চাঁদপুর। শুক্রবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২ পৌষ ১৪২৩। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৬-সূরা শু’আরা


২২৭ আয়াত, ১১ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৩০। এবং যখন তোমরা আঘাত হান তখন আঘাত হানিয়ে থাক কঠোরভাবে। 


১৩০। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।   


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


সফলতা কখনো অন্ধ হয়  না। 


                           -টমাস ফুলার।   


সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী যে স্বল্পাহারে সন্তুষ্ট থাকে অল্প হাসে এবং লজ্জাস্থান ঢাকিবার উপযোগী বস্ত্রে পরিতুষ্ট।     


  

লড়াই করে স্বাধীনতা এনেছি
মোঃ হাশিম প্রধানীয়া
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

"এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে উল্লেখিত স্বাধীনতা সংগ্রামের রণমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে বাঙালিকে রণ উন্মাদ করে তুলেছিলেন, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য জলদগম্ভীরে বজ্রনিনাদে উচ্চারণ করেছিলেন, তিনিই বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক, আমাদের ১৫ কোটি জনতার এই বিশাল শ্যামভূমির সেই মহামণি বটবৃক্ষ, আমাদের ইতিহাসের মহানায়ক, দীর্ঘ অমাবস্যা পেরিয়ে উদিত সেই সূর্য স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তাঁরই রণমন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে জীবনবাজি রেখে শৃঙ্খল মুক্তির যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম 'জয় বাংলা' রণ মন্ত্রের রণ হুঙ্কারে। '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, '৭০-এর নির্বাচন শেষে '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতা সূর্যের লাল সবুজ পতাকায় আচ্ছাদিত করেছি বাংলাদেশের হৃদয়।

'৫২-এর পর থেকেই পূর্ব বাংলায় জোরদার হয় ভাষা আন্দোলনের দাবি। পাকিস্তানিরা চাচ্ছিল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার রূপ দিতে, আর পূর্ব বাংলার জনগণ চাচ্ছিল বাংলা ভাষাই হবে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা। ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত হন। ভাষা আন্দোলন এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে দমন করার জন্য আইয়ুব মোনায়েম পরামর্শ করে এনএসএফ গঠন করেন। তারই এক মিটিংয়ে যোগ দেবার জন্য মোনায়েম খান চাঁদপুরে আগমন করবেন। মনে পড়ে ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর লালমতি, বাচ্চু ভাই, কানাইদার নেতৃত্বে বিরাট ছাত্রজনতা হেলিপেড ঘেরাও করে রাখে। উদ্দেশ্য ছিলো কোনো অবস্থাতেই হেলিকপ্টার নামতে দেয়া হবে না।

কুমিল্লা থেকে আর্মড পুলিশ এলো। ছাত্র-জনতার সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বেঁধে গেল। আমিও সেই দিন এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি।

১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে হযরত বাল মসজিদে রক্ষিত হযরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর পবিত্র কেশ চুরি যাওয়ার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। আইয়ুব-মোনায়েম পেশাদার অবাঙালি গু-াদের দিয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। সারাদেশে এ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই সুযোগে পাকিস্তানপন্থীরা আমাদের বিরুদ্ধে লেগে যায়। চাঁদপুরেও এ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় দালালদের সাহায্যে তারা খুন, রাহাজানি, জ্বালাও, পোড়াও আরম্ভ করে দেয়। এ দাঙ্গায় স্থানীয় কিছু সংখ্যক পাকিস্তানপন্থী দালালদের বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দিলে আগুনের লেলিহান শিখায় নিমিষেই সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই সময়ে রাজনীতিবিদ তৎকালীন বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রী বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী দাঙ্গা এলাকা পরিদর্শনে আসেন এবং আমাদেরকে কঠোরভাবে দাঙ্গা দমনে নির্দেশ দেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। '৭০-এর নির্বাচনে মিজানুর রহমান চৌধুরী নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। তরপুরচ-ী আনন্দ বাজার এলাকা পাকিস্তানি সমর্থকদের দুর্জয় ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত। আমাকে এই এলাকার আওয়ামী লীগ কনভেনর করা হয়। অতীব সাহস এবং দক্ষতার সাথেই এই এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন করি।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না। দেশ সংঘাতের দিকে এগিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু সংগ্রামের ডাক দিলেন। উত্তাল মার্চ। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার আয়োজন করা হলো। বক্তা একজনই। কবি জসীম উদ্দিনের ভাষায় বলতে গেলে মুকুটহীন সম্রাট, আধুনিক বাঙালির জনক, স্বাধীনতার স্থপতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্র কণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়ে দেশবাসীকে প্রস্তুত হবার কথা বললেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ডাকে বাংলার মানুষের কর্ণ বিদীর্ণ করে ধ্বনিত হলো 'জয় বাংলা'।

সেদিনের 'জয়বাংলা' রণমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে, আঃ করিম পাটওয়ারী সাহেবের তত্ত্বাবধানে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলো। জনাব ইব্রাহিম বন্দুকশীকে সভাপতি এবং আমাকে চাঁদপুর উত্তর এলাকার সংগ্রাম পরিষদের সেক্রেটারী করা হলো। আমি প্রথমেই এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে জয় বাংলা রণ হুঙ্কারে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জয় বাংলা ধ্বনিতে এলাকা প্রকম্পিত করে তুলি। বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সেই সময়ে ঢাকার সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ চাঁদপুর নদী বন্দর। এখানে হানাদার বাহিনী ঘাঁটি গেঁড়েছিল। দিবারাত্র বিশেষ করে গভীর রাতে শত জনতার 'জয় বাংলা' ধ্বনিতে এলাকা প্রকম্পিত করে তুলতাম। আমাদের সাথে নারীরাও এসে মিলিত হলো। 'জয় বাংলা' ধ্বনি শুনে হানাদাররা ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতো। নৌযান নিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হানাদাররা সশস্ত্র অবস্থায় নদীতে টহল দিত। এমনিভাবে হানাদার বাহিনীকে ভয়ে তটস্থ করে তাদের রাতের ঘুমকে হারাম করে রাখতাম। হানাদাররা জানতে চেয়েছে এই মুক্তির লিডার কে? এলাকার অনেক লোকই রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সদস্য ছিল। বিশেষ করে আনন্দ বাজার এলাকা পাকিস্তাপন্থীদের ঘাঁটি বলেই পরিচিতি ছিল। হানাদারদের কাছে আমার নামই তারা প্রকাশ করেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের ক্রাইম লিস্টে আমার নাম লাল কালিতে লিখা হয়েছে।

প্রতি রাতেই শহরের উপকণ্ঠে গেরিলা হামলা করা হতো। গোপনে শহরে প্রবেশ করে হানাদারদের কার্যকলাপ ও তাদের অবস্থান প্রত্যক্ষ করতাম। আমাকে ধরে নেবার জন্য বারবার নৌযান নিয়ে বাড়িতে হানা দিয়েছে আলবদর কমান্ডার মান্নান ও রাজাকার কমান্ডার আয়াতুল্লাহসহ হানাদার বাহিনীর অন্য দোসররা। আল বদরের মান্নানদের সাথে বারবার সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই আমার নামে হুলিয়া বের হলো। হানাদারদের কাছে আমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তাহলে হানাদাররা চাঁদপুরের উত্তর এলাকায় হামলা, জ্বালাও পোড়াও করবে না। ডিসেম্বরের ৮ তারিখ চাঁদপুর মুক্ত হয়ে গেল। ভোরের দিকে হানাদাররা চাঁদপুর থেকে পলায়নের প্রস্তুতি নেয়। তারা কয়েকটি নৌযানে করে তাদের বাহিনী, গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাচ্ছিল। চাঁদপুর নদী বন্দর থেকে এক মাইলের মধ্যেই ভারতীয় বিমান পাকিস্তানি নৌবহরগুলো আক্রমণ করে। বিমান আক্রমণে নৌবহরগুলো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় এবং তাতে আগুন ধরে যায়। শত শত নরনারী মেঘনার বুকে এই বিমান আক্রমণের খেলা দেখছিল। হানাদার বাহিনীর আহত সেনাদের আর্তনাদে ও গোলাবারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধুর রণ মন্ত্রে দীক্ষিত, বিজয় উল্লাসে যুদ্ধ-উন্মাদ শত শত স্বাধীনতাকামী মানুষ 'জয় বাংলা' ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলেছিল।

মেঘনার বুকে কোড়ালিয়ার চরের রণাঙ্গনে মিত্র বাহিনীর সাথে হানাদার বাহিনীর তুমুল লড়াই হয়। এ লড়াইয়ে জীবনবাজি রেখে মিত্র বাহিনীর সাথে আমিও অংশ নিয়ে তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছি। প্রজন্মের কাছে বলতে গর্ব হয় লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। বড় আশা নিয়ে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে সমৃদ্ধিতে দেশ পরিপূর্ণ হবে। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। জাতি অভিশাপ মুক্ত হবে। আজ দেখতে পাচ্ছি, এ দেশীয় পাকিস্তানি দোসররা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে নিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয়কে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে।

বাংলাদেশের ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের প্রাক্কালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছে। এতে বুঝা যায় একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর এক লক্ষ সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান যে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে, ৪৪ বৎসর পরেও সেই পরাজয়ের গ্লানি মন থেকে তারা মুছে ফেলতে পারেনি। তারা বুঝে গেছে '৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ যে বিজয় অর্জন করেছে তাতে আর কোনো দিন পরাজিত হবার নয়। তাই যখনই তারা সুযোগ পাবে, তখনই তারা তাদের এ দেশীয় দোসরদের নিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করবে। এই ষড়যন্ত্রকারীরা '৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। যখনই মুক্তিযুদ্ধের সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখনই তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে দেশের উন্নয়নকে নস্যাৎ করার জন্য, মানুষ হত্যার জন্যে। আগুনে পুড়িয়েছে বাড়ি ঘর, বিদেশী নাগরিক হত্যায় মেতে উঠেছে তারা। যাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবতাবিরোধী বিচার বাধাগ্রস্ত হয়।

দেশ স্বাধীনের ৪০ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য শুরু হয়েছে। '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মানুষের আজীবনের লালিত স্বপ্ন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে বাংলার মানুষের কাছে এই বিশ্বাসই ছিল। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এই বহুল প্রতীক্ষিত বিচার শুরু হয়। এ যাবৎ মানবতাবিরোধী অপরাধের শীর্ষ ৪ নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, কামরুজ্জামান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। এই ৪ নেতার ফাঁসি হওয়াতে শহীদদের আত্মা শান্তি পেয়েছে। এই অপরাধীরা দম্ভভরে মনে করত বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না। একাত্তরের হত্যাকা-ের জন্য যারা দায়ী তাদের ফাঁসি হওয়াতে দেশের মানুষ আনন্দিত। এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়াতে জাতি দায় থেকে মুক্ত হয়েছে। বিচার চলতে থাকবে যতক্ষণ না একজন অপরাধী বাংলার মাটিতে জীবিত থাকবে।

লক্ষ শহীদের রক্ত কখনও বৃথা যাবে না। এ দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে সন্ত্রাস ও শোষণ মুক্ত দেশ গড়তে হবে-বিজয়ের মাসে এই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক পরিচিতি : '৭১-এ মহান সংগ্রাম পরিষদের স্থানীয় সেক্রেটারী, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, সমালোচক, সামাজিক ও সংস্কৃতি সংগঠক; অধ্যাপক পাড়া, চাঁদপুর।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৯৭৫৪
পুরোন সংখ্যা