চাঁদপুর। বুধবার ২১ জুন ২০১৭। ৭ আষাঢ় ১৪২৪। ২৫ রমজান ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৬২। এবং সেই দিন তিনি উহাদিগকে আহ্বান করিয়া বলিবেন, ‘তোমরা যাহাদিগকে আমার শরীক গণ্য করিতে, তাহারা কোথায়?’


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


স্বপ্নে রাজা হয়েছে, এমন লোকের সংখ্যা কম নয়।                    -জজ ওয়েস্ট স্টোন।


 


যারা পয়গম্বরদের (নবীদের) কবর পূজা করে, তারা অভিশপ্ত হোক। 


 

ফটো গ্যালারি
সৃজনশীল পদ্ধতির বড় বাধা গাইড বই
মোহসিনা হোসাইন
২১ জুন, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


 



 



সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর সময় বলা হয়েছিল নোট-গাইড, কোচিং, গৃহশিক্ষক নির্ভরতা ও মুখস্থবিদ্যার বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। আদতে তা হয়নি।



সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও কমেনি গাইড নির্ভরতা। ছাত্রছাত্রী তো বটেই, শিক্ষকরাও ঝুঁকছেন গাইড বইয়ে। ছাত্রছাত্রীরা সৃজনশীলে কাঁচা মেনে নেওয়া যায়; কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষকই এ পদ্ধতি বোঝেন না, এটা মেনে নেওয়া সত্যি কঠিন।



 



অনেক শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করেন গাইড বইয়ের নমুনা প্রশ্ন সামনে রেখে। আবার কোনো কোনো শিক্ষক অন্য স্কুলের প্রশ্ন ধার নেন। অাঁতকে ওঠার মতো বিষয়, সরকারি হিসাবেই বরিশাল অঞ্চলে এমন শিক্ষকের সংখ্যা ৯২ শতাংশ। সারা দেশে এ সংখ্যা ৪৫ শতাংশ। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন ভীতিকর তথ্য। বাইরে থেকে প্রশ্ন কিনেও পরীক্ষা নেয় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।



 



শিক্ষকরা নিজেরাই যদি সৃজনশীল পদ্ধতি না বোঝেন, প্রশ্ন করার দক্ষতা না রাখেন, ছাত্রছাত্রীদের বোঝাবেন কী করে? উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়নই বা করবেন কিভাবে? বিষয়টি আমাদের আরো বেশি ভাবিয়ে তোলে যখন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নও করা হয় গাইড বই থেকে। সদ্য সমাপ্ত অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় গাইড বইয়ের প্রশ্ন হুবহু প্রশ্নপত্রে জুড়ে দেওয়ার শাস্তি হিসেবে এক শিক্ষককে ফেনী থেকে খাগড়াছড়ি বদলি করা হয়েছে। ওই প্রশ্ন তৈরির সঙ্গে জড়িত চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে নোটিশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন গাইড বই থেকে হুবহু তুলে দেওয়া হলে বিষয়টি নিয়েও দেশজুড়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল।



 



পাবলিক পরীক্ষা তো দূরের কথা, স্কুল-কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায়ও গাইড বই থেকে প্রশ্ন না করার ব্যাপারে একাধিকবার সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের এমপিও বাতিল করার কথাও বলা হয়েছে। বাইরে থেকে প্রশ্ন না কেনার ব্যাপারেও নির্দেশনা আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।



২০১০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা ও ধর্ম শিক্ষা প্রথমবারের মতো সৃজনশীল পদ্ধতির আওতায় আসে। ক্রমান্বয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু করে এইচএসসি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। প্রাথমিক স্তরে সৃজনশীলের আদলে চালু করা হয় যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন। মুখস্থবিদ্যা, গাইড বই নির্ভরতার বদলে চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানোই ছিল সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পেছনের কথা। কিন্তু বাজার যেখানে সৃজনশীল গাইড বইয়ের দখলে, সেখানে সৃজনশীল পদ্ধতিই হুমকির মুখে পড়াটা স্বাভাবিক! সব শ্রেণির, সব সৃজনশীল বিষয়ের গাইড বই পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। অভিভাবকরা বুঝে কিংবা না বুঝেই এসব বই তুলে দিচ্ছেন ছেলেমেয়েদের হাতে। অথচ সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের একমাত্র সহায়ক হওয়ার কথা পাঠ্য বই। শিক্ষার্থীকে প্রশ্নের উত্তর করতে হয় পাঠের মূল বিষয়বস্তু ও তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝে। বইয়ের পাঠসংশ্লিষ্ট উদ্দীপক পড়ে পাঠ্য বই ও বাইরের অর্জিত জ্ঞানের আলোতে তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার কথা। সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতিতে মুখস্থবিদ্যার সুযোগ নেই, কোনো প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিও হয় না। এ পদ্ধতিতে ভালো করার একমাত্র উপায় পাঠ্য বই ভালোভাবে আত্মস্থ করা ও পাঠ্য বইয়ের বাইরের জ্ঞান রাখা।



 



সব কিছু জেনেশুনেও কেন গাইড বই? কারণ একটাই, চাহিদা। আর এই চাহিদার পেছনের বড় কারণ শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা যে পাঠদান করছেন, তাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আস্থা রাখতে পারছেন না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষকরা সৃজনশীল বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি। এ কারণে ঠিকঠাক পড়াতে পারছেন না, প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারছেন না। সৃজনশীল পদ্ধতির ওপর যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষকদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আশা করাও বৃথা।



 



সৃজনশীল পদ্ধতির জন্য বড় হুমকি বিভিন্ন প্রকাশনীর নোট বা গাইড বই। অথচ প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট বই মুদ্রণ, প্রকাশনা, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে প্রণীত ১৯৮০ সালের নোট বই নিষিদ্ধকরণ আইনের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, 'কোনো ব্যক্তি নোট বই মুদ্রণ, প্রকাশনা, আমদানি, বিক্রয়, বিতরণ অথবা কোনো প্রকারে উহার প্রচার করিতে বা মুদ্রণ, প্রকাশনা, বিক্রয়, বিতরণ কিংবা প্রচারের উদ্দেশ্যে রাখিতে পারিবেন না।'



এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদ- অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার বিধান রাখা হয়েছে। পরে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নোট বই নিষিদ্ধকরণ আইনের আওতায় নোট বইয়ের সঙ্গে গাইড বইও বাজারজাত এবং বিক্রি নিষিদ্ধ করেন হাইকোর্ট।



 



রাজধানীর বাংলাবাজারকেন্দ্রিক এসব প্রকাশক সৃজনশীল বই প্রকাশ না করলেও 'সৃজনশীল গাইড বই' প্রকাশে দারুণ মনোযোগী। আগে যেসব প্রকাশনী নোট বই ছাপতো, এখনো তারাই সৃজনশীল গাইড বই বাজারে ছাড়ে। আইনে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যন্ত নোট বা গাইড বই নিষিদ্ধের কথা বলা আছে। এর আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের গাইড বই।



 



প্রতিটি স্কুলের শিক্ষকরা যাতে সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং যাতে বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতে না পারেন সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদনে। সৃজনশীল পদ্ধতির সব ধরনের গাইড বই নিষিদ্ধ করে নতুন করে আইন প্রণয়নও জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে শুধু আইন করেই গাইড বই বন্ধ করা যাবে না। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকত্মসবার সচেতনতা জরুরি। নামকাওয়াস্তে নয়, শিক্ষকদের জন্য চাই কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতি বুঝতে পারলেই ক্লাসে বোঝাতে পারবেন, প্রশ্ন তৈরি করতে পারবেন। তবেই বাজবে নোট-গাইড, কোচিং ও মুখস্থবিদ্যার বিদায়ঘণ্টা।



 



লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সড়যংরহধ.যড়ংংধরহফঁ@মসধরষ.পড়স



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬০৯৬৬৩
পুরোন সংখ্যা