চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ১০ অক্টোবর ২০১৯, ২৫ আশ্বিন ১৪২৬, ১০ সফর ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৭-সূরা হাদীদ


২৯ আয়াত, ৪ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


 


০৩। তিনিই আদি, তিনিই অন্ত; তিনিই ব্যক্ত ও তিনিই গুপ্ত এবং তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত।


৪। তিনিই ছয় দিবসে আকাশম-লী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন; অতঃপর 'আরশে সমাসীন হইয়াছেন। তিনি জানেন যাহা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যাহা কিছু উহা হইতে বাহির হয় এবং আকাশ হইতে যাহা কিছু নামে ও আকাশে যাহা কিছু উত্থিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেনো_তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, তোমরা যাহা কিছু করো আল্লাহ তাহা দেখেন।


 


assets/data_files/web

সংশয় যেখানে থাকে সফলতা সেখানে ধীর পদক্ষেপে আসে।


-জন রে।


 


 


যে ব্যক্তি উদর পূর্তি করিয়া আহার করে, বেহেশতের দিকে তাহার জন্য পথ উন্মুক্ত হয় না।


 


যে শিক্ষা গ্রহণ করে তার মৃত্যু নেই।


 


ফটো গ্যালারি
আমাদের উদাহরণ : কমরেড নিরোদ বরণ অধিকারী
জাহাঙ্গীর হোসেন
১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


প্রথমে একটি অণুগল্পের মধ্য দিয়ে শুরু করা যায় আজকের এ প্রবন্ধটি। পানি গরম করতে চুলায় একটি পাত্র রাখা হলো। ওই পাত্রে জীবিত একটি ব্যাঙ রাখা হলো। চুলাতে আগুন ধরানো হলো। ব্যাঙটি ধীরে ধীরে গরম তাপ অনুভব করতে লাগলো। অনেকক্ষণ ধরে ব্যাঙটি সেই পাত্রেই অবস্থান করতে লাগলো। পানির তাপমাত্রা এমনই চরম পর্যায়ে চলে গেল যে, তখন ব্যাঙটি পাত্র থেকে সরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। পানি অতিমাত্রায় উত্তপ্ত হওয়ায় ব্যাঙটি তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তার পক্ষে লাফ দিয়ে আর রক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকলো না। অবশেষে ব্যাঙটি গরম পানিতেই গলে নির্মম মৃত্যুতে নিঃশেষ হলো। বর্তমানে একজন বিপ্লবীর জন্য এ উদাহরণটির সাযুজ্য খুঁজে পাচ্ছি। একজন বিপ্লবী ও সংগ্রামী জেনেশুনেই ত্যাগ স্বীকার করেন। জীবনযাপন অতিকষ্টের ভেবেও অতি কঠিন কাজ বাস্তবায়নের সংগ্রামে নিয়জিত হন। হিংসা-লোভ-লালসা, প্রদর্শনবাদ, লুটপাট ও ইমেজবাদকে উপেক্ষা করে নির্দ্বিধায় কাজ করে যান। কঠিন কাজকে ব্রত হিসেবে নিয়ে সামনে এগুনোটাই হয়ে উঠে তার কর্মসূচি, একমাত্র বিষয়সূচি। মানবসেবায় ধীরে ধীরে একাকার হয়ে যাওয়াই তার প্রচেষ্টা। প্রকৃত বিপ্লবীরা অতি কষ্টে থাকেন, অভাব-অনটনে দিনাতিপাত করেন-এ সবই মানুষের জন্যে। শেষ পর্যন্ত অতিকষ্টকে পুষে রাখা ব্যাঙ লাফিয়ে বাঁচতে চায়, কিন্তু প্রকৃত বিপ্লবীরা তা হতে দেয় না। তিনিও সে চেষ্টায় ছিলেন।

আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও আপনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড নিরোদ বরণ অধিকারী। আমরা যারা সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখি, আমরা যারা বিদ্যমান সমাজকে পাল্টানোর স্বপ্নবাজ-তাদের অনুকরণীয় উপকরণ কমরেড নিরোদ। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চাঁদপুর জেলার সাবেক সভাপতি, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে দেহদানকারীদের মধ্যে বাংলাদেশে তৃতীয় ব্যক্তি। ব্যাঙ দিয়ে যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ল্যাবরেটরীতে বিজ্ঞান শিক্ষায় অগ্রসর হতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, সেটা কাটাকাটি করেন-এমনই একটা করার জন্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে উন্নত করতে মানবসেবায় নিজের দেহটাকে বিলিয়ে দিয়েছেন। হিন্দু ধর্মে উঁচু বর্ণের লোক হয়েও বিরল কাজটি করতে তিনি দ্বিধা করেননি।

কমিউনিস্ট পার্টির হাল ধরেছেন দীর্ঘ ১৭ বছর। চাঁদপুর জেলার সুপরিচিত মুখ ও বিপ্লবী কমরেড আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৯৭ সালে সিপিবির উক্ত পদে অধিষ্ঠিত হন তিনি। অবশেষে তিনি ২০১৪ সালে অসুস্থতার কারণে অব্যাহতি নেন। কমরেড নিরোদ বরণ অধিকারী গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ তারিখে  দিনের ২টা ৪৩ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। চাঁদপুর সদরের মৈশাদী ইউনিয়নের বাহের খলিশাডুলীতে (বর্তমানে পৌর এলাকার অধীন)। কলেজে পড়াবস্থায় কমরেড নিরোদ ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। চাঁদপুর কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়াবস্থায় শিক্ষক দিলীপ প-িত ও সৈয়দ আব্দুস সাত্তার স্যারের অনুপ্রেরণায় মূলত বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে অংশ নেন। তিনি ১৯৬৪ সালে এসএসসি ও ১৯৬৮ সালে চাঁদপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর বিএ পরীক্ষা দিয়ে ১৯৭০ সনের ১১ আগস্ট বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর পূর্বে তিনি শাহতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে খ-কালীন শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি মঞ্জু চক্রবর্তীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যিনি বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁর একমাত্র সন্তান সজীব অধিকারী স্বাগত। যিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন চাঁদপুর জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সাবেক সহ-সম্পাদক। কমরেড নিরোদ ২০০৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন।

লেখার শুরুতেই একটি উপমা উল্লেখ করেছিলাম, সে নিরিখেই আরো কিছু স্মৃতি যে রোমন্থন করতেই হয়। আমি ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বাসদ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। বাসদের অঙ্গ সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। এক পর্যায়ে বাসদ ও  ছাত্রফ্রন্ট থেকে পদত্যাগ করি।

১৯৯৭ সাল থেকে আমি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাথে অভিনয় বিভাগে কাজ করি। সে সুবাদে সিপিবির অধ্যাপক দুলাল দাস, নিরোদ বরণ অধিকারী ও জাকির হোসেন মিয়াজীর সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল। আমি যখন বাসদের সাথে আর কাজ করছিলাম না তখন অধ্যাপক দুলাল দাস ছাত্র ইউনিয়ন করার জন্যে আমাকে প্রস্তাব দেন। দেড় বছর কোনো সম্মতি দেইনি। একদিন আমাকে নিমন্ত্রণ করা হলো বাবুরহাট বাজারে কমিউনিস্ট পার্টির পথসভায়। আমি সেখানে অনুষ্ঠানটি দেখতে গেলাম। নিরোদ দা আমাকে দেখে খুশি হলেন। পথসভার শুরুতেই কমরেড নিরোদ ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি সম্বোধন করে বক্তৃতার জন্যে আমার নাম ঘোষণা করলেন। আমি তখন বিব্রত হই, কারণ সে সময় ছাত্র ইউনিয়নের কিছুই ছিলাম না। তবে জনগণকে বুঝতে দেইনি। আমি বক্তৃতা রাখলাম। এক পর্যায়ে ভাবলাম, সহজ সরল মনের মানুষ এ দলের লোকজন। ছাত্র ইউনিয়ন যেহেতু করার জন্যে এতো করে বলছে, করে দেখি সংগঠনটি। ভাবতে শুরু করলাম যে, সংগঠনটির ঐতিহ্য আছে, আদর্শ আছে, তাই শুরু করে দিই। ২০০৪ সালের ৯ জুন দীর্ঘ ১২ বছর পর পুনরায় চাঁদপুরে গোড়াপত্তন হতে শুরু করলো ছাত্র ইউনিয়ন।

এভাবেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে থাকে এ বিপ্লবীর সাথে। কমরেড নিরোদ বরণ অধিকারী হাস্য-রস সম্বলিত বক্তৃতা দেয়ায় উপস্থিত জনতা তাঁর বক্তব্য লুফে নিতেন। বক্তব্যে তিনি চমকপ্রদ উপমা জুড়ে দিতে পারতেন, তাতে করে উপস্থিত শ্রোতাগণ সহজেই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম হতেন। বক্তব্য ছিল ছন্দময়। ঘরোয়া সভাও মাতিয়ে রাখতে পারতেন। বক্তব্য শুনলে এমনই ভালো লাগতো যে, হাসি খুশিতেই নিমগ্ন থাকতো সভাস্থল।

কমরেড নিরোদ বরণ অধিকারী ছাত্র রাজনীতি ছাড়ার পর কৃষকদের দাবিভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কৃষক সমিতি গড়ে তোলেন। সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি নিঃসন্দেহে একজন ভাল সংগঠক ছিলেন। সে কারণেই প্রান্তিক মানুষের মতো করে বক্তব্য দিতেন। তিনি দুটো সূত্র প্রায়শই বলে থাকতেন :- এক. সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনটি প্রয়োজন : তা হলো Man, Mind, Money। দুই. ব্যক্তিকে সংগঠক ও নেতা হতে হলে Head, Heart, Hand এ তিনটির সমন্বয় থাকা দরকার।

এ আজীবন সংগ্রামী ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চাঁদপুরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের চাঁদপুরে প্রবেশ প্রতিরোধ করতে বোমা তৈরিতে উদ্যোক্তা হিসেবে অংশ নেন। বোমা তৈরির জন্যে রসায়নবিদ দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্ত্তীকে নিয়োজিত করেন তিনি। দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্ত্তী সে সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। এ বোমা বানাতে গিয়ে বোমা বিস্ফোরণে চাঁদপুরে প্রথম শহীদ হন কালাম, খালেক, সুশীল ও শংকর। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান সেখানে না থাকায়। ওই সময় বোমা বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আনোয়ার হোসেন আরিফ। তবে শংকর ছাড়া এই কাজের সাথে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন প্রায় সকলেই ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিলেন।

বাবুরহাট অঞ্চলের সর্বশেষ জমিদার বসন্ত কুমার অধিকারীর পুত্র জিতেন্দ্র কুমার অধিকারীর ঔরসজাত সন্তান নিরোদ বরণ অধিকারী। তাঁর মাতার নাম গায়েত্রী চক্রবর্ত্তী। জমিদারি বংশে জন্মগ্রহণ করেও সেটাকে ব্রত হিসেবে না নিয়ে শোষিতের পক্ষে শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যুক্ত হন। শুধু তাই নয়, শোষণযন্ত্রকে নির্বংশ করতে আমৃত্যু সংগ্রাম চালিয়ে যান। এতেই ক্ষান্ত থাকতে চাইলেন না এ মহান ব্যক্তি, মানবসেবার জন্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর দেহ দান করেন। মৃত্যুর অনেক আগে তিনি ২০০৭ সালে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের গবেষণার উদ্দেশ্যে দেহদান করে সর্বশেষ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে যান।

পরিশেষে বলতে হয়, কমরেড নিরোদের মতো বিপ্লবীরা শোষণমুক্ত সমাজ গঠন, লুটপাট ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের সংগ্রামে প্রকৃত শ্রমিক হয়েছিলেন, কিন্তু শ্রমের মূল্য নেননি। মাঝে মধ্যে শুনতে হয়েছে, এগুলো করে লাভ কী, এসবের কোনো ভাত আছে? তাই শেষলগ্নে প্রশ্ন করতে হয়, যারা এখন পর্যন্ত বিপ্লবীর পথে যুক্ত হননি, তাদের সকলের কি ভাত হয়?



লেখক পরিচিতি : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, চাঁদপুর জেলা সংসদ; সাংস্কৃতিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি।

 


এই পাতার আরো খবর -
আজকের পাঠকসংখ্যা
৩১৩৭১৬
পুরোন সংখ্যা