চাঁদপুর। সোমবার ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭। ২৭ ভাদ্র ১৪২৪। ১৯ জিলহজ ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৯-সূরা আনকাবূত


৬৯ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৫৩। উহারা তোমাকে শাস্তি ত্বরান্বিত করিতে বলে। যদি নির্ধারিত কাল না থাকিত তবে শাস্তি তাহাদের উপর অবশ্যই আসিত। নিশ্চয়ই উহাদের উপর শাস্তি আসিবে আকস্মিকভাবে, উহাদের অজ্ঞাতসারে।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


সুকর্ম কখনো হারিয়ে যায় না।


-রেসিল।

নীরবতাই শ্রেষ্ঠতম এবাদত। 


অন্তরে অপার্থিব আলোকনই বিতর্ক
ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


গুহাবাসী মানুষ সারাদিন নিপতিত থাকতো অন্ধকারে। গুহার নিবিড় অাঁধার যেমন একদিকে তার জাগতিক দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করে রাখতো তেমনি অন্তরের অন্ধকারও দূর দৃষ্টি এবং প্রজ্ঞাকে আচ্ছাদিত করে রাখতো নিরন্তর। কিন্তু যেদিন হতে পাথরে পাথরে ঘর্ষণে লাল আলোর ফুল তৈরি হলো, অর্থাৎ যেদিন আবিষ্কৃত হলো আগুন সেদিনই তার জীবন গেল আমূল পাল্টে। তার খাদ্যাভ্যাসে যে শুধু পরিবর্তন আসলো তা নয়, তার মধ্যে তৈরি হলো যুক্তির চর্চা। অদৃষ্টবাদী মানুষ কার্যকারণ সম্পর্কে অবহিত হলো। মানুষ জানলো পাথরে পাথরে ঘর্ষণ করলে আগুন তৈরি হয়। এভাবে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে যুক্তির উন্মেষ ও বিকাশ ঘটলো বলেই মানুষ আজ হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে ধাঁধিয়ে দিয়েছে জগৎ। যুক্তির এই যে নিরন্তর চর্চা তাকে অধিকতর শাণিত করে তোলার যে প্রক্রিয়া তার নামই বিতর্ক। বিতর্ক হলো একটি নিরন্তর সুস্থ প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তরে অপার্থিব আলোকনের সূচনা হয়। বিতর্কের নান্দনিক আলোক উৎসে দূর হয় অন্তরের অন্ধকার। বিতর্কের মাধ্যমে যুক্তিচর্চা খুলে দেয় অন্তরের প্রজ্ঞা লোচনের অবলোকন। আর এতেই অবহিত হওয়া যায় প্রকৃত সত্য।



জগৎ পরম সত্য ও আপাত সত্য এই দ্বিবিধ প্রকরণ দিয়ে ভরা। যুক্তির চর্চা ও বিতর্ক এই আপাত সত্যের বাঁধন হতে পরম সত্যকে মুক্ত করে এবং ব্যক্তির মধ্যে প্রজ্ঞালোক উৎপাদন করে। অন্তর চোখে অন্ধ ব্যক্তি মাত্রেই আপাত সত্যে জগৎ দেখে। ফলে জগৎটাকে নিজের যুক্তিমতো দেখতে গিয়ে ভ্রমের উৎপত্তি ঘটে। এই ভ্রম ব্যক্তি যখন বিতর্কের যুক্তির পরশে হঠাৎ চিহ্নিত করে তখন তাকে মানতে পারে না। ফলে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। তৈরি হয় আবেগ। ব্যক্তি যখন আবেগাক্রান্ত থাকে যুক্তিকে তখন দূরে ঠেলে দেয়। ফলে দোষারোপ ও অশ্রুপাতের সংস্কৃতিকে অাঁকড়ে ধরে সান্ত্বনার আশায়।



জীবক ছিলেন সুদূর অতীতে একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। তাঁর শিক্ষা সমাপনান্তে তিনি গুরুর কাছে উপনীত হয়ে বিদায় প্রার্থনা করেন। গুরু তাঁর শিক্ষা সমাপনের সত্যতা জানতে তাঁর হাতে এক হাত দৈর্ঘ্যের এক কুঠার দিয়ে বলেছিলেন-যাও বৎস, এক ক্রোশব্যাপী এলাকায় যে বৃক্ষটি তুমি ঔষধের অনুপযোগী পাবে তার নমুনা আমার জন্যে নিয়ে আসবে। তবেই বুঝবো তোমার শিক্ষা সমাপন হয়েছে। জীবক প্রফুল্লচিত্তে গুরু হতে 'যথা আজ্ঞা' বলে বিদায় নিয়ে বের হলেন শিক্ষা সমাপনের নমুনা সংগ্রহে। কিন্তু সারাদিন ব্যয় করার পরও তিনি এমন কোনো বৃক্ষের নমুনা পেলেন না যা দিয়ে ঔষধ হয় না। দিনশেষে বিমর্ষ মুখে তিনি গুরুর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বললেন-গুরুদেব, আমি এমন কোনো বৃক্ষের নমুনা পেলাম না, যা ঔষধের অনুপযোগী। গুরু সহাস্য বদনে তাকে বুকে জড়িয়ে বললেন-যাও বৎস, তোমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে। তুমি সত্যিকারের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রজ্ঞ বটে। গুরুর শিক্ষায় জীবকের যেমন অন্তর্চক্ষু উন্মীলিত হয়েছিল, তিনি সকল বৃক্ষের গুণাগুণ খুঁজে পেয়েছিলেন, তেমনি বিতর্কের শিক্ষাও ব্যক্তির অন্তরে তৈরি করে ভেদনকারী প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার দু'টি ক্ষমতা বা বৈশিষ্ট্য। একটি ভেদন আর অন্যটি আলোকন। বিতার্কিক যুক্তি চর্চার প্রজ্ঞাবলে ভেদন করতে পারেন সকল বাধা-বিপত্তি। এর দ্বারা তিনি জানতে পারেন নিজের ত্রুটি, অন্যের সাফল্য। বিতর্কের আলোকনে মনের সঙ্কীর্ণতা দূর হয়। আত্মদোষ অন্বেষণের প্রজ্ঞা তৈরি হয়। নিজের ত্রুটি বিশ্লেষণ ও অন্যের সাফল্য অনুমোদনের অভিপ্রায় তৈরি হয়। যার দৃষ্টি ক্ষীণ, সীমাবদ্ধ যার বিবেচনা, তার কাছে নিজেকেই সর্বসেরা বলে মনে হতে পারে। এটাকেই আপাত সত্য ধরে ব্যক্তি মাতিয়ে তোলে চরাচর, সিক্ত করে তোলে নিত্যভূমি। অথচ যিনি প্রকৃত বিতার্কিক তার প্রজ্ঞাদৃষ্টি প্রসারিত থাকে, নিজের সঙ্কীর্ণতা বিদূরিত হয় এবং অপার্থিব সত্যের বলে তিনি জেনে নেন কোন্ যুক্তি সঠিক আর কার মতামতই বা সেরা।



প্রকৃত অর্থে বিতর্ক কী? প্রকৃত অর্থেই বিতর্ক কোনো ক্রীড়া নয়। তাই যেনতেনভাবে এতে বিজয়ী হওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বিতর্ক হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে সত্য উদ্ঘাটনের জ্ঞান নির্ভর যুক্তিচর্চার শিল্প যা পরম সত্যকে উন্মোচিত করে। ক্রীড়ায় চাতুরির অবকাশ থাকে, ছলের উদ্ভব হয়। এমনকি বল প্রয়োগেরও ঘটনা ঘটে। মহাতারকা ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড বলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ছিয়াশি সালে দেওয়া গোলটি সম্পূর্ণ চাতুরি মিশ্রিত। সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পরও এতে চাতুরিই বিজয়ী। কিন্তু বিতর্ক এমন কোনো প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয় যেখানে যেনতেনভাবে বিজয়ী হতে হবে। বিতর্ক সুনির্দিষ্টভাবে কতগুলো বিষয় পর্যালোচনা করে। বিতার্কিকের শিষ্টাচার, পোশাক-পরিচ্ছদ, বাচনভঙ্গি, উপস্থাপনা, উচ্চারণ এসব বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করা হয় বিতর্কের ক্ষেত্রে। একজন বিতার্কিকের পক্ষে এইসব বিষয়ে স্বমূল্যায়ন নির্ধারণ সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে বিতার্কিক যদি নিজের মানকে অত্যুচ্চ বলে ধরে নেন তবেই শুরু হয় বিপত্তি। এরপরে আছে বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিতার্কিকের বিশ্লেষণের ধরণ যদি বিজ্ঞ বিচারকের মতামতে অপছন্দ হয় তবে তাতে বদলে যেতে পারে ফলাফল। বিষয়বস্তুর চলক চিহ্নিতকরণ এবং মূল প্রত্যয় বাছাইকরণে অদক্ষতা থাকলে তাতে বিতার্কিক ও বিচারকের মধ্যে তৈরি হতে পারে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বক্তা যদি স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে বক্তব্য পাঠ করে যান তবে তাতেও তৈরি হয় বিতার্কিক ও বিচারকের মধ্যে বিস্তর প্রভেদ। বিতর্কদলের তিন বক্তা যদি তাদের বক্তব্যে ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় ঘটান তবে সেই ত্রুটিও বিতার্কিক নিজে চিহ্নিত করতে পারেন না। এক্ষেত্রে যিনি তিনজনের বক্তব্য শ্রবণ করেন তিনিই বুঝতে পারেন ঘাটতি বা দুর্বলতা কোথায়। কাজেই একজন বিতার্কিক যদি সত্যিকার অর্থেই ঋদ্ধিমান না হন তবে তার পক্ষে একদেশদর্শিতা মুক্ত হওয়া কঠিন।



পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতার মহামঞ্চে যুক্তির প্রখর চর্চায় নিবেদিত দলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিযোগিতার মানসিকতায় উজ্জীবিত থাকে। ফলে প্রত্যেক দলের মধ্যেই 'বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী'র মতো মানসিকতা বিরাজ করে। চূড়ান্ত বিজয়ের পথে দীর্ঘ এই অভিযাত্রায় নৈপুণ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন বৈকি। বিজয়ের পথে দীর্ঘ প্রবহমানতায় যার স্রোত খেই হারিয়ে ফেলে, চূড়ান্ত গন্তব্যে পেঁৗছা তার কাছে কষ্টকর ও অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিজয়ের লক্ষ্যে অনেকগুলো স্তর পার হতে গিয়ে সবার মনের মধ্যে শিকড় গেঁড়ে প্রোথিত হয় আবেগ, আকাঙ্ক্ষা। ফলে কোনো এক স্তরে হোঁচট খেলেই শুরু হয় দোষারোপ সংস্কৃতি কিংবা অসন্তুষ্টির সবাক বেদন। যে জিতে বা বিজয়ী হয় তার মুখে বিরাজ করে হাসি আর যে হারে তার চোখে বয়ে যায় অশ্রু নহর। আগের পর্বে যার মুখে বিজয়ীর হাসি ছিলো, পরের পর্বে তার হারেও ঐ দল একই কায়দায় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে। হাসি-কান্নার এই দোলাচল, এই বহমানতা এটাই প্রমাণ করে-বিতর্ক এখনও বিতার্কিকদের মধ্যে আত্মদোষ অন্বেষণের সক্ষমতা তৈরি করেনি। এখনও বিতর্ক বিতার্কিকদের মধ্যে আত্মসমালোচনার অমূল্য শক্তি সৃষ্টি করেনি।



বিতর্ক একদিকে যেমন নিজ মতামতকে সবার মধ্যে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠার আয়োজন তৈরি করে, তেমনি অপরদিকে অন্যের মতকে যুক্তিগ্রাহ্য উপায়ে মেনে নেয়ার সামর্থ্যও প্রদান করে। অর্থাৎ বিতর্ক ব্যক্তির অন্তরে এমন এক অপার্থিব আলোকন তৈরি করে, যার প্রভায় সে দেখতে পায় নিজের ত্রুটি, অন্যের সক্ষমতা এবং পরিশেষে পরম সত্যের সুমহান ভিত্তি। কাজেই বিতর্ক কেবলমাত্র দক্ষতা নয় মোটেই, বিতর্ক হচ্ছে প্রকৃত সত্য যাচাইয়ে অমল আলোর ঝর্ণাধারায় প্রজ্ঞার পূর্ণতা।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৭৮৪৩
পুরোন সংখ্যা