চাঁদপুর। শুক্রবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২ পৌষ ১৪২৩। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

সর্বশেষ খবর :

  • পুরানবাজার ট্রাঙ্কপট্টিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড, আগুন নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস || পুরানবাজার ট্রাঙ্কপট্টিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড, আগুন নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৬-সূরা শু’আরা


২২৭ আয়াত, ১১ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৩০। এবং যখন তোমরা আঘাত হান তখন আঘাত হানিয়ে থাক কঠোরভাবে। 


১৩০। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।   


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


সফলতা কখনো অন্ধ হয়  না। 


                           -টমাস ফুলার।   


সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী যে স্বল্পাহারে সন্তুষ্ট থাকে অল্প হাসে এবং লজ্জাস্থান ঢাকিবার উপযোগী বস্ত্রে পরিতুষ্ট।     


  

আমার স্বাধীনতা_আমার গর্ব
আহমেদ উল্লাহ ভঁূইয়া (বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আয়কর আইনজীবী)
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবস আসলেই এক শ্রেণীর আবেগপ্রবণ অথবা '৭১-এর নিভৃতচারীগণ নব প্রজন্মের নিকট মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে এমন সব তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেন বাস্তবতার সাথে যার দূরতম সম্পর্কও নেই। এরা ভুলে যান তাদের সবময়সী এবং বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত অনেক বিদগ্ধ লোক এখনও বেঁচে আছেন কালের সাক্ষী হয়ে। মানব জীবনের সবচে' বড় কাজ হলো জাতির ক্রান্তিলগ্নে দেশ ও জনগণের জন্য নিজেকে উপস্থাপন করা, আত্মোৎসর্গ করা। জাতি হিসেবে আজকের বাংলাদেশী জনগণের রয়েছে হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনরত নিহত স্বজনদের হার দিয়েই আমরা শুরু করি প্রতিরোধ যুদ্ধ। তৎকালীন বিশ্বের তৃতীয় সমর শক্তি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে অসম্মানজনকভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ছিনিয়ে আনি বিজয় পতাকা, আমার আরাধ্য স্বাধীনতা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

দীর্ঘ ২১৪ বছরের বল্গাহীন শাসন শোষণে আমরা যখন আত্মপরিচয় হারানোর পথে, তখন বাস্তবতা আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার সঙ্কল্প যোগায়। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্র কাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর অসংখ্য জীবন এবং সম্ভ্রমের বিনিময়ে সবুজের মাঝে সূর্য খচিত পতাকা আমরা অর্জন করি। দীর্ঘ শোষণ এবং অত্যাচারে আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের সোনালী অতীত। বৃটিশ আগমনের আগে আমরা ছিলাম শাসক। আর বৃটিশের ভারত দখলের ফলে আমরা হলাম শোষিত-নিষ্পেষিত। বৃটিশের বিমাতাসুলভ আচরণ আর অত্যাচারী জমিদার শ্রেণীর অমানবিক শোষণে জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় যখন মুছে যাওয়া সময়ের ব্যাপার প্রায়, ডুবন্ত জাহাজের যাত্রীর মত পরম বিশ্বাসে আমরা পাকিস্তানকে অাঁকড়ে ধরলাম। আমাদের বিশ্বাস ছিল একই ধর্মে বিশ্বাসী হিসেবে পাকিস্তান আমাদের সাথে অন্তত গাদ্দারি করবে না। কিন্তু শাসক হিসেবে যাদের পেলাম মনে হলো এরা বৃটিশ এবং অত্যাচারী জমিদারদের পাকিস্তানী সংস্করণ মাত্র। এরা আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবেই গণ্য করত। ক্রমশ আমাদের নিদ্রাভঙ্গ হতে লাগল। জমিদার বাবুরা বলতো, আমরা চাষার জাত। নিম্ন শ্রেণীর চ-াল বা শূদ্র শ্রেণী হতে মুসলমান হয়েছি। পাকিস্তানীরা বলতো, আমরা বুজদিল বা কাপুরুষ। আসলে জমিদারদের অত্যাচার আর বৃটিশদের নিপীড়নে আমরা আমাদের আত্মপরিচয়, সহায় সম্পদ হারিয়ে একটি অশিক্ষিত গরিব মজুর শ্রেণীতে পরিণত হয়ে পড়েছিলাম। বাবু কবি সাহিত্যিকরা আমাদের নেড়ে-চাষা বলে গালাগাল দিত। পাকিস্তানী নাক উঁচু জেনারেলরা বলতেন, আমরা আধা-মালাউন, অধঃস্তন মুসলমান, হিন্দু আচার আচরণে পুষ্ট। তারা আরো বলতেন, সামরিক বাহিনীতে চাকুরি করার মত যোগ্যতা আমাদের নেই।

আজ মনে পড়ে, সহযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অবঃ) জহিরুল হক পাঠান-টি.জে. সুবেদার (মৃত) আব্দুর রব, মৃত সুবেদার মেজর মফিজুল ইসলাম, ক্যাপটেন (অবঃ) গোলাম মাওলা, সুবেদার মেজর মৃত আলী আকবর পাটওয়ারী, শহীদ নায়েক সুবেদার নুর আহমদ গাজী, মৃত পেটি অফিসার (নেভী) জয়নাল আবেদীন চৌধুরী (আমার দীর্ঘকালীন প্লাটুন কমান্ডার), নায়েক এরশাদ উল্লাহ, মৃত সুবেদার প-িত আলী, হাবিলদার আবদুল করিম, মৃত আতিকুর রহমান বাচ্চু, মৃত সুবেদার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট (অবঃ) আব্দুল গফুর (সবার প্রিয় গফুর ওস্তাদ), মৃত সুবেদার আব্দুল হক, মৃত হাবিলদার আবদুস সাত্তার হারেস, নায়েক আরব আলী, নায়েক বাসার, নায়েক আমিরুল ইসলাম, নায়েক শফিকুর রহমান, নায়েক শহীদ উমর ফারুক, হাবিলদার মৃত মোহাম্মদ আলী টি.কে. (আমার শ্রদ্ধেয় সেকশন কমান্ডার), নায়েক আবদুল হালিম পাটওয়ারী, হাবিলদার আবদুল মতিন, ল্যান্স নায়েক জাহাঙ্গীর, হাবিলদার আবদুল মান্নান ইপিআর, নায়েক নুরুল ইসলাম ইপিআর, নায়েক নুর ইসলাম ইপিআর, মৃত নায়েক সুবেদার জহিরুল ইসলাম, হাবিলদার লোকমান আহমেদ, সিপাহী ওয়ালী উল্লাহ, সিপাহী আবদুল করিম, ল্যান্স নায়েক আবদুল করিম পাটওয়ারী, ল্যান্স নায়েক বজলুর রহমান, মৃত হাবিলদার আবদুর রশিদ, ল্যান্স নায়েক সিদ্দিকুর রহমান, নায়েক আব্দুল হালিম পাটওয়ারী, বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা বর্তমান জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার আব্দুল ওয়াদুুদ প্রমুখ। এছাড়া অনেকের নামই ভুলে গেছি।

এঁদের রণকৌশল, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, সহমর্মিতা-সততা-আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। এঁরা অধিকাংশই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। নিশ্চিত ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলির ভয়কে তুচ্ছ করে দেশ মাতৃকার ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যেখানে এদেশের হাজার হাজার শিক্ষিত ডাকসাইটে আমলা, স্কুল, কলেজ শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, প্রফেসর, ডাক্তার, বুদ্ধিজীবী, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনৈতিক নেতা '৭০ সালের নির্বাচিত অনেক প্রাদেশিক ও জাতীয় সংসদ সদস্য পাক-হানাদার বাহিনীর নির্লজ্জ দালালি করেছে, সেখানে এ সাধারণ সৈনিকগণ তাদের প্রিয়জন এবং নিজের জীবন বাজি রেখে সম্মুখ যুদ্ধ করে দেশকে হানাদার মুক্ত করেছেন, ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতা। এঁদের এ ত্যাগ তুল্যহীন। যে কোনো বিবেচনায় এঁরাই জাতির শ্রেষ্ঠতম সন্তান। ক্যাপ্টেন (অবঃ) জহিরুল হক পাঠান টি.জে.র ট্রুপস তখন পরিচিত ছিল পাঠান কলিম উল্লাহ ভূঁইয়ার মুক্তিফৌজ নামে। জনাব কলিম উল্লাহ ভঁূইয়া ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে হাজীগঞ্জ থানায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৮ সালে হাজীগঞ্জ হাই স্কুল হতে ম্যাট্রিক, ১৯৫০ সালে চাঁদপুর কলেজ হতে ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৫২ সালে জগন্নাথ কলেজ হতে বি-কম পাস করেন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে তিনি গ্রেটার কুমিল্লা জেলা ভাষা সংগ্রাম পরিষদের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫৫ সালে তিনি করাচী থেকে কস্ট অ্যাকাউনট্যান্সি পাস করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাকুরিতে যোগ দেন। দুই বছর চাকুরি করার পর তিনি আয়কর আইনজীবী হিসেবে করাচীতে আয়কর আইন ব্যবসা শুরু করেন। এই সময় তিনি বাম রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি নিজ এলাকায় স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিগত অবস্থান এবং '৭১-এর প্রেক্ষাপটে চাঁদপুরের সামরিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ঢাকা হতে চাঁদপুরের দূরত্ব সড়ক পথে ১৬৯ কিলোমিটার, রেলপথে ২৪১.৫০ কিলোমিটার, আর নদীপথে মাত্র ৬৭.৬২ কিলোমিটার।

চাঁদপুর অন্তত '৭১-এর প্রেক্ষাপটে একটি বীর প্রসবিনী মহকুমা। যা আজকের জেলা। আজকের এ জেলায়ই জন্মগ্রহণ করেছেন মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, যিনি ছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশের বৃহত্তর সেক্টর-১-এর কিংবদন্তীর সেক্টর কমান্ডার, সেক্টর-৮-এর সেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী, বীর প্রতীক মেজর জেনারেল (অবঃ) সামসুল হক, ক্যাপ্টেন (অবঃ) জহিরুল হক পাঠান টি.জে. জনাব মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীর প্রতীক), জনাব ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল, ক্যাপ্টেন (অবঃ) আবদুল জাব্বার পাটওয়ারী, ক্যাপ্টেন (অবঃ) গোলাম মাওলা, লেঃ (লে.) আবদুল গফুর, বি.এম. কলিম উল্লাহ, জনাব খালেকুজ্জামান ভঁূইয়া, জনাব মমিন উল্লাহ পাটওয়ারী বীর প্রতীক, জনাব আবদুল মমিন খান মাখন, মতলবের জনাব কবির আহমদ খান, হাজীগঞ্জের শ্রী কালী নারায়ণ লোধ, ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) শাহ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন দুলু প্রমুখ।

ক্যাপ্টেন (অবঃ) জহিরুল হক পাঠান টিজে ও কলিম উল্লাহ ভঁূইয়ার ট্রুপসে যে সকল চৌকস ছাত্র-যুবক যোগদান করে সম্মুখ সমরে অসামান্য অবদান রেখেছেন আমার সেসব সহযোদ্ধার মাঝে হাজী মোহাম্মদ শাহজাহান, ইঞ্জিনিয়ার শহীদ আহমদ, নজির আহমদ, গোলাম রাব্বানী, আলাউদ্দিন, আবদুল লতিফ ভঁূইয়া, মরহুম আমির হোসেন পারভেজ, আনম বোরহান উদ্দিন চৌধুরী, হাজিফুর রহমান মিন্টু, মোঃ শাহজাহান, বিএম মহসিন, ডাঃ দেলোয়ার হোসেন খান, মোঃ শাহ আলম (উভা রামপুর), অজিত সাহা, বিডি পোদ্দার, মকবুল আহমেদ সাহেবগঞ্জ, আহমেদ উল্লাহ রতন, হাবিলদার মরহুম আবদুল মান্নাফ (সাহেবগঞ্জ-ফরিদগঞ্জ), নায়েক মরহুম আব্দুল আজিজ, মোঃ আব্বাস উদ্দিন, মরহুম ওসমান গনি, তরিক উল্লাহ পাঠান, সফিউল্লাহ পাঠান, মোঃ কামাল পাঠান, সাইফুল ইসলাম পাঠান, হাজীগঞ্জ মোহাম্মদপুরের আনোয়ার হোসেন এবং তার সহোদর বড় ভাই গোলাম মহিউদ্দিন খান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ফরিদগঞ্জের ১৬ নং ইউনিয়নে মরহুম হাবিলদার আব্দুল মান্নাফের নেতৃত্বে স্থানীয়ভাবে ৪০ জনের একটি দল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

চাঁদপুরের মুক্তিযুদ্ধকে যাঁরা পূর্ণাঙ্গ রূপদানে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, পরিশোধিত করেছেন জনগণের অর্পিত আস্থার ঋণ, তাঁরা হলেন দেশ-মাতৃকার কৃতী সন্তান মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরী, মরহুম আব্দুল করিম পাটওয়ারী, মরহুম আবু জাফর মাঈন উদ্দীন, মরহুম ওয়ালী উল্লাহ নৌজোয়ান, মরহুম রাজা মিয়া, মরহুম শফিউল্লাহ, মরহুম তফাজ্জাল হায়দার চৌধুরী (নসু চৌধুরী), আবদুর রব বিএসসি, জনাব সালেহ আহমদ বিএসসি, ফরিদগঞ্জ কেরোয়ার মরহুম সিরাজ মিয়া, আবুল খায়ের পাটওয়ারী, আমিনুল হক মাস্টার, কসমিক সফিউল্যাহসহ আরো অনেকে। আজ এতদিন পর অনেকের নামও স্মরণে আসে না। তবে কালের ইতিহাস যদি কোনো দিন নোংরা রাজনীতির ঊধর্ে্ব উঠতে পারে তবে অবশ্যই ভাবী বংশধরগণ এঁদের খুঁজে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। মূল্যায়ন করবে। খুঁজে বের করবে যাঁরা ইতোমধ্যেই বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের প্রযোজনীয় অস্ত্রের অভাব দেখা দেয়। আমরা জানতে পারি জনাব কলিম উল্লাহ ভঁূইয়ার নিকট কিছু অস্ত্র আছে। তাঁকে খবর দেয়ার পর তিনি পাইকপাড়া আসলেন। এখানকার সৈনিকদের সমাহার দেখে তিনি অভিভূত হয়ে যান। তিনি কিছু অস্ত্র দিলেন এবং বললেন, আপনারা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলে অস্ত্রের অভাব হবে না। অস্ত্র কিভাবে সংগ্রহ করতে হয় তা আমি জানি। তিনি বললেন, আমাদের যুদ্ধ করতে হবে গণচীন বা ভিয়েতনামের কায়দায়। শত্রুর কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েই যুদ্ধ করতে হবে। এবং গেরিলা পদ্ধতিতে। এরপর আমরা অস্ত্র লুট করলাম কচুয়া থানার, মতলব থানার এবং হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জ থানার। সে এক লোমহর্ষক কাহিনী। ছদ্মবেশ ধারণে কলিম উল্লাহ ভঁূইয়ার জুড়ি ছিল না। মজার ব্যাপার হলো, চাঁদপুরের প্রতিটি থানায়ই তাঁর লোকজন ছিল। তিনি গঠন করলেন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। শুরু হলো অতর্কিত শত্রুর উপর আক্রমণ। হিট এন্ড রান পদ্ধতি। যুদ্ধের প্রারম্ভে বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর, বৃহত্তর রামগঞ্জ, চৌমুহনী, পূর্বে লাকসাম এবং পুরো চাঁদপুর মহকুমা (বা আজকের জেলা)। প্রথমে রাইফেল, কারবাইন, স্টেনগান। পরে চৌমুহনীতে হঠাৎ পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ করে (এপ্রিলের শেষ দিকের ঘটনা) তিনটি এলএমজি (বৃটিশ), বেশ কিছু জি-থ্রি এবং চায়নিজ রাইফেল আমাদের হস্তগত হয়। সাথে প্রচুর গোলাবারুদ। এমনি করে দিনে দিনে আমরা অস্ত্র সংগ্রহ করতে লাগলাম। মে মাসের শেষের দিকেই বিভিন্ন গেরিলা কায়দায় আমরা শত্রুকে চ্যালেঞ্জ করার মত অস্ত্রের অধিকারী হই। এক্ষেত্রে জনাব বি.এম. কলিম উল্যাহর কৃতিত্ব অপরিসীম। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি, ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা এবং সাহস সবাইকে হতবাক করে দিত। জনাব জহিরুল হক পাঠানের সামরিক প্রজ্ঞা আর জনাব কলিম উল্যাহ ভঁূইয়ার রণকৌশলে অচিরেই আমরা বিবেচিত হই শত্রুর ত্রাস রূপে। ফরিদগঞ্জ থানার খাদ্য গোডাউন লুট, সোনাপুরের ব্যাংক লুট আমাদের খাদ্য এবং হাত খরচের জন্য যথেষ্ট ছিল। অধিকন্তু সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে কিছু অর্থ ভারতেও পাঠানো হয়।

যে জনগণ এতদিন আমাদের আশ্রয় দিতে ভয় পেত, তারাই আজ ছায়ার মত আমাদের অনুসরণ করে, সেবা দানে কার্পণ্য করে না, আশ্রয় দানে পিছ পা হয় না। আসলে কথায় বলে বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা। পরাজিতের পক্ষে কেউই নেই, থাকে না। এটাই জগতের রীতি। ক্রমশঃ জহিরুল হক পাঠান ও কলিম উল্যাহ ভঁূইয়ার নাম কিংবদন্তীর মতো গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। শত্রুর বুকে ধরত কম্পন। পরবর্তীতে রাজাকার ও দালালরা আমাদের ট্রুপসের পরিচয় জানলে হাত থেকে তাদের অস্ত্র পড়ে যেত। আমরা একবার দুইজনে একত্রে ২৬ জন রাজাকার ধরে নিয়ে গেছি গরুর পালের মত হাজীগঞ্জের কৈয়ারপুল থেকে।

চাঁদপুর পাক হানাদার বাহিনীর রিয়ার হেড কোয়ার্টার হওয়াতে এবং তখন ঢাকা হতে চট্টগ্রামের একমাত্র পথ বিবেচনা করা হতো ঢাকা-চাঁদপুর-চৌমুহনী, ফেনী-চট্টগ্রাম রূটকে। তাই প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অবস্থানে আমাদের কোনো না কোনো গ্রুপের সাথে তাদের যুদ্ধ হতো। এছাড়া আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে কিছু কিছু এফ.এফ. এবং দেশের দিকে বি.এল.এফ. বাহিনীর কিছু সদস্য চাঁদপুর এলাকায় অনুপ্রবেশ করে। তাদের কেউ কেউ যুদ্ধ করেছেন, কেউ ভালও করেছেন। তবে হানাদার পাক আর্মিকে আমরা সবসময় লক্ষ্যে রাখতাম। সুযোগ পেলেই আক্রমণ করতাম। তবে জুনের পর থেকে খুব কম অবস্থান থেকেই হানাদার বাহিনী আমাদের স্থান ত্যাগে বাধ্য করতে পেরেছে।

আমরা পাক-হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি অসামান্য বীরত্বের সাথে লড়েছি ফরিদগঞ্জ, খাজুরিয়া, কড়ইতলী, গাজীপুর, চান্দ্রা, নানুপুর, ইচলী, নরিংপুর, পানিয়ালা, উটতলী, মুন্সীরহাট, শোল্লা, বলাখাল, রাগৈ, বাকিলা, খোদাই বিল, সূচীপাড়া, খেতের পাড়, ঠাকুর বাজার, আয়নাতলী, লাওকোরা, রামগঞ্জ, মুদাফফরগঞ্জ, রঘুনাথপুর, বইশেরহাট, গবিন্দপুর, মুকুন্দসার, ভাটিরগাঁও, বাসারা, শাশিয়ালী, পাইকপাড়া, খিলা, চৌমুহনী, চিতোষী, লাঙ্গলকোট, হাসনাবাদ, রূপসা, বিঘা, পালিশারা, মেহের কালীবাড়ী, ঠাকুর বাজার, চৌধুরী বাজার, প্রভৃতি স্থানে। অনেক স্থানের নামও ভুলে গেছি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা আমাদের হাতে নিহত এবং আহত হয়েছে। পরাজিত হয়েছে।

যতই দিন যাচ্ছিল যুদ্ধের তীব্রতা ততই বাড়ছিল। পাক হানাদার বাহিনীর অফেনসিভ বা আক্রমণাত্মক অবস্থার ক্রম অবনতি ঘটে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যায়ে আমরা অফেনসিভ হয়ে উঠি। শত্রুর নিকট হতে কেড়ে নেয়া অস্ত্রেই আমরা তাদেরকে পরিখায় ঢুকিয়ে দেই। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে তারা থানার বাইরের অবস্থান হতে থানায় উঠে যায়। এরপর মহকুমা বা কোথাও জেলা শহরগুলোতে আশ্রয় নেয়। চাঁদপুরের অবস্থান ভিন্নতর ছিল। রিয়ার হেড কোয়ার্টার হওয়াতে একে রক্ষার জন্য তারা লাকসামে ও ফেণীতে এক ব্রিগেড করে সৈন্য সবসময় রাখতো। এরপর কুমিল্লা হতে পাকিস্তান কামান্ডো বাহিনী দিয়ে আমাদের উপর প্রায়শ চাপ দিত। ফলাফল কখনও তাদের অনুকূলে যায় নি। কারণ তাদেরই ট্রেনিংপ্রাপ্ত তাদের সাথে দীর্ঘদিন চাকুরিরত এবং ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বাঙালি সৈনিকরা তাদের নাড়ীর স্পন্দনও বুঝতেন।

আমাদের এখানে কিছু কিছু লোক আজ বলে বেড়ান, ভারত সৈন্য সরিয়ে না নিলে আমরা আবার পরাধীনই থাকতাম। তবে এদের বেশির ভাগই যুদ্ধক্ষেত্রে পাক-হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হননি। এরা যুদ্ধের পরিসমাপ্তির সময়ে ভারতীয় বাহিনীর পশ্চাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তবে পাক-হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে তাদেরও যুদ্ধ করতে হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মিত্র বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল ম্যাক আর্থার যথার্থই বলেছিলেন, "যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিদের রচিত যুদ্ধের ইতিহাস রূপকথায় রূপান্তরিত হয়।" আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যাঁরা লিখেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বোঝা যায়, এরা আবেগ তাড়িত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবর্জিত রাজনৈতিক সাহিত্যকর্মী। এদের অনেকেই যুদ্ধকালীন সময়ে হয় দেশে চাকুরিরত, পলাতক অথবা ভারতের আশ্রয় শিবিরে ছিলেন। ভারতে বসে বা আড়ালে আবডালে বসে যুদ্ধক্ষেত্র কল্পনা করা যায়, বাস্তব তথ্যভিত্তিক ছবি অাঁকা যায় না। সবচে' বড় সত্য হলো_সেদিন ছিল ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্য, শত্রু হননের কঠিন প্রতিজ্ঞা। অপরিপক্ক রাজাকার আর ঘৃণিত দালালরা তাই হারিয়ে গেছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বাধীনতাকামী জনতার তীব্র ঘৃণার থুথুর নিচে। সে দিনের সে জাতীয় ঐক্যই পারে জাতীয় সমৃদ্ধি ও মর্যাদাকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করতে। যারা এ কথা বলেন, তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন-তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বাহিনী-পাক বাহিনীর থেকে অবশ্যই চৌকস ছিল না। পাকিস্তানের এক ব্রিগেড সৈন্য '৭১-এর একেবারে শেষের দিকে জেনারেল থাপনের একটি পূর্ণাঙ্গ কোরকে হিলি সীমান্তে ২৩দিন ঠেকিয়ে রাখে। অথচ মুক্তিবাহিনীর হাতে পাক-বাহিনীর অসহায়ত্বের কথাতো টাইগার খ্যাত লেঃ জেঃ আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী এক আলাপচারিতায় ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক মিত্র বাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে স্বীকার করেছেন এভাবে, "মুক্তিবাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে ক্রমশঃ আক্রমণকারী বাহিনী থেকে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত বাহিনীতে পরিণত হয়। পাক-বাহিনী গ্রামগঞ্জ ছেড়ে জেলা শহরে চলে আসতে বাধ্য হয়। এক সময় তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও প্রান্তিক পর্যায়ে চলে আসে।" তথ্য সূত্র : দি বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান, লেঃ জেঃ আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে সুবিধাবাদীরা সর্বকালে জাতির মনোযোগকে ভিন্ন পথে চলার সংকেত দান কেরে এবং তা শুধু আত্মস্বার্থের জন্য। এতে দেশ এবং জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এরা লাভবান হয়। সুবিধাবাদীরা দেশ ও জাতি বোঝে না। দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সংহতি, জাতীয় ঐক্য বিনাশে এদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। হামান, শশী গুপ্ত, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, মীর জাফর, গোয়েবলস, মার্শাল পেঁতা, কুইসলিং লেন্দুপদর্জি, হামিদ কারজাই, চেলাবি সকল যুগেই জন্মায়। এরা কালের অভিশাপ, মানবতার ক্ষত। এদের কলাকৌশল বুঝতে হলে ইতিহাস জানতে হবে। নগদ ইতিহাস ক্ষমতাসীনদের বা ক্ষমতাবানদের মনোরঞ্জনের মানপত্রের সামিল। জাতিদ্রোহী, সঙ্কীর্ণ মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং শত্রুর প্রশংসিত এবং পুরস্কৃত ব্যক্তি কখনও মজলুমের বন্ধু হতে পারে না। যে কবি বা সাহিত্যিক জাতিকে দস্যু পূজায় উদ্বুদ্ধ করে, বিজাতীয় সংস্কৃতির জন্য স্বীয় দ্বার উন্মুক্ত করার ফতোয়া দান করে, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী বা সম্প্রসারণবাদী শক্তির স্তূতিকীর্তন করে, এরা প্রকারান্তরে জাতিসত্তার বিলোপ সাধনের সর্ব আয়োজনেই ব্যস্ত থাকে। আমরা এদের প্রতিরোধ করতে না পারলেও ঘৃণা করা উচিত বলে মনে করি। তবে বেঈমানদের আখের কোনো কালেই সুখকর হয়নি।

আজ মুক্ত স্বদেশে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা জাতীয় সংসদ সদস্যের গুলিতেও মরছেন। অনেকে মতপার্থক্যের কারণে হচ্ছেন লাঞ্ছিত-অপমানিত। আমরাতো চাকুরি করতে যুদ্ধে যাইনি, দেশ ও জনগণের মুক্তির জন্যেই জীবন ও স্বজনদের জীবনকে ঝুঁকিতে রেখে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছি। প্রত্যাশা ছিল আমরাই হবো শাসক ও শাসিত। সবাই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে দেশটাকে এগিয়ে নেব। হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও নারী ধর্ষণের জন্য আমরা তাদেরকে হত্যা করেছি। এখন মুক্ত স্বদেশে ধর্ষকদের বিচার হয় না খুনি লুটেরাদের নাম নিতেও ভয় লাগে। জানি না হত্যাকারীদের আল্লাহ কী বিচার করবেন? যে দেশের ৬৮ লক্ষ যুবক-যুবতী নেশাগ্রস্ত, সে জাতির ভবিষ্যৎ একমাত্র আলেমুল গায়েবই জানেন। অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাসোহারা বৃদ্ধি এবং সরকার কর্তৃক চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনের গৃহীত সিদ্ধান্ত সন্দেহাতীতভাবে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, যাদের কবরের জায়গাও নেই। বিনীতভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সকাশে আবেদন : ঢাকা এবং প্রতিটি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি করে নির্দিষ্ট কবরস্থানের ব্যবস্থা করলে আমাদের আর প্রত্যাশার তেমন কিছু থাকে না। সংঘাত ভুলে একাত্তরের ইস্পাত কঠিন ঐক্যের আলোকে দেশকে এগিয়ে নিলেই শহীদদের আত্মা-মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয় শান্তির পরশে পুলকিত হবে। প্রার্থনা করি সমৃদ্ধির সাথে পারস্পরিক সহমর্মিতা ঘটুক। শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ রাষ্ট্রের প্রত্যাশাই আমাদের কামনা। সকল মৃত সহযোদ্ধার আত্মার মাগফেরাত ও জীবিতদের সুস্বাস্থ্য, সম্মান, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৮৪০৬১
পুরোন সংখ্যা