চাঁদপুর। বুধবার ২১ জুন ২০১৭। ৭ আষাঢ় ১৪২৪। ২৫ রমজান ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • আজ ভোরে অ্যাডঃ এ.বি.এম. মোনাওয়ার উল্লা মৃত্যুবরন করেছেন (ইন্নালিল্লাহে.....রাজেউন)। তাঁর মৃত্যুতে চাঁদপুর রোটারী ক্লাব ও চাঁদপুর ডায়াবেটিক সমিতির পক্ষ থেকে গভীর শোক জানিয়েছেন
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৬২। এবং সেই দিন তিনি উহাদিগকে আহ্বান করিয়া বলিবেন, ‘তোমরা যাহাদিগকে আমার শরীক গণ্য করিতে, তাহারা কোথায়?’


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


স্বপ্নে রাজা হয়েছে, এমন লোকের সংখ্যা কম নয়।                    -জজ ওয়েস্ট স্টোন।


 


যারা পয়গম্বরদের (নবীদের) কবর পূজা করে, তারা অভিশপ্ত হোক। 


 

কোচিং বাণিজ্যের দখল
মজিবর রহমান মুজিব
২১ জুন, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


 



 



বর্তমান কালের লেখাপড়া যেন অনেকটাই প্রাইভেট বা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়েছে। স্কুল-কলেজে উপস্থিত না হয়ে কিংবা কোনোরকম হাজিরা দিয়েই ছাত্র-ছাত্রীরা ছুটে কোচিং সেন্টারের দিকে। সেখানেই যেন তাদের আসল লেখাপড়া। প্রাইভেট না পড়লে লেখাপড়া করা সম্ভব নয়, এই ধারণাটা যেন ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবক উভয়ই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। প্রায় অভিভাবকের মুখেই শুনি, কী করব স্যার, পয়সার অভাবে মেয়েটাকে প্রাইভেট পড়াতে পারি না। লেখাপড়া হবে কী করে?



আমি যতোই বলি_নিয়মিত স্কুলে পাঠান, বাড়িতে পড়ার অভ্যাস করান প্রাইভেট পড়াতে হবে না। কিন্তু এ কথায় তারা আশ্বস্ত হতে পারেন না। স্কুলে লেখাপড়া হয়_এ বিশ্বাস যেন তাদের মন থেকে উঠে গেছে। এর মূলে রয়েছেন শিক্ষকরা। কিছু সম্মানিত তথাকথিত নামধারী শিক্ষক রয়েছেন, যারা স্কুলের ক্লাসে তেমন মনযোগী নন। কোন রকম দায়সারা গোছের ক্লাস নিয়েই কর্তব্য শেষ করেন। কথা হলে গর্ব ভরে প্রচার করেন 'ছাত্র-ছাত্রীরা কেউ পড়ে না স্যার, কেউ কিচ্ছু পারে না। কী করে পারবে, ক্লাসে ভালো করে পড়ালে তো পারবে। দায়িত্বে থেকে তো দেখছি_একটা ক্লাস মিস করার কত অজুহাত! ঘণ্টা বাজার পাঁচ মিনিট পর ক্লাসে ঢোকে পাঁচ মিনিট আগে বেরিয়ে যায়। অথচ কোনোদিন যদি ঘণ্টা বাজাতে দু'মিনিট দেরি হয়, ক্লাস থেকে এসে দপ্তরির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে। ক্লাসে যাবার সময় আমাকে মনে করিয়ে দিতে হয়, স্যারেরা ঘণ্টা বেজেছে ক্লাসে যান।



ঐ সমস্ত শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়ানোর জন্যে নানা রকম ফন্দি-ফিকির বের করে_কিভাবে ছাত্র বাগিয়ে আনা যায়। জরিপে দেখা গেছে, অনেকে ক্লাসে পড়া না পারলে নানা রকম শাস্তি দেয়, যদিও শাস্তি নিষিদ্ধ। পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়, মৌখিকভাবে তার কাছে প্রাইভেট পড়ার পরামর্শ দেয়, ভালো করে পাস করিয়ে দেয়ার লোভ দেখায়। অভিভাবকের কাছে ফোন করে ইত্যাদি। কেউ আর্থিক অসচ্ছলতার কথা বললে তার কাছ থেকে টাকা কম নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। মোট কথা যে করেই হোক তার কোচিং সেন্টারে ছাত্র গিজগিজ করতে হবে। আমার চেনা এক কোচিংবাজ শিক্ষক তার স্কুলের প্রায় ষাট ভাগ ছাত্র পড়ায়। তারপরেও কেউ যদি অন্য কারো কাছে পড়ছে শোনে, তার রাগের সীমা থাকে না। ক্লাসে পড়া না শেখার অজুহাতে সেই ছাত্রের ওপর নানাবিদ নির্যাতন করতে থাকে। ক্লাসে পড়ায় তার নিজস্ব কোচিং সেন্টার থেকে দেয়া সীট থেকে। এতে তার প্রাইভেট ছাত্ররা পড়া পারে, অন্যরা পারে না। ফলে তাদের মধ্যেও কোচিং সেন্টারে যাবার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ছাত্ররা এসব অনাচার থেকে নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্যে বাধ্য হয়ে তার কাছে প্রাইভেট পড়তে যায়। এছাড়াও ঐ সকল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্যে অর্থলোভী, পিশাচ, কোচিংবাজ শিক্ষক নামধারী কীটেরা ছেলেমেয়েদের একত্রে পড়ায় এবং পাশাপাশি বসার ব্যবস্থা করে। তাদের মধ্যে একটা ভাব-ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে দিতে সহায়তা করে। ফলে কিছু কিছু ছেলেমেয়ে তার কাছে প্রাইভেট পড়তে কিংবা তার কোচিং সেন্টারে যেতে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। আমার শিক্ষকতা জীবনে এমনও দেখেছি যে, ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে পটিয়ে তার ব্যাচে এনে বখাটেপনা দশটি ছেলেকে সংগ্রহ করেছে। পড়ার সময় টেপ ছেড়ে গান বাজিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের শিহরণ সৃষ্টি করে বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছে। আর বাণিজ্যের খাতিরে ক্লাসে যে স্যার রাশভারী-স্বল্পভাষী, নিয়ম-নীতির প্রতিভু, কোচিং সেন্টারে তিনি হয়ে যান পরম বন্ধু, সহজ-সরল প্রাণখোলা একজন কাছের মানুষ। আসলে সেই তো মানুষের প্রিয় হন, যিনি কারো মতামতের বিরোধীতা করেন না। একজন টিনএজ ছেলেমেয়েকে যিনি প্রশ্রয় দেন, তিনি হন প্রিয় ব্যক্তি। তবে একথা সত্যি যে , ঐ বয়সটা পার হয়ে গেলে যখন সে বুঝতে শেখে, তখন সে আফসোস করে আর ঐ ব্যক্তি সম্পর্কেও মূল্যায়ন করতে পারে। বিশেষ বয়সের আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে ঐ শিক্ষক তার কি ক্ষতি করেছে সেটি যখন ধরতে পারে তখন তাকে গালি দেয়। নিজের ভুলের জন্যে কপাল চাপড়ায়। প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন সে ফেলে আসা কর্মের জন্যে অনুশোচনা করে। কিন্তু তখন সংশোধনের সময় থাকে না।



শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সরকার ২০১২ সালে একটা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। সে অনুযায়ী কোনো শিক্ষক তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবে না। প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের দশ জনকে পড়াতে পারবে। এবং সেই দশজনের নামের তালিকা প্রধান শিক্ষকের কাছে জমা দিতে হবে। এছাড়া চাকরিবিধি ১৯৬০ এবং ১৯৭৯ অনুসারে শিক্ষকের প্রাইভেট পড়ানো একদম নিষেধ। কিন্তু শিক্ষকরা এটা কোনক্রমে মানছে না বা মানান যাচ্ছে না। কোচিং বাণিজ্য বন্ধে পাঁচ বছর আগে করা সরকারের নীতিমালা বা শিক্ষকের সার্ভিস রুলটি বাস্তবায়ন করতে পারলে কোচিং বা প্রাইভেট-এর এতটা প্রসার ঘটতো না। অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষকরা ক্লাসে ঠিকমত পড়ালেই শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট কিংবা কোচিং সেন্টারের দ্বারস্থ হতে হয় না। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় নিজেও বলছেন, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত লেখাপড়া নিশ্চিত করতে না পারলে প্রাইভেট-টিউশনি ও কোচিং ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয়।



কোচিং ব্যবসা বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে পেঁৗছেছে যে, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কোচিংবাজ শিক্ষকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এটি পরিবারের উপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং এই বাড়তি চাপ মোকাবেলা করার জন্যে স্বল্প আয়ের মানুষদেরকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। একদিকে শিক্ষকরাও পিছিয়ে পড়ছে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা থেকে। কোচিংবাজ শিক্ষকরা ক্লাসে শুধু সময় কাটায় আর ছাত্রদের কোচিং সেন্টারে আসার দাওয়াত দেয়। এটাই তাদের নিত্যদিবসের কাজ। অথচ সরকার এই কাজের জন্যে তাদেরকে মাসিক বেতন দ্বিগুণ করে দিয়েছে, বৃদ্ধি করেছে নানা রকম সুযোগ-সুবিধা।



কোচিং বাণিজ্যে ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানের শিক্ষকরা বেশি সম্পৃক্ত থাকলেও অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকরাও কমে নেই। বাজারের গাইড বই থেকে সীট তৈরি করে তারাও বাণিজ্যের দোকান খুলেছে। জগতে দেখাদেখি মানুষ সব কিছু করে। মূলকথা হচ্ছে একটা পঁচা আমের সাথে পাঁচটা ভালো আম থাকলে সেগুলোও পঁচে যায়। এজন্য একজন মণীষী বলেছিলেন, শরীরের কোনো অংশে পচন ধরলে সে অংশ কেটে বাদ দেওয়াই শ্রেয়। কাজেই ঐ সমস্ত দুর্নীতিপরায়ণ, অর্থাৎ অর্থলোভী জ্ঞানপাপী, কোচিংবাজ শিক্ষকদের তালিকা করে নিয়ম ভঙ্গের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারের মুখোমুখি করতে পারলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানাতে বাধ্য করতে পারলে, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে পারলে সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন আমাদের ভবিষ্যতের কা-ারী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বেঁচে যাবে প্রাইভেট বা কোচিং সেন্টারে যাবার অত্যাচার থেকে, অন্যদিকে অভিভাবকবৃন্দ বেঁচে যাবে বাড়তি আর্থিক ব্যয়ের বোঝা বহন করা থেকে।



পরিশেষে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা পরিবারের কর্মকর্তাদের প্রতি একজন ভুক্তভোগী অভিভাবক হিসেবে কোচিং বাণিজ্য বন্ধের জন্যে এবং শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন করে জাতিকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করছি।



লেখক : শিক্ষক।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৩১৮০১
পুরোন সংখ্যা