চাঁদপুর, শুক্রবার ৩১ জুলাই ২০২০, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৭, ৯ জিলহজ ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
ঈদ-যাপন উদযাপন
সৌম্য সালেক
৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শাওয়াল মাসের নতুন চন্দ্রোদয়ের সাথে সাথে ঈদের অনাবিল আনন্দ বারতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে চারদিক। শিশুদের পাখিস্বরে ঈদকে ঘিরে যে অনাবিল মুখরতা চলে জগতে তার তুলনা নেই। আক্ষরিকভাবে, মাসব্যাপী রোজা পালনের পবিত্র চিহ্নরূপে মুসলিম সমাজ ঈদুল ফিতর উদ্যাপনে সম্মিলিত হয়। তবে ঈদের আনুষ্ঠানিকতা ও আনন্দ আবাহন আজ কেবল মুসলিম সমাজের প্রীতি ও প্রার্থনা সভার মধ্যে সীমিত নেই; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছেই আজ ঈদ আনন্দের বড় বিষয়, ঈদের জন্য সবাই ক্ষণ গোণে এবং সাধ্যমতো প্রস্তুতি নেয়।



ঈদ উদ্যাপনের প্রস্তুতি আসলে রমজান মাসের গোড়া থেকেই আরম্ভ হয়ে যায়। পুরো মাসজুড়ে ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক-পরিচ্ছদ ও বিভিন্ন সৌন্দর্য-সামগ্রী কেনাবেচা চলে মধ্যরাত অবধি। পিতা-মাতা ও স্বজনের সাথে একত্রে ঈদ করার জন্য ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে শহর থেকে গ্রামের দিকে ছুটে চলে; বোধ করি পৃথিবীর কোথাও ঈদকে কেন্দ্র করে এমন জনস্রোত সৃষ্টি হয় না। বাসে, রেলে, জলযানে এমনকি অভ্যন্তরীণ ঊর্ধ্বযানেও সেসময় ব্যাপক লোকজট তৈরি হয়। নাড়ির টানে মানুষের বাড়ি ফেরার এই দৃশ্য যেমন ঈদের তাৎপর্যকে তুলে ধরে, তেমনি পারিবারিক বন্ধনের প্রতি বাঙালির চিরদিনের মমতা ও ভালোবাসাকে প্রকাশ করে। যা কিছু অর্জন ও আনন্দের, বাঙালিরা সেসব গ্রহণ কিংবা উদ্যাপন করতে চায় তার স্বজন-পরিজনকে সাথে নিয়ে, এ ছাড়া তার তৃপ্তি নেই।



খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সেমাই বা মিষ্টান্ন ভোজনের পর যে দৃশ্যগুলো ঈদকে অপার্থিব আনন্দযোগে হৃদয়কে নন্দিত করে, তার মধ্যে : নতুন জামাকাপড় পরে শিশুদের কলকাকলি, দল বেঁধে ঈদ ময়দানের দিকে পথচলা, সালামী দেয়া-নেয়া, নতুন-পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সাক্ষাৎ ও কোলাকুলি, একপথে যাওয়া ও অন্য পথে ফিরে আসা, নতুন শাড়ি-কাপড় পরে নারীদের এক বাসা থেকে অন্য বাসায় যাতায়াত ও সদালাপ, চারিদিকে আতর সুরমার সৌরভ ও 'ঈদ মোবারক'-সম্ভাষণ এবং সর্বোপরি মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে সম্মিলিত প্রার্থনায় অংশগ্রহণ।



 



দুই.



আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে মামার বাড়িতে। ঈদকে ঘিরে যেমন শৈশবের অসংখ্য মধুর স্মৃতি রয়েছে তেমনি দু-একটি কষ্টের স্মৃতিও রয়েছে যা আজও বেদনা জাগায়। আমরা দল বেঁধে ঈদের নতুন চাঁদ দেখার জন্য বাড়ির পশ্চিমে অবস্থিত উঁচু রাস্তায় অবস্থান করতাম। প্রথম চাঁদ দেখাটা ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাই আলো কমে সূর্য ঢলে পড়তেই তন্ন তন্ন করে চন্দ্রোদয়ের গোটা দিকটায় আমরা কঠিন তল্লাশি চালাতাম। যে প্রথম চাঁদ দেখলো সে বিজয়ী হয়ে ব্যাপক আনন্দিত আর বিজিতদের প্রত্যেকেই সামনের বার চাঁদ বের করার প্রত্যয় নিয়ে স্থান ত্যাগ করতো। একবার আমারও প্রথম চাঁদ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, সেই সুখস্মৃতি আজও হৃদয়ে আনন্দ জাগায়। নতুন চাঁদ আবিষ্কারের কিছুক্ষণ পরই আমরা শোনতাম এদিক ওদিক থেকে বেজে উঠছে ঈদ নিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের অতুল্য অমিয়-সংগীত, 'ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।' এ গানের মধুর ঝঙ্কার যে কী অনাবিল সুখ ছড়াতো তা আজ বলে বুঝানো সম্ভব নয়।



রমজানের শেষ জুমআ'র নামাজ আয়োজনের জন্য বিখ্যাত হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ তখনও আমার দেখা হয়নি। অনেকের কাছে শুনেছিলাম, সেখানে উঁচু মিনার রয়েছে, মিনারে উঠলে পৃথিবীকে অন্যরকম লাগে। একদিন আমি ও নবীর হোসেন (এক সমবয়সী মামা) প্রায় দশ কি.মি. পথ পায়ে হেঁটে সেখানে যাই। আমরা মিনারে উঠলাম। তখন মনে হয়েছিল, সবকিছু ঘিরে আছে, নিচে সবকিছু ছোট; মানুষ, ঘরবাড়ি সব যেনো একই সমবায়ে একই পরিম-লে নিবিড়ভাবে রয়েছে। তখনও গ্রাম ছেড়ে আমার শহরে যাওয়া হয়নি। সে মিনারে চড়ার মুহূর্তটুকু বিশ্বদেখার মাহাত্ম্যে মনকে রাঙিয়েছিল বহুদিন।



নবীর হোসেনের সাথে ঈদ নিয়ে আরও একটি উল্লেখযোগ্য স্মৃতি রয়েছে, সেটা এক কোরবানির ঈদে। একবার আমরা কোরবানির পশু দেখার জন্য দুজনে চলে গেলাম কচুয়া বাজারে; বাড়ির উপযুক্ত যারা, তারা গরু কেনার জন্য আগেই বাজারে পেঁৗছেছিল। আমরা তখনো কচুয়া বাজারের পথ-ঘাট ঠিকঠাক চিনি না। সেবার পশুর হাট বসেছিল বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ মাঠে। বড় বড় গরু, ছাগল, মহিষ যথাসম্ভব দেখতে দেখতে বেলা ফুরিয়ে গেলো। ফেরার পথে আছি আমরা, মাগরিবের আজান পড়ে গেছে, খুব দ্রুত পথ চলছি তাই। হঠাৎ আমার কেন যেনো মনে হলো আমরা ভুল পথে আছি, নবীরকে বললাম বিষয়টা, সে খুব একটা পাত্তা দিল না। তবু এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম যে, কাদলা যাবার পথ কি এটা? তিনি অবাক হয়ে বললেন : না না...। সেদিন দক্ষিণের পথে হাঁটতে হাঁটতে কোনও দূর অজানায় আমরা হারিয়েও যেতে পারতাম! যাক্।



সেই অচিন বৃদ্ধের দেখানো পথ ধরে আমরা সেদিন বাড়ির পথে এগুই। কাছাকাছি পেঁৗছে দেখি, আমার মামারা এবং তার ভাই-বোনেরা অনেকদূর এগিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। শুনেছি এরমধ্যে দুজনকে নাকি বাজারেও পাঠানো হয়েছে আমাদের খোঁজার জন্য। এই দুঃসাহসের জন্য অনেক বকাবকির সাথে যে সেদিন বড় মামার সামান্য উত্তম-মধ্যমেরও শিকার হয়েছি, তা অবশ্য ভুলে যাইনি।



আমাদের শৈশবে অর্থাৎ নব্বইয়ের শেষদিকে ঈদ হতো শীতকালে, তখন মনে হতো ঈদ-রোজা এসব শীতকালেরই ঘটনা। খুব ঠা-া থাকলেও দ্রুত ঈদে যাবার তাড়নায় পুকুরে ডুব দিয়ে সকাল সকাল গোসল সেরে নিয়ে সালামি আদায় করতাম। নানী, মামা ও খালাদের থেকে সবমিলিয়ে ত্রিশ-চলি্লশ টাকা হতো। সে টাকায় ডিম, আলুর দম, মুরালি ও আইসক্রিম খেয়ে পিস্তল, কিছু বেলুন-বাঁশি বা একটি টেনিস বল কিনে বাড়ি ফিরতাম। ঈদ করতাম দরবেশগঞ্জ বাজারের ঈদগাহে। তখন পাঁচ-ছয়টি গ্রামের লোকজন সেখানে ঈদ করতো। পুরো দরবেশগঞ্জ-জুড়ে বসতো ঈদের পণ্য-পসরা। ঈদগাহের পাশে অনেকটা মেলার মতো বসতো বাহারি দোকানপাট। খেলনা, মিষ্টান্ন, সৌন্দর্যসামগ্রী ও নিত্য পণ্যের বিপুল সমাহার ছিল সেখানে। একবার দরবেশগঞ্জ বাজারের ঈদ আয়োজনে আমিও একটা খেলনার দোকান দেই। একদিন কী মনে করে যেনো মেঝো মামা কিছু না জানিয়ে, বাজার থেকে বেলুন, বাঁশি, পিস্তল, বল, লাটিম, চরকিসহ অনেক খেলনাসামগ্রী নিয়ে এসে বললেন : তোর জন্য এনেছি, কাল ঈদে দোকান দিবি। ঈদের বাজারে দোকান দেবার জন্য খুঁটি, কাপড় ইত্যাদির ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। খেলনার দোকান দিয়ে যে কিছু মুনাফা হয়নি তা নয়, তবে ঈদ-উদ্যাপনের আনন্দটা সেবার জলে গেছে। তারপর আর কখনও এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।



এখন অবশ্য দরবেশগঞ্জে ঈদের সেই আমেজ আর নেই। প্রায় প্রতিটি গ্রামে এখন ঈদগাহ হয়েছে, কিন্তু ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রামের মানুষের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ার যে ব্যাপারটি ছিল সেটি সংকুচিত হওয়াতে আজ ঈদকে ঘিরে আমার ভেতরের উচ্ছ্বাস-উত্তেজনা অনেকটাই কমে গেছে।



এক রোজার ঈদের দুদিন আগে আমার শিক্ষক বড়মামা হাজীগঞ্জ বাজার থেকে সবার জন্য ভালোমানের পোশাক ও থান কাপড় কিনে এনেছেন, আর আমার জামা তৈরির জন্য এনেছেন তুলনামূলক নিম্নমানের দেড়গজ পলেস্টার কাপড়। মামা যখন বাড়ির সবার জামাকাপড় ব্যাগ থেকে বের করে দেখাচ্ছিলেন তখন মামি তাকে বলেছিলেন, 'এই পলেস্টার ছাড়া কি আর কোনও ভালো কাপড় বাজারে ছিল না?' মামির এই প্রশ্নের উত্তরে মামা কী বলেছেন তা শোনার আগেই ঘর থেকে আমি বেরিয়ে যাই। একটি সুন্দর জামা না পাওয়ার বেদনায় সেদিন আমার দুচোখে অঘোর বৃষ্টি ঝরেছিল। যে শিশুরা ঈদে নতুন জামা পাচ্ছে না বা পছন্দের সুন্দর জামা পরতে পারছে না তাদের দেখলে আজও আমার সেই অপূর্ণতার ব্যথা জেগে ওঠে, অন্তরে অশ্রু ঝরে। পরবর্তীকালে শৈশবের সেই বেদনা-স্মৃতি নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম, প্রথম স্তবক ছিল :



'মামা এনেছেন জামাকাপড়, সেমাই, সুগন্ধি, সাজ-সম্ভার শত/ কাল ঈদ, আনন্দে থই থই চারদিক/দেখে যান, আরও এনেছেন আমার জামার পলেস্টারি থান/ আহা, কী সুন্দর থান!'



শৈশবের আরও যে স্মৃতিপ্রস্থ আজও রোমন্থন-সুধা জাগায়, তা হলো বিশেষত কোরবানির ঈদে মামাবাড়ির উঠোনজুড়ে মধ্যরাত অবধি জ্যোৎস্নালোকে রাজা-রাণী, রেডি, গোল্লাছুট আর পলায়ন খেলার ক্ষণগুলো। সেসময় মাঝে মাঝে রাতভর আমিরসাধু, সোনাভান, সখিসোনা, বেহুলার পালা, পুঁথিপাঠসহ বিভিন্ন লোকপালার আয়োজন হতো, যা কখনও ভোলার নয়।



সময়ের সাথে সাথে ঈদ উদ্যাপনে বস্তুগত কিছু পরিবর্তন ঘটলেও বদলায়নি ঈদের বার্তা বা মানবিক তাৎপর্য। ঈদ মানে আনন্দ এবং সেই আনন্দ ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয় বরং সামষ্টিক। এবং সমষ্টির স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই মূলত যাকাত-ফেতরাসহ অন্যান্য সদকা বণ্টন ব্যবস্থা এসেছে। একজন মানুষও ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হোক। ঘরে ঘরে ঈদ আসুক মৈত্রী, মানবতা, সমপ্রীতি ও সমৃদ্ধির চিরন্তন বার্তা বয়ে।



 



?সৌম্য সালেক, কবি ও প্রাবন্ধিক। কালচারাল অফিসার : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। মোবাইল ফোন : ০১৯১৮৭১০৭৭৩



 



 



 



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৭২-সূরা জিন্ন্


২৮ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


২৪। যখন উহারা প্রতিশ্রুত শাস্তি প্রত্যক্ষ করিবে, বুঝিতে পারিবে, কে সাহায্যকারীর দিক দিয়া দুর্বল এবং কে সংখ্যায় স্বল্প।


২৫। বল, 'আমি জানি না তোমাদিগকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে তাহা কি আসন্ন, না আমার প্রতিপালক ইহার জন্য কোন দীর্ঘ মেয়াদ স্থির করিবেন।'


 


 


ভিক্ষাবৃত্তি পতিতাবৃত্তির চেয়েও খারাপ।


-লেলিন।


 


দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানচর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করো।


 


 


ফটো গ্যালারি
করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৩,৮৭,২৯৫ ৩,৯৬,৩৮,১৮৮
সুস্থ ৩,০২,২৯৮ ২,৯৬,৭৮,৪৪৬
মৃত্যু ৫,৬৪৬ ১১,০৯,৮৩৮
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৬৯৩২৯
পুরোন সংখ্যা