চাঁদপুর। মঙ্গলবার ৮ মার্চ ২০১৬। ২৫ ফাল্গুন ১৪২২। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৭
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • হাজীগঞ্জে বসতঘর আগুনে পুড়ে ছাই || স্বাগতিক চাঁদপুরের কাছে ১ গোলে হেরেছে কুমিল্লা জেলা দল || শহরের নাজির পাড়ায় মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাসহ সাইনবোর্ডে নাম মুছে দিয়েছে দুবৃর্ত্তরা || চাঁদপুর কলেজে অনুমতি ছাড়া ইশা ছাত্র আন্দোলন সম্মেলন ॥ আটক ২
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২২-সূরা : হাজ্জ

৭৮ আয়াত, ১০ রুকু, মাদানী

পরম করুণাাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।



৬২। এইজন্য ও যে, আল্লাহ্, তিনিই সত্য এবং উহারা তাঁহার পরিবর্তে যাহাকে ডাকে উহা তো অসত্য এবং আল্লাহ্, তিনিই তো সমুচ্চ, মহান।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


আমি আমার নিজের প্রশংসা নিজে করি না বলে লোকে আমাকে সম্মান দেয় বেশি।                      


                                                     -ক্যালডিরন।


দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান চর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করো।

                 -হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)


ফটো গ্যালারি
শিক্ষকের স্কুলজীবন
ফেলে আসা সোনারঙা দিনগুলো
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন
০৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

আমি যখন প্রথম শ্রেণিতে পড়তাম, তখন আমার বয়স ছিলো সবে ছয়। আমার স্কুল ছিলো বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। আমরা হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। আমার সাথে ছিলো আমার বড়ভাই। স্কুলটির নাম ছিলো পশ্চিম মার্টিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বড়ভাই পড়তো প্রথম শ্রেণিতে। আমি পড়তাম শিশুতে। তখনকার নিয়ম ছিলো একজন শিক্ষার্থী বোর্ডের কাছে গিয়ে পড়াবে। তার সাথে সাথে বাকি শিক্ষার্থীরা চিৎকার করে পড়বে। একজন বোর্ডে গিয়ে বলতো, ক। আমরা সবাই চিৎকার করে বলতাম_ ক। আগেই বলেছি আমরা হেঁটে স্কুলে যেতাম। তবে বর্ষকালে এই হাঁটায় কিছু দূর্ভোগ পোহাতে হতো। কেননা রাস্তা ছিলো মাটির, আর সেই রাস্তা ছিলো ছোট ছোট গর্তে ভরা, বৃষ্টি হলে এমন গর্তে পড়ে আমারদের বই খাতা ভিজতো, আমরা তো নিজেরা ভিজতামই। তবে মজার ব্যাপার হলো_ স্কুলে যাবার পথেই একটা বাঁশের সাঁকো পড়তো। এ সাঁকো কিছুটা নড়বড়ে। আমরা সাঁকোর উপর দিয়ে হেঁটে গেলো সাঁকো কাঁপতো। কিন্তু এ হাঁটায় আমরা ছিলাম অভ্যস্ত। ফলে আমরা কখনো সাঁকো থেকে খালে পড়ে যাইনি। আমরা সবাই সাঁতার জানতাম। তাই মাঝে মধ্যেই সাঁকো থেকে লাফ দিতাম নিচে। এটাকে বলতাম লাফালাফি খেলা। সবাই খেলতো।

স্কুলে প্রবেশ করতে গিয়ে চোখে পড়তো বিরাট একটা বটগাছ। আগে প্রায় অধিকাংশ স্কুলের আশেপাশে বটগাছ ছিলো। এখনতো বটগাছ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। স্কুলের সেই বটগাছটি ছিলো আমাদের জন্য মজার এক জায়গা। আমরা সেখানে দলবেঁধে খেলতাম। এ খেলার জন্য একটু আগেই বেরিয়ে যেতাম বাড়ি থেকে। সেখানে খেলা হতো বিচিত্র ধরনের। আমরা বেশি খেলতাম হাডুডু। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা আর বৌচি খেলাও হতো হরদম। সে এক অন্যজগত। গোল্লাছুট খেলায় গোল্লা দিতে গিয়ে কত যে দৌড়ে বেরিয়েছি, কত ছুটে চলেছি...এখন সেসব মনে পড়লে হাসি পায়। একা একা হাসি।

একসময় কেনো জানি না, পশ্চিম মার্টিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আমার কাছে ভালো লাগলো না। এর কারণ কিংবা আমাকে প্রভাবিত করেছিলো তোফায়েল, যে পরবর্তীতে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু হয়েছিলো। তোফায়েল আমাদের পাশের বাড়িতে তার বোনের বাড়িতে আসতো। সে পড়তো তোরাবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। একসময়ই সেই আমাকে তোরাবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিকে ভর্তি করে দেয়। স্কুলে সে ছিলো আমার নিত্য সহচর। আর আরেক বন্ধু ছিলো। শাহলম ভালো গল্প বলতে পারতো। স্কুল জীবনের অনেক স্মৃতি তাকে ঘিরে। তো নতুন স্কুলে এসে আমি বেশ খুশি হলাম। কারণ, স্কুলের সবকিছুই আমার মনমতই হয়েছিলো...

আমার স্যারদের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তারা পড়া না পারলে বিচিত্র রকমের শাস্তি দিতেন। কখনো কানে ধরা, কখনো বেঞ্চের নিচে মাথা দেয়া অথবা হাতে বেত দেয়া ছিলো ডাল-ভাত ব্যাপার। তখন একটা ব্যপার ছিলো পড়ার সময় পড়া, আদরের সময় আদর আর শাসনের সময় শাসন। আমি নিয়মিতই পড়া পারতাম। তবু মাঝে মাঝে শাস্তি আমার ভাগ্যেও জুটতো। আমার প্রিয় স্যার ছিলেন আমাদের প্রধান শিক্ষক আঃ রাজ্জাক স্যার। এত ভালো শিক্ষক আমি আমার শিক্ষা জীবনে আর পাইনি। আমাদের সেকেন্ড স্যার ছিলেন মফিজ স্যার। আর থার্ড স্যার ছিলেন আঃ কুদ্দুস স্যার। তাদের কথা এখনো মনে আছে। স্যারদের মধ্যে এখন কেবল থার্ড স্যার বেঁচে আছেন। বাড়িতে গেলে স্যারকে প্রায়াই দেখতে যাই।

আমি যখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, তখন দেশে যুদ্ধ বাধে। সে এক ভয়ানক অবস্থা। স্কুল বন্ধ। সারাদিন ঘোরাফেরা করাই ছিলো একমাত্র কাজ। আমাদের ছিলো একটা খামার। সেখানে এক-দেড়শো গরু, ৫০-৬০টি মহিষ আর ১৫০টির মতো ভেড়া ছিলো। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ছিলো খামার। মাঝে মধ্যে আমি গাভী নিয়ে খামার থেকে বাড়ি আসতাম। সে এক মজার স্মৃতি। তখন আমার ছোটচাচা মুক্তিযোদ্ধাদের খামারে আশ্রয় দিতেন। তাদেরকে খাবার খাওয়াতেন। আমি মাঝে মাঝে তাদেরকে দেখতে যেতাম। কিন্তু একদিন শুনলাম_ রাজাকাররা আমার সেই চাচাকে ধরতে বাড়ি ঘেরাও করেছে। কিন্তু চাচা কৌশলে বেঁচে যান। তারা শেষ পর্যন্ত চাচাকে ধরতে পারেনি। তেমনি একদিন বাজার থেকে মুরগির খাঁচা নিয়ে ফিরছিলাম। পথে আসতে শুনি পাঞ্জাবিরা আসছে। এটা শুনেই আমি খাঁচা ফেলে সোজা বাড়ির পথে দৌড়।

আমরা লিখতাম দোয়াত আর কালি দিয়ে। লিখতাম কাগজে। তবে তখন এত ভালো কাগজ ছিলো না। কাগজের রং ছিলো হলদেটে। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি আমরা কাচারি ঘরে আরবি পড়তাম। আরবি হুজুর ছিলেন আমাদের গৃহশিক্ষকও। আমরা রাতে পড়ার জন্য চলে যেতাম কাচারী ঘরে। সেখানে হুজুর আমাদের সাত আটজনকে একত্রে পড়াতেন। হুজুরও খুব ভালো ছিলেন। হুজুরের নাম ছিলো মজিবুল হক।

আমাদের স্কুল থেকে দশ বারো কিলো দূরে ছিলো মেঘনা নদী। একদিন আমরা আর আমাদের স্কুলের বড় ভাইরা মিলে ঠিক করলাম নদী দেখতে যাবো। সকালে রওনা দিয়ে গেলাম নদী দেখতে। স্কুল পালিয়ে আর বাড়িতে কাউকে না বলে গেলাম আমরা। নদী দেখে ফিরলাম সন্ধ্যা বেলায়। আম্মা এজন্য বকাও দিলো। আমার নানু বাড়ির পাশেই ছিলো ভুলুয়া নদী। আমরা বছরের আশ্বিন মাসে নানু বাড়িতে যেতাম। নদীতে লোকে ইলিশ মাছ সহ আরো ছোটছোট আরো অনেক মাছ ধরতো। কখনো মামা সহ আমরাও মাছ ধরতে নেমে যেতাম। পেতামও অনেক মাছ। তবে স্কুলের বন্ধের ফাঁকে আমরা যেতাম নানু বাড়িতে।

যুদ্ধের শেষে আমাদের অটো প্রমোশন দিয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠানো হলো। আমাদের সময় বৃত্তি পরীক্ষা ছিলো না। ফাইভে উঠে আমরা যেনো এক লাফে ঢের বড় হয়ে গেলাম। আমাদের মধ্যে সিনিয়র-সিনিয়র ভাব এসে গেলো।

আমার শৈশবের পাঠশালা ছিলো ঘটনাবহুল। কত ঘটনা যে মনে পড়ে। এখনকার ছেলেমেয়েদের দেখি। অবাক হই। তারাও স্কুলে যাচ্ছে। তাদের কাঁধে বইয়ের বোঝা। আমাদের শৈশব কেটেছে মা, মাটির সাথে। আমরা বরই পাড়তাম। ঢিল মেরে আম পাড়তাম। প্রকৃতির সাথে ছিলো আমাদের সম্পর্ক। আমাদের সে সুযোগ ছিলো। এখন মনে হচ্ছে আমরা সত্যি অনেক ভাগ্যবান। স্মৃতি হাতড়ে বেড়ালে এখন মনে হয় শৈশব পাঠশালায় আমাদের বসত ছিলো রূপকথার রাজ্যে, অন্য কোনো স্থানে...

(অনুলিখিত)

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪১৮০৫১
পুরোন সংখ্যা