চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৮ ভাদ্র ১৪২৬, ১২ মহররম ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • অনিবার্য কারণে শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনির আজকের চাঁদপুর সফর স্থগিত করা হয়েছে
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


০৭। তোমরা আল্লাহ ও তাহার রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহ তোমাদিগকে যাহা কিছুর উত্তরাধিকারী করিয়াছেন তাহা হইতে ব্যয় কর। তোমাদের মধ্যে যাহারা ঈমান আনে ও ব্যয় করে, তাহাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার।


 


 


assets/data_files/web

মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে আমি নিজের অভিভাবক। -নিকেলাস রান্ড।


 


 


যদি মানুষের ধৈর্য থাকে তবে সে অবশ্য সৌভাগ্যশালী হয়।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
শোকের মাসে চাঁদপুর প্রেসক্লাবের স্মরণীয় অভিযাত্রা
কাজী শাহাদাত
১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


তিন



 



হঠাৎ দুঃসংবাদে হরিষে বিষাদ



'বেশি হাসিলে কাঁদিতে হয়' এ কথাটির সত্যতা অন্য কারো ক্ষেত্রে কতোটা প্রতিফলিত হয় তা জানি না, তবে আমার ক্ষেত্রে যে প্রায়শই হয় সেটা অন্তত অকপটে বলতে পারি। গত ২৫ আগস্ট ২০১৯ রোববার চাঁদপুর থেকে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধে পেঁৗছার জন্যে ভোর ৫টা থেকে চাঁদপুর প্রেসক্লাব সদস্যগণ ৯ ঘন্টার যে অভিযাত্রা চালান, তাতে কষ্ট থাকলেও মানসিক তৃপ্তির প্রাবল্য ছিলো। পথচলার সময় পারস্পরিক আলাপচারিতায় আনন্দ-হাসিতে ভরপুর ছিলো তিনটি মাইক্রোবাসই।



একটি মাইক্রোবাসের সামনের আসনে বসে নেতৃত্ব দেন চাঁদপুর প্রেসক্লাব সভাপতি শহীদ পাটোয়ারী। সাথে ছিলেন সাধারণ সম্পাদক লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর। আরো ছিলেন সাবেক সভাপতি শরীফ চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা ও জিএম শাহীন, চাঁদপুর জেলা টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রিয়াদ ফেরদৌস, দৈনিক মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি শাহাদাত হোসেন শান্ত ও বৈশাখী টিভির জেলা প্রতিনিধি ওয়াদুদ রানা। এ গাড়িতে শরীফ, রহিম ও শাহীন তাদের আলাপচারিতায় পথচলার আনন্দকে যেভাবে চাঙ্গা রাখেন, তাতে সক্রিয় সাড়া দেন লক্ষ্মণ, শান্ত ও রিয়াদও। সভাপতির সাথে বারবার ফোনে কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটি টের পাচ্ছিলাম।



আমাদের অভিযাত্রায় সবচে' প্রবীণ সদস্য ছিলেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, ইত্তেফাক ও বিটিভির জেলা প্রতিনিধি শ্রদ্ধেয় গোলাম কিবরিয়া জীবন। তিনি একটি মাইক্রোবাসের সামনে বসে নেতৃত্ব দেন। তাঁর সাথে ছিলেন প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন মিলন ও মির্জা জাকির, দৈনিক ইল্শেপাড়ের প্রধান সম্পাদক মাহবুবুর রহমান সুমন, দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের যুগ্ম সম্পাদক হাসান মাহমুদ, প্রেসক্লাবের দীর্ঘদিনের ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডঃ চৌধুরী ইয়াছিন ইকরাম ও বাসস প্রতিনিধি আঃ সামাদ আজাদ জুয়েল। জীবন ভাই সাংবাদিকতায় প্রায় সাড়ে চার দশকের অভিজ্ঞতায় অন্যদের সাথে আলাপচারিতা চালিয়ে পথচলাকে করেছেন আনন্দময়। সক্রিয় সাড়া দেন তাঁর শ্যালকতুল্য মৈশাদীর জাকির, জাকিরের বন্ধু শাহতলীর মিলন, হারবাল চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত বাবুরহাটের হাছান। মুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন সখিপুরের সুমন, পুরাণবাজারের ইয়াছিন ও ফরিদগঞ্জের জুয়েল।



আমি প্রেসক্লাব সভাপতির বদান্যতায় যে মাইক্রোবাসের সামনে বসার সুযোগ পাই, সেটির আরোহী ছিলেন সাবেক সভাপতি, চাঁদপুর প্রতিদিন সম্পাদক ইকবাল হোসেন পাটোয়ারী, তাঁর বিয়াই সময় টিভি ও কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি ফারুক আহম্মদ, চাঁদপুর টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম সভাপতি আল ইমরান শোভন, এনটিভির জেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান খান, চাঁদপুর ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারী তালহা জোবায়ের, দৈনিক সুদীপ্ত চাঁদপুরের পরিচালক এম. আর. ইসলাম বাবু ও চাঁদপুর জমিনের বার্তা সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম অনিক। ইকবাল পাটোয়ারী দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন বলে আমাদের গাড়ির সকলকে তাঁর কথা দিয়ে ক্লাসের মতোই জমিয়ে রেখেছিলেন বেশ। সকল সময় ফারুক ও শোভন এবং মাঝে মাঝে হাবিব খান অধ্যাপক ইকবালের কথায় সক্রিয় সাড়া দিয়ে তাকে প্রাণবন্ত রেখে চলছিলেন। তালহা মাঝে মধ্যে তাল দিলেও অনিক ও বাবু ছিলেন অনেকটাই নীরব। অথচ বাবু কথা বলার লোক ও ভালো উপস্থাপক। আমি সকলের কথায় আনন্দের আতিশয্যে অনেক বেশি হাসছিলাম। সেজন্যে বোধহয় আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল বিষাদ।



আমরা শেখ সেলিম এমপির পোস্টার দেখে দেখে গোপালগঞ্জ জেলা সদরের দিকে যখন এগুচ্ছিলাম, তখন বেলা ১টা। মোবাইল ফোনে হঠাৎ বেজে উঠলো ভাতিজা কামাল হোসেন কাজলের কল। দেখেই সেটি রিসিভ করলাম। সে সালাম জানিয়ে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বললো, চাচা ! আব্বা বারোটার সময় মারা গেছেন। আমি 'ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন' বলে এবং শোক ও সান্ত্বনা জানিয়ে তাকে বললাম, আমি এখন গোপালগঞ্জে। সেজন্যে রাতে জানাজা হলে এতো দূরবর্তী স্থান থেকে ফিরে গিয়ে তাতে অংশ নিতে পারবো না। যদি কাল সকালে হয় অবশ্যই অংশগ্রহণের চেষ্টা করবো। জবাবে কাজল বললো, ঠিক আছে চাচা, আমি ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে যেতে মুরবি্ব ও আত্মীয় স্বজনের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাজা ও দাফনের সময় আপনাকে জানাবো।



আমি ফোনে কথা বলা শেষ না করতেই আমার সহযাত্রীরা কার মৃত্যু হয়েছে সেটি জানলেন। তাদেরকে এ কথাটি জানাতে না জানাতেই আমার সেজো ভাই (কাজী সামছুল আলম)-এর কল লক্ষ্য করলাম আমার ফোনে। তিনিও এ দুঃসংবাদটি নিশ্চিত করলেন।



হাজীগঞ্জের বলাখাল গ্রামে আমার এ সেজো ভাইয়ের নিকটতম প্রতিবেশী ছিলেন আমার ভাতিজা কাজলের আব্বা কাজী মালুম ইসলাম। তিনি আমার সহোদর না হলেও আমার বাবার মেজো সহোদরের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন, অর্থাৎ আমার জেঠার ছেলে মানে জেঠাতো ভাই। তিনি লালমাই রেলস্টেশনে আমার বাবার কোয়ার্টারে যখন আমার দুরন্ত শৈশব কাটছিলো, তখন ও পরবর্তী জীবনে আমাকে তাঁর স্নেহের আতিশয্যে ধন্য করেছিলেন। অশীতিপর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর শেষ বিদায়ের প্রাক্কালে আমার অনুপস্থিত থাকার আশঙ্কায় আমি বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলাম, নস্টালজিক হলাম বার বার।



পেশায় একজন রেল কর্মচারী এবং আওয়ামী লীগের একজন ত্যাগী ও সাহসী কর্মী, বিশেষ করে অসম্ভব বঙ্গবন্ধু ভক্ত ছিলেন আমার জেঠাতো ভাই কাজী মালুম ইসলাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ে তাঁকে যেভাবে অশ্রু ঝরাতে দেখেছি, আমার এলাকায় অন্য কারো মাঝে সেভাবে দেখিনি। আমি বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ দেখে গিয়ে তাকে যদি তার রোগশয্যায় বসে বিবরণ শোনাতে পারতাম, তাহলে তিনি কষ্ট হলেও তার শীর্ণ হাতটি উপরে তুলে আমার মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বলতেন, তুমি অনেক ভালো কাজ করেছো।



তাই টুঙ্গিপাড়া অভিমুখে আমাদের অভিযাত্রায় আমার এই ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদে আমার শোকের মাত্রাটা ছিলো অস্বাভাবিক। যেটা ছিলো অপ্রকাশিত, সেজন্যে কষ্টকর।



সড়ক ও নদীর ওপর রেলসেতু



আমরা ঢাকা-গোপালগঞ্জ হাইওয়ের কাছাকাছি যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে সুন্দর একটি দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। গোপালগঞ্জে নূতন যে রেলপথ নির্মিত হয়েছে, সেটি আমরা যে সড়ক দিয়ে এগুচ্ছিলাম সে সড়ক ও পার্শ্ববর্তী নদীর ওপর নির্মিত সেতু দিয়ে অতিক্রম করেছে। লক্ষ্য করলাম, কিছু পর্যটক এই সুন্দর সেতুটিকে পশ্চাদপটে রেখে ছবি তুলছে। আমাদেরও এমন ছবি তোলার সখ জেগেছিলো, কিন্তু সাড়ে ৭ ঘন্টা সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা গোপালগঞ্জ জেলা সদরে পেঁৗছতে পারিনি বলে এই সখপূরণে কালক্ষেপণ করতে যাইনি।



খেজুর গাছের আধিক্য



আমাদের চাঁদপুর ও সনি্নহিত অঞ্চলে খেজুর গাছ বিরলদৃষ্ট বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সেজন্যে শীতকালে খেজুরের শিরনি ও পায়েস খাওয়া এবং খেজুরের রসে বানানো তরল গুড়ে চিতই পিঠা খাওয়ার স্বাদ নেয়ার সুযোগ শতকরা নব্বই জনই পান না। আমরা গোপালগঞ্জের সর্বত্র লক্ষ্য করলাম খেজুর গাছের আধিক্য। সড়কের পাশে যেমন খেজুর গাছ রয়েছে, তেমনি পার্শ্ববর্তী বাগানেও রয়েছে। আর সড়কের দু পাশে লতাগুল্মের আধিক্যটা অস্বাভাবিকই মনে হলো। এগুলো খেয়ে কমাবার মতো গরু-ছাগলের বিচরণও দেখলাম না। হালকা জনবসতি হবার কারণে মানুষের হাত এসব লতাগুল্ম ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় ছোট গাছপালায় মোটেও পড়ে না বলে মনে হলো। সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ ঢাকা-গোপালগঞ্জ-খুলনা হাইওয়েকে অনেক মসৃণতা উপহার দিতে পারলেও সড়কের দুপাশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় দৃষ্টিনন্দন করতে পারেনি। আমাদের সহযাত্রীদের কেউ কেউ বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এলাকায় এমন দৃশ্যপট শোভন নয়, বরং আপত্তিকর এবং মশকের নিরাপদ বসবাসে সহায়ক।



হাইওয়ের পাশে কেবলই নির্দেশিকা ও তোরণ



আমরা মাদারীপুর শহরে বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দেখেছি অসংখ্য তোরণ। তারপর ঢাকা-গোপালগঞ্জ হাইওয়েতে উঠে লক্ষ্য করলাম একের পর এক সুউচ্চ তোরণ, যেগুলো শোকের মাসের আবহ তৈরিতে যথার্থই মনে হচ্ছিলো। আরো লক্ষ্য করলাম, এই সড়কের দু পাশে গোপালগঞ্জ জেলা শহরের লাগ্-অস্তিত্ব নেই, তবে দৃষ্টিশক্তির আওতায় নিকটবর্তী স্থানে রয়েছে শহরটির ভিন্ন মাত্রার অস্তিত্ব। কিছুক্ষণ পরপর সড়কের এক পাশে নূতন রেলপথের বিভিন্ন স্টেশনে যাবার পথনির্দেশিকা এবং অপর পাশে শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাবার নির্দেশিকা শক্ত খুঁটিতে সাঁটানো রয়েছে। আমরা এগুলো কেবলই দেখলাম, কিন্তু সময়াভাবে টুঙ্গিপাড়া ছাড়া অন্য কোথাও যাবার সুযোগ যে নিশ্চিতভাবে পাবো না সেটা কষ্টকর হলেও অনুধাবন করলাম।



হঠাৎ থেমে যাওয়া



ঘড়ির কাঁটায় একটা পেরিয়ে গেছে। এখনও আমরা ঢাকা-গোপালগঞ্জ হাইওয়েতে। কখন পেঁৗছাবো টুঙ্গিপাড়া, কখন দুপুরের খাবার খাবো ইত্যাদি ভাবনায় উসখুস করছিলাম। এমন সময় দেখলাম, হাইওয়েতে আমাদের সামনের দুটি মাইক্রোবাস হঠাৎ করেই থেমে গেছে। কিছুটা বিস্মিত হয়ে আমরাও থামলাম। প্রেসক্লাব সেক্রেটারী লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর জানালেন, অনেকের ক্ষুধা পেয়েছে। সেজন্যে হাইওয়ে রেস্তোরাঁ দেখেই আমরা থেমে গেলাম। আপনিও ইচ্ছে করলে খেতে পারেন। কিন্তু জেঠাতো ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ এবং চাঁদপুরের বাসা থেকে বেরুবার ৮ ঘন্টা পেরিয়ে যাবার পরও টুঙ্গিপাড়া অভিমুখী সড়কে প্রবেশ করতে না পরায় কেনো যেনো একটা উৎকণ্ঠা কাজ করছিলো মনে। এতে পেটের ক্ষুধা ও চোখের ক্ষুধা যেনো উবে যাচ্ছিলো মনের ক্ষুধার চাপে। পথচারীদের জিজ্ঞেস করলাম, টুঙ্গিপাড়া আর কতো দূর? তারা বললো, একটু সামনে গেলেই খুঁজে পাবেন টুঙ্গিপাড়া সড়ক এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনারা পেঁৗছে যাবেন বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধে। (চলবে)



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৫৩০২৬
পুরোন সংখ্যা