চাঁদপুর। বুধবার ৩১ অক্টোবর ২০১৮। ১৬ কার্তিক ১৪২৫। ২০ সফর ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৩-সূরা যূখরুফ

৮৯ আয়াত, ৭ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৩৩। (সত্য অস্বীকারে) মানুষ যদি এক উম্মতে পরিণত হয়ে পড়বে, এই আশঙ্কা না থাকলে দয়াময় আল্লাহকে যারা অস্বীকার করে, তাদেরকে আমি দিতাম তাদের গৃহের জন্যে রৌপ্য নির্মিত ছাদ ও সিঁড়ি, যাতে তারা আরোহণ করে।

৩৪। এবং তাদের গৃহের জন্যে দিতাম দরজা, (বিশ্রামের জন্যে) পালঙ্ক, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসতো।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন



 


যে ব্যক্তি প্রথম সালাম দেয়, সে অহঙ্কারমুক্ত।                   

 -আল হাদিস।


দাতার হাত ভিক্ষুকের হাত অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি স্বাবলম্বী ও তৃপ্ত হতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বন ও তৃপ্তি দান করেন।



 


ফটো গ্যালারি
একটি বাড়ি একটি খামারের রোল মডেল এরশাদ কাজী
বাড়িতে তৈরি জৈব সারে চাষাবাদ ও উপার্জন
কৃষিকণ্ঠ প্রতিবেদক
৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মোঃ আরশাদ কাজী। পেশায় তিনি কৃষক। বর্তমানে তিনি আরশাদ মেম্বার নামে পরিচিত। ইউপি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এলাকায় আজিজ এগ্রো ফার্মের মালিক নামেও পরিচিতি রয়েছে তার। তিনি বছর খানেক আগে ১ একর জমিতে মাছ চাষের পরিকল্পনা করেন। সেই মাছ চাষের পরিকল্পনা এখন রূপ নিয়েছে একটি বাড়ি, একটি খামারের।



সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সংরক্ষিত বিশাল এক এলাকা । সেখানে গড়ে উঠেছে একটি লেয়ার মুরগীর ফার্ম। ফার্মের নিচে বিশাল পকুর। পুকুরের চার পাশে বিভিন্ন সবজির বাগান। পশ্চিম উত্তর পাশে রয়েছে একটি ডেইরী ফার্ম। তার পাশেই রয়েছে জৈব সার তৈরির স্থাপনা। সব মিলে গড়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই স্বপ্ন একটি বাড়ি, একটি খামার। আর স্থানীয়দের বলতে শোনা গেছে, একটি বাড়ি, একটি খামারের রোল মডেল এরশাদ কাজী।



কাজী পাড়া জামে মসজিদের খতিব মাওঃ মাহাদী হাসান বলেন, কৃষকরা জমিতে রবি শস্যের আবাদ করেন। শুরু থেকেই তারা জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে আসছিলেন। কিন্তু ৩ বছর আগে কৃষি অফিস তাদের জৈব সার তৈরির উপকরণ সরবরাহ করে। এরপর থেকে অনেক কৃষক বাড়িতেই জৈব সার তৈরি করছেন। এই সার দিয়েই চলছে তাদের চাষাবাদ, পাচ্ছেন বিষমুক্ত ফলন। সেইসঙ্গে অতিরিক্ত সার বিক্রি করে মিলছে নগদ অর্থও। আরশাদ কাজী এরই মধ্যে কেঁচো দিয়ে ভার্মিংকম্পোস্ট সার তৈরি করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।



মরহুম রফিকুল ইসলাম কাজী ও মোমিনা বেগমের পুত্র মোঃ আরশাদ কাজী। আরশাদ কাজীর এক ছেলে তাসকিন আহমেদ (৩) আর মেয়ে তাসফিয়া খাতুন (১)। স্ত্রী রুনা বেগম। তিনি আজিজ এগ্রো ফার্মে ৬ হাজার লেয়ার পালন করছেন। এর থেকে প্রতিদিন ৫ হাজার ডিম উত্তোলন করেন। ডিম, দুধ, মাছ ও শাক-সবজি বিক্রি করতে বেশি বেগ পেতে হয় না। পাশেই রয়েছে কাজীর বাজার, দাসাদী ও বাবুরহাট বাজার। ওই বাজারের ব্যবসায়ীরা পাইকারি ক্রয় করেন। এছাড়া স্থানীয়রা তো আছেনই। তাদের চাহিদা অনুযায়ী ক্রয় করে থাকেন। তিনি তার এ কাজের দেখাশুনার জন্য ৪জন শ্রমিক রেখেছেন। সকল খরচ শেষে তার মাসিক আয় থাকে ৩০-৪০ হাজার টাকা।



 



চাঁদপুর সদর উপজেলা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে তরপুরচ-ী গ্রাম। গ্রামটি বিশাল বড় হওয়ায় এটাকে করা হয়েছে ইউনিয়ন। আর এ গ্রামের শতকরা ৯০ শতাংশ পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফসলের ক্ষেত নিচু হওয়ায় এ গ্রামে রবি শস্যের আবাদ কম হয়। বর্তমানে গ্রামের কৃষকরা জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সবজি উৎপাদন করছেন, যা উপজেলার ৪০ শতাংশ সবজির চাহিদা পূরণ করছে।



গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আগে বছরের পর বছর জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে নানা রকমের সমস্যায় পড়তেন তারা। এতে ফসলের উৎপাদন খরচও হতো বেশি। বছর খানেক আগে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের দিল আতিয়া পারভীন স্যার জৈব সার তৈরির ব্যাপারে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। সে থেকে আমরা জৈব সার দিয়ে জমিতে চাষাবাদ শুরু করি। এতে সাফল্য পেতে শুরু করেন তারা। একে অন্যের দেখাদেখি পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে জৈব সারে চাষাবাদ পদ্ধতি।



গ্রামের কৃষকরা জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় ফসল নষ্ট ও উৎপাদন কমসহ নানা রকম সমস্যা শুরু হলো। পরিত্রাণ পেতে ২০১৫ সালের দিকে কৃষক আরশাদ কাজী জমিতে কেঁচো ও জৈব সারের ব্যবহার শুরু করেন। ওই বছরের মার্চ মাসে তিনি তরপুরচস্ডী বস্নকের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মোঃ মোবারক হোসেনের কাছ থেকে কেঁচো সার ও ভার্মি কম্পোস্ট সারের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। সেই বছরেই তিনি বাড়িতে কেঁচো সার তৈরির মাধ্যমে নিজের এক একর জমিতে সবজি চাষ করেন। এতে আগের বছরের চেয়ে ভালো ফলন পান তিনি। উৎপাদন খরচও নেমে আসে অর্ধেকে।



আরশাদ কাজীর দেখাদেখি ওই সময় একই গ্রামের আরো কয়েকজন কৃষক কেঁচোর জৈব সার তৈরি ও ব্যবহারের মাধ্যমে সবজি চাষ করে ভালো সাফল্য পেতে শুরু করেন। এরপর থেকে তরপুরচন্ডী গ্রামজুড়ে শুরু হয় কেঁচোর জৈব সারের মাধ্যমে সবজি চাষ। বর্তমানে জৈব সার তৈরি ও এর মাধ্যমে চাষাবাদে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৫০টি পরিবার।



জানতে চাইলে কৃষিকণ্ঠ'কে মোঃ আরশাদ কাজী বলেন, এক বন্ধুর মাধ্যমে খোঁজ পেয়ে তিনিসহ কয়েকজন মিলে বিনামূল্যে কেঁচো সার তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। এরপর শুরু করেন সার তৈরি। তিনি জানান, প্রথমে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে লাল শাক, পালং শাক, টমেটো, বেগুন, বাঁধাকপি ও মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেতে জৈব সার প্রয়োগ করেন। ফলনও ভালো পান। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সিমেন্টের তৈরি রিংয়ের মধ্যে গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট, কলা গাছের খোল কেটে মিশ্রিত করে তার মধ্যে কেঁচো দিয়ে সার তৈরির জন্য রাখা হয়েছে। তিনি জানান, একটি মাটির পাত্রে ২৫ থেকে ৩০ কেজি জৈব সার তৈরি করা হয়। এতে ২ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত কেঁচো পাওয়া যায়। অতিরিক্ত জৈব সার প্রতি কেজি ১৮ টাকা দরে এবং কেঁচো প্রতি কেজি ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। কৃষি অফিস থেকে এসব কেঁচো কিনে নেয়। বর্তমানে জৈব সার দিয়ে লাল শাক, পালং শাক, পুঁই শাক, বেগুন, খিরাই, টমেটো, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মরিচ, করলা, আলুসহ নানা সবজির চাষ করছি।



তরপুরচন্ডী বস্নকের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মোঃ মোবারক হোসেন বলেন, রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে জৈব সার ব্যবহারের প্রতি কৃষকদের উৎসাহিত করি। যার কারণে এ গ্রামের মানুষ বিষমুক্ত সবজি চাষে এগিয়ে রয়েছেন। এভাবে গ্রামের ২৫০ জন কৃষক নিজেদের তৈরি সার ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছেন। তরপুরচন্ডী বস্নকে নিচু জমি বেশি। তাই কৃষি অফিসার দিল আতিয়া পারভীন স্যার অনেক কৃষককে ভাসমান সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আগামীতে এ এলাকায় কৃষকরা আগাম ভাসমান সবজি চাষ করবেন বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।



তরপুরচন্ডী ইউপি চেয়ারম্যান ইমাম হাসান রাসেল গাজী বলেন, আমার ইউনিয়নে উৎপাদিত রাসায়নিকমুক্ত সবজির আবাদ বেড়েছে। প্রতিটি কৃষক পরিবার কেঁচো দিয়ে জৈব সার তৈরি করে ফসলের মাঠে ব্যবহার করছেন। এতে ফসলের উৎপাদন ব্যয় যেমন কমেছে তেমনি সবজির উৎপাদন বেড়েছে। তিনি আরো জানান, আমাদের ইউপি সদস্য এরশাদ কাজীও বিষ মুক্ত সবজি চাষ করছেন শুনে খুশি হয়েছি। একজন জনপ্রতিনিধি আদর্শ কৃষক ও খামারী হিসেবে বেশ পরিচিতি অর্জন করেছেন। তার মতো এ রকম উদ্যোক্তা হলে একদিন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবে দেশ।



এসব বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ দিল আতিয়া পারভীন বলেন, বিষমুক্ত ফসল উপাদনের লক্ষ্যে কৃষকেরা জৈব সার ব্যবহার করছেন। এ সার তারা জমিতে ব্যবহার করছেন। এতে তাদের উৎপাদন খরচ কম হয়। ফলন হয় বিষমুক্ত এবং বেশি লাভ হয়। তেমনি কেঁচো বিক্রি করে বাড়তি আয় করার সুযোগও রয়েছে।



চাঁদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আবদুল মোতালেব বলেন, আরশাদ কাজী একজন পরিশ্রমী মানুষ। তার চেষ্টার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন। আমি মনে করি তিনি একটি বাড়ি, একটি খামারের রোল মডেল।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫০৫৬১৪
পুরোন সংখ্যা