চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ১০ অক্টোবর ২০১৯, ২৫ আশ্বিন ১৪২৬, ১০ সফর ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


 


০৩। তিনিই আদি, তিনিই অন্ত; তিনিই ব্যক্ত ও তিনিই গুপ্ত এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।


৪। তিনিই ছয় দিবসে আকাশম-লী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন; অতঃপর 'আরশে সমাসীন হইয়াছেন। তিনি জানেন যাহা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যাহা কিছু উহা হইতে বাহির হয় এবং আকাশ হইতে যাহা কিছু নামে ও আকাশে যাহা কিছু উত্থিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেনো_তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যাহা কিছু করো আল্লাহ তাহা দেখেন।


 


assets/data_files/web

সংশয় যেখানে থাকে সফলতা সেখানে ধীর পদক্ষেপে আসে।


-জন রে।


 


 


যে ব্যক্তি উদর পূর্তি করিয়া আহার করে, বেহেশতের দিকে তাহার জন্য পথ উন্মুক্ত হয় না।


 


যে শিক্ষা গ্রহণ করে তার মৃত্যু নেই।


 


ফটো গ্যালারি
ভিন্ন চোখে দেখা দিল্লী
এ.এস.এম. শফিকুর রহমান
১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


হঠাৎ করেই চলে গেলাম ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী। উদ্দেশ্য আমার শারীরিক চিকিৎসা, পরামর্শ ও সেবা গ্রহণ। তারিখ ছিল জুন মাসের ৩। আমার সাথে ছিলেন আমার সহধর্মিণী জাহানারা বেগম। ঢাকায় জুন মাসের ২ তারিখ রাতে সেহেরী খেয়ে জুন মাসের ৩ তারিখ বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে নয়াদিল্লীর উদ্দেশ্যে উড়াল দিলাম বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নং- বিজি ০০৯৭-এ। ক্যাপ্টেন তাপসের নেৃতত্বে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভূমি থেকে ৩৬ হাজার ফুট উপর দিয়ে বিমান উড়ে স্থানীয় সময় ৪টা ৫০ মিনিটে নয়াদিল্লী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করে। নিয়মিত ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে লাগেজ জোন থেকে লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরের বাইরে এসে ভাড়া করা ট্যাক্সিতে ওঠার জন্যে নামতেই হঠাৎ মনে হলো আমার শরীরে কে যেনো আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ তাপমাত্রা তখন ৪২ ডিগ্রি, যা আমাদের কাছে অসহনীয় ছিল। বিমানের টিকেট ক্রয়, পাসপোর্টে ডলারের পরিমাণ উল্লেখসহ যাবতীয় কাজগুলো আমার বড় জামাই রিটনের সহকারী মাহবুব কর্তৃক ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীতে  আমার ছোট মেয়ের বাসা থেকে বিমান বন্দরে পৌঁছা ও ইমিগ্রেশনের কাজ সারা পর্যন্ত এই মাহবুব সহযোগিতা করেছে।



উল্লেখ করা যেতে পারে যে, দিল্লী যাওয়ার পূর্বেই দিল্লীতে থাকার জন্যে অনলাইনে যোগাযোগ করে নয়াদিল্লীর কালকাজী এলাকার রাজ সাহেব সার্ভিস এপার্টমেন্টে একটি রুম অগ্রিম টাকা দিয়ে এক মাসের জন্যে ভাড়া করেছিলাম। সেইভাবেই এপার্টমেন্টের উদ্দেশ্যে ট্যাক্সি ভাড়া নিলাম। প্রায় এক ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিয়ে কালকাজী এলাকার বি ১৩৫ বাড়ির সামনে পৌঁছলাম। চাঁদপুর থেকে রওয়ানা করার আগে আমার সিনিয়র অফিস কলিগ বাবু আশুতোষ সরকারের নিকট থেকে ভারতীয় বোদা ফোনের একটি সিম নিয়ে যাই, যা দিল্লী অবতরণ করার সাথে সাথে আমার মোবাইল ফোনে প্রতিস্থাপন করা হয়। এপাটর্মেন্টের সামনে পৌঁছে মোবাইলফোন থেকে বাড়ির মালিক রাজ সাহেবকে ফোন দেই, যিনি একজন শিখ। ফোন করার সাথে সাথে ভেতর থেকে বাড়ির কেয়ারটেকার বাহাদুর নামে এক লোক এসে আমাদেরকে এপার্টমেন্টের ভাড়া কক্ষে নিয়ে যায় এবং সাথের লাগেজগুলো ঠিকভাবে সাজিয়ে রাখে। ইতিমধ্যে ইফতারের সময় হয়ে যায়। আমাদের সাথে থাকা চিনি ও চিড়া ভিজিয়ে কোনোমতে ইফতার সেরে নিলাম এবং মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিলাম।



আধা ঘণ্টা পর আমাদের কক্ষে থাকা টিভি চ্যানেলের জি বাংলা চালু করা মাত্র ঘোষণা দেখলাম এবং শুনলাম আগামী ৪ জুন পবিত্র ঈদুল ফিতর। অচেনা জায়গা কোথায় কোন্ মসজিদে নামাজ আদায় করবো, কিভাবে সেখানে যাবো বা নামাজের সময় এ সম্পর্কে জানার জন্য আমি বাড়ির মালিক রাজ সাহেবের দ্বারস্থ হলাম। তিনি ফোনে যোগাযোগ করে সকাল ৭টায় দিল্লী জামে মসজিদে নামাজ আদায়ের পরামর্শ দিলেন এবং সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে দেয়ার জন্য বাড়ির কেয়ারটেকার বালাম সিংহকে নির্দেশ দিলেন। তারপরে এশার নামাজ পড়ে নিলাম। কেয়ারটেকার বাহাদুর নিজের বাসা থেকে আমাদের জন্যে সবজি, মাছ ও ভাত এনে দিলেন, যা খেয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ৪ জুন ঈদুল ফিতর। ঈদের নাস্তা খাবার বলতে আমাদের তেমন কিছু ছিল না। শুধু মুড়ি আর চা পান করে ভাড়া করা অটোরিকশায় আমি দিল্লী জামে মসজিদের দিকে রওয়ানা করলাম। ২৫ মিনিট পর পৌঁছে গেলো মসজিদের কাছে। তখন দেখলাম মূল মসজিদ ছেড়ে রাস্তার অনেক দূরে মুসল্লিগণ নামাজে দাঁড়িয়ে গেছেন। আমিও নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। নামাজ আদায় শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী কোলাকুলি সেরে কুশল বিনিময় করার জন্যে মাত্র বাঙালি একজনকে পেলাম। তার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরে।



মুঘল স¤্রাট শাহজাহান ১৬৫০ থেকে ১৬৫৬ সালের মধ্যে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। পাঁচ হাজার শ্রমিক এই মসজিদ নির্মাণে কাজ করে। স¤্রাট শাহজাহানের প্রধানমন্ত্রী শাআদুল্লাহ খান মসজিদের নির্মাণ কাজ তদারকি করেন। এর নির্মাণ কাজে সেই কালে এক মিলিয়ন রুপী খরচ হয়। ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুলাই উজবেকিস্তানের বুখারার সৈয়দ আবদুল গফুর বুখারার ইমামতিতে জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মসজিদ উদ্বোধন করা হয়। পঁচিশ হাজার মুসল্লী এক সাথে এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারে। ১৮৫৭ সালের বিপ্লবে জয়ের পর বৃটিশ সৈন্যরা এই মসজিদে আস্তানা করে এবং মসজিদটি ধ্বংস করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। যা তখনকার সময়ে বিরোধিতার জন্যে থমকে যায়। তবে মসজিদের কিছু অংশ ব্রিটিশ আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৪৮ সালে হায়দারাবাদের নিয়মে মসজিদের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনঃ নির্মাণে ৩ লক্ষ রুপী ব্যয় হয়। ভারতের সবচেয়ে বড় মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করার সুযোগে এতোটা আনন্দ পেলাম যা লিখে প্রকাশ করা যায় না। অনেক চেষ্টা করেও মসজিদের ভেতরের অংশে যেতে পারি নি। মুসল্লিগণের ভিড় পেরিয়ে মসজিদের প্রবেশ মুখে প্রধান গেট পর্যন্ত যেতে পেরেছি। মসজিদের এক পাশে স¤্রাট শাহজাহানের নির্মিত রেডফোর্ট যা লাল কিল্লাহ হিসেবে পরিচিত। ইউনেস্কোর ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। ১৭ শতাব্দীতে নির্মিত এই রেডফোর্ট ঈদের দিন বন্ধ থাকার কারণে দেখার সুযোগ হয়নি। মসজিদের আরেক পাশে বিখ্যাত করিম হোটেল। ঢাকার হাজীর বিরানী হোটেলের ন্যায় এই করিম হোটেল ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত, যাতে দিল্লীর সবচেয়ে উন্নতমানের কাবাবসহ খাবার তৈরি করা হয়। কিন্তু হোটেলের কাছে গেলেও হোটেলটি ঈদের কারণে বন্ধ ছিল। পরে দিল্লীর মেট্রো রেলে কালকাজীস্থ আমার বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। ১৪টি স্টেশন অতিক্রম করে নেহেরু প্লেস স্টেশনে নেমে সিএনজিতে চলে আসলাম আমার ভাড়া করা বাসায়। বাসায় এসে কাপড় চোপড় পরিবর্তন করে ফ্রেশ হয়ে কেয়ারটেকারের দেয়া রুটি, ডিম ও চা দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। ঈদের কোনো আনন্দ আমেজ বলতে কিছুই আমাদের ছিল না। আমি যে এপার্টমেন্টে আছি তা আমাদের ঢাকার গুলশান বনানীর মতো একটি এলাকা। যেখানে অভিজাত ও বিত্তবানদের বসবাস। এই এলাকাটি হিন্দু এবং শিখ অধ্যুষিত এলাকা।



৬ জুন দিল্লীর নিফাসউদ্দিন পূর্ব এলাকায় অবস্থিত মুঘল স¤্রাট হুমায়ুনের সমাধি দেখার জন্য সিএনজিতে গেলাম। টিকেট কেটে প্রবেশ করতে হবে। প্রবেশ গেটে ৩টি টিকেট কাউন্টার। এর মধ্যে ২টি ভারতীয়দের জন্য নির্দিষ্ট। কারণ ভারতীয়দের টিকেটের মূল্য ৪০ রুপী আর বিদেশীদের জন্য নির্দিষ্ট অপর কাউন্টারে প্রবেশ মূল্য ৬০০ ভারতীয় রুপী। বাংলাদেশের অনেক পর্যটককে দেখলাম ভারতীয় পরিচয়ে ৪০ রুপী মূল্যের টিকেট কেটে অনায়াসে ভিতরে প্রবেশ করে। কিন্তু আমার সাহস হলো না। আমি ৬০০ রুপী দিয়ে নির্দিষ্ট বিদেশী কাউন্টার থেকে টিকেট নিয়ে সমাধি প্রাঙ্গণে গেলাম। বিরাট এলাকা। মুঘল আমলে নির্মিত ইটের প্রাচীরে ঘেরা এই সমাধি স্থানটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। ২টি গেট পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলাম সমাধি দেখার জন্যে। ভিতরে গিয়ে দেখলাম, পাথর মোড়াই স¤্রাট হুমায়ুনের সমাধির উপরে আবার ইটের তৈরি ঘর। সমাধির কাছে দাঁড়িয়ে স¤্রাটের কবর জিয়ারত করলাম। জানা যায় ১৫৬৯-৭০ সালে স¤্রাট হুমায়ুনের প্রথম স্ত্রী বেগা বেগম বা হাজী বেগম স¤্রাটের মৃত্যুর পর এই সমাধিক্ষেত্র কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। পারসিয়ান স্থপতি মিরাজ মির্জা গিয়াস এবং তার ছেলে সাইয়েদ মোহাম্মদ এই সমাধি ও কমপ্লেক্সের নকশা তৈরি করেন। এর পাশে আছে ঈসা খাঁ নিয়াজির সমাধি। এই সমাধি কমপ্লেক্সে স¤্রাট হুমায়ুনের স্ত্রী বেগা বেগম, হামিদা বেগম এবং দৌহিত্র দারা শিখুরের কবর। কথিত আছে যে, মুঘল সা¤্রাজ্যের শেষ স¤্রাট বাহাদুর শাহ। ১৮৫৭ সালের বিপ্লবে পরাজিত হয়ে তিন রাজ কন্যাসহ এই কমপ্লেক্সে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সেনা বাহিনীর ক্যাপ্টেন হডসন তাদেরকে ধরে রেংগুনে নির্বাসন পাঠিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, হুমায়ুন এবং ঈসা খাঁর সমাধি কমপ্লেক্স ছোট একটি সড়ক দ্বারা বিভক্ত এবং সমগ্র এলাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। কমপ্লেক্সটি বর্তমানে আগা খান ফাউন্ডেশন দ্বারা পরিচালনা করা হয়।

রাষ্ট্রপতি ভবন। ভারতের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন। নয়াদিল্লীর পশ্চিম রাজপথে এর অবস্থান। বৃটিশ শাসন আমলে এই রাষ্ট্রপতি ভবন ভাইস রয়ের অফিস ছিল। এখানে ভূমির পরিমাণ ৩২০ একর এবং আয়তন ১৪ হাজার স্কয়ার মিটার। রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষ, দরবার হল, অতিথি আপ্যায়ন কক্ষ, অভ্যর্থনা কক্ষসহ ৩৪০টি কক্ষআছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতির ভবনের মধ্যে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন অন্যতম বড় ভবন। রাষ্ট্রপতি ভবনে মুঘল গার্ডেন নামে একটি চমৎকার সুন্দর বাগান আছে। এই রাষ্ট্রপতি ভবনের কাছে সাউথ ব্লক এবং নর্থ ব্লক। সাউথ ব্লকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দপ্তর। অপরদিকে নর্থব্লকে আছে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দপ্তর। জানা যায়, কলকাতা থেকে ভারতের রাজধানী দিল্লীতে ১৯১১ সালে এই ভাইসরয়ের অফিস স্থানান্তর করা হয়। তখনকার এই ভাইসরয় অফিস বর্তমানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন। রাষ্ট্রপতি ভবন নির্মাণে প্রায় ১৭ বছর সময় লাগে। ১৯২৯ সালে নির্মাণ শেষ হলে ভাইসরয় ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত থেকেছেন। ১৯৫০ সালে ভারত প্রজাতন্ত্র হওয়ার সাথে সাথে ভারতের রাষ্ট্রপতি অফিস হিসেবে ব্যবহার করা আরম্ভ হয়। রাষ্ট্রপতি ভবনের কিছু দূরেই ভারতের পার্লামেন্ট ভবন অবস্থিত। এই পার্লামেন্টে ভারতের লোকসভা এবং রাজ্যসভার অধিবেশন হয়। বৃটিশ স্থপতি অ্যাডউইন ল্যান্ডসির লুটেনস এবং হারবাট বেকারের তত্ত্বাবধানে ৭৯০ আসন বিশিষ্ট ভারতের এই হাউজ অব পার্লামেন্ট নির্মাণ করা হয়। প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ভবন ও হাউজ অব পার্লামেন্টের নিরাপত্তাজনিত কারণে ভেতরে প্রবেশ করা যায় নি।



১০ জুন ১০০ টাকায় সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে ইন্ডিয়া গেইট দেখতে গেলাম। বৃটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ৭০ হাজার ভারতীয় সৈন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ১৯১৪ সালে, ১৯২১ সালের মধ্যে ফ্রান্স, ফ্ল্যানডার্ম, মেসোপোটামিয়া, পার্সিয়া, পূর্ব আফ্রিকা এবং ২য় অ্যাংলো আফগান যুদ্ধে ১৩,৩০০ ভারতীয় সৈন্য মারা যায়। তাদের স্মরণে এই গেইট নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সকল ভারতীয় সৈন্য মারা যায় তাদের স্মরণেও ‘আমাদের জোয়ান জোতি’ নামে গেট সংলগ্ন একট শিখা আছে। এটা ভারতের সবচেয়ে বড় ওয়ার মেমোরিয়াল গেট। এখানে একটি বড় পানির ফোয়ারা এবং দর্শনীয় একটি শিশু পার্ক আছে। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রজাতন্ত্র প্যারেড এখানে অনুষ্ঠিত হয় এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই গেইট পরিদর্শন করেন।

কুতুব মিনার দিল্লীর মেহেরুল এলাকায় অবস্থিত। ইটের তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার। গোড়ায় এটির প্রশস্ততা ৪৭ ফুট। তবে ২৩৯ ফুট উচ্চতার এই মিনারের উপরিভাগ ৯ ফুট চওড়া। দিল্লীতে সুলতানী শাসন স্থাপনের প্রতিষ্ঠাতা কুতুব উদ্দিন আইবেক এই মিনারের প্রতিষ্ঠাতা। ১১৯২ সালে তিনি এর নির্মাণ কাজ আরম্ভ করেন। কুতুব উদ্দিনের উত্তরসূরি তার জামাতা শামছুদ্দিন ইলতুতমিশ ১২২০ সালে এই মিনারের নির্মাণ কাজ শেষ করেন। ১৩৬৯ সালে বজ্রপাতে মিনারের উপরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফিরোজ শাহ তুঘলক ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা পুনঃনির্মাণ করেন। স¤্রাট হুমায়ুন যখন নির্বাসনে তখন শেরশাহ সুরী এই মিনারের প্রবেশ পথ নির্মাণ করেন। মিনারের চারদিকে কুতুব কমপ্লেক্সের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে। ১৫০৫ সালে ভূমিকম্পে কুতুব মিনার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৃটিশ সেনাবাহিনীর মেজর রবার্ট স্মিথ ১৮২৮ সালে মিনার পুনঃনির্মাণ করেন।  



লোটাস টেম্পল একটি প্রার্থনা ঘর। দিল্লীর নেহেরু প্লেস এবং কালকাজী মন্দিরের ৫০০ মিটারের মধ্যে অবস্থান। ২৬  একর জায়গার মাঝখানে প্রার্থনা ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে। শাপলা ফুলের আদলে নির্মাণ করা এই প্রার্থনা ঘরটি দেখার জন্যে প্রচুর দর্শক সমাগম হয়। এই প্রার্থনা ঘরে প্রবেশের ৯টি দরজা সহ একটি হলরুম আছে, যাতে এক সঙ্গে ২৫০০ লোকের সমাগম করা যায়। এই প্রার্থনা ঘরটি সকল ধর্মের লোকজনের জন্যে উন্মুক্ত। এটির পাশে রয়েছে একটি বিশাল শিশু পার্ক এবং তথ্য কেন্দ্র, যেখানে এই টেম্পলের সকল তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

আমি দিল্লীতে প্রায় এক মাস ছিলাম। এই সময়ের মধ্যে নিজের চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করি এবং দিল্লীর উল্লেখিত দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখার সুযোগ হয়। প্রচ- গরমের কারণে দিল্লীর সড়কের ফুটপাতে দিনের বেলায় লোকজনের চলাচল কম থাকে। গণ পরিবহনের মধ্যে আছে মেট্রো রেল, দিল্লীর ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের অধীনে দিল্লী বাস ট্রান্সপোর্ট এবং প্রাইভেট পরিবহনের মধ্যে উবার, ওলাও ইত্যাদি পরিবহন। আমি বেশির ভাগ সময় সিএনজি অটোরিকশা এবং উবারে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেছি। দিল্লীতে অসংখ্য সড়ক এবং ফ্লাইওভার। যানজট নেই। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় লাল সবুজ বাতির সংকেত চালকগণ মেনে চলে। এক মাসে দিল্লী শহরে ইউনিফর্ম ছাড়া পুলিশ আমার চোখে পড়েনি। এসব পরিবহনের ভাড়া আমাদের দেশের তুলনায় অনেক কম। দিল্লীর অধিকাংশ সড়কের দুই পাশে এবং মাঝখানের আইল্যান্ডে বড় বড় গাছ আছে। সেগুলো প্রচ- গরম থেকে মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেয়। প্রচ- গরমের মধ্যে সড়কের মোড়ে মোড়ে দেখা যায় বিত্তবান ভারতীয়দের সেবাধর্মী কাজ। অর্থাৎ তৃষ্ণার্ত ও গরমে অতিষ্ঠ পথচারীদের ঠা-া শরবত পান করানো হয়, যাতে গরম থেকে কিছুটা হলেও মানুষ স্বস্তি পায়। গিরিনরগর জামে মসজিদে  জুমার নামাজ আদায়ের পর আমার নিজের শরবত পান করার সুযোগ হয়। এই সেবাধর্মী কাজটি বেশির ভাগ মুসলিম বিত্তবানদের দ্বারা পরিচালিত হয়।

প্রশাসনিকভাবে দিল্লীকে শাসন করা হয় যথাক্রমে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রাদেশিক মর্যাদায় ল্যাঃ গভর্নর শাসিত মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের মাধ্যমে। আর নাগরিক সেবাধর্মী কাজে দিল্লী নগরী যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে বিভক্ত। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ইত্যাদি সেবার বিল ত্রৈমাসিকভাবে সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থা সমূহ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আদায় করে থাকে। আমি দিল্লীতে অভিনব একটি বিষয় দেখলাম, যা হলোÑবড় বড় দোকান বিশেষ করে কাপড়ের দোকানগুলো তাদের মালামাল বিক্রির জন্যে দালাল বা ৩য় ব্যক্তিকে নিয়োজিত করে। কুতুব মিনার দেখতে আসার সময় একটি কাপড়ের দোকানে যাওয়ার সময় এই নজির দেখতে পাই। কারণ আমি যে সিএনজি অটোরিকশায় গিয়েছি তার চালক তার দেখানো নির্দিষ্ট দোকানে কাপড় দেখতে যাইনি বিধায় আমার উপর অসন্তুষ্ট হয় এবং এরকম অনেক জায়গায় এই অবস্থা দেখতে পেয়েছি।

    কালকাজীতে এক মাস অবস্থানকালে কোথাও কোনো মুসলমানের সঙ্গে দেখা হয়নি। কালকাজীর পাশে সি.আর. পার্ক এলাকায় কাঁচা বাজার আছে, যেখান থেকে দু-একদিন পর মাছ, শাক-সবজি ক্রয় করেছি। এ বাজারে সকলেই বাংলায় কথা বলে, যাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের খুলনা, যশোর ও ঢাকার কেরানিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। আমি যে অ্যাপার্টমেন্টে ছিলাম সেখানে রাখা সকল সরঞ্জামসহ রান্না করার ব্যবস্থা ছিল। প্রায় ২ দিন কেয়ারটেকারের বাসা থেকে সরবরাহকৃত খাবার খেলেও পরে নিজে বাজার করেই আমার সহধর্মিণীর দ্বারা রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এখানকার মাছ বাজারের ভোক্তা বা ক্রেতার জন্যে প্রথম সুবিধা হলো যে, ১০০ গ্রাম ২০০ গ্রাম অর্থাৎ প্রয়োজন অনুসারে মাছ ক্রয় করা যায় এবং মাছ বিক্রেতারাই কেটে বানিয়ে দেয়। এটি আমাদের দেশে চিন্তা করাই যায় না।

উল্লেখ্য, আমার একটি খারাপ অভ্যাস যে, নিয়মিত পান খাই। যাবার সময় বাংলাদেশ থেকে যে পান-সুপারি নিয়েছিলাম তাতে ৮ দিন চলে এবং ৮ দিন পর পানের খোঁজে বলা যায় দিল্øীর পথে পথে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। একাধারে ৩ দিন খোঁজ করে কালকাজী এলাকার সড়কের পাশেই ছোট একটি দোকানে পানের খোঁজ পেলাম। পরে সেখান থেকে প্রতিটি পান ক্রয় করি ১০ রুপী করে। অবশিষ্ট ক’দিন এভাবে পান খেলাম। দিল্লী থাকাকালে আমি মোবাইলে আমার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করি।

    ভিন্ন চোখে দেখা এই দিল্লীতে আমি একমাস ছিলাম। জুলাই মাসের তিন তারিখ ৬টায় বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নং-বিজি-০০৯৮-এ দিল্লী থেকে উড়াল দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। ক্যাপ্টেন তাপসের নেতৃত্বে এই বিমান ঢাকায় অবতরণ করে বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায়। ইমিগ্রেশন কাজ সেরে বিমান বন্দর থেকে বের হলেই বড় জামাইর সহকারী মাহবুবকে দেখতে পাই গাড়ি নিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। বলা দরকার, চাঁদপুর থেকে যেদিন দিল্লীর উদ্দেশ্যে ঢাকা রওয়ানা করি সেদিন রফরফ লঞ্চে ঈদুল ফিতরের ছুটির কারণে যাত্রীদের প্রচ- ভিড় ছিল এবং যানজটে রেলওয়ে ক্লাবের সামনে আটকে গিয়েছিলাম। সেই সময় আমার সাথে আমার ছোট মেয়ের জামাই রিপন ছিল এবং যথেষ্ট কষ্ট করে আমাদের লাগেজ মাথায় নিয়ে হেঁটে রফরফে উঠিয়ে দেয়। সে না থাকলে আমরা লঞ্চে উঠে ঢাকা আসতে পারতাম না। অর্থাৎ দিল্লী ভ্রমণের যাত্রায় এবং ফেরায় মাহবুব এবং জামাই রিপনের কষ্টের কথা মনে রেখে তাদের দোয়া করে ভিন্নচোখে দেখা দিল্লী লেখা শেষ করছি।

লেখক  : এ.এস.এম. শফিকুর রহমান, লেখক ও সমাজকর্মী। মোবাইল ফোন : ০১৬৭০-৮৭৯-৫৮৯।

 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩০৩৭১৫
পুরোন সংখ্যা