চাঁদপুর। মঙ্গলবার ১৭ এপ্রিল ২০১৮। ৪ বৈশাখ ১৪২৫। ২৯ রজব ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেবেন মোঃ কামরুজ্জামান। তিনি বর্তমানে এলজিইডি মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৭- সূরা আস-সাফফাত


১৮২ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৩২। আমরা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিলাম। কারণ আমরা নিজেরাই পথভ্রষ্ট ছিলাম।


৩৩। তারা সবাই সেদিন শান্তিতে শরীক হবে।


৩৪। অপরাধীদের সাথে আমি এমনি ব্যবহার করে থাকি।


৩৫। তাদের যখন বলা হত, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


 


উৎকৃষ্ট বীজ থেকেই উত্তম বৃক্ষ জন্ম নেয়।


-জনগে।


 


 


 


 


পিতার আনন্দে খোদার আনন্দ এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে খোদার অসন্তুষ্টি


 


 


ফটো গ্যালারি
বিতর্কের উর্বর ভূমি ফরিদগঞ্জে একজন পৃষ্ঠপোষক ভীষণ প্রয়োজন
রাসেল হাসান
১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


একটি বাগান করার স্বপ্ন ছিলো। জেলা শহরের অদূরে ফরিদগঞ্জ উপজেলায় সে বাগানের জন্য ভূমি নির্বাচন করা হলো। বছর নয়েক আগে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শেষ বিকেলের লজ্জাবতী গাছের ন্যায় লজ্জায় নুয়ে পড়া এক ঝাঁক অঙ্কুরিত চারা দিয়ে শুরু করা হয়েছিলো বাগানটির চাষাবাদ। এ চাষাবাদের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো কিছু দক্ষ কৃষক। তাই বৃথা যায়নি চাষাবাদের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম। উপজেলার অনুন্নত অঞ্চল থেকে খুঁজে বের করা কিছু উন্নত হওয়ার স্বপ্ন দেখা বৃক্ষকে রোপণ করা হলো সে বাগানে। কৃষক অভিজ্ঞ হওয়ায় পরিমিত হাল চাষ আর আনুপাতিক জৈব সার মিশ্রণের মাধ্যমে বাগানের মাটি এত বেশি উর্বর হয়ে উঠলো যে, প্রথম বছরেই সে বাগানের বৃক্ষগুলোতে ফুল ফুটলো! যে ফুলের সুবাসে প্রাণ ফিরে পেলো পুরো উপজেলা। সে বাগানটির নাম 'বিতর্ক বাগান'। বিতর্কের চাষ হয়েছিলো এখানে। এক ঝাঁক বিতর্ক শ্রমিকের নিরলস প্রচেষ্টায় এ চাষ থেকে বেরিয়ে এসেছিলো জান্নাতুল রাফেয়া, শামীম হাসান, হাওয়া আক্তারের মতো বাচিকশিল্পীরা। প্রতিটি শিল্পীই যেন এক একটি ফুল! যাদের যুক্তির ঝলকে পলক ফেলা দায় ছিলো শ্রোতাদের।



প্রতিটি দেশের যেমনি একটি রাজধানী থাকে ঠিক তেমনি আমাদের চাঁদপুরে বিতর্ক আন্দোলনেরও একটি অঘোষিত রাজধানী গড়ে উঠেছিলো। চাঁদপুর জেলাকে যদি বিতর্কের দেশ ধরি তবে সে দেশের রাজধানী হয়ে উঠেছিলো ফরিদগঞ্জ উপজেলা। জেলাভিত্তিক প্রতিটি বার্ষিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ফরিদগঞ্জের বিতার্কিকদের জয় আর সরব উপস্থিতি জানান দিয়েছিলো বিতর্ক ফরিদগঞ্জের, ফরিদগঞ্জ বিতর্কের।



২০০৯ সাল থেকে যাত্রা শুরু হওয়া সে আন্দোলনটির নাম পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো প্রজন্মের মুখে কথার ফুল ফুটানো। তখনও ফরিদগঞ্জের মানুষের ধারণা ছিলো বিতর্ক মানে ঝগড়া-ঝাটি করা। বিতর্ক মানে পড়ালেখা বাদ দিয়ে মুখে মুখে তর্ক করা। সেই মানসিকতাসম্পন্ন সমাজ থেকেই স্রোতের বিপরীতে শুরু হয়েছিলো এ আন্দোলন। জেলাভিত্তিক প্রতিযোগিতার প্রথম বছরই শিরোপা ঘরে তুললো ফরিদগঞ্জ উপজেলা। প্রথম বছরই জেলা সদরের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেছনে ফেলে কলেজ পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করলো ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ। টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে সপ্তসুর সংগীত একাডেমিকে হারিয়ে জয়ের স্বাদ পেয়েছিলো ফরিদগঞ্জবাসী। সেদিনকার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৃশ্যটি এখনও চোখের সামনে ভাসছে। ফরিদগঞ্জের ছেলে-মেয়েগুলো তাদের মেধা ও যুক্তি দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেও তার আনন্দ বয়ে যায়নি সবার মাঝে। উপজেলা সদরের অনেকেই হাওয়া আক্তার, শামীম হাসান আর সোহাগী ইসলামের দলকে বলেছিলো-'কিসের আবার বিতর্ক-টিতর্ক? এটাতে চ্যাম্পিয়ন হইলেও কী আর না হইলেও কী?' বিতর্কবিদ্বেষী সেদিনকার মানুষগুলো ভাবতেও পারেনি ফরিদগঞ্জের মেয়ে হাওয়া আক্তার যুক্তির হাওয়ায় কি ঝড়টাই না বইয়ে দিয়েছিলো চাঁদপুর জেলা সদরে! তৎকালীন চাঁদপুর সরকারি কলেজের তারকা বিতার্কিকদের পেছনে ফেলে শ্রেষ্ঠ বক্তা হয়েছিলো আমাদের হাওয়া আক্তার।



দ্বিতীয় বছর কলেজ পর্যায়ে ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ আবারও ফাইনালে। এ বছর চাঁদপুর সরকারি কলেজ অর্থনীতি বিভাগের সাথে না পেরে উঠলেও রানার্স-আপ ট্রফি ঘরে তুলেছিলো দলটি। কলেজ পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও জাগরণ এসেছিলো স্কুল পর্যায়ে। মাতৃপীঠ, হাসান আলী, বাবুরহাটের মতো দলগুলোকে পেছনে ফেলে ফাইনালে উঠলো ফরিদগঞ্জেরই দুটি দল! ফরিদগঞ্জ রূপসা আহম্মদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বি. আর. হাজী আব্দুল আহাদ উচ্চ বিদ্যালয়। সেমি-ফাইনালের শেষেই নিশ্চিত হওয়া গেলো এবারো একটি চ্যাম্পিয়ন শিরোপা ঘরে তুলতে যাচ্ছে ফরিদগঞ্জ উপজেলা। কারণ ফাইনালের দুটি দলই যে ফরিদগঞ্জের। দেখার প্রতীক্ষা ছিলো কে হাসে বিজয়ের হাসি। তখনও যে রূপসার জান্নাতুল রাফেয়ার ঝলক দেখার বাকি ছিলো। যার পুরোটাই দেখা গেলো ফাইনালের মঞ্চে। রাফেয়ার অসাধারণ বিতর্কে সেদিন উল্লাস করেছিলো রূপসা আহম্মদিয়া। শ্রেষ্ঠ বক্তা নিঃসন্দেহে জান্নাতুল রাফেয়া। কে জানতো, ২০১০ সালে স্কুল পর্যায়ে জেলার শ্রেষ্ঠ বক্তা হওয়া সেই জান্নাতুল রাফেয়াই ২০১৪ সালে টিআইবি আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক নির্বাচিত হবে। কেউ কি ভেবেছিলো ফরিদগঞ্জের মেয়েটি ঢাকা হলিক্রস কলেজ থেকে শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক সম্মাননা পাওয়া ছাড়াও ২০১৭ সালে পাবে এই বিতর্কের জন্যই বেগম রোকেয়া স্বর্ণ পদক! তেমনটিই হয়েছিলো। আর পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতার তারকা বিতার্কিকদের জাতীয় পর্যায়ের এমন এক-একটি সাফল্য জানান দেয়, এ প্রতিযোগিতার প্রতিটি পর্বের বিচারকার্য অতীতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে।



২০১১ সালে তৃতীয় পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গতবারের রানার্স-আপের কষ্ট নিয়ে সর্ব শক্তিতে আবারো জেগে উঠেছিলো ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ। ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন দল চাঁদপুর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগকে হারিয়ে মধুর প্রতিশোধ নিলো একই কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিতর্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক রাধেশ্যাম কুরী স্যারের মেয়ে চৈতি কুরীর নেতৃত্বাধীন দলটি। তবে ফাইনালে জয়ের নায়ক ছিলো শামীম হাসান। টানা ৩য় বার ফাইনালে উঠে নিজে ২য় বক্তা হওয়া সত্ত্বেও পেলো শ্রেষ্ঠ বক্তার সম্মাননা।



২০১২ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে চাঁদপুর সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের কাছে মাত্র ১ পয়েন্টের ব্যবধানে ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ বিদায় নিলেও জেগে উঠেছিলো ফরিদগঞ্জ এ. আর. পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। তৎকালীন বিতর্ক অঙ্গনের নতুন মুখ তামান্না নাছরিন বৃষ্টির নেতৃত্বাধীন দলটি হোছনা ইয়াসমিন সূচনা ও লায়লা রহমান পামিকে সাথে নিয়ে জেলা সদরের শক্তিশালী দল মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো।



২০১৩ সালটি আনলাকি থার্টিন হলেও এ বছরটি ছিলো ফরিদগঞ্জ উপজেলার জন্য সবচেয়ে সাফল্যের বছর। স্কুল পর্যায়ে টানা ২য় বারের মত ফাইনালে উঠে তামান্না নাছরিন বৃষ্টির ফরিদগঞ্জ এ. আর. পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। আবারও প্রতিপক্ষ মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়! তামান্না নাছরিন বৃষ্টির চমকে টানা ২য় বারের মত চ্যাম্পিয়ন হলো ফরিদগঞ্জ। একই বছর কলেজ পর্যায়ে ফাইনালে উঠলো ফরিদগঞ্জের আরেক নবাগত বিতর্ক দল ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম। ফাইনালে চাঁদপুর সরকারি কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগকে ১২ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়ে সহজ জয় পেয়ে ওই বছর স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে দুটি শিরোপা একই সাথে ঘরে তুললো ফরিদগঞ্জ উপজেলা।



২০১৪ ও ২০১৫ সালে স্কুল পর্যায়ে যথাক্রমে ফরিদগঞ্জ এ. আর. পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও কালিরবাজার মিজানুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় সেমি-ফাইনালে বিদায় নিলেও পরবর্তী দুটি বছরই কলেজ পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়লো ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম। ২০১৪ সালে শাহরাস্তির সূচীপাড়া ডিগ্রি কলেজকে এবং ২০১৫ সালে চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজকে হারিয়ে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয় ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম। ততক্ষণে বিতর্কের জোয়ার বইতে শুরু করলো পুরো ফরিদগঞ্জ উপজেলায়। জেলার গ-ি পেরিয়ে জেলার বাইরে জাতীয় পর্যায়ে পা রাখলো ফরিদগঞ্জের বিতার্কিকরা। ২০১৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক আয়োজিত দেশব্যাপী বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সিলেটে স্কুল পর্যায়ে চাঁদপুর জেলা বিতর্ক দলের হয়ে অংশ নিলো ফরিদগঞ্জের তামান্না নাছরিন বৃষ্টি, তানজিদুল ইসলাম শিশির ও সেদিনকার ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া খুদে বিতার্কিক (বর্তমানে ফরিদগঞ্জ এ. আর. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বিতর্ক ক্লাবের সভাপতি) আব্দুল্লাহ আল মাহি। দলটি প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা শংকর উচ্চ বিদ্যালয়কে এবং পরবর্তীতে নরসিংদী ক্যাডেট স্কুলকে হারায়। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে কলেজ পর্যায়ে অংশ নেয়া ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরামের বিতার্কিকরা দুদক আয়োজিত বিতর্কে সেমি-ফাইনাল পর্বে টেলিভিশন বিতর্ক পর্যন্ত অংশ নেয়। কলেজ পর্যায়ে ২০১৫ সালে হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সিকেডিএফ ফরিদগঞ্জ উপজেলা শাখা কর্তৃক আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের দল দুটিকে সংবর্ধনা দেয় ১৭টি সংগঠন। সেদিনকার বিতার্কিকদের ফুলে ফুলে সিক্ত হওয়ার মুহূর্তটি জানান দিয়েছিলো বিতর্ক চর্চাটি কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ফরিদগঞ্জের মানুষের কাছে।



কলেজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ বিতর্কে অংশ না নেয়ায় এবং সাংগঠনিক পরিচয়ে কোনো দল বিতর্কে অংশ নিতে পারবে না সিকেডিএফ-এর এমন নিয়ম চালু হওয়ায় গত দুবছর কলেজ পর্যায়ে অংশ নেয়নি ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরাম। তাই এ দুবছর ফরিদগঞ্জ উপজেলা চ্যাম্পিয়নের দেখা না পেলেও গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হাসমত ডিগ্রি কলেজের ২০১৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল ও ২০১৭ সালে সেমি-ফাইনালে ওঠার লড়াইটি ছিলো দেখার মত। ২০১৭ সালে স্কুল পর্যায়ে ফরিদগঞ্জেরই আরেক দল বালিথুবা আব্দুল হামিদ উচ্চ বিদ্যালয় ফাইনালের মঞ্চে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রানার্স-আপ হয় ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে হেরে। সব মিলিয়ে বিতর্কের গত ৯টি আসরে ফরিদগঞ্জের স্কুল অথবা কলেজ পর্যায়ের দলগুলোর মধ্যে ফাইনালের মঞ্চে ফরিদগঞ্জ ছিলো ৮বার! অর্থাৎ ফরিদগঞ্জ উপজেলার কোনো দলকে বাদ দিয়ে পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠের শুধু একটি ফাইনালই হয়েছিলো এবং তা ছিলো ২০১৬ সাল। এ ছাড়া প্রতিটি ফাইনালেরই দর্শক গ্যালারীর একাংশ ছিলো ফরিদগঞ্জের দখলে।



বিতর্কে এতো সাফল্য যে উপজেলার বিতার্কিকদের, সে উপজেলাকে চাঁদপুর জেলায় বিতর্কের উর্বর ভূমি না বলার কি কোনো কারণ আছে? এ মাটিতে একটু দেখেশুনে চাষ করতে পারলেই সাফল্যের ফসল ঘরে তোলা যায়। এখানে উর্বর মাটি সম্পন্ন জমি আছে, জমিতে চাষাবাদ করার মত দক্ষ কৃষক আছে, উন্নত ফসলের সম্ভাবনাময় বীজও আছে। শুধু নেই চাষাবাদের খরচ চালিয়ে নেয়ার মত কোনো পৃষ্ঠপোষক। একটু জৈব সার পেলে যেমনি সতেজ হয়ে উঠে যে কোনো শস্য, ঠিক তেমনি একটি ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ পেলেই সতেজ হয়ে উঠবে এ উপজেলার বিতার্কিকরা। একটু উৎসাহ, একটু উদ্দীপনা, একটু সাহস জোগাতে পারলেই ওরা সকল শক্তিশালী দলকে পরাজিত করার ক্ষমতা রাখে। তা এ অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে খুব সামনে থেকেই দেখেছি।



ঘামে-শ্রমে, অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বিতার্কিকরা যখন চ্যাম্পিয়ন হয় তখন সবার আগে প্রশংসা কুড়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, প্রশংসা কুড়ায় পুরো উপজেলা। কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানও ঘোষণা করেননি তার স্কুল বা কলেজ থেকে যে বা যারা চ্যাম্পিয়ন হবে তাদের পড়া-লেখার খরচ ফ্রি করে দেয়া হবে। মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জনাব মঞ্জুর আহমেদের মত এ উপজেলার কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তিই ঘোষণা দেননি বিতর্কে অগ্রসর বা চ্যাম্পিয়ন হওয়া কোনো বিতার্কিককে বৃত্তি প্রদান করা হবে। বিতার্কিকরা বারুদের মত নিজের ভিতরে প্রতিভার শক্তি নিয়ে বসে আছে। এক টুকরো ফায়ার বঙ্রে কাগজ পেলেই তারা ঘর্ষণে ঘর্ষণে জ্বলে উঠবে আপন শক্তিতে, আলোকিত করবে তার চারিপাশ।



খুব লজ্জা হয়, যখন শুনি কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান বিতার্কিকদের বলেন, তোমাদের কাছে টাকা থাকলে নিজ দায়িত্বে চাঁদপুর গিয়ে বিতর্ক কর। খুব অবাক হই যখন বিতার্কিকরা বলেন, 'ভাইয়া আমাদের স্যার বলেছেন, বিতর্কে চাঁদপুর আসা যাওয়ায় যা খরচ হবে তার অর্ধেক স্কুল দিবে আর অর্ধেক আমরা দিতে হবে।' ফরিদগঞ্জ পৌরসভার এমন বহু বিতার্কিককে দেখেছি, স্কুলে লেইজার পিরিয়ডের টিফিনের টাকা জমিয়ে বিতর্কে চাঁদপুর যাওয়ার গাড়ি ভাড়া যোগাড় করতে! আবার এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানকেও দেখেছি, বিতার্কিকরা বহু সংগ্রাম করে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আসলেও তাদেরকে বলেন, পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেক খরচ! এত খরচ দিতে পারবো না।' জেলাভিত্তিক কোয়ার্টার ফাইনালে বা সেমি-ফাইনালে ওঠা বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দলগুলোকে দেখেছি দুপুর ২টায় কিংবা ৩টায় বিতর্ক শেষে কালীবাড়ি মোড়ে দুপুরের খাবারের পরিবর্তে কলা-রুটির দোকানে দু-একটি রুটি ভাগাভাগি করে খেয়ে বাড়ি ফিরতে। ওরা বিতর্কে জয়ী হয় ঠিকই, কিন্তু প্রতিষ্ঠান প্রধানের মন জয় করতে পারে না। তবুও ওরা বিতর্কের সাথে আছে, থাকবে। কারণ বিতর্ক শিল্প যে তাদের রক্ত-মাংসের সাথে মিশে আছে।



প্রতি বছর ফরিদগঞ্জে বিতর্কের প্রান্তিক পর্বে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ কর্তৃক বিতর্কের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের আশ্বাস পেয়ে বিতার্কিকরা উজ্জীবিত হয়। হাততালি দিয়ে মাননীয় অতিথির বক্তব্যকে অভিনন্দন জানায়। কিন্তু এ আশ্বাস আর বিশ্বাসে পরিণত হয় না। প্রান্তিক পর্বের বিতর্ক শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায় মাননীয় অতিথিদের প্রতিশ্রুতির বাক্যগুলো। তাই বিতর্কের উর্বর ভূমি ফরিদগঞ্জে একজন পৃষ্ঠপোষক ভীষণ প্রয়োজন। যার উৎসাহে, উদ্দীপনায় সৃষ্টি হবে নতুন আরো এক ঝাঁক বাচিক শিল্পী। যাঁরা যুক্তির কথা বলবে, মুক্তির কথা বলবে, গড়ে তুলবে আগামীর সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ।



 



লেখক : চ্যাম্পিয়ন বিতার্কিক; উপাধ্যক্ষ, চাঁদপুর বিতর্ক একাডেমি (সিডিএ); সহকারী শিক্ষক, গণি মডেল হাইস্কুল, চাঁদপুর।



 



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৯৬৪৩৬
পুরোন সংখ্যা