চাঁদপুর। মঙ্গলবার ২ অক্টোবর ২০১৮। ১৭ আশ্বিন ১৪২৫। ২১ মহররম ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪২-সূরা শূরা


৫৪ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৪। তাদের নিকট তাওহীদের জ্ঞান আসার পরও শুধুমাত্র পারস্পরিক বাড়াবাড়ির কারণে তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ ঘটায়; এক নির্ধারিত কাল পর্যন্ত অবকাশ সম্পর্কে তোমার প্রতিপালকের পূর্ব সিদ্ধান্ত না থাকলে তাদের বিষয়ে ফয়সালা হয়ে যেতো। তাদের পর যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে তারা বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছে।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


 


 


নিজেকে কখনো অপরের চেয়ে ছোট মনে করো না। -জন কিপলিং।


 


 


পবিত্র হওয়াই ধর্মের অর্থ।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
শিক্ষার মানোন্নয়নে গ্রুপ স্টাডি
মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ মারুফ
০২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা অনেকদূর এগিয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে বর্তমানে প্রাথমিক স্কুলে প্রকৃত ভর্তির হার ৯৭.৯৪ শতাংশ। ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি (এমডিজি-২) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় এমডিজি অর্জনের এই সাফল্য আমাদের নির্ধারিত সময়ে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজি)-এর লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০১৬-২০৩০ মেয়াদে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কাজ করে যাচেছ। শিক্ষাসংক্রান্ত এসডিজি-৪ লক্ষ্যমাত্রার সাতটি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে টার্গেট ৪.১ এ বলা হয়েছে ্তুইু ২০৩০, বহংঁৎব ঃযধঃ ধষষ মরৎষং ধহফ নড়ুং পড়সঢ়ষবঃব ভৎবব, বয়ঁরঃধনষব ধহফ য়ঁধষরঃু ঢ়ৎরসধৎু ধহফ ংবপড়হফধৎু বফঁপধঃরড়হ ষবধফরহম ঃড় ৎবষবাধহঃ ধহফ বভভবপঃরাব ষবধৎহরহম ড়ঁঃপড়সবং্থ। অর্থাৎ এসডিজি অর্জনের জন্যে স্বাক্ষরকারী দেশসমূহ ২০৩০ সালের সকল ছেলে-মেয়ের জন্য বিনামূল্যে, সমতাভিত্তিক এবং মানসম্মত প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করবে। যা কার্যকর শিখন ফলাফল নিশ্চিত করবে। সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কার্যকর শিখন ফলাফল নিশ্চিত করতে বর্তমান লেখকের একটি সৃজনশীল ধারণা হিসেবে 'গ্রুপ স্টাডি' বা দলগত শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতির বিপরীতে অত্যন্ত কার্যকরভাবে শাহরাস্তি উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।



মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রচলিত শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতির পরিবর্তে নানা গবেষণালব্ধ ও সৃজনশীল পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে যেখানে শিক্ষকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহন বাড়ানো হচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকাই মুখ্য আর শিক্ষার্থীর ভূমিকা গৌণ। ফলে এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর কার্যকর অংশগ্রহণ সম্ভব হয় না। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে শিক্ষকের একক ভুমিকার কারণে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের মত বিকল্প শিক্ষাদান পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে। যা মানসম্মত শিক্ষার অন্তরায় বলে সকলেই স্বীকার করছেন।



এৎড়ঁঢ় ঝঃঁফু বা দলগত শিক্ষা পদ্ধতি কি ?



গ্রুপ স্টাডি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর শিক্ষণ-শিখনের আংশিক দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নিজেদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীগণ শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়ায় জ্ঞান অর্জন করে থাকে। স্কুলের পড়া প্রস্তুতিতে অত্যন্ত কার্যকরী এই গ্রুপ স্টাডি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ক্লাস রুমে ৭-১০ জনের গ্রুপে বিভক্ত করা হয়। দল গঠনের সময় দুর্বল ও সবল শিক্ষার্থীর সংমিশ্রন করা হয়। দলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত হবে তা শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শ্রেণিকক্ষের আয়তন, পরিবেশ প্রভৃতির ওপর নির্ভর করবে। প্রাথমিকভাবে স্কুল সময়ের আগে ও পরে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীরা গ্রুপ করে তাদের পরের দিনের স্কুলের পড়া প্রস্তুত করে থাকে। প্রতিটি দলে সবাই দলগতভাবে ওইদিনের স্কুলের পড়া তৈরি করবে। অগ্রসর শিক্ষার্থীরা অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করবে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক প্রয়োজনীয় তত্ত্ব্বাবধান ও তদারকি করে থাকেন মাত্র। একটি দলের শিক্ষার্থীরা যদি সম্মিলিতভাবে কোন সাবজেক্টের ওইদিনের পড়ার কোন অংশ বুঝতে না পারেন তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তা বুঝিয়ে দিতে সহায়তা করবেন। যেমন, গণিতের কোন সমস্যা যদি গ্রুপের সকল শিক্ষার্থী বুঝতে না পারে তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তা বুঝিয়ে দিবেন।



কেন গ্রুপ স্টাডি?



মুলত প্রাইভেট বা কোচিংয়ের কার্যকর বিকল্প হিসেবে এই গ্রুপ স্টাডি বা দলগত শিক্ষার প্রবর্তন করা হয়। বাংলাদেশ সরকার প্রাইভেট বা কোচিং নিরুৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এমনকি আইন করেও প্রাইভেট বা কোচিং বন্ধ করার বিষয় আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হল আমাদের দেশে মূলত শিক্ষককেন্দ্রিক সনাতন শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। যেমন, বক্তৃতাদান পদ্ধতি, প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি, প্রদর্শন পদ্ধতি, এসাইনমেন্ট পদ্ধতি প্রভৃতি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপরোক্ত কোন একটি বা একাধিক পদ্ধতির সমন্বয়ে শিক্ষাদান করা হয়। শিক্ষককেন্দ্রীক এই পদ্ধতিসমূহে ক্লাসরুম বা ক্লাসরুমের বাইরে শিক্ষকের সহায়তা ব্যতীত পাঠ প্রস্তুত করা কঠিন। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী বাসায় আসলে বিকল্প শিক্ষক বা শিক্ষিত অভিভাবকের সহায়তা নিয়ে শিক্ষার্থীকে পাঠ প্রস্তুত করতে হয়। ফলে স্কুলে বা ঘরে শিক্ষকের সহায়তা নিয়েই পড়ালেখা করতে হয়। অভিভাবক তাই বাধ্য হয়ে তার সন্তানকে নিজে পড়াতে হয় নতুবা প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পাঠাতে হচ্ছে। এছাড়াও একশ্রেণির শিক্ষকদের কোচিং বা টিউশন বাণিজ্যের অভিযোগ তো আছেই। যেহেতু সনাতন এই শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতিতে ক্লাসরুমের বাইরেও শিক্ষকের সহায়তা ছাড়া পড়ালেখা করা সম্ভব নয় সেহেতু প্রাইভেট বা কোচিং আইন করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান লেখক কোচিং বা প্রাইভেট বন্ধ করার আগে এগুলির বিকল্প কী হতে পারে তা অনুসন্ধান করা হয়। যাতে কোচিং বা প্রাইভেটের চাহিদা কমে যায় এবং কার্যকরভাবে তা বন্ধ হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গবেষণাপ্রসুত আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতিসমূহে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এখানে শিক্ষার্থীদের উপর শিক্ষণ-শিখনের আংশিক দায়িত্ব অর্পণের মাধ্যমে শ্রেণি কক্ষে বা শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষকের একচ্ছত্র ভূমিকা হ্রাস করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের তত্ত্বাবধায়নে শিক্ষার্থীগণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়ায় জ্ঞান অর্জন করে থাকে। আমাদের দেশে একদশক আগেও মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষায় প্রচলিত অংশগ্রহণমূলক শিক্ষন-শিখন পদ্ধতি কিংবা প্রাচীন গুরুগৃহে প্রচলিত অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতিকেই আধুনিক সময়ে কার্যকর শিক্ষাদান পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। উন্নত দেশেও এই পদ্ধতির ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়।



এই পদ্ধতির সুবিধাসমূহ : গ্রুপ স্টাডির এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের তত্ত্বাবধায়নে শিক্ষার্থীগণ শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়ায় জ্ঞান অর্জন করে থাকে। প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় এই পদ্ধতি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর। এই পদ্ধতির সুবিধাসমূহ যাচাই করলেই তা বুঝা যাবে।



দুর্বল শিক্ষার্থী অগ্রসর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গণিত, ইংরেজিসহ অন্যান্য বিষয়ের ওইদিনের পড়া শিখে নিতে পারে । আবার ভাল শিক্ষার্থী অন্যকে বুঝানোর ফলে তার নিজের পড়া আত্মস্থ করে নিতে পারে। (২) একসাথে দলবদ্ধভাবে পড়তে গিয়ে নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক ইতিবাচক প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয় যা শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি আরো মনোযোগী করে তুলে। (৩) বিভিন্ন গ্রুপসমূহের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়। ফলে তারা পাঠ প্রস্তুতে মনোযোগী হয়। (৪) পাঠদান কার্যক্রম সহজ, দীর্ঘস্থায়ী ও একঘেয়েমি মুক্ত করা যায়। (৫) শিক্ষণ-শিখন স্থায়ী ও আনন্দদায়ক হয়। (৬) দুর্বল ও অনগ্রসর শিক্ষার্থীরা সহপাঠীর সহযোগিতায় পাঠে আগ্রহী হয়। (৬) শিক্ষকের সময় ও কাজ কমে যায়। (৭) শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। (৮) পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। (৯) শিক্ষার্থীরা দৈনন্দিন জীবনে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে পারদর্শী হয়। (১০) শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক চিন্তা করার দক্ষতা অর্জন করে। (১১) শিক্ষার্থীর চিন্তন, দক্ষতা ও সৃজনী শক্তির বিকাশ ঘটে।



আধুনিক শিক্ষণ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর নিজস্ব প্রয়োজন, সামর্থ্য, আগ্রহ, পছন্দ-অপছন্দের ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও শিক্ষা পদ্ধতির আমুল সংস্কারের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই শিক্ষণ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীর স্বাধীনতার স্বীকৃতি, শিখনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ, তার পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার উপর অধিক গুরুত্বারোপ, সুশৃঙ্খল মানব শক্তির অধিকারী করে তোলা, সৃজনশীলতার উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং ব্যক্তি সত্তার পূর্ণ বিকাশ। আবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বয়স, মনন ও আগ্রহ বিবেচনায় শিক্ষণ-শিখনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিহার্য়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে যেখানে আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, শ্রেণীকক্ষ এবং শিক্ষার আধুনিক পরিবেশ সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা যায়নি সেখানে শিক্ষকের ভূমিকা আরো বেশি। তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়তায় শিক্ষণ শিখন পদ্ধতি-গ্রুপ স্টাডি মডেলে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীগণ শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী পারস্পরিক সহযোগিতায় শ্রেণির পাঠ প্রস্তুত করে থাকে। ফলে এই পদ্ধতিতে কার্যকর শিখন ফলাফল নিশ্চিত করা যায় যা সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।



 



লেখক : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, শাহরাস্তি , চাঁদপুর।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৯৪১৫০২
পুরোন সংখ্যা