চাঁদপুর। বুধবার ২১ নভেম্বর ২০১৮। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • ফরিদগঞ্জের মনতলা হাজী বাড়ির মোতাহের হোসেনের ছেলে ফাহিম মাহমুদ (৩) নিজ বাড়ির পুকুরে ডুবে মারা গেছেন। ||  শনিবার সকালে ফাহিমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক। || 
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৩-সূরা যুখ্রুফ


৮৯ আয়াত, ৭ রুকু,' মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৭৯। উহারা কি কোন ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে? বরং আমিই তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী।


৮০। উহারা কি মনে করে যে, আমি উহাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণার খবর রাখি না? অবশ্যই রাখি। আমার ফিরিশতাগণ তো উহাদের নিকট থাকিয়া সবকিছু লিপিবদ্ধ করে।


 


গণতন্ত্র যেখানে নেই, স্বস্তি সেখানে থাকার কথা নয়। -এস বাল্ডউইন।


 


যে ধনী বিখ্যাত হবার জন্য দান করে, সে প্রথমে দোজখে প্রবেশ করবে।


 


ফটো গ্যালারি
নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম : সৃষ্টি থেকে শুভাগমন পর্যন্ত
মুহাম্মাদ মিলাদ শরীফ
২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


নিখিল প্রেমাষ্পদ প্রিয়তম রাসূল মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম। কাঠফাটা চৌচির, তপ্ত-শুষ্ক হৃদয়ে যার নাম নিলেই রহমতে এলাহীর বারি বর্ষিত হয় শ্রাবণধারায়। গুনাহের আবর্জনায় পূতিগন্ধময় আত্মা জান্নাতি সুবাসে ভরে উঠে যার স্মরণে। অমানিষায় ঘেরা অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয়াকাশে মধ্য গগনের সূর্যালোক উদ্ভাসিত হয় যে নামের পরশে। বিশ্ব নিয়ন্তা রাব্বুল আলামীন তাঁকে সৃষ্টিই করেছেন আলোকময় পবিত্র স্বত্তা করে। বরং সব আলো বা নূরের প্রস্রবণ তথা উৎস হিসেবে। ইহ জগৎ পরজগত দুইটাই অন্ধ তাঁর নূর ছাড়া। অন্যদের কথা বাদ দিলেও পৃথিবীর মনুষ্যজাতি দুই চোখ থাকা সত্বেও অন্ধ থাকতো যদি নূরে মোহাম্মদীর আলোকপ্রভা বিকশিত না হত। তিনি নুরুন আ'লা নূর, তিনি সিরাজুম মুনীর, তিনিই আসল নূর, অন্যসব নূর তাঁরই দান। তিনি এমন নূর যা কখনো নিভবে না, নিষ্প্রভও হবে না, বরং বাকি সব নূর হারিয়ে যাবে তাঁর নূর ছাড়া।



মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা ছাড়া কেউ ছিলেন না। আরশ-কুরসী-লওহ-কলম, আকাশ-জমিন এককথায় কিছুই ছিল না। রাব্বুল আলামীন ছিলেন অতি গোপন, যার পরিচয় তখনও প্রকাশ হয়নি। নিজের রবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাত সৃষ্টির সামনে প্রকাশ করার জন্যে তিনি সর্বপ্রথম একটি মাখলুক সৃষ্টি করলেন। ইরশাদ হচ্ছে-আমি ছিলাম সুপ্ত ভান্ডার (কেউ আমার পরিচয় জানত না) অতঃপর আমি চাইলাম নিজের পরিচয় প্রকাশ করব, তাই এক স্বত্তাকে তৈরি করলাম নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্য। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাত-১/৩৫৬, ছইদুল খাত্বের লি ইবনিল জওযী-১/১২৩, সনদের কারণে এই বর্ণনাটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ আপত্তি করলেও হাদিসের মূল বক্তব্য সহিহ। দেখুন-ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী, মিরক্বাত-১/৪৪২, ইমাম ইসমাঈল আজলুনী-কাশফুল খাফা-২/১৩২, ইমাম মুহাম্মদ বিন খলিল ত্বরাবলসী-আল লুউ লুউল মারছূ-১/১৪৩)



এখন প্রশ্ন হল সর্বপ্রথম সৃষ্টি কি ছিলো যার দ্বারা স্বয়ং আল্লাহ নিজের পরিচয় প্রকাশ করলেন? এর উত্তর আমরা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকেই নিতে পারি। বর্ণিত আছে-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মে'রাজ সফরে বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে ছিলেন একটি মনজিল অতিক্রম করার সময় তিনজনের একটি কাফেলা দেখতে পান যারা তাঁকে সালাম দিচ্ছেন এই বলে- 'আপনাকে সালাম হে আউয়াল বা সূচনাকারী, আপনাকে সালাম হে পরিসমাপ্তিকারী, আপনাকে সালাম হে একত্রকারী! (তাফসীরে ইবনে কাছির-৩/১১, আহাদিসুল মুখতারাহ লি দ্বিয়া মাক্বদেসী- হাদিস নং ২২৭৭, তিনি বলেছেন এই হাদিসের সনদ সমূহ সহিহ) জিবরাঈল (আঃ)কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন এই তিনজন হলেন যথাক্রমে হযরত ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা আলাইহিস সালাম। এই বর্ণনা দ্বারা ঐ বিষয়টি আবারও প্রমাণ হল যে, আল্লাহ চাইলে ইন্তেকালের পরও আল্লাহর নবীগণ কুদরতীভাবে যেথায় ইচ্ছা সেথায় গমণ করতে পারেন এবং তাঁরা সক্রিয় থাকেন।



আমাদের আলোচ্য বিষয় এখানে 'আপনাকে সালাম হে প্রথম বা সূচনাকারী' অংশটুকু নিয়ে। এই প্রথম বা সূচনাকারী দ্বারা কি উদ্দেশ্যে তা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই অন্য হাদিসে ব্যাখ্যা করেছেন। নবীজী ইরশাদ করেন-অর্থাৎ আমি সৃষ্টিগত দিক থেকে মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম আর প্রেরণের দিক থেকে সর্বশেষ। [তবাকাতে ইবনে সা'দ-১/১৪৯] আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বপ্রথম তাঁর পেয়ারা হাবিবকে নূর হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সেই নূর আল্লাহর কুদরতে হাজার-কোটি বছর বিভিন্ন মাধ্যমে পরিভ্রমণ করে বাশারি সূরত নিয়ে ৫৭০ খৃস্টাব্দের ১২ রবিউল আওয়াল পৃথিবীতে শুভাগমন করেন। এটা এত দীর্ঘ নূরাণী সফর যার সঠিক বর্ণনা দিতে গেলে হাজার হাজার পৃষ্ঠা দরকার। এখানে আমরা হাদিস ও সীরাতের কিতাব থেকে কিছু বর্ণনা ধারাবাহিকভাবে সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করার চেষ্টা করছি-



* হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-একদা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার বয়স কত? জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আরজ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার বয়স কত তা আমি জানি না তবে, চতুর্থ হিজাবে একটি নক্ষত্র ৭০ হাজার বছর পর পর একবার উদিত হতো, তাকে আমি ৭২ হাজার বার দেখেছি। পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে জিবরাঈল! আমার রবের ইজ্জতের কসম! আমিই সেই তারকা। [সীরাতে হালাবিয়্যা, ১ম খন্ড/৪৯ পৃ.]



* হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন-আমি আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টি হওয়ার ১৪ হাজার বছর পূর্বে আমার প্রতিপালক আল্লাহর দরবারে নূর হিসাবে বিদ্যমান ছিলাম। [কিতাবুল আহকাম লি ইবনে কাত্তান-১/১৪২ পৃ., মাওয়াহেবুল লাদুনিয়্যাহ-১/৭৪ পৃ.] এই নূরে মোহাম্মদী তখন সর্বদা আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা এসেছে-এই নূর যখন তাসবীহ পাঠ করতেন তখন ফেরেশতারাও তাঁর সাথে তাসবীহ করত। [খাসায়েসুল কোবরা-১/৬৯ পৃ.] সুবহানাল্লাহ! এই বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূর হিসেবে আলমে আজলে কত লক্ষ কোটি বছর অতিক্রম করেছেন প্রকৃতপক্ষে তা হিসাব করা অসম্ভব।



* এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন একদা রূহের জগতে সৃষ্টির সকল রুহকে একত্রিত করলেন তাঁর রবুবিয়্যাতের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য। সেখানে তিনি সবার সামনে প্রশ্ন রাখেন কুরআনের ভাষায়-আমি কি তোমাদের রব নই? তখন তারা জবাব দেয় হ্যাঁ (আপনিই আমাদের রব)। [সূরা আনফাল/আয়াত নং-১৭২] সেই সমাবেশেও সকল রূহের পক্ষ থেকে যিনি সর্বপ্রথম আল্লাহকে রব বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। [মাওয়াহেব-১/৪২ পৃ.]



* রূহের জগতে মহান আল্লাহ সকল নবীদের রূহ নিয়ে আরেকটি সমাবেশ করেন। যেখান থেকে তিনি তাঁর প্রিয় হাবিবের রিসালাতের স্বাক্ষী গ্রহণ করেন। সেখানেও নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেন। বর্ণিত হচ্ছে-নবীজী এরশাদ করেন, সেই সমাবেশে নবীগণ আমাকে একটি সমুজ্জ্বল নূর হিসেবে দেখতে পান, হযরত আদম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করেন-তিনি কে? আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন-ইনি হচ্ছেন তোমার সন্তান আহমদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিই (সৃষ্টির দিক থেকে) প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রথম সুপারিশকারী। [দালায়েলুন নবুওয়্যাত, ইমাম বায়হাকী-হাদিস নং ৪৮৩, এই হাদিসের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য] এই সহিহ হাদিসটি প্রমাণ করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম নূর হিসেবে তৈরি করেছেন।



* এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন বাবা আদম আলাইহিস সালামকে দেহরুপে তৈরি করার পর এই নূরে মোহাম্মদীকে তাঁর ঔরশে স্থানান্তর করলেন। আদম আলাইহিস সালাম তার পৃষ্ঠদেশ থেকে পাখির হালকা কিচির মিচির আওয়াজের মত শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন হে রব! এটা কিসের আওয়াজ? আল্লাহ বলেন-এটা নূরে মোহাম্মদীর তাসবীহ'র আওয়াজ। এই নূরের প্রবল আকর্ষণে ফেরেশতারা দলে দলে আদমের পেছনে এসে ভীড় করতে লাগলেন এবং এই নূরের জিয়ারত করতে লাগলেন। আদম আলাইহিস সালাম বলেন, হে আল্লাহ! ফেরেশতারা সবাই আমারা পেছনে ভীড় করছে কেন? আল্লাহ এরশাদ করেন-এরা সবাই নূরে মোহাম্মদীর আকর্ষণে এমন করছে। তখন আদম বলেন, তাহলে সেই নূরকে আমার সামনে এনে দিন। অতঃপর আল্লাহতায়ালা নূরে মোহাম্মদীকে আদম আলাইহিস সালামের কপালে স্থানান্তর করেন। আদম আলাইহিস সালামের কপালে নূরে মোহাম্মদী ঝলমল করতে থাকে এবং এই নূরে মোহাম্মদীর সম্মানেই ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুমে আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা করে। [আল মাদখাল- ইবনুল হাজ্জ মালেকী-২/২২-২৩ পৃ., তাফসীরে কবির-১/৯৮০ পৃ.]



* এই পূত-পবিত্র নূরে মোহাম্মদীকে ধারণ করে আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম পৃথিবীতে নেমে আসেন। সেখান থেকে এই নূর আদম তনয় হযরত শীছ আলাইহিস সালামের নিকট স্থানান্তরিত হয়। আদম আলাইহিস সালাম ইন্তেকালের পূর্ব মুহুর্তে পুত্রকে ওসীয়ত করে যান যেন পবিত্র রেহেম (গর্ভ) ছাড়া অন্য কোথাও এই নূর স্থানান্তর করা না হয়। সেখান থেকে এই নূর বংশানুক্রমে বিভিন্ন পবিত্র ও ঈমানদার ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হতে থাকে। এক নবী থেকে আরেক নবী, এক পবিত্র ঔরস থেকে আরেক পবিত্র ঔরসে স্থানান্তর হতে থাকে। [মাওয়াহেব-১/৫৬]



* হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিঃ থেকে বর্ণিত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'আদম (আঃ) সৃষ্টিরও দুই হাজার বছর পূর্ব থেকে নবীজীর রূহ মুবারক নূর হিসেবে আল্লাহর সামনে তাসবীহ পাঠ করতেন, তাঁর তাসবীহ শুনে ফেরেশতারাও তাসবীহ পাঠ করতো। আল্লাহ যখন আদম (আঃ)কে তৈরি করলেন, তখন আদমের পৃষ্ঠদেশে ঐ নূরে মুহাম্মদী স্থানান্তর করেন। অতঃপর আদমের সাথেই ঐ নূর পৃথিবীতে নেমে আসেন, সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে নূহ (আঃ)-এর পৃষ্ঠে, তারপর নবী ইবরাহীম খলিলুল্লাহ (আঃ)-এর পৃষ্ঠে নূরে মুহাম্মদী স্থানান্তর করা হয়।' [আশ শিফা-১/৮৩, খাছাইছুল কুবরা-১/৬৭, সীরাতে হালাবিয়্যাহ-১/৪৯]



হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র নসবনামায় আদি পিতা আদম (আঃ) থেকে শুরু করে আব্বাজান খাজা আবদুল্লাহ (রাঃ) এবং আম্মাজান আমেনা (রাঃ) পর্যন্ত প্রত্যেকেই ছিলেন জ্ঞানে-গুণে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে যুগের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি। পবিত্র কোরআনের সূরা আশুরার ১৯নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, 'আমি আপনাকে (যুগে যুগে) সিজদাকারীদের মধ্যে স্থানান্তর করেছি'। এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে মুফাসসীরকুল শ্রেষ্ঠ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো 'আমি আপনাকে এক নবী থেকে অন্য নবীর ঔরসে স্থানান্তর করেছি এমনকি শেষ পর্যন্ত নবী হিসেবে বের করেছি', ভিন্ন বর্ণনায় এসেছে আমি আপনাকে নবীদের পৃষ্ঠদেশে স্থানান্তর করেছি এবং শেষ পর্যন্ত আপনাকে আপনার আম্মাজান জন্ম দিয়েছেন। [মু'জামুল কবীর লিত তবারাণী-হাদি: নং ১২০২১, মু'জামে ইবনুল আ'রাবী-হাদি: নং-১৭০৫, মাজামউয যাওয়ায়েদ-হাদি: নং ১১২৪৭- এবং হাদিসটি সহিহ] এভাবেই বাবা আদম থেকে প্রত্যেক নবীর যুগেই আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূর মুবারক কোনো না কোনো নবীর কিংবা সময়ের সবচেয়ে মুত্তাকী ব্যক্তির পৃষ্ঠদেশে ছিল। হিজরী তৃতীয় শতকের জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল মালেক খারকুশী সংকলিত 'শরফুল মুস্তাফা' কিতাবের প্রথম অধ্যায় পর্যালোচনা করে জানা যায় আদম (আঃ) থেকে শুরু করে নবী ঈসা (আঃ) পর্যন্ত প্রত্যেক নবীর যুগেই যখনই কোন বড় বিপদ-আপদ আসতো আল্লাহতায়ালা নূরে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতে তাদেরকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করতেন। কাল পরিক্রমায় আল্লাহর হাবিব সরকারে দোআ'লম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের সময় ঘনিয়ে এল। নবীজীর পূর্বপুরুষদের মধ্যে যাদের ঔরসে নূরে মুহাম্মদী গচ্ছিত ছিল তাদের থেকেও নানা আলামত প্রকাশ হওয়া শুরু করলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে একজন ছিলেন 'আদনান' নামে। তিনিই সর্বপ্রথম হারাম শরীফে বসতি স্থাপন করেন এবং সর্বপ্রথম তিনিই পবিত্র কা'বায় গেলাফ পরান। তার পরবর্তী জন হচ্ছেন 'মাআ'দ'। তার সারা জীবন কেটেছে জিহাদের ময়দানে এবং তিনি প্রত্যেক যুদ্ধেই বিজয় লাভ করতেন। আল্লাহতায়ালা ঐ যুগের নবীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন 'মাআদকে সম্মানের সাথে নিজ বোরাকে আরোহন করিয়ে সিরিয়ায় নিয়ে যেতে। কেন না আমি তার বংশ থেকেই এক সম্মানিত নবী পয়দা করতে যাচ্ছি, যার মাধ্যমে পয়গম্বরের ধারাবাহিকতায় সমাপ্তি ঘটবে।' বলা বাহুল্য এসবই নূরে মুহাম্মদীর সম্মানে। তার পরবর্তী জন হলেন 'নিযার'। এটি নযর শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ বিরল। তিনি নিজ যুগে একজন বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তার ললাটে নূরে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চমকাচ্ছিল। সে যুগে জ্ঞানে গুনে বুদ্ধিমত্তায় তার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। পরবর্তী জন হলেন 'মুযার'। অত্যন্ত জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ছিলেন। নূরে মুহাম্মদীর বরকতে তিনি দেখতে এতো আকর্ষণীয় ছিলেন যে, যে কেউ দেখলেই তাকে মহব্বত ও সম্মান করত। তিনি সুকন্ঠের অধিকারীও ছিলেন। তার পরে 'ইলয়াস'। তিনিই প্রথম বাইতুল্লাহ হতে পশু প্রেরণের প্রচলন করেন। বর্ণিত আছে ইলয়াস বিন মুযার স্বীয় পৃষ্ঠদেশ হতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হজ্বের তালবিয়া শ্রবণ করতেন। এভাবে হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বুযুর্গ দাদা পর্যন্ত প্রত্যেকেই ঈমানদার এবং যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন। হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মক্কার সবচেয়ে সম্মানিত ও প্রভাবশালী মানুষ। নূরে মুহাম্মদীর ঝলকে তার চেহারা এত উজ্জ্বল ছিল যে, অন্ধকার রাত্রেও তিনি কোথাও আগমন করলে আঁধার দূরীভূত হয়ে যেত। [শরহুয যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব-১/১৩৫, ১৩৬ ও ১৩৭, রওজুল উনফ-১/৮]



নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত আব্বাজান হযরত আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের কনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রিয় পুত্র। বর্ণিত আছে যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন সেদিন সম্পর্কে সিরিয়ার খৃস্টান ও ইহুদী পন্ডিতরা জানতে পারে। তাদের কাছে নবী ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের রক্তমাখা একটি জুব্বাহ ছিল। তাদের আসমানী কিতাবে লিখিত ছিল যখন দেখবে এই জুব্বার রক্ত তাজা হয়ে উঠেছে এবং টপটপ করে রক্ত ঝরছে তখন বুঝে নিও আখেরী যামানার পয়গম্বরের পিতা দুনিয়ায় আগমন করেছেন। ঠিকই যেদিন আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন সেদিন ঐ জুব্বা থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরতে থাকে। তারা দলবলে মক্কায় এসে হুজুরের আব্বাজানকে খোঁজ করে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করলে আল্লাহ কুদরতীভাবে তাঁকে রক্ষা করেন। তারা ব্যর্থ হয়ে সিরিয়ায় ফিরে যায়। সিরিয়ায় পেঁৗছানোর পর ওখানকার লোকেরা জিজ্ঞাসা করলে তারা বলতে থাকল আমার মক্কার কুরাইশদের মাঝে ঝলমল করা একটা রেখে এসেছি। হুজুরে পুর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আব্বা একদিন পিতা আবদুল মুত্তালিবকে বলেন 'আমি মক্কার উপকণ্ঠে জাবালে ছুবাইরে উঠলে দেখলাম আমার পৃষ্ঠ হতে দুটি নূর বের হল। একটি পূর্ব দিগন্তে অন্যটি পশ্চিম দিগন্তে মিলিত হল। তারপর দেখলাম নূর দুটি বৃত্তাকার ঘুরছে এমনকি মেঘের আকৃতি ধারণ করল। এরপর আকাশ বিদীর্ণ হয়ে গেলে মুহুর্তের মধ্যে দেখলাম নূর দুটি আকাশাভ্যান্তরে প্রবেশ করে আবার আমার কাছে ফিরে আসল। আমি যেখানেই বসি আমি শুনতে পাই কেউ আমাকে সালাম দিচ্ছে হে নূরে মুহাম্মদীর রক্ষক আপনায় সালাম। যে কোনো শুকনো জায়গায় বসলে সেটা মুহুর্তেই সবুজ-শ্যামলে রূপান্তর হয়ে যায়। আবদুল মুত্তালিব বললেন সুসংবাদ গ্রহণ কর হে আমার পুত্র! তোমার নছল থেকেই আল্লাহ জগতের সবচেয়ে সম্মানিত স্বত্তাকে বের করবেন। [তারিখুল খামীছ-১/১৮২] পরিণত বয়সে আবদুল্লাহকে বিবাহ দেয়ার জন্য পিতা আবদুল মুত্তালিব রওয়ানা হলে পথিমধ্যে ফাতেমা বিনতে মুররাহ নামে এক ইহুদি নারীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। সে তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদিতে অভিজ্ঞ ছিল। খাজা আবদুল্লাহর চেহারায় নূরে মুহাম্মদীর অপরূপ ঝলক দেখে সে নিজেকে তার কাছে পেশ করলো এবং প্রস্তাব দিল আমি তোমাকে একশ' উট উপহার দেব তুমি আমাকে বিয়ে কর। কিন্তু আবদুল্লাহ চারিত্রিক মাধুর্যতা ও পিতার সম্মানের কথা খেয়াল করে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। অবশেষে বনী যোহরা গোত্রের ওহাব বিন আবদে মানাফের অতুলনীয় কন্যা জগতের সবচেয়ে ভাগ্যবান রমণী আম্মাজান আমেনা (রাঃ)-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়ে যায়। [দালাইলুন নবুওয়্যাহ-আবূ নুআইম ইস্ফাহানী-১/৩৮] বিবি আমেনার সাথে পরিণয়ের পরদিন হযরত আবদুল্লাহ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনকালে ফের ঐ মহিলার সাথে সাক্ষাৎ হয়। এবার মহিলা আবদুল্লাহকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে জবাব দিল, 'গতকাল তোমার মাঝে যে নূর ছিল আজ সে নূর তোমার থেকে বিদায় নিয়েছে। সুতরাং তোমাতে আমার কোনো প্রয়োজন নাই।' [শরহুয যুরকানী- ১/১৯৩] এখানেও একজন ইহুদি মহিলা আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নূর হিসেবে অভিহিত করলেন। মা আমেনা আল্লাহর হাবিবকে গর্ভে ধারণ করার দুই মাস পরেই হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) ইন্তেকাল করেন। যে রাতে হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূর মুবারক আম্মাজানের রেহেমে স্থানান্তর হয়, সে রাতে আল্লাহ জান্নাতের রক্ষক 'খাজেন'কে হুকুম দিয়েছিলেন জান্নাতের সকল দরজা খুলে দিতে। আকাশের ফেরশতারা আনন্দে মেতে উঠেছিল। আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করলেন, 'সাবধান! তোমরা জেনে রাখ, আজকের রাত্রেই ঐ গচ্ছিত নূর যা থেকে হেদায়েত দানকারী শেষ নবী আবির্ভূত হবেন তা তাঁর আম্মাজানের রেহেমে স্থানান্তর হচ্ছে।' [তারিখুল খামিছ-১/১৮৫] নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পেয়ারা নবী নিখিল বিশ্বের পরম প্রেমাষ্পদ হাবিবে কিবরিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভাগমনের সময় এসে গেল। অবশেষে ৫৭০ খৃঃ সহিহ ও প্রসিদ্ধ বর্ণনা মতে ১২ রবিউল আউয়াল নূর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধরায় আগমণ করেন। [সিরাতে নববী-ইবনে কাছির-১/১৯৯]



হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমন মুহুর্তে যে সকল অলৌকিক ঘটনাবলী সংঘটিত হলো তার মধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলো :



* হযরত মা আমেনা (রাঃ) বলেন তাঁর জন্মলগ্নের পর মুহুর্তেই একটা নূর প্রকাশিত হল যার আলোতে পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের সব কিছু আলোকিত হয়। যেই আলোতে সুদূর সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ সমূহ আমি দেখতে পাই। [তারিখুল কবীর-ইমাম বুখারী-১/৩৯, মুসনাদে আহমদ-৪/১২৭]



* ফাতিমা বিন সুলাইমান বর্ণনা করেন, প্রিয় নবীর বেলাদতের সময় আমি দেখলাম বায়তুল্লাহ নূরের জ্যোতিতে আলোকময় হয়ে উঠলো এবং তারকারাজী যমীনের এতো নিকটবর্তী হয়ে এলো যে মনে হচ্ছিল এগুলো আমার উপর এসে পড়বে। [ফাতহুল বারী-৬/৪২৬]



* পারস্য সম্রাট কিসরার রাজ প্রাসাদের ১৪টি গম্বুজ ধ্বসে পড়ে। [বায়হাকী-১২৬ পৃ.]



* ইরানের অনির্বাণ শিখা যা এক হাজার বছর পর্যন্ত এক মুহুর্তের জন্যও নিভেনি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিলাদতের মুহুর্তে তা দপ করে নিভে যায়। [বায়হাকী-১২৬ পৃ.]



* তবরীয়া হ্রদ শুকিয়ে গেল। [মাওয়াহেব]



* হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খতনা করা অবস্থায়ই দুনিয়ায় তাশরীফ আনেন। [নেহায়াতুল আরব-১/৭৭]



* আল্লাহর হাবীব দুনিয়ায় আগমনের সময় কোনো প্রকার অপবিত্র বস্তু তাঁর শরীরে ছিল না। পূত পবিত্র অবস্থায় দুনিয়ায় এসেছেন। [নেহায়াতুল আরব-১/৭৬]



* হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানে ঐ বছর সকল মা পুত্র সন্তান প্রসব করেন। [মাওয়াহেব-১/৭৬]



* হুজুরের শুভাগমনের সময় আম্মাজানের খেদমতে আল্লাহতায়ালা জান্নাত থেকে বিবি আছিয়া এবং মরিয়ম আলাইহিমাস সালামকে পাঠান। [মাওয়াহেব-১/৭৬]



* হুজুরের আগমন মুহুর্তে পবিত্র কা'বাঘর আনন্দে সিজদায় পতিত হয়। [নেহায়াতুল আরব-১/৭৮]



* আম্মাজান আমেনা (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মের পর একটি প্রবল রশ্মি সম্পন্ন নূরের মেঘ এগিয়ে আসলো এবং একজন ঘোষণা করলো তাঁকে আকাশ ও যমীন পরিভ্রমন করিয়ে নিয়ে এসো যাতে প্রত্যেকেই তাঁর পরিচয় লাভ করতে পারে। (ফেরেশতারা তাঁকে নিয়ে পরিভ্রমন করে) ফিরে আসার পর যখন আবার আমার শিয়রে রাখলো আমি দেখলাম আমার নয়নের টুকরাকে যেন পূর্ণিমার চাঁদের মত দেখা যায়। আর তার থেকে মেশক আম্বরের তীব্র সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছিল। [মাওয়াহেব-১/৭৭]



* নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুভাগমনের পরই স্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন, 'আশহাদু আল লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আনি্ন রাসূলুল্লাহ'। [তারিখুল খামিছ-১/২০৩]



সৃষ্টির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হল আলোর প্রতি সবাই আকর্ষিত হয়। পতঙ্গ ঝাঁপিয়ে পড়ে আলোতে নিজ জীবনের মায়া না করেই। তাহলে যিনি সব সৃষ্টির মূল, যিনি সব আলোর প্রাণ, সৃষ্টিকুল তাঁর জন্যে দিওয়ানা হবে না কেন? তাই তো তাঁর পবিত্র মিলাদে এত খুশী, এত আয়োজন, এত আলোচনা। সকলেই তাঁর আগমনে আনন্দিত, সৃষ্টির প্রতি ধূলিকণা তাঁর জন্য পাগলপারা শুধু শয়তান এবং তার অনুসারী ব্যতীত।



 



লেখক : মাস্টার্স, আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ



ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৯৬০৪৪
পুরোন সংখ্যা