চাঁদপুর, রোববার ৮ মার্চ ২০২০, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ১২ রজব ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৫-সূরা তালাক


১২ আয়াত, ২ রুকু, মাদানী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১১। এক রাসূল, যে তোমার নিকট আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করে, যাহারা মু'মিন ও সৎকর্মপরায়ণ তাহাদিগকে অন্ধকার হইতে আলোতে আনিবার জন্য। যে কেহ আল্লাহে বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে তিনি তাহাকে দাখিল করিবেন জান্নাতে, যাহার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তাহারা চিরস্থায়ী হইবে; আল্লাহ তাহাকে উত্তম রিয্ক দিবেন।


 


প্রতিভাই শক্তি কিন্তু কৌশল হচ্ছে দক্ষতা।


-ডাবিস্নউ পি স্কারজিল।


 


অভ্যাগত অতিথির যথাসাধ্য সম্মান করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।


ফটো গ্যালারি
হাইমচরের অদম্য সবিতার গল্প
রিয়াজ মোচ্ছাবির
০৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


নারী শব্দটা দুই অক্ষরের হলেও বাস্তবজীবনে নারীর অবদান এবং প্রভাব দু চোখে লক্ষ্য করার মতোই। পুরুষবিহীন নারী সংগ্রামের মাধ্যমে যে পৃথিবীতে স্বাবলম্বী হতে পারে তার অনেক ঘটনাই আমরা আমাদের আশপাশে দেখতে পাই। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, 'বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর'।



 



পুরুষ ছাড়াও নারী স্বাবলম্বী হতে পারে, শুধু প্রয়োজন অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্য। এ অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর ধৈর্যের কারণে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন অনেকেই। তেমনি একজন অদম্য নারী হাইমচর উপজেলার পশ্চিম চরকৃষ্ণপুর এলাকার সবিতা রায়। সবিতা রায় দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হওয়ায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকা সত্বেও অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি। দারিদ্র্যতার কারণে অল্প বয়সেই তাকে জীবন কৃষ্ণ সুতার সাথে বিয়ে দেয়া হয়। স্বামী পেশায় দিনমজুর। শুরু হয় 'সংসার' নামক নতুন জীবন। কিন্তু কে জানতো 'সংসার' নামক জীবনটা তার 'অসম্পন্ন সংসারে' পরিণত হবে। বিয়ের চার বছরের মাথায় সবিতার স্বামী ইহকাল ত্যাগ করেন। রেখে যান দুটি কন্যাসন্তান। অনেকেই বলেছে, সবিতার নাকি 'পোড়া কপাল'। পোড়া কপালে কীভাবে ফসল ফলাতে হয় সবিতা তা করে দেখিয়েছেন। তার দুই সন্তানের একজন ৩ বছরের, আরেক সন্তান কোলের বাচ্চা। সবিতার শ্বশুর বাড়ির মানুষগুলোও নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কারণ তাদের দিনগুলোও দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে চলছে। আশপাশের অনেকেই বলেছিলো, সবিতা তুমি বাচ্চাদের এতিমখানায় রেখে আরেকটা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হও। স্বামী ছাড়া তুমি কীভাবে এ সংসার চালাবে। স্বামী ছাড়া মেয়েরা অচল। সবিতা তার ফুটফুটে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিলেন। প্রতিবেশীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, কেনো? স্বামী ছাড়া কি মেয়েরা জীবন চালাতে পারে না। কিসের অচল? আমার সাথে যার বিয়ে হয়েছে সেও একজন মানুষ, আমিও একজন মানুষ। পৃথিবীতে কাউকে ছাড়া কেউ অচল হতে পারে না। অনেকই বললো, এটা আবেগ কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। সবার কথা এড়িয়ে সেই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে সংগ্রামে পা বাড়ালেন সবিতা। দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি চারদিকে ধোঁয়াশা দেখে। দু মুঠো ভাতের জন্যে হাহাকার। কোনো মূলধনও ছিলো না যে কোনো ব্যবসা করবে। এদিকে বড় মেয়ের বয়স ৫ বছর। তাকে স্কুলে ভর্তি করালো। বাপের বাড়ির অবস্থা খারাপ, সেখানে তিনি কীভাবে সাহায্যের জন্যে হাত পাতবেন। কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না সবিতা। তখন একজনের পরামর্শে একটি এনজিও থেকে স্বল্প সুদে কিছু ঋণ নেয় সবিতা। তারপর চর-এলাকায় থেকে পাটি বুনার কাঁচা পাতা ক্রয় করে। কাঁচা পাতা কয়েক সপ্তাহ ধরে শুকিয়ে পাটি তৈরি করে। সেই পাটি এলাকার মানুষের কাছে বিক্রি করে। একটি পাটি বুনতে দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগতো। বড় মেয়ের পড়াশোনা, ছোট মেয়ের খাবার, সংসার, অন্যদিকে ঋণকৃত টাকার চাপ। ছোট মেয়ে কোলের শিশু হওয়ায় তিনি দিনে সময় করে পাটি বুনতে পারতেন না। তাই তিনি রাতে পাটি বুনার কাজ করতেন।



 



এদিকে ছোট মেয়ের খুবই অসুখ। পাটিপাতা কেনার সব টাকা মেয়ের অসুখ সারানের পেছনে ব্যয় করলেন। আবারো চারদিকে ধোঁয়াশা। এর মাঝে কোনো দিন দিনে একবেলা খেয়েছেন, কোনদিন সে সুযোগও হয়নি। ছোট শিশুটার কান্নায় প্রতিবেশীরাও বিরক্তিবোধ করে। এ অভাব দূর করতে তিনি একটা বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নেন। সংগ্রাম করার জন্যে নিজের সোনার টুকরো মেয়েকে স্থানীয় হাসপাতালে চাকুরি করা দম্পতির কাছে দত্তক দিয়ে দেন। বড় মেয়েকে নিয়ে অনেক বড় হতে হবে তার। ঋণকৃত টাকা কিছু গহনা বিক্রি করে পরিশোধ করলেন। এখন তার কাছে কোনো সম্বল নেই।



 



একদিকে মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা অন্যদিকে হিংস্র মানুষের থাবা। অপরদিকে প্রতিবেশীরা তাকে তিরস্কার করতে লাগলো। সবিতা ভেঙ্গে পড়ার মেয়ে নয়। সকল বাঁধা, প্রতিবেশীদের তিরস্কার, মূলধনের অভাবকে ডিঙিয়ে তিনি এক বাসায় গৃহপরিচালিকা হিসেবে কাজ করেন। ভাত না থাকায় মেয়েকে সকালে বিস্কুট ও মুড়ি খাওয়ালেও স্কুলে দিয়ে আসতেন। তারপর কাজের বাড়িতে চলে যান। দুপুরে স্কুলে গিয়ে মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসতেন। মেয়েকে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে রেখে আবার কাজে আসতেন। এভাবে দুই বছর অতিবাহিত হয়। কাজের টাকা জমিয়ে পাঁচ হাজার হয়। এতো পরিশ্রমের কারণে সবিতা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবিতা বলে, 'হে ইশ্বর আমাকে শক্তি দাও, আমি স্বাবলম্বী হতে চাই।'



জমানো টাকা দিয়ে সবিতার চিকিৎসা হয়। এমন দুঃখ, দুর্দশার মাঝেও কিছু মানুষ তাকে নিয়ে কটূ কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেনি। তাতে কান দেন না সবিতা। এবার এলাকার এক মহিলার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা ধার করে আবারো পাটি তৈরির পাতা কিনেন। পাটি বুনে বিক্রি করার জন্যে। শুরু হয় আবারো সংগ্রাম।



 



এদিকে মেয়ের বয়স ৯ বছর। মেয়ের পড়ালেখার খরচও বাড়তে থাকে। তিন বছর পাটি বুনে সাত হাজার টাকা সঞ্চয় করে। এবার এক প্রতিবেশীর কাছে এক হাজার টাকা দিয়ে রাতে অবসর সময়ে সেলাই কাজ শিখতে শুরু করলেন সবিতা। দীর্ঘ ৬-৭ মাসের কঠোর পরিশ্রমে সেলাই কাজ শিখে ফেলে। নিজের সঞ্চয় করা টাকা দিয়ে একটি নতুন সেলাই মেশিন ক্রয় করেন। ছেড়ে দেন পাটি বুনার কাজ। ধীরে ধীরে তার কাছে কাপড় সেলাইয়ের কাজ আসতে থাকে। মাঝে মধ্যে দত্তক দেয়া মেয়েকে দেখতে যান আর চোখের পানি ছেড়ে বলেন, অভাবের কারণে আজ জন্মদাত্রী মায়ের কাছ থেকে আলাদা। ক্ষমা করে দিস মাকে। বড় মেয়ে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগলো। কিছুদিন পর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি টিনের ঘর পেলেন এবং কিছু আর্থিক সাহায্যও পেলেন। সবিতা তার পরিশ্রম বাড়িয়ে দিলেন। অনেক রাত অবধি কাজ করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে তার কাজের পরিধি বাড়তে লাগলো। তাই তিনি একজন নারী সহকর্মী রাখলেন। কিছুদিন পর তার কাছে সেলাই কাজ শেখার জন্যে অন্য নারীরা আসতে শুরু করলো। তাই তিনি আরেকটি সেলাই মেশিন ক্রয় করলেন। এভাবে কাজ করার পর দশ হাজার টাকার মতো গজ কাপড় কিনলেন। নিজের ডিজাইনে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের পোশাক। সবিতার কর্মদক্ষতা দেখে নারীরা তার কাছে কাজ নিয়ে আসতে শুরু করে। সবিতা কাপড় সেলাইয়ের পাশাপাশি কাপড় বিক্রিও করতেন। সেলাই কাজও শেখাতেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে আজ তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল। সবিতা নিজ গ্রামের পিছিয়েপড়া হতদরিদ্র নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিনা সুদে টাকা ধার দেন। বড় মেয়েকে অনার্স পড়াচ্ছেন। কিছুদিন আগে মেয়ের বিয়ে দেন। সবিতার এ সংগ্রামের পথ পাড়ি দেয়ায় অসচ্ছল নারীরা 'আইডল' হিসেবে দেখে।



 



সবিতা নারীদের বলেন, মুখ খুললে যেখানে তোমার অস্তিত্ববিলীন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যে তোমার চরিত্র নিয়ে কথা বলে, তাদের মুখ বন্ধ করতে প্রয়োজনে তাদেরকে এড়িয়ে যাও। তারা বিকৃত রুচির মানুষ। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করো।



 



আমরা সবিতার স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প শোনে বলতে পারি, নিজের সত্তাকে অন্যের কাছে বিলীন না করে নিজের জন্যে বাঁচতে হবে। জাগরিত হও নারী। না হলে অন্যেরা তোমাকে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে দেবে না। যতোদিন প্রাণ আছে, বেঁচে থাকাটাকে সার্থক করো। প্রাণভরে শ্বাস নাও। জীবনটা তোমার, আপসোস করে সময় নষ্ট করো না। কীভাবে এখান থেকে উত্তরণ ঘটবে সেই পথে পা বাড়াও। দুর্গম যাত্রাপথে নিজেকেই নিজের অবস্থান তৈরি করতে হবে। তাই নিজেকে বেশি ভালোবাসো। নিজেকে চেনো। নিজেকে জানো।



 



রিয়াজ মোচ্ছাবির : বিবিএ চতুর্থ বর্ষ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, চাঁদপুর সরকারি কলেজ।



 



 


করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৩,৩৯,৩৩২ ২,৯২,০১,৬৮৫
সুস্থ ২,৪৩,১৫৫ ২,১০,৩৫,৯২৬
মৃত্যু ৪,৭৫৯ ৯,২৮,৬৮৬
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৫০৭৬০
পুরোন সংখ্যা