চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার ৪ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭, ১৯ রজব ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
মেঘের দেশ 'সাজেক ভ্যালি'
অমৃত ফরহাদ
০৪ মার্চ, ২০২১ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


বাংলাদেশের যতগুলো আলোচিত পর্যটন স্থানের নাম শুনেছি, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে স্থানের নাম শুনেছি সেটি হলো সাজেক। রাঙামাটি গেলাম কিন্তু সাজেক যাওয়ার সৌভাগ্য হলো না। কারণ রাঙামাটি থেকে সাজেক যাওয়ার সহজ কোনো পথ নেই। সাজেক রাঙামাটি জেলায় পড়লেও যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও যাওয়া হলো না।



২০২০ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে যাই বই সংগ্রহ করতে। ঢাকাতে গেলে প্রায় সময়ই বন্ধু মুন্নার বাসায় উঠি। যথারীতি এবারও তার বাসায় উঠলাম। দিনের কাজ সেরে যখন ঘুমাতে গেলাম, তখন মুন্না সাজেক ভ্রমণ বিষয়ে কার সাথে যেনো মোবাইলে কথা বলছিলো। সাজেক শব্দ শুনতেই আমার মনোযোগ সেদিকে চলে গেলো। কথা শেষ হতেই তাকে বললাম এবার কিন্তু আমাকে নিয়ে যেতে হবে। মুন্না কথা দিতে পারলো না। কয়েকদিন পর ফোন দিয়ে জানালো ৭ নভেম্বর তারা সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। যদিও তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। কয়েকদিন পিছিয়ে ২৪ নভেম্বর ভ্রমণের তারিখ পুনঃনির্ধারণ করা হয়। প্রথম তারিখে আমার কোনো প্রোগ্রাম ছিলো না, কিন্তু দ্বিতীয় তারিখে আমার আরেকটা অনুষ্ঠান ছিলো। তাই দ্বিধায় পড়ে গেলাম কী করবো। এমন একজন মানুষের দাওয়াত ছিলো যা এড়িয়ে যাওয়া অনেক কঠিন ছিলো। কিন্তু বিন্যাসকর্তা সুন্দরভাবে রাস্তাটি সহজ করে দিলেন। যে মানুষটি আমাকে নিমন্ত্রণ দিলো অনুষ্ঠানের তিনদিন আগে তিনি আমার সাথে ঠুনকো একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা করে বসলেন। তাই আমিও তার অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। না যাওয়া বললে ভুল হবে। কথাটা হবে, তিনি আমাকে নিতে চাননি।



মুন্না আমাকে বলে দিয়েছে ১২টার লঞ্চে উঠার জন্যে। আগেরদিন রাতে জানলাম সাজেকে রবি নেটওয়ার্ক ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানীর নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তাই পরদিন সকালে রবি অফিসে গেলাম আমার পুরানো সিমটি উঠাতে। কিন্তু সার্ভারের সমস্যার কারণে সিমটি তুলতে পারিনি। আর একই কারণে ১২টার লঞ্চটিও মিস করলাম। তারপরও যথাসময়েই ঢাকায় পেঁৗছি। রাত ১০টার দিকে জনকণ্ঠ অফিসের সামনে থেকে আমরা সাজেকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। গাড়িতে অনেক রাত পর্যন্ত মজা করলাম। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পুরস্কার বিতরণীও করা হলো। এর ভেতর একবার নাস্তাও দেয়া হলো। গিফটের মধ্যে ছিলো একটি দৃষ্টিনন্দন ব্যাগ, টি-শার্ট, প্যাড, ২টি মাস্ক ও কলম। এর মাঝেই আমার ঘুম চলে আসলো। এক ঘুমে কুমিল্লা। মুন্নার মৃদু 'ফরহাদ' শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘুম থেকে জেগে উঠতেই সে বললো ভাত খেতে হবে। আমি বললাম, খাবো না। সে বললো, সামান্য হলেও খাও। কী আর করা তার সাথে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। ফ্রেশ হয়ে সবার সাথে আমিও রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ ছবি-টবি উঠিয়ে একটু হেঁটে আবার গাড়িতে উঠলাম। প্রায় ঘণ্টাখানিক পর ঘুম আসলো। ঘুম ভাঙ্গলো খাগড়াছড়ি সদরে এসে, আর যেখানেই আমরা গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। মানে বাস যাওয়ার আর অনুমতি নেই। পাশেই ছিলো একটি সুবিশাল মসজিদ। সেখানে আমরা সবাই ফ্রেশ হয়ে ওজু করে ফজর নামাজ আদায় করে নিলাম।



দৈনিক খোলা কাগজের স্টাফ রিপোর্টার শাহাদাৎ স্বপনের নেতৃত্বে ঢাকা থেকে বিভিন্ন হাউজের প্রায় ৪০ জন সংবাদকর্মী এই ভ্রমণে এসেছে। আমরা সবাই মসজিদের সামনে অবস্থান করছি। অপেক্ষা খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি জিতেন বড়ুয়ার জন্যে। অবশেষে তিনি আসলেন এবং তাকে নিয়ে আমরা সকালের নাস্তাটি সেরে নিলাম। তার আগে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে ছোট একটি দল আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করলো এবং সাজেক নিয়ে আমাদেরকে দিকনির্দেশনামূলক কিছু উপদেশ দিলো। সেই সাথে এ অঞ্চলের পরিবেশ এবং পরিস্থিতি আমাদেরকে অবহিত করলো।



নাস্তা শেষ করেই আমরা আমাদের নির্ধারিত চাঁন্দের গাড়িতে উঠলাম। সকালের নির্মল বাতাসকে কেটে সাঁই সাঁই করে ছুটে চললো চাঁন্দের গাড়ি। সাজেক উপত্যকা বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নের একটি বিখ্যাত পর্যটনস্থল। তবে এই তথ্যকে সাবেক করে দিয়ে সাজেক এখন ইউনিয়ন থেকে প্রমোশন পেয়ে থানায় রূপান্তর হয়েছে। রাঙামাটির একেবারে উত্তরে অবস্থিত এই সাজেক ভ্যালিতে রয়েছে দুটি পাহাড়। একটি রুইলুই এবং অপরটি কংলাক। ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত রুইলুই পাহাড় ১,৭২০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। আর কংলাক পাহাড় ১,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত।



২০১৯-এর শেষ এবং ২০২০-এর শুরুতে বেশ ঘুরেছি। বৈশি্বক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে ভেবেছি এবার ২০২০-এর শেষ এবং ২০২১-এর শুরুতে ঘুরতে যাওয়াই সম্ভব হবে না। ঘুরাতো দূরের কথা, যেভাবে মৃত্যুর সংবাদ শুনছিলাম, বেঁচে থাকবো কি না সেটাও ছিলো অনিশ্চিত। তারপরও এই শীত মৌসুমে সাজেক দিয়েই শুরু করলাম। যদিও জানি এবার আর তেমন একটা ঘোরা হবে না। কারণ সবারই অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক।



করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর গত ১ সেপ্টেম্বর খুলে দেয়া হয়েছে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র বাংলাদেশের দার্জিলিং-খ্যাত সাজেক ভ্যালি। সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। রাঙামাটি জেলা সদর থেকে সাজেকে আসার সহজ কোনো পথ না থাকায় খাগড়াছড়ি জেলা সদর হয়েই এখানে আসতে হয়। যখন ইউনিয়ন ছিলো তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন ছিলো সাজেক ইউনিয়ন। যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। সাজেকে রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প। এছাড়াও আছে হেলিপ্যাড।



দুপুরের মধ্যেই আমরা সাজেক এসে উপস্থিত হই এবং পূর্বনির্ধারিত অ্যাভারেস্ট রিসোর্টে উঠি। জামা-কাপড় ছেড়ে ১০ মিনিটের জন্যে বিছানায় দেহকে সঁপে দিলাম। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি কিছুটা দূর করার বৃথা চেষ্টা। সফরসঙ্গীদের অনুরোধে গোসল করতে গেলাম। কিন্তু গিয়ে দেখলাম পানি নেই। বের হয়ে গেলাম। রুমমেট একজন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালো। কিছুক্ষণ পর পানি আসলো। আমার দেরি দেখে রুমমেট গোসল করা শুরু করলো। এদিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতি দেখে আমি গোসলের কথাই ভুলে গেছি। আমাদের হোটেলটি বাঁশ-কাঠের চমৎকার ডিজাইনে তৈরি। আমরা যে রুমে উঠেছি তার পাশেই সুন্দর একটি বারান্দা। সেখানে দাঁড়িয়ে পাহাড় আর সুবজের ঢেউ দেখে মুগ্ধ হতেই হবে। জাগতিক সব কিছুর কথা ভুলতেই হবে। সে এক অভাবনীয় সৌন্দর্যের তীর্থ ভূমি। মুন্নার ডাকে মগ্নতায় ছেদ পড়লো। আবার গোসল করতে গেলাম। ফরহাদের কপাল বলে কথা, আবারও পানি নেই! সাজেকে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা তা হলো পানির সমস্যা। এখানে পানির চরম সঙ্কট। আধাঘণ্টার চেষ্টার পর বালতি পানিতে ভর্তি হলো। তারপর গোসল করলাম, প্রসাধনী লাগালাম, জামাকাপড় পরলাম। এরপর সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেতে গেলাম।



 



খাবার খেয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়লাম। সাজেকে সর্বত্র মেঘ, পাহাড় আর সবুজ। এখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়। সাজেকের রুইলুই পাহাড় থেকে ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়ে যাওয়া যায়। কংলাক হচ্ছে সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। কংলাকে যাওয়ার পথে মিজোরাম সীমান্তের বড় বড় পাহাড়, আদিবাসীদের জীবনযাপন, চারদিকে মেঘের আনাগোনা দেখা যায়। এখানে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে উপজাতীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয় এবং তাদের সংস্কৃতির নানা উপকরণ উপভোগ করা যায়। প্রকৃতি দেখতে দেখতে আমরা আমাদের নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হলাম। সাজেকের হেলিপ্যাডে বেলুন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করলাম।



খাগড়াছড়ি জেলা থেকে চাঁন্দের গাড়ি দিয়ে দীর্ঘ পাহাড়ি অাঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে আসার সময় রাস্তার দুই পাশে মনোরম দৃশ্য পরিলক্ষিত হবে। সেই সাথে দেখতে পারবেন উপজাতিদের জীবনচিত্র। আর এই দীর্ঘ পথজুড়ে দেখতে পাবেন নীল আকাশ। খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেক যাওয়ার পথে মনে করে চকলেট নিয়ে যাবেন। সাজেকে প্রবেশের পর রাস্তার পাশে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা হাত নেড়ে আপনাদেরকে স্বাগত জানাবে। বিনিময়ে আপনারা তাদেরকে চকলেট দিবেন। এটা আপনাদের কাছে তারা প্রত্যাশা করে। চকলেট পেয়ে তারা মহাখুশি হবে।



সাজেকে আছে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রিসোর্ট। প্রথমে দেখতে পাবেন সাজেক রিসোর্ট। এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত। তারপর আছে মেঘ মাচাং রিসোর্ট, মেঘপুঞ্জি রিসোর্ট, জুমঘর রিসোর্ট, রুন্ময় রিসোর্ট, আলো রিসোর্ট, আদিবাসীদের ঘরে ইত্যাদি। সাজেকের শেষ গ্রাম কংলাকপাড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা প্রায় ১৮০০ ফুট। রুইলুইপাড়ার শেষ প্রান্তে আছে বিজিবি ক্যাম্প। এখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার সামনে কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় আরেক পাহাড়ি গ্রাম কংলাকপাড়া। সাজেকের হেলিপ্যাড থেকে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ট্রেকিং করে কংলাক পাড়ায় যাওয়া যায়। এ গ্রামেও লুসাই ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। কংলাকপাড়া থেকে ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়, যেখান থেকে কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তি। কংলাক থেকে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সীমান্ত বেশ কাছাকাছি, হাঁটার দূরত্ব প্রায় ২ ঘণ্টার।



সাজেক রুইলুইপাড়া, হামারিপাড়া এবং কংলাকপাড়া এই তিনটি পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত। সাজেকে মূলত লুসাই, পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা উপজাতি বসবাস করে। রাঙামাটির অনেকটা অংশই দেখা যায় সাজেক ভ্যালি থেকে। এজন্যে সাজেক ভ্যালিকে রাঙামাটির ছাদ বলা হয়। কর্ণফুলী নদী থেকে উদ্ভূত সাজেক নদী থেকে সাজেক ভ্যালির নাম এসেছে। মেঘে আচ্ছন্ন পর্বতশ্রেণী সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। আর দিঘিনালা থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দিঘিনালা অবস্থিত। একসময় সাজেক যখন ইউনিয়ন ছিলো তখন এটি ছিলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। সাজেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষের বসবাস। তাদের বাড়িঘর বাঁশের মাচানের উপর তৈরি করা।



পাহাড়ের চূড়া তখন হালকা কুয়াশায় আচ্ছন্ন। শীতের চাদর মোড়ানো শেষ বিকেল পেরিয়ে পশ্চিমের আকাশে বিদায়ী সোনার সিংহ-সূর্য তখন পাহাড়ের কোলে হেলে পড়ছে মাত্র। সূর্যের সোনালি রংয়ে মোড়ানো সবুজ পাহাড়। দিনশেষে এই রং যেনো পুরো পাহাড়কে সোনায় মুড়িয়ে রাখে। অদূর সীমান্তে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের নিথর পাহাড়গুলো। উপত্যকা পেরিয়ে ক্রমশ পাহাড়ের ভাঁজ যেনো আকাশচুম্বী হয়েছে ওখানে। আর এই দীর্ঘ ভূখ-জুড়ে অরণ্যের সীমানা। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই নৈসর্গিক নীরবতা পাহাড়ের চারপাশে। হাজার ফুটের পাহাড় পেরিয়ে রাতের দিগন্তে দেখা দেয় চাঁদের শীতল আলো। জোছনায় ঢাকা প্রকৃতি। রাতের আকাশে মেঘ উড়ে যাচ্ছে থেমে থেমে। যেনো গ্রাস করে নিচ্ছে চন্দ্রের মায়াবী আলো। পাহাড়ের নির্জনতায় কেবল জেগে থাকা দূর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। সাজেক হেলিপ্যাডে বসে এমন রাত পাওয়াটা সত্যিই বিমুগ্ধ করে। চূড়া থেকে পাখির মতো চোখে পড়ে ধবধবে জোছনার আলোয় আলোকিত পুরো উপত্যকা।



রাতের খাবারের তাগিদে চলে গেলাম রিসোর্টে। খাবার খেয়ে আরো কিছুক্ষণ হাঁটলাম এবং দেখলাম। তারপর ঘুম। ভোরেই উঠে যাই। কারণ আগেই বলে দেয়া হয়েছে ফজরের পর পরই নাস্তা অতঃপর কংলাক পাহাড়। যে দেরি করবে তাকে রেখে যাওয়া হবে। ভোরের সাজেক অন্যরকম। রাত বেড়েছে আর ধীরে ধীরে মেঘ জমছে উপত্যকার ভাঁজে ভাঁজে। যা সকাল ১০/১১ টা পর্যন্ত থাকে। মেঘের সাদা রঙে ঢেকে যাচ্ছে সবুজ বনানী। নাস্তা সেরেই আমরা চাঁন্দের গাড়িতে কংলাকের পাদদেশে একে একে অবস্থান করলাম। পাহাড়ে উঠার জন্য বাঁশের লাঠি কিনলাম। অতঃপর একযোগে ১ হাজার ৮শ' ফুট পায়ে হেঁটে অতিক্রম করলাম। কংলাক পাহাড় বা পাড়া যেন 'সাজেক ভ্যালি'র মুকুট। পুরো সাজেক উপত্যকার সর্বোচ্চ চূড়ার কংলাক পাড়া যেন রাঙামাটির ছাদ। কংলাক থেকে মেঘ মুক্ত আকাশে চোখে পড়ে দূরের কাপ্তাই লেকের জলধারা। এখানে বসে নীল মেঘের সমুদ্র পেরিয়ে পাহাড় দর্শনের জন্য সাজেক উপত্যকার সর্বোচ্চ চূড়া কংলাক যেন অনন্য। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। কত উপরে আমি! এ যেন পাহাড়ের উপর পাহাড়। সুবহানাল্লাহ। এটা কীভাবে সম্ভব? দুনিয়ার সকল কষ্ট ভুলে থাকার জন্য এখানে আসা দরকার। পাহাড়ীরা প্রতিদিন একাধিকবার এ পাহাড়ে ওঠানামা করে। কারণ পাহাড়ের উপরে অনেকেরই বসবাস। উঠার সময় কষ্ট হলেও ভয় লাগেনি। কারণ কোনো দিকে তাকাইনি। নামার সময় খুব ভয় পেয়েছি। নিচের দিকে তাকালে ভয় এমনিতে বাসা বাঁধে। তাই নামতে আমার যথেষ্ট সময় লেগেছে। কংলাক পাহাড়ের পাদদেশে ১৯৬৩ সালে স্থাপিত হয় কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।



সেখান থেকে আমরা চলে আসলাম খাগড়াছড়ি সদরে। এখানে এসে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম। তারপর বেরিয়ে পড়লাম আলু টিলার পথে। খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার মূল শহর হতে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে সমুদ্র সমতল হতে ৩০০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট আলুটিলা বা আরবারী পাহাড়ে আলুটিলা গুহা অবস্থিত। স্থানীয়রা একে বলে মাতাই হাকড়া বা দেবতার গুহা। এটি খাগড়াছড়ির একটি নামকরা পর্যটন কেন্দ্র। এই গুহাটি খুবই অন্ধকার ও শীতল। কোনো প্রকার সূর্যের আলো প্রবেশ করে না বলে মশাল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। সুড়ঙ্গের তলদেশ পিচ্ছিল এবং পাথুরে। এর তলদেশে একটি ঝর্ণা প্রবহমান। গুহাটি দেখতে অনেকটা ভূ-গর্ভস্থ টানেলের মত, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ ফুট। গুহাটির এপাশ দিয়ে ঢুকে ওপাশ দিয়ে বের হতে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। গুহাটির উচ্চতা মাঝে মাঝে খুব কম হওয়ায় নতজানু হয়ে হেঁটে যেতে হয়।



আলু টিলা থেকে আমরা চলে গেলাম ঝর্ণার কাছে। বহু বছর পর ঝর্ণা দেখলাম। রিসাং ঝর্ণা। সবুজ প্রকৃতির মাঝে ঝর্ণা, সে এক অপরূপ সৌন্দর্য। বর্ষায় এর রূপ যেন হয়ে ওঠে আরো দৃষ্টিনন্দন। কারণ, বর্ষা যেন এর রূপের পূর্ণতা দান করে, আর সবুজ যেন এর চারপাশের প্রকৃতিকে আরো মায়াময় করে তোলে। ঝর্ণার শব্দ অনেকের কাছে ছন্দময়। ঝর্ণার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার ঝর্ণা কবিতায় লিখেছেন, 'ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!/ তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা!'



চোখ জুড়ানো মায়াময় অনেক ঝর্ণাই রয়েছে পার্বত্য জেলাগুলোতে। এসব ঝর্ণার মধ্যে অন্যতম সুন্দর ঝর্ণা হলো রিসাং ঝর্ণা। ঝর্ণাটি দেখতে অপূর্ব সুন্দর। যারা আগেও ঝর্ণা দেখেছেন, তারা এই ঝর্ণাটিতে কিছুটা হলেও নতুনত্ব পাবেন। ঝর্ণাটির আসল সৌন্দর্য দেখতে আপনাকে যেতে হবে বর্ষাকালে। তবে সারা বছরই পর্যটকরা এই ঝর্ণা দেখতে আসেন, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মাসে। ঝর্ণাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এই ঝর্ণার পানি প্রথমে উঁচু স্থানে পড়ে, আবার সেখান থেকে ঢালু জায়গা দিয়ে দ্রুতবেগে গড়িয়ে পড়ে। ঝর্ণাটি দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ছুটে আসেন।



রিসাং ঝর্ণার (তেরাংতৈ কালাই) অবস্থান খাগড়াছড়ি জেলায়। ঝর্ণাটির মায়াময় সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে প্রথমেই যেতে হবে খাগড়াছড়ি সদরে। এখান থেকে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার জন্যে চাঁন্দের গাড়িসহ অনেক গাড়ি আপনি পাবেন। পাকা রাস্তা থেকে রিসাং ঝর্ণা যেতে আরো প্রায় তিন কিলোমিটার যেতে হবে। সেখানে বেশ কয়েকটি দোকান পাবেন। চাইলে সেখান থেকে চা, লেবুর শরবত, ডাব খেয়ে নিতে পারেন। দোকানগুলোর সামনেই কতগুলো পাকা সিঁড়ি দেখতে পাবেন, যেগুলো নেমে গেছে পাহাড়ের নিচের দিকে। ঝর্ণাটি দেখতে হলে আপনাকে ২৩৫টি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হবে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই ঝর্ণার শ্রুতিমধুর শব্দ কানে আসবে আপনার। নিচে নেমে ঝর্ণা এবং এর আশপাশের প্রকৃতি আপনাকে আনন্দে ভরিয়ে তুলবে।



সন্ধ্যার পর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কং জুরি চৌধুরী আমাদের জন্য নৈশ ভোজের আয়োজন করেন 'হিল ফ্লেভারস রেস্টুরেন্ট এন্ড কমিউনিটি সেন্টার'-এ। তার আগে তিনি আমাদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সেখানে তিনি সংক্ষেপে পার্বত্য জেলার ইতিহাস এবং সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন। এ সময় তিনি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সবাইকে শুভেচ্ছা উপহার দেন। ঐ রাতেই আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।



প্রায় সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তবে একটি বিষয় বাদ পড়েছে। তা হলো রাঙামাটির বিশেষ খাবার। রাঙামাটির বিশেষ কিছু খাবার আমাকে এতোটাই আকৃষ্ট করেছে যে বিষয়টি নিয়ে আলাদা ভাবে লিখলাম। বিশেষ করে বাঁশ সংক্রান্ত খাবার। রাঙামাটিতে বাঁশের খাবার দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ব্যাম্বো টি, ব্যাম্বো চিকেন, ব্যাম্বো বিরিয়ানি। বাঁশের খাবার ছাড়াও আরো কিছু ইউনিক খাবার রয়েছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের। সেগুলো হলো : তেঁতুলের কচি পাতা দিয়ে মুরগির স্যুপ, কাঁচা হলুদ ভর্তা, ছোট মাছ দিয়ে হলুদ ফুলের সবজি, কলাপাতা মোড়ানো ছোট মাছ, থানকুনি পাতা ভর্তা, মজাদার ডিম মাশরুম, বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি সিদ্ধ সবজি, চিকেন গুরদানি, কাঁচকি ফ্রাই, আমপাতা ভর্তা কিংবা কাঁচা কচি আস্ত কলাগাছের ভর্তা! কোনো আজগুবি গল্প নয়, এগুলো সত্যিই খাবার। মজাদার এসব অদ্ভুত পাহাড়ি খাবার পেতে জুড়ি নেই পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সমতল শহরের ঘরোয়া রেস্টুরেন্ট সিস্টেমের। খাবারের বৈচিত্র্যে অন্য দুই পার্বত্য জেলা থেকে রাঙামাটির সাজেক যে আলাদা তার প্রমাণ মিলবে মং মারমার নিজ হাতে গড়া রেস্টুরেন্টে। পর্যটনের অপার সম্ভাবনার এ জেলায় এসে সিস্টেমে বাঁশ থেকে হাঁস খাননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। জনা পঞ্চাশেক ভোজনরসিকের ধারণক্ষমতার এ রেস্টুরেন্টে সবচেয়ে বেশি ভিড় জমান সাজেকগামী পর্যটকরা।



কথা বলতে বলতে মং মারমা ফিরে যান এক যুগ আগে। জানান, একটি টেবিল পেতে এক যুগ আগে রাস্তার পাশে বসে চা বেচতেন তিনি। সেখানে বিপদে পড়ে কখনো সখনো কেউ ভাত খেতে চাইতেন। এসে বলতেন, 'দাদা একটু দেখেন না, সিস্টেম করে দেয়া যায় কি-না'। এভাবে বাড়তে থাকে দুই, চার, ছয়জনের পরিসর। তারপর ২০১০ সালে নিজ বাড়ির সামনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গড়ে তোলেন ঘরোয়া রেস্টুরেন্ট সিস্টেম। সদালাপি ও সদাহাস্য মং বলেন, 'মানুষকে খাইয়ে সব সময় খুশি করতে চাই। কেউ খেতে এলে আমি ফেরাই না। সব সময় চেষ্টা থাকে, যা আছে তা দিয়ে খাওয়ানো। টাকা না থাকলেও অনেক সময় খাওয়াই। মানুষকে খাওয়ালে কমে না'।



কচি বাঁশের নানা পদের খাবারে সিস্টেমের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। বাঁশ ভাজি, বাঁশ ডাল তো আছেই, সঙ্গে রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ ব্যাম্বো চিকেন। পাহাড়ে আসলে এটি অবশ্য পরখ করে দেখবেন। না হলে যেন সব বৃথা। বাঁশের ভিতরে রান্না করা হয় ব্যাম্বো চিকেন। ব্যঞ্জনাটা একটু ভিন্ন। পাহাড়ী মোরগের সঙ্গে পাহাড়ি আদা, রসুন, মরিচ এবং সাবারাং পাতার সংমিশ্রণ করে কাঁচা বাঁশের ভিতরে ঢুকিয়ে কলাপাতা দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় বাঁশের মুখ। পাহাড়ী মুরগীর ব্যাম্বো চিকেন ৭০০ টাকা, ব্রয়লার মুরগীর ব্যাম্বো চিকেন ৫০০ টাকা। ১টি ব্যাম্বো চিকেন দিয়ে ৩/৪ জন খেতে পারবেন। শুধু কয়লার আগুনেই খাবারটি পূর্ণতা পায়। স্বাদ আর গন্ধে ব্যাম্বো চিকেন অসাধারণ। ২০ টাকা দিয়ে ব্যাম্বো চা পান করতে পারবেন। খাবারে মেন্যু ও স্বাদে ভিন্নতা থাকলেও দাম একটু বেশিই। তবে ঘুরতে বের হয়ে কেউ পয়সার দিকে তাকান না। ভিন্ন স্বাদের খাবার খেয়েই খুশি। ও, হ্যাঁ, খাবার শেষে অসাধারণ স্বাদের তেঁতুলের জুস আর বাইরে রাখা আমলকি মুখে দিয়ে ফিরতে ভুলবেন না কিন্তু!



 



 



 



 


এই পাতার আরো খবর -
    হেরার আলো
    বাণী চিরন্তন
    আল-হাদিস

    ৯৯-সূরা যিল্যাল


    ০৮ আয়াত, ১ রুকু, মাদানী


    পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


    ৪। সেই দিন পৃথিবী তাহার বৃত্তান্ত বর্ণনা করিবে,


    ৫। কারণ তোমার প্রতিপালক তাহাকে আদেশ করিবেন,


    ৬। সেই দিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বাহির হইবে, যাহাতে উহাদিগকে উহাদের কৃতকর্ম দেখান যায়,


     


     


    যার বশ্যতার মধ্যে তোমার স্বার্থ নিহিত, তার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ো না।


    _এরিস্টিটল।


     


     


    যে শিক্ষিত ব্যক্তিকে সম্মান করে, সে আমাকে সম্মান করে


     


     


    ফটো গ্যালারি
    করোনা পরিস্থিতি
    বাংলাদেশ বিশ্ব
    আক্রান্ত ৬,৪৪,৪৩৯ ১৩,২১,৯৪,৪৪৭
    সুস্থ ৫,৫৫,৪১৪ ১০,৬৪,২৬,৮২২
    মৃত্যু ৯,৩১৮ ২৮,৬৯,৩৬৯
    দেশ ২১৩
    সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
    আজকের পাঠকসংখ্যা
    ৬৯২১৫
    পুরোন সংখ্যা