চাঁদপুর, বুধবার ১২ জুন ২০১৯, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৮ শাওয়াল ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৭৮ আয়াত, ৩ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


 


৬। তৃণলতা ও বৃক্ষাদি তাঁহারই সিজ্দায় রত রহিয়াছে,


৭। তিনি আকাশকে করিয়াছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করিয়াছেন মানদ-,


৮। যাহাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না কর মানদন্ডে।


 


 


 


assets/data_files/web

যার বন্ধু নাই তার শত্রুও নাই।


-টেনিসন।


 


 


যে পরনিন্দা গ্রহণ করে সে নিন্দুকের অন্যতম।


 


 


ফটো গ্যালারি
চাঁদপুর কণ্ঠের শক্ত ভিতে সাংবাদিকতায় আমার বেড়ে ওঠা
মোহাম্মদ কামাল হোসেন
১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

১৯৯৬-৯৭ সালের মাঝামাঝি চাঁদপুর অবস্থান করেছিলাম লেখাপড়া করার জন্যে মেঝো ভাইয়ের কাছে। অবসর সময় চাঁদপুর শহরের নাজিরপাড়া বা বিপণীবাগ এলাকার জিলানী প্রেসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে দেখতাম পেপার পড়ে আছে। কাউকে কোনো কথা না বলে নিজে পেপার পড়তে থাকি। পেপার পড়া শেষে আবার চলে আসি। মাঝে মাঝে দেখি একজন লোক খুব পরিচ্ছন্নভাবে বসে রয়েছেন এবং তাঁর কী কী কাজ নিজে করছেন। আমি অন্যদিনের মতো একদিন গিয়ে পেপার পড়ছি। হঠাৎ মোটা সুন্দর এক লোক আমাকে বলে উঠলেন 'এই ছেলে তোমার বাড়ি কোথায়? তুমি এখানে বসতে কে বলেছে' ইত্যাদি। আমি ছোট মানুষ কোনো কথা না বলে নীরব ভূমিকায় ছিলাম। আবার বলেন, তোমার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম, হাজীগঞ্জে। তিনি বললেন, হাজীগঞ্জের কোথায়?-বড়কুল। এখানে কী করো?-পড়ালেখা করতে আসছি। অবসর সময় পেপার পড়তে এখানে আসি। এখানে কার কাছে থাকো?-মেঝো ভাইয়ের কাছে। তার নাম কী?-আলমগীর।-ওহ আচ্ছা।

কয়েক মাস পর কম্পিউটার শেখার জন্যে চাঁদপুর পৌর হকার্স মার্কেটের ইউনিভার্সেল কম্পিউটার সেন্টারে ভর্তি হই। এ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটর শিক্ষক ছিলেন নূর আহমেদ। ২/৩ মাস পর মহিউদ্দিন সরকার ও আবু সাঈদ কাউসার সাপ্তাহিক চাঁদপুর কণ্ঠ নামে একটি পেপারের কাজের জন্যে সপ্তাহে দুদিন এখানে আসতেন। নূর আহমেদ ছিলেন ভালোমানের কম্পিউটার অপারেটর। তিনি নিজেই পত্রিকার সকল কাজ করতেন। আর মহিউদ্দিন সরকার ও আবু সাঈদ কাউসার সাথে থাকতেন। এদের কাছ থেকেই জিলানী প্রেসের কাজী শাহাদাত ভাই সম্পর্কে জেনেছি। তবে সবাই কাজী শাহাদাত ভাইকে অনেক ভয় এবং শ্রদ্ধা করতেন। এর মধ্যে আমি কম্পিউটারের কিছু কাজ-কর্ম শিখেছি। পত্রিকার অফিস ছিলো কম্পিউটার সেন্টারের পশ্চিম পাশে দু গলির পরে। পত্রিকার লেখার প্রুফগুলো আমাকে দিয়ে আনা-নেয়া করতেন নূর আহমেদ ভাই। এভাবেই চলছে। আসা-যাওয়াতে কাজী শাহাদাত ভাইয়ের সাথে মোটামুটি পরিচয় হলো এবং মাঝে মাঝে কথা হতো।

সাপ্তাহিক চাঁদপুর কণ্ঠের যে কোনো একটি সংখ্যার পুরো লেখা আমার অজান্তে কম্পিউটার ডিলেট বা মুছে গেছে। আমিতো আর জানি না। নূর আহমেদ ভাই পত্রিকা বের করার জন্যে সকল লেখা শাহাদাত ভাইকে দেখানোর জন্যে প্রিন্ট করতে গিয়ে দেখেন, ফাইলের মধ্যে কোনো লেখা নেই। নূর আহমেদ ভাইয়ের মাথা গরম হয়েছে, আর আমাকে মিন মিন করে অনেক কথা বলছেন। এর মধ্যে মহিউদ্দিন সরকার ও আবু সাঈদ কাউসার আসলেন। তারাও জানলেন এ ঘটনা ঘটেছে। এখন তারা সবাই শাহাদাত ভাইয়ের ভয়ে কী করবে বা শাহাদাত ভাইকে কী উত্তর দেবে চিন্তায় পড়ে গেছেন। আজ রাতই পত্রিকা বের করতে হবে। আমি তো আর এতোকিছু বুঝি না। তারা সবাই শাহাদাত ভাইকে ঘটনাটি বললেন। তিনি চোখ লাল করে তাদের উপর ক্ষেপে গেলেন। আর নূর আহমেদসহ সবাইকে ধমকা-ধমকিসহ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে যা বলার ইচ্ছা তা-ই বলেছেন।

রাত ৭/৮টার সময় আমাকে খবর দিলেন নূর আহমেদ ভাইকে দিয়ে শাহাদাত ভাই। আমি সোজা চলে গেলাম। গিয়ে দিখি তিনি গাল ফুলে চোখ লাল করে বসে আছেন। আমাকে দেখেই ক্ষেপে এক ধমকে বলে উঠলেন, এই ছেলে গ্রাম থেকে শহরে আসলে কেনো? লেখাপড়া জানো না আবার কম্পিউটার শিখতে আসছো। কম্পিউটারের 'ক' বোঝ না আবার টাইপ করতে কম্পিউটারে হাত দাও। আমার লেখা ফাইল নষ্ট করছো কেনো? তোমাকে এতো বড় সাহস দিছে কে? গরু-ছাগল কোথাকার। গ্রামে গিয়ে লাঙ্গল দিয়ে হাল চাষ করো। কম্পিউটার শেখার দরকার নেই। আগামীকাল থেকে যেনো আর এ সীমানায় না দেখি তোমাকে। এখান থেকে যাও। আমি ভয়ে ও নীরবে চলে আসি। পরের দিন আমি আবারো কম্পিউটার সেন্টারে যাই। মালিক আবু তাহের বিষয়টা জানার পর আমাকে জিজ্ঞাসা করলে আমি সত্যটাই তাকে বলেছি। তিনি হাসি দিয়ে বলেন, তোমাদের এলাকার লোক, ঠিক হয়ে যাবে। তিনি (কাজী শাহাদাত ভাই) বড় সাংবাদিক।

আমি ছোটবেলা থেকেই একটু বেশি রাগী। আমার সামনে কেউ মিথ্যা বললে সাথে সাথে প্রতিবাদ করি। যার জন্যে অনেকে আমাকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখে। আমি কিছু মনে করি না। আমার ছাত্রজীবনে আমার স্কুল শিক্ষকদের কেউ কেউ আমার উপর অনেক অবিচার করেছেন। যার জন্যে আরেকটু বেশি রাগ কাজ করতো। এক পর্যায়ে আমি অনেকের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই। তবে পরে দেখি তারা সবাই আমাকে বুঝায় এতো ছোট বয়সে সত্য-মিথ্যার প্রতিবাদ করার দরকার নেই। যখন যোগ্য হবে তখন প্রতিবাদ করলে কাজে লাগবে।

হঠাৎ মনে পড়লো প্রতিবাদ করার তো অনেক মাধ্যম আছে। যেমন সাংবাদিকতা। বাড়ি থেকে হাজীগঞ্জ এসে আজিজ মজুমদারের পেপারের দোকানে এসে পত্রিকা পড়ি কলেজের ফাঁকে ফাঁকে। তখন অবশ্য চাঁদপুরের কোনো দৈনিক বের হয়নি। সকল পত্রিকা ছিলো সাপ্তাহিক। কথা হয় ছাত্রলীগ নেতা মিঠুন ভদ্রের সাথে। তিনি বললেন, তুমি মাঝে মাঝে আমাদের একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা আছে সেটাতে লেখতো পারো। মনে মনে ভাবলাম, সুযোগ পেয়ে গেছি। আমি পরের দিন একটা দরখাস্ত দিলাম মিঠুন ভদ্রের কাছে। তিনি আমাকে চাঁদপুরে বিনয় ভূষণ মজুমদারের কাছে দেখা করে দরখাস্ত দিতে বলেন। আমি দরখস্ত দিলাম। এরপর থেকে গ্রামের সমস্যা সংক্রান্তসহ বিভিন্ন লেখা পাঠালে মাঝে মাঝে পত্রিকা ডাকে আসলে দেখি, লেখা ছাপা হয়েছে। তখন মনের মধ্যে আরো আগ্রহ প্রকাশ পেতো। এর মধ্যে হাজীগঞ্জের কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে পরিচয় হয়। তার মধ্যে জাকির মজুমদার, নূরে আলম পাটওয়ারী, খালেকুজ্জামান শামীম, হাছান মাহমুদসহ আরো অনেক। এভাবে এক বা দেড় বছর পার হওয়ার পর চাঁদপুর কণ্ঠের বড়কুল সংবাদদাতার জন্যে আবেদন করি জাকির মজুমদারের মাধ্যমে। কিন্তু জাকির মজুমদার আমার আবেদন জুয়েল রানার ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখেন। দুমাস পরে একদিন দেখি জুয়েল ভাই ড্রয়ার পরিষ্কার করার জন্যে কাগজপত্র বের করছেন। এ সময় আমার নজরে আসে আমার লেখা দরখাস্ত পড়ে আছে। আমি কৌশলে দরখাস্ত পকেটে নিলাম। কাউকে কিছু বলিনি। পরে জাকির ভাইকে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, শাহাদাত ভাইয়ের কাছে দিয়েছি। আসলে কথাটা সঠিক ছিলো না।

অন্যের বুদ্ধিতে কৌশলে আমি নিজেই দরখাস্ত নিয়ে চাঁদপুর হকার্স মার্কেটের অফিসে গিয়ে দেখি, শাহাদাত ভাই বসে কাজ করছেন। আমি দরখাস্তের খাম দিলে তিনি খুলে দরখাস্ত দেখে বলে উঠলেন, ও একবার লেখার ফাইল ডিলেট করে দিয়েছো, এখন আবার সাংবাদিকতা করতে আসছো। কী, হালচাষ করতে ভালো লাগে না? সাংবাদিকতার প্রয়োজন নেই। গ্রামে গিয়ে গরু দিয়ে হালচাষ করো। তখন আমার মনে ক্ষোভ আসলো এজন্যে যে, তিনি পুরানো বিষয়টা নিয়ে আমাকে আবারো অপদস্থ করেছেন। অতএব, আমি এটার শেষ কোথায় দেখবো। আমি সাংবাদিকতা করবো। সুনাম অর্জন করবো।

লেখাপড়ার ফাঁকে মাঝে মাঝে ডাকযোগে বা কোনো মাধ্যমে সাপ্তাহিক চাঁদপুর কণ্ঠে লেখা পাঠাই। একদিন দেখি সংবাদদাতা দিয়ে 'বড়কুল ইউনিয়নে রাস্তা না থাকায় জনদুর্ভোগ এলাকাবাসীর' নামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তখন ভাবলাম, লেখা আরো বেশি করে পাঠাতে হবে। কোনো না কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবেই।

সাপ্তাহিক চাঁদপুর কণ্ঠ দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো চাঁদপুরের প্রথম দৈনিক হিসেবে। দৈনিক হওয়ার কারণে লোকবল বেশি প্রয়োজন। তার সাথে সাথে বড় অফিসের প্রয়োজন। অফিস নেয়া হলো গুয়াখোলা রোডের মুখে একটি বাসায়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন উপজেলা সংবাদাদাতারা আসেন অফিসে। আমিও এ প্রথম অফিসে ঢুকে প্রথম রুমের উত্তর পাশের দিকে তাকিয়ে দেখি শাহাদাত ভাই বসে কাজ করছেন এবং চশমার উপরের অংশ দিয়ে দরজার দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে দেখেন আমি দাঁড়িয়ে আছি। মাথা উঠিয়ে 'কিরে কামাইল্লা, তুই সাংবাদিক হইবি' বলে ভেতরে যেতে বলেন। গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বসতে বললেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি আমার খোঁজখবর নিলেন। হাজীগঞ্জের অন্য সাংবাদিকদের খবর নিলেন। আমি চেষ্টা করেছি সবার ব্যাপারে সত্য কথা বলার জন্যে। এ পর্যায়ে কাজী শাহাদাত ভাই আমাকে বলেন 'তোরে কে কইছে সাংবাদিকতা করতি। যে তোরে বুদ্ধি দিয়েছে সে ভালো বুদ্ধি দেয়নি। এ পেশায় থাকলে ভাতে মরবি, কেউ মেয়ে বিয়ে দিবে না'সহ নানা কথা। এক পর্যায় আমাকে বলেন, 'আসলে কি সাংবাদিকতা করবি না দুষ্টামি করবি?' আমি বললাম, সাংবাদিকতা করতে আসছি। আপনি আমাকে সহযোগিতা করতে হবে। তিনি আমাকে পত্রিকার সার্কুলেশন বৃদ্ধি, বিজ্ঞাপনসহ সার্বিক বিষয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ দিলেন। পরে আমি হাজীগঞ্জে চলে আসি।

দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠে আমরা যারা নিয়মিত সাংবাদিকতা করতাম তাদের মধ্যে ছিলো একতা। জাকির মজুমদার ছিলেন ব্যুরো ইনচার্জ, সহকারী ছিলেন আরিফ ইমাম মিন্টু, সাংবাদদাতা ছিলেন নূরে আলম পাটওয়ারী, হাছান মাহমুদ, খালেকুজ্জামান শামীম ও আমি মোঃ কামাল হোসেন। আমরা সাংবাদ সংগ্রহ করে সাদা কাগজে লিখে ব্যুরো ইনচার্জের কাছে জমা দিলে তিনি সংবাদটি দেখতেন। এরপর তিনি চাঁদপুর কণ্ঠ অফিসে পাঠানোর জন্যে আমাদের হাতে দিতেন। আমরা ম্যাঙ্রি মাধ্যমে বা বোগদাদ বাসের মাধ্যমে চাঁদপুর আমির হোসেন পেট্রোল পাম্পে পাঠালে সেখান থেকে চাঁদপুর কণ্ঠ অফিসের পিয়ন নিয়ে যেতেন। এভাবে চলছিলো নিয়মিত সাংবাদিকতা। ২/৩ বছরের মধ্যে জাকির মজুমদারসহ তিন-চার জন জীবিকার তাগিদে ধীরে ধীরে এ পেশা থেকে অন্য পেশায় চলে যাওয়ার সুযোগে আমার কর্ম বেড়ে যায়। আমি কাজী শাহাদাত ভাইয়ের পরামর্শে এবং তাঁর নিয়মিত নির্দেশনায় মাত্র ৪ বছরের মধ্যে মন জয় করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি ২০০২ সালে জেলার সকল সংবাদদাতাকে নিয়ে তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। আমি সে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করি। প্রশিক্ষণেও সফলতা অর্জন করি।

২০০৪ সালে শিক্ষাঙ্গন পরিক্রমায় জেলায় প্রথম হওয়ায় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর হাত দিয়ে আমাকে ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করা হয়। ওই বছরই আমাকে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের হাজীগঞ্জ ব্যুরো ইনচার্জের দয়িত্ব দেয়া হয়। আমি একটানা ১০ বছর ব্যুরো ইনচার্জের দায়িত্ব পালনকালে বহু কর্মে সফলতা অর্জন করেছি। মাসে ৩০ সংখ্যার মধ্যে ২০/২৫ সংখ্যায় ছিলো আমার লেখা সংবাদের শিরোনাম। কণ্ঠের কামাল নামে সবাই আমাকে চিনতো। এ কারণে আমার জনপ্রিয়তা বাড়ে। বির্তক প্রতিযোগিতায়ও আমার সফলতা ছিলো। আবার সত্য সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার কারণে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হই এবং আমার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা করা হয় চাঁদাবাজির। আমি পুলিশের ভয়ে চাঁদপুর কণ্ঠের অফিসে টেবিলের মধ্যে রাত কাটিয়েছি। কিন্তু শাহাদাত ভাইয়ের নির্দেশে অপরাধীদের কাছে নতি স্বীকার করিনি। অবশেষে সে মামলাগুলোর রায় আমার পক্ষে হয়।

সর্বমোট ১৮ বছরের কর্মের মধ্যে প্রতি বছরই চাঁদপুর কণ্ঠের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাকে সম্মান করা হয় এবং সম্মাননা হিসেবে ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করা হয় বিশিষ্ট জনদের মাধ্যমে। হাতে ধরে বিভিন্ন সাংবাদ তৈরির কলাকৌলগুলো শিখিয়েছেন কাজী শাহাদাত। চাঁদপুর কণ্ঠের প্রতিটি সংখ্যায় থাকতো আমার লেখা শিরোনামের সংবাদ। চাঁদপুর কণ্ঠ হাজীগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি জায়গায় আমি পেঁৗছে দিয়েছি পাঠকের হাতে। আজ চাঁদপুর কণ্ঠ জেলা ও হাজীগঞ্জ উপজেলার মধ্যে সেরা পত্রিকা।

এর মধ্যে আমার বিরুদ্ধে একটি চক্র দাঁড়িয়ে যায় সুনাম নষ্ট করার জন্যে এবং চাঁদপুর কণ্ঠের অর্থনীতি ও পত্রিকার মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে। এ চক্র অফিস থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ে শত্রুতামি করে। হাজীগঞ্জের ৫/৬ জন মিলে সারাদিন আমার বিরুদ্ধে করে ফোন আর ফোন। এর সাথে যুক্ত হয় চাঁদপুর কণ্ঠের ম্যানেজার ও পরবর্তীতে যুগ্ম সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন মিলনও। এ শত্রুরা আমাকে চাঁদপুর কণ্ঠ থেকে সরানোর জন্যে সাদাকে কালো বানিয়ে মিথ্যা প্রচার করে। এভাবে চলতে চলতে অধৈর্য হয়ে পড়ি। আমি আমার আপনজনদের সাথে আলোচনা করার পর তারা আমাকে পরামর্শ দিলেন তুমি চাঁদপুর কণ্ঠ ছেড়ে নিজে পত্রিকা বের করার উদ্যোগগ্রহণ করো। আমরা তোমার সাথে থাকবো। আমি বললাম, পত্রিকা বের করা কঠিন কাজ। এটা বললে হয় না। পত্রিকা বের করার পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও স্থানীয় এমপির সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। এছাড়াও নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন। আমার পরামর্শকরা আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করার জন্যে প্রস্তুত। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমার প্রিয় পত্রিকা চাঁদপুর কণ্ঠ থেকে বিদায় বা পদত্যগ করতে হবে এবং আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে আবার। ১৮ বছরের কর্মের মধ্যেও ছিলো নানা ভুল-ভ্রান্তি। এ ভুল-ভ্রান্তির জন্যে কাজী শাহাদাত ভাই আমার সাথে রূঢ় আচরণ করেছেন। আমি এই আচরণে মনে কিছু নেইনি। কারণ তিনি 'আমার সাংবাদিকতার প্রিয় শিক্ষক'।

২০১৩ সালে আমি চাঁদপুর কণ্ঠ থেকে পদত্যাগ করি নগদ ৬০ হাজার টাকা দেনা পরিশোধের মধ্য দিয়ে। বিদায় নেয়ার আগে আমার সাংবাদিকতার শিক্ষক কাজী শাহাদাতের কাছে আবদার করলাম আমাকে অভিজ্ঞতার সনদ দেয়ার জন্যে। সাথে সাথে কম্পিউটার অপারেটরকে ডেকে বলেন, দ্রুত এ লেখাটা বের করে দাও। সেখানে তিনি লিখেছেন 'অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞানপত্র' । মনটা অনেক খুশিতে ভরে গেলো। মনের মধ্যে ছিলো প্রিয় চাঁদপুর কণ্ঠ ছেড়ে দেয়ার বেদনা, আবার ছিলো অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞানপত্র পাওয়ার আনন্দ। শাহাদাত ভাই সাথে সাথে বলেছেন, তুই পত্রিকা বের করবি? আমি বলেছি, চেষ্টা করবো। কিন্তু শত্রুপক্ষ বিশ্বাসই করেনি আমি পদত্যাগ করবো। তারা ভেবেছে, শাহাদাত ভাই আমাকে চাঁদাবাজ পরিচয় দিয়ে চাঁদপুর কণ্ঠ পত্রিকায় ছবি ছাপিয়ে দেবে আর তারা এটা দিয়ে আমার সুনাম নষ্ট করবে এবং রাজনীতি করবে। বলা দরকার, শাহাদাত ভাই কখনো কোনো প্রতিনিধিকে চাঁদপুর কণ্ঠ পত্রিকায় ছবি দিয়ে বহিষ্কার করেননি। এটা চাঁদপুর কণ্ঠের আদর্শ। যা অন্য পত্রিকায় নেই।

চাঁদপুর কণ্ঠ ছেড়ে বেকার হয়ে গেলাম। মাথায় অনেক চিন্তা কী করবো। বয়স হয়েছে, বিয়ে করিনি। বেকার ছেলেদের কাছে মেয়েরা বিয়ে বসে না। পত্রিকা বের করা কঠিন কাজ। আমার বংশের লোকেরা এমনিতেই সাংবাদিক কাকে বলে জানে না। আর আমি হলাম সাংবাদিক। আবারও আমার উপদেষ্টাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কী করবো। তারা বলেন, এমপির সাথে তোমার সম্পর্ক ভালো, পত্রিকা বের করার সকল ব্যবস্থা করো। আমি বলেছি, এমপি সম্মতি দিবে কি না সেটা তার সিদ্ধান্ত। কয়েক দিন পর আমার অভিভাবক মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম এমপিকে ফোন করে বললাম, আমি পত্রিকা বের করবো। তিনি রাজি হলেন। আমি সকল কাগজপত্র ঠিক করে এমপি স্যারকে জানালে তিনি আমাকে ডিও লেটার দেন এবং সাথে সাথে জেলা প্রশাসক মোঃ ইসমাইল হোসেনকে ফোনে বলে দেন, কামাল ভালো ছেলে। পত্রিকা বের করার জন্যে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। ৬ মাসের মাথায় চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে 'আমার কণ্ঠ' নামে পত্রিকার ছাড়পত্র পেয়ে ডিসি স্যারের কাছে জমা দিলে তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র দেয়ার তারিখ ঠিক করেন ২৮ মে। আমি এমপি স্যারকে তারিখ জানালে তিনি অনেক খুশি হন এবং কিছু পরামর্শ দেন। আমি কাজী শাহাদাত ভাইকে ফোনে জানালাম, 'আমার কণ্ঠ' নামে পত্রিকার ঘোষণাপত্র দেয়া হবে আমাকে, আপনাকে থাকতে হবে। তিনি বললেন, আমি জানতাম তুমি পত্রিকা বের করবে। তবে আমি না থাকলেও আমার পক্ষ থেকে একজনকে পাঠাবো। তোমার প্রতি দোয়া থাকবে। ২৮ মে ২০১৪ খ্রিঃ তারিখে জেলা প্রশাসকের অফিসে গেলে ডিসি স্যার এক ঘণ্টা পরে আসলে কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। ডিসি স্যার আমার ৭ মাসের দক্ষতা দেখে বলেন, কামাল পত্রিকা চালাতে পারবে। উপস্থিত সবাই তখন খুশি হয়েছে শুনে।

সবশেষ বলবো, কাজী শাহাদাত নিজের যোগ্যতায় জেলার সর্বস্তরের মানুষের মন জয় করেছেন। চাঁদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক শিক্ষক বা সাংবাদিক প্রতিষ্ঠান কাজী শাহাদাত। তাঁকে চাঁদপুরের সকল গুণীজন এক বাক্যে পছন্দ করেন বা মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তিনি যতো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেন সবক'টির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। তার প্রতিটি ছাত্রের মধ্যে তাঁরই কর্মের আদর্শ রয়েছে। তাঁর কোনো ছাত্রকেই তিনি চাঁদাবাজ সাংবাদিক বা অদক্ষ সাংবাদিক তৈরি করেননি। অর্থ আয়ের মেশিন তৈরি করেননি। তিনি প্রতি ছাত্রকে শিখিয়েছেন সৎ থেকেও কীভাবে সুন্দরভাবে জীবনযাপন এবং সুনাম অর্জন করা যায়। তার ছাত্ররাই জাতীয় পর্যায়ে, জেলা ও উপজেলায় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। জেলার অন্য কোনো পত্রিকার প্রধান সম্পাদকের এতো ছাত্র আছে কি না বলা মুশকিল। তাঁর প্রতিটি কর্ম জেলাবাসী আজীবন মনে রাখবে। আমার ১৭ বছরের জীবনে আমাকে যা শিখিয়েছেন তা এখন আমার আদর্শ। তিনি বহুগুণের অধিকারী। তাই আমরা সবাই কাজী শাহাদাতকে জীবদ্দশায় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ও তাঁর আদর্শকে লালন করা দরকার।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক ও প্রকাশক, সাপ্তাহিক আমার কণ্ঠ।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৪৫১৫
পুরোন সংখ্যা