রেতন্ত্রে নির্ভরতা ছিলো। দূর্বাঘাস এমন একটি উদ্ভিদ, যে উদ্ভিদ একটি থেকে অনেক উদ্ভিদ জন্ম হয়, বিনাযত্নে যত্রতত্র বেড়ে ওঠে। শক্তপ্রাণ, বহুবর্ষজীবী একটি উদ্ভিদ। মানুষ সারাদিন তাকে পায়ের নিচে রেখে পিষে মারে। কিন্তু দূর্বাঘাসের চলার পথ দুরন্ত-দুর্বার। এছাড়াও দূর্বার অ্যান্টিসেপ্টিক গুণ তো আছেই। আর তাই প্রাচীনকাল থেকে দূর্বাঘাস মানুষের মাঙ্গলিক কাজে ও পূজায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দূর্বা দিয়ে বরণডালা সাজিয়ে সন্তান কামনা করে, দীর্ঘায়ু কামনা করে। দূর্বাঘাস দিয়ে মানুষ_দূর্বার মতো অসংখ্য, শক্তপ্রাণ, দীর্ঘজীবী এবং চিরসবুজ মানুষের কামনা করে। আর এভাবেই আরোপিত নয়, বরং সহজাতভাবে যাপিতজীবনের সেই শূন্য অবস্থা থেকে যা কিছু দিয়ে নিজেকে নিরাপদ সুরক্ষা ও ঋদ্ধ করেছে, তাই তো ধর্ম। একইভবে ধানের ব্যবহার আমরা দেখি যে কোনো অনুষ্ঠানে। ধর্ম শব্দটির অর্থ, 'যা ধারণ করে'। ধৃ ধাতু+মন্ (প্রত্যয়)= ধর্ম। ধ ধাতুর অর্থ ধারণ করা। যা হৃদয়ে ধারণ করে মানুষ সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও নির্মল, পবিত্র জীবনযাপন করতে পারে তাকেই ধর্ম বলে।



সৃষ্টি আদিকাল থেকে এ ধর্মমতের পরিচয় মেলে। দীর্ঘ যাত্রাপথে ধর্মের মূলতত্ত্বকে ধরে রেখে নতুন ধর্মীয় চিন্তা গ্রহণ করে এ ধর্ম ক্রমশ পল্লবিত হয়েছে, হচ্ছে।



সিন্ধুসভ্যতার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার নিদর্শন থেকে হিন্দুধর্মের কিঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায়। প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে আর্য সভ্যতার সংঘর্ষ এবং পরিণতিতে সিন্ধুসভ্যতার সঙ্গে আর্য সভ্যতার সমন্বয় ঘটে। আর্যগণ সুপ্রাচীন সিন্ধুনদের তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করতো। বহিরাগত আফগান ও পার্সিক সম্প্রদায় সিন্ধুনদকে হিন্দুনদ বলে উচ্চারণ করতো। তাদের উচ্চারণে সিন্ধুর 'স' পরিবর্তিত হয়ে 'হ'তে রূপ নেয় এবং সিন্ধু শব্দটি 'হিন্দু' বলে উচ্চারিত হতে থাকে। তাই অনেক গবেষকের মতে, সিন্ধু শব্দ থেকেই 'হিন্দু' শব্দের আগমন এবং সিন্ধু নদের তীরবর্তী লোকদের ধর্মই 'হিন্দুধর্ম' বলে আখ্যায়িত হয়। তবে সময়ের অগ্রগতিতে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের অনুষঙ্গ হিসেবে সনাতন ধর্মের চিন্তা চেতনায় নতুনত্বের সংযোজন ঘটেছে।



 



ধর্মসংস্কার : সময়ের সাথে সনাতন ধর্মের সংস্কার ও ধর্মসাধনার নব নব রূপ লক্ষ্যণীয়। রাজা রামমোহন রায়, ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ, রাণী রাসমণি, স্বামীবিবেকানন্দ, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু, প্রভু জগবন্ধু, ঠাকুর অনুকুলচন্দ্র, রামঠাকুর, স্বামীস্বরূপানন্দ, বাবা লোকনাথ, হরিচাঁদ ঠাকুর, স্বামী প্রণবানন্দ, এসি ভক্তি বেদান্ত, স্বামী প্রভুপাদ প্রমুখ ধর্মগুরুর গৌরবময় অবদান সনাতন ধর্মকে আধুনিকতার পরিম-লে উন্নীত করেছে।



শ্রী রামকৃষ্ণ বলতেন, 'যখন বাইরে লোকের সাথে মিশবে তখন সকলকে ভালোবাসবে। মিশে যেনো এক হয়ে যাবে। বিদ্বেষভাব রাখবে না। ও সাকার মানে, নিরাকার মানে না; ও নিরাকার মানে সাকার মানে না; ও হিন্দু, ও মুসলমান, ও খ্রিস্টান_ও বৌদ্ধ এ বলে কাউকে ঘৃণা করবে না'। শ্রী রামকৃষ্ণের এই যে উদার মনোভাবের দ্বারা শুধু ভারতীয়রাই নন, বিদেশীরাও বিমোহিত হয়েছেন। এক রাশিয়ান অধ্যাপক 'শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত' (গসপেল অফ শ্রী রামকৃষ্ণ) পড়ে বলেছেন, এতো উদার বিশ্বজনীন, সার্বজনীন ভাব আর কোথাও দেখা যায় না। জনৈক ইহুদী বলেছেন, 'ইসরাইলে একটি রামকৃষ্ণ সেন্টার হওয়া উচিৎ'।



তাঁরই শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকার শিকাগো শহরে বক্তৃতা দিয়ে সারা আমেরিকা জয় করেন। সেখানকার সংবাদপত্রগুলোতে তাঁকে 'সাইক্লোনিক হিন্দু' নামে অভিহিত করেছে। বিবেকানন্দ তাঁর মতাদর্শ প্রচারের জন্যে নিউইয়র্কে 'বেদান্ত সমিতি' প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি ইউরোপে যান। তিনি বেদান্ত দর্শনের প্রকৃত সত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'জীবে প্রেম করে যে জন, সে জন সেবিছে ঈশ্বর'। তিনি বলেন, 'শক্তি ও সাহসিকতাই ধর্ম। দুর্বলতা ও কাপুরুষতাই পাপ। স্বাধীনতাই ধর্ম, পরাধীনতাই পাপ'। বিবেকানন্দ নারী স্বাধীনতাই বিশ্বাসী ছিলেন। নারীশিক্ষাকে তিনি সর্বান্তকরণে সমর্থন করতেন। তাঁর মতে, যে জাতি নারীকে সম্মান দেয় না, সে জাতি কখনো বড় হতে পারে না।



বিবেকানন্দ সতীদাহ বিলোপের জন্যে রাজা রামমোহন রায়ের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্যে বিদ্যাসাগরকে 'মহাবীর' বলে আখ্যায়িত করেন। তবে বিধবাদের পুনর্বিবাহের পাশাপাশি তাদের যথাযথ শিক্ষা দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলার কথাও বলেন। বাল্যবিবাহকে তিনি ঘৃণা করতেন। তিনি বলতেন, 'বাল্যবিবাহে মেয়েরা অকালে সন্তান প্রসব করে অধিকাংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তাদের সন্তানসন্ততি ক্ষীণজীবী হয়ে দেশে ভিখারির সংখ্যা বৃদ্ধি করে।'



 



পূজা : সুপ্রাচীন বাংলায় বাস করতো কিরাত ও আদি অস্ট্রাল জাতি। কিরাতদের সংখ্যা ছিলো কম, চেহারা ছিলো মঙ্গোলয়েডদের মতো এবং আদি অস্ট্রালদের সংখ্যা ছিলো বেশি। এদের চেহারা ছিলো অস্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসীদের মতন। এরাই বাঙালির পূর্বপুরুষ ছিলো। এরা অস্ট্রিক ভাষায় কথা বলতো। 'পূজা' বৈদিক আর্যদের সংস্কৃত শব্দ নয়। এটি 'অস্ট্রিক' ভাষার শব্দ।



সুপ্রাচীন বাংলার মানুষ কথা বলতো এই অস্ট্রিক ভাষায়। আর বৈদিক আর্যরা বাংলায় এসেছিলো পশ্চিম দিক থেকে, সময়টা ৮০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে। কিরাত ও আদি অস্ট্রালরা অরণ্যচারী শিকারী ছিলো বলেই বৈদিক আর্যরা তাদের 'নিষাদ' জাতি বলতো।



আর্যদের বৈদিক ধর্মীয় বিশ্বাস প্রাচীন বাংলার নিষাদ জনগোষ্ঠী গ্রহণ করলো। ফলে 'নিষাদ' জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-আচরণ ইত্যাদি বদলে গেলো। ফলে আর্য ও অনার্য নিষাদদের মধ্যে ভাষাগতভাবে ধর্মীয়গতভাবে ও আচরণগতভাবে একটা সঙ্করায়ণ হলো।



নিষাদ জাতি প্রকৃতিকে 'চৈতন্যময়ী' মনে করতো। এই চৈতন্যময়ী প্রকৃতিকেই পূজা করতো। নিষাদদের সমাজব্যবস্থা ছিলো মাতৃতান্ত্রিক। সুজলা-সুফলা উর্বর মাটির কারণে তারা বনে বনে ফলমূল কুড়াতো আর পশু-পাখি শিকার করতো। তবে অনুন্নত হাতিয়ারের কারণে কৃষিজীবন ছিলো ভারি অনিশ্চিত, বিপরীতে জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিলো। কাজে কাজেই প্রকৃতির কৃপার উপর নির্ভর করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিলো না।



অনার্য নিষাদদের আদিম ও স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মবিশ্বাস ছিলো সংখ্যা, তন্ত্র এবং যোগ। আর্যরা এই তিনটি মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো। এ প্রসঙ্গে ড. আহমেদ শরীফ লিখেছেন_'বৈদিক ভাষায় দেশী শব্দ গৃহীত হয়েছে। তেমনি 'যোগ' পদ্ধতিও প্রবিষ্ট হয়েছে। বস্তুত এই দ্বিবিধ ঋগ্বেদেও সুপ্রকট। তাছাড়া দেশী জন্মান্তরবাদ, প্রতিমা পূজা, নারী, পশু, বৃক্ষ, দেবতা স্বীকৃতি, মন্দিরোপসনা, ধ্যান, কর্মবাদ, মায়াবাদএবং প্রেততত্ত্ব দেবী মানসপ্রসূত। কাজেই যোগ ও তন্ত্র সর্বভারতীয় হলেও অস্ট্রিক, নিষাদ ভোটচীনা কিরাত অধ্যুষিত বাংলা আসাম নেপাল অঞ্চলেই হয়েছিলো এসবের বিশেষ বিকাশ। যোগীর দেহশুদ্ধি এবং তান্ত্রিকের ভূতশুদ্ধি মূলত অভিন্ন ও একই লক্ষ্যে নিয়োজিত। বহু ও বিভিন্ন মননের ফলে_কালে কালে ক্রমবিকাশের ধারায় সংখ্যা, যোগ, তন্ত্র_তিনটে স্বতন্ত্র দর্শন ও তত্ত্বরূপে প্রতিষ্ঠা পায় এবং প্রচীন ভারতের আর সব ঐতিহ্যের মতো এগুলো আর্য



শাস্ত্রে ও দর্শনের মর্যদা লাভ করে (বাংলা, বাঙালি ও বাঙালিত্ব)।



 



পূজা শব্দের অর্থ প্রশংসা বা শ্রদ্ধা জানানো। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট হলো_



১। প্রাকৃতিক শক্তিকে চৈতন্যময়ী বলে মনে করা।



২। সেই চৈতন্যময়ী শক্তিকে মানবীয় উপলদ্ধির সীমানায় নিয়ে আসা।



৩। সেই চৈতন্যময়ী শক্তির সঙ্গে মাতা-পিতার সম্পর্ক স্থাপন করা।



৪। সেই চৈতন্যময়ী শক্তির আরাধনা করা।



এই চৈতন্যময়ী প্রকৃতিকে তুষ্ট করতেই পূজা করা হয়, যাতে পূজারী/ভক্তের জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়। চারপাশ আনন্দে হিল্লোলিত হয়।



 



প্রতীক কেনো অপরিহার্য : ঝুসনড়ষ অর্থাৎ প্রতীক একটি পরিচয়জ্ঞাপক চিহ্ন। এর মূল গ্রীক শব্দের ঝুসনড়ষড়হ-এর অর্থ যার দ্বারা কোনো বস্তুকে অতি সহজেই জানা বা অনুমান করা যায়। প্রতীক সেই চিহ্ন_যার দ্বারা অদৃশ্য কোনো বস্তুর প্রতিভূ হিসেবে কোনো দৃশ্য অথবা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে প্রকাশ করা হয়। বহিঃজগতের সাথে আমাদের যোগাযোগের ভিত্তি প্রতীক। সব ভাষারই শেষ আশ্রয়স্থল 'প্রতীক' এবং ধর্মীয় ভাষার ক্ষেত্রে তা একটি বিশেষ মাত্রা পায়। কারণ ধর্ম যেনো সত্যকে প্রকাশ করতে চায়, যার গভীরতাকে অক্ষর স্পর্শ করতে পারে না। কোনো দেবমূর্তি বা ঈশ্বরের প্রতীক আমাদের সেই উদ্দেশ্যই সিদ্ধ করে যাতে আমরা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যোগ্য কোনো বস্তুর মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে আমাদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে পারি। ভাবের সহজ আদান-প্রদানের জন্যে প্রতীক ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়ে।



পূজো দুই ধরনের হতে পারে :



১। সাকার উপাসনার মাধ্যমে।



২। নিরাকার উপাসনার মাধ্যমে।



 



সাকার উপাসনা : সাকার হলো যার আকার আছে। বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমাকে (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মনসা প্রভৃতি) ঈশ্বর সাকাররূপে উপাসনা করা হয়।



 



নিরাকার উপাসনা : নিরাকার শব্দের অর্থ যার কোনো আকার নেই। মূলত এটি জ্ঞানযোগ। অতি সাধারণের পক্ষে এই উপাসনা অনেকটা দূরহ। যেমন : মায়ের ছবিটি চোখের সামনে থাকলে যতটা সহজে যতটা তাড়াতাড়ি তাকে ছোঁয়া যায়, ছবিটি না থাকলে কী সেভাবে ছোঁয়া যাবে? অনুভব তো তারও পরের ধাপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিকভাবে ব্রাহ্মসমাজে জন্মে ছিলেন। ব্রাহ্মসমাজে নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করা হয়। তিনি সামাজিকভাবে বা আমরা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যা দেখি তাতে মনে হয় তিনি নিরাকার ঈশ্বরের সাধনা করেছেন। আসলেই কী তাই! তিনি তার সংগীত ও নৃত্যে সব সৌন্দর্যের মধ্যে ঈশ্বরকে উপাসনা করেছেন। অসাধারণ তাঁর কল্পনাশক্তি অতি প্রখর। আমরা অতি সাধারণ আমরা তৈরি করা পথে সহজে লক্ষ্যে পেঁৗছতে পারি।



হিন্দুধর্মে সৌন্দর্যবোধ অতি প্রখর। প্রত্যেক প্রতিমাই পরমসুন্দর করে তৈরি করা হয়। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সুন্দরের পূজারী। সুন্দর জিনিসটিকে আমরা অতি আপন করে নিজের করে পেতে চাই। মিশে যেতে চাই তার মধ্যে। ধারণা করা হয় প্রতিমার সৌন্দর্যের বশে দেবতা তাতে সনি্নহিত হন। আর চরম শৈল্পিক সত্তার উন্মেষ ঘটিয়েছেন সমাজের কুমোরেরা।



বাংলাদেশে অনেক ধরনের পূজা উদ্যাপিত হয়। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতী পূজা, মনসা পূজা, বিশ্বকর্মা পূজা, নারায়ণ পূজা, কার্তিক পূজা, শীতলা পূজা, গণেশ পূজা, বিষ্ণুপূজা ইত্যাদি ইত্যাদি। বারো মাসে তের পার্বন। অঞ্চলভেদে, প্রয়োজন অনুসারে পূজার ভিন্নতা পরিলক্ষিত।



সকল পূজোর দেব-দেবীই মাটি দিয়ে তৈরি হয়। এই মাটিই আমাদের মা। মাটিবিহীন আমাদের অস্তিত্ব কল্পনা করা বাতুলতামাত্র। আমাদের জীবনধারণের জন্যে যা কিছু প্রয়োজন সবই মাটিনির্ভর। সাধকের জ্ঞানে কুমোরের তুলির অাঁচড়ে সৌন্দর্যে-সৌকর্যে অলঙ্কারে ভরে ওঠে দেবদেবী। মৃন্ময়ী মা দিনে দিনে চিন্ময়ী উঠে সকলের কাছে। শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় মাসের পর মাস হাতের ছোঁয়ায় মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী হয়ে ওঠেন।



পূজা দু ধরনের হয়ে থাকে।



১। পারিবারিক।



২। সার্বজনীন পূজা।



সার্বজনীন পূজার মধ্যে দুর্গাপূজা সমাদৃত সর্বশ্রেষ্ঠ। সমাজের সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহণে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।



১ম অংশ শেষ।



২য় অংশ শুরু।



 



শারদীয় দুর্গোৎসব : শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে শারদীয় দুর্গোৎসব।



 



শরৎকালে কেনো : বাঙালির জীবনযাত্রা আবর্তিত হয় ছয়টি ঋতুকে ঘিরে। আর ঋতুর কথা যদি বলি তবে শরৎকাল নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বদেহী সুন্দর ও কল্যাণময় একটি ঋতু। এটা তো সত্যি এই বাংলায় প্রত্যেকটি ঋতুর আছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য, আলাদা আলাদা মোহনীয় সৌন্দর্য। আর সব ঋতুর কিছু সুবিধা যেমন আছে তেমনি অসুবিধাও আছে। ধরা যাক্ বাঙালির ঋতুরাজ বসন্তের কথা। রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন_



বসন্তে কি শুধু ফোটা ফুলের মেলা রে।



দেখিস নে কি শুকনো পাতা ঝরা ফুলের খেলা রে...



এছাড়া গ্রীষ্মে বৃষ্টিহীনতা, অতি তাপদাহ; বর্ষায় অতি বর্ষণে বন্যা, শীতে শুষ্কতা।



কিন্তু শরৎ প্রকৃতিকে উজাড় করে দিয়ে অপরূপ সাজে সাজিয়ে তোলে চারপাশ, চারদিক। শরৎ কোমল, স্নিগ্ধ, মায়াময় এক ঋতু। বর্ষার শেষে চারিদিক স্বপ্নের মতো সবুজ থাকে। গাছগুলোকে দেখে মনে হয়, ভরা যৌবনা। সজীব পত্র-পল্লবে, ফুলে-ফলে পরিপূর্ণ এক ঋতু। সূর্য উঠে সোনার বরণ রূপ নিয়ে। সোনাঝরা স্নিগ্ধ রোদ ঝরে পরে মাঠের ফসলের ওপর আর উঠোনে। ঝির-ঝির ঠা-া বাতাসে দোল খায় ধানের শীষ, মাঠের ফসল। কৃষকের মন নেচে উঠে নিজের অজান্তে। স্বচ্ছ পরিষ্কার স্বপ্নালু নীলাকাশে তুলোর মতো মেঘেরা ঘুরে বেড়ায় মনের আনন্দে। ছেলে-মেয়েরা রং বে-রং-এর ঘুড়ি ছেড়ে দেয় আকাশের বুকে। প্রজাপতিরা সোনাঝরা রোদে ফুলে ফুলে দোল খায়। বাংলার পাখিরা কলকাকলিতে মাতিয়ে তোলে চারিদিক। রাতের আকাশে উজ্জ্বল তারার মেলা। আর পূর্ণিমার রাতে এতো বড় মায়াবী চাঁদ আকাশের বুকে দেখে মানবজীবন আরও একবার ধন্য হয়। নদীতীরে কাশফুলেরা হাতছানি দিয়ে উচ্ছ্বাসিত প্রকৃতিকে ডাক দেয়। গাছভরা শিউলি ফুলগুলো টুপটাপ করে গাছ থেকে ঝরে পরে শিশির ভেজা নরম ঘাসের ওপর, আর নিকোন উঠোনে। নৌকার পাল তুলে ভাটিয়ালি গান গেয়ে মাঝিরা এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে যায়। মনোমুগ্ধকর এই শরতের রূপের বর্ণনা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া পূর্ণতা পায় না_'আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা_/নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।/এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,/এসো নির্মল নীলপথে,/এসো ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমল বনগিরিপর্বতে_।'



 



কেনো শারদীয় দুর্গোৎসব পূজা না হয়ে উৎসব? 'উৎসব কথাটির অর্থ যাহা 'সুখ প্রসব করে'। সুখ ও আনন্দ তো বটেই, সেই সুখ যেনো সর্বজনের কাছে পেঁৗছায়, সেজন্যেই যেনো উৎসব শব্দটির মধ্যে 'সব' শব্দটি রয়েছে।



শিউলি, কামিনী, গন্ধরাজ মিষ্টি গন্ধে ভরে থাকে চারিদিক আর নদীর চরের কাশফুল আমাদের মনে করিয়ে দেয় এসেছে 'শারদীয় দুর্গোৎসব'। গেয়ে উঠে মন :



মাতলোরে ভূবন



বাজলো তোমার আলোর বেণু।



আজ প্রভাতে যে সুর শুনে



খুলে দিনু মন



বাজলো তোমার আলোর বেণু।



 



আমাদের কুমোরেরা অর্থাৎ মাটির শিল্পীরা ব্যস্ত হয়ে ওঠে প্রতিমা গড়ার কাজে। আর ঢাকিরা ঢাক নিয়ে তৈরি। পূজোর অনেক আগে ঢাকের তালে তালে দেবী দুর্গার আগমনী বারতা নিয়ে হাজির হয় বাড়ি বাড়ি। ঘরে ঘরে বাড়িতে বাড়িতে মেয়েদের, মায়েদের, বউদের চোখের পাতায় ঘুম যেনো কেড়ে নেয়। কাজের ব্যস্ততায় খুব দ্রুত সময় গড়িয়ে যায়। বাড়িঘর ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, ঘরবাড়িতে আবার একটু নতুন রঙের ছোঁয়া, নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তোলা। ঘরের আঙ্গিনায়, বারান্দায় আল্পনা দিয়ে ভরিয়ে তোলা। আর এগুলো করার জন্যে আলাদা করে শিল্পীর দরকার হয় না, আমাদের প্রত্যেকের ভেতর যে শিল্পীমন আছে তার প্রতিফলন ঘটে এই পূজোতে। এই উৎসবে নারিকেলের নাড়ু, মোয়া, সন্দেশ তৈরি করার প্রচ-রকমের ধুম পড়ে যায়। একেক বাড়িতে ২৫-৩০ জোড়া নারিকেল সংগ্রহ করা হয়। সে নারিকেলগুলো ছোলা, ভাঙ্গা, ঠনা খোলা, কুচা তৈরি করা, চিড়াকুটা_তারপর কাক_কে সামলে সেইসব নারিকেল রৌদে শুকিয়ে ঘরে আনা; খ- তৈরি করা, সন্দেশের নারিকেল বাটা, সন্দেশ দেবীদুর্গা দশভূজা। তাঁর দশটি হাত। হাত হলো কর্মের কারণ। আলস্য নিদ্রা-তন্দ্রা-জড়তার মহাপাপ দূর করে জীবের ভেতর কর্মশক্তি জাগিয়ে দেয়ার জন্যেই দেবী হয়েছেন দশভূজা। তাঁর গায়ের রং অতসী ফুলের মতো সোনালি হলুদ। শক্তিধর সিংহ তাঁর বাহক। প্রতি শরৎকালে তিনি পিতৃগৃহে আসেন পুত্র-কন্যাদের সাথে নিয়ে। দেবীকে কন্যারূপে এবং শিবকে জামাতারূপে কল্পনা করা বাঙালি জাতির এক অভিনব বৈশিষ্ট্য। প্রতি শরৎকালে তিনি পুত্রকন্যাদের সাথে নিয়ে পিতৃগৃহে আসেন। আমাদের মেয়েরা আসলে আমরা যেভবে আনন্দ করি আর কি!



বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় পাঁচদিনব্যাপী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।



 



বোধন : পঞ্চমী সন্ধ্যায় বেলগাছ তলায় সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালিয়ে মায়ের বোধন বা জাগরণ করা হয়। আমরা যেমন মেয়ের বাড়িতে যাই মেয়েকে আনতে।



 



আমন্ত্রণ বা আবাহন : ষষ্ঠীতে দেবীকে আমন্ত্রণ ও অধিবাস করা হয়। তাঁকে জাগালেই তো হবে না, তাঁকে জানাতে হবে এসেছি তোমায় নিতে। মাটি তৈলহরিদ্রা, গন্ধ, মহী, শিলা, ধান, দূর্বা, ফুল, ফল, দধি, ঘি, সিঁদুর, শঙ্খ, কাজল, গোরচনা, সোনা, রূপা, তামা, চামর, আয়না, প্রদীপ, বরাহদন্ত ও খড়গ ডালাতে সাজানো থাকে। যাকে বরণডালা বলা হয়। দেবীকে বরণ করা হয়। এইসব জিনিস দিয়ে বিয়ের সময়, যেকোনো



 



মাঙ্গলিক কাজে ছেলেমেয়েদের কপালে ঠেকিয়ে আশীর্বাদ বা মঙ্গল কামনা করা হয়।



 



নবপত্রিকা : সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্থাপন করা হয়। নব মানে নয়। পত্রিকা হলো পাতাযুক্ত গাছ। এতদ্বাঞ্চলে বিশেষ করে শরতের সময় সবুজের প্রাচুর্য নবপত্রিকা পক্ষে ভারি অনুকূল। নয়টি গাছ দিয়ে এর সূচনা। প্রথমটি রম্ভা অর্থাৎ কলাগাছ, এর সঙ্গে আরও আটটি গাছ। সাদা অপরাজিতা লতা জড়িয়ে শাড়ি পরিয়ে কলাগাছের মাঝের ডগাটির মাথায় সিঁদুর দিয়ে দেবীর ডানদিকে গণেশের পাশে একে রাখা হয় আল্পনা দেয়া পিঁড়ির উপর। কলাবউ ব্রহ্মণী রূপ বহন করে। কচুগাছে 'কালিকা', হলুদ গাছে 'দুর্গা', জয়ন্তী গাছে 'কার্তিক', বেল গাছে 'শিবা', ডালিম গাছে 'রক্তদন্দিকা', অশোক গাছে 'শোকরহিতা', মানগাছে 'চ-িকা', ধান গাছে 'লক্ষ্মী'। প্রত্যেকটি গাছের পৃথক পৃথক পূজা হয়। দুর্গার আরেক নাম 'নবপত্রিকাবাসিনী'।



 



মহাষ্টমী : তৃতীয়দিন অষ্টমী পূজা। ভাবগাম্ভীর্য ও মহত্বপূর্ণ দিন। মহাস্নান, কুমারীপূজা, পুষ্পাঞ্জলি, সন্ধিপূজা এবং নরনারায়ণ সেবা। এই স্নানে যেমন বহু জায়গার মাটি লাগে তেমনি জলও লাগে নানা স্থানের। পদ্ম লাগে ১০৮টি। প্রতিমায় জল মাটি ঢাললে কী অবস্থা হবে। আর তাই বড় পাত্রে আয়না বসিয়ে তাতে দেবীর যে প্রতিবিম্ব পড়ে, তার ওপরই জল ঢালা হয়।



কুমারী পূজা সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ আছে। তবে এক থেকে ষোল বছরের একটি কুমারী কন্যাকে মাতৃরূপে পূজা করা হয়। রাণী রাসমণি প্রতিবছর কুমারী পূজা করতেন। বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো কুমারী পূজা। ১৯০১ সালে ১৯ অক্টোবর স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কুমারী পূজা করেন। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জাগ্রত করাই এর অন্যতম কারণ।



 



সন্ধিপূজা : অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিতে দেবীর যে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয় তাকেই সন্ধিপূজা বলা হয়। অষ্টমীর শেষ চবি্বশ মিনিট আর নবমীর প্রথম চবি্বশ মিনিট মোট আটচলি্লশ মিনিটের মধ্যে এই পূজা সম্পন্ন করতে হয়। সন্ধিপূজায় ১০৮টি মাটির প্রদীপ প্রজ্বলন করে দেবীর পূজা করা হয়। এ সময় দেবীদুর্গাকে বিভিন্ন ধরনের ভোগ নিবেদন করা হয়। অবশ্য প্রতিদিনেই ভোগ নিবেদন করা হয়। প্রচুর ভক্তের সমাগম হয় এদিন। আরতি প্রতিযোগিতা নবমীর অন্যতম আকর্ষণ।



 



দশমী পূজা : দশমী তিথিতে পূজাবিধি অনুসারে দেবীদুর্গার দশমবিহিত পূজা করা হয়। এদিনে দেবীদুর্গার প্রতিমা বিসর্জন। দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে মিষ্টি মুখ করা হয়। নারীরা একে অন্যকে সিঁদুর পরিয়ে মিষ্টি মুখ করে। একে অপরকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে। বিজয়া দশমী নামে এটি পরিচিত। দুর্গাপ্রতিমা নদী, পুকুর, প্রভৃতি জলাশয়ে বিসর্জনের মাধ্যমে শারদীয় দুর্গা উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।



দেবীদুর্গা যেনো আমাদের ঘরের মেয়ে। তিনি শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে আসেন। চারদিন থাকার পর তাঁর ছেলেমেয়ে কার্তিক গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীকে নিয়ে কৈলাসভবনে যাত্রা করেন।



মহিষাসুরকে বধ করে অর্থাৎ অসুভ শক্তিকে পরাজিত করে বিজয়া দশমীর মাধ্যমে বিজয় পালিত হয়। অন্যায় অবিচারকে প্রতিহত করা হয় এই পূজার মাধ্যমে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকদের মধ্যে সৃজনশীলতা তৈরি করে। এই পূজোকে ঘিরে কত নতুন গান, কত নতুন নাচ, কত নতুন সাহিত্য, নাটক রচিত হয় তা বলা বাহুল্য। মৃৎশিল্পী, অলংকারশিল্পী, আল্পনাশিল্পী, ম-প তৈরিকরণশিল্পী, শোলা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্ম একদিকে যেমন নান্দনিক সৃজনশীলতা চোখে পড়ার মতো; তেমনি জীবিকানির্বাহের দারুণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। পূজারীদের, রাঁধুনিদের, মিষ্টিবিক্রেতাদের, ফেরিওয়ালাদের সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে কর্মযজ্ঞ তৈরি হয়। তাই পূজার আরেক নাম সৃজনশীলতা। যে সৃজনশীলতার মাধ্যমে সমাজের সুবিধার জন্যে সৃষ্ট বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষকে একেই মঞ্চে একত্রিত করে, পৃথিবীর সকল মানুষ, সকল প্রাণীর জন্যে মঙ্গল কামনা করা হয়। পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রত্যেকটি প্রাণী প্রত্যেকটি উদ্ভিদের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। ধূপ, চন্দন, ফুল, বেলপাতা, তুলসিপাতা, দূর্বাঘাসের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ, প্রেম, ভালোবাসা জাগ্রত করাই পূজার অন্যতম উদ্দেশ্য।



দেবীদুর্গা আমাদের সমাজের নারীর প্রতিচ্ছবি। নারীর প্রতিভা বিকাশের নিরাপদ এবং উপযুক্ত স্থান তাঁর বাবার বাড়ি। নারী শুধু মমতাময়ী মা, প্রেমময়ী স্ত্রী, স্নেহময়ী কন্যা_তা নয়। নারীর ভেতরের যে শক্তি, যে তেজ, যে ক্ষমতা আছে, তারই বহিঃপ্রকাশ দেবীদুর্গার মধ্যে প্রকাশিত হয়। নারী শুধু চুল বাঁধে আর রান্না করে তা তো নয়। পরিবেশ পেলে সে নিজেকেসহ সকল প্রাণীর জীবন রক্ষাকারী। নারী যে কোনো অশুভ শক্তির বিরদ্ধে, অবিচার-অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাই আজকের নারী যেমন সন্তান ধারণ, লালন পালনে পারঙ্গম তেমনি চুলবাঁধাতে, রান্নাতেও পারঙ্গম। নারী স্থান আজ শুধু গৃহে নয়, যেমন আছে দেশ পরিচালনায়, যুদ্ধক্ষেত্রে, তেমনি খেলার মাঠে, কী ক্রিকেট কী ফুটবল কী আকাশে, কী জলে সব জায়গাতে শত প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। নারী তার পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। তাই দেবীদুর্গা আমাদের আরাধ্য যুগ যুগ ধরে। আর প্রকৃতিকে সযত্নে বাঁচাতে হবে আমদের প্রয়োজনেই। ভালো থাকুক বাঙালি, ভালো থাকুক বাংলাদেশ। বেঁচে থাকুক বাঙালির হাজার বছরের শিল্পসাহিত্য কৃষ্টি, সব মিলিয়ে ডানা মেলুক সংস্কৃতি।



 



লেখক : গ্রন্থাগারিক, চাঁদপুর সরকারি কলেজ।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬২৭৪৯৯
পুরোন সংখ্যা