চাঁদপুর। মঙ্গলবার ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮। ১১ পৌষ ১৪২৫। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫১-সূরা যারিয়াত


৬০ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


৫৬। আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে।


৫৭। আমি উহাদের নিকট হইতে জীবিকা চাহি না এবং ইহাও চাহি না যে, উহারা আমার আহার্য্য যোগাইবে।


 


 


 


 


assets/data_files/web

খ্যাতিমান লোকের ভালোবাসা অনেক ক্ষেত্রে গোপন থাকে। -বেন জনসন।


 


 


যার দ্বারা মানবতা উপকৃত হয়, মানুষের মধ্যে তিনি উত্তম পুরুষ।


 


 


 


 


ফটো গ্যালারি
প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য ও গন্তব্য
আরাফাত শাহীন
২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


আমাদের দেশ শিক্ষাক্ষেত্রে এখন অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য অসংখ্য পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন সেটা বাস্তবায়িত হলে দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় যে ব্যাপক গতির সঞ্চার হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার পাঠ শেষ করে বের হয়ে আসছে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত সুখকর একটা বিষয়। তবে এখানেও একটা কথা থেকে যাচ্ছে। আমরা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের আচরণে এই শিক্ষার কতটুকু প্রতিফলন ঘটছে? আমাদের আচার-আচরণে যদি শিক্ষিত মানুষের বহিঃপ্রকাশ না ঘটে তাহলে সেই শিক্ষা কি আদৌ দেশের জন্য ফলপ্রসূ হবে?



শিক্ষা আসলে কী? শিক্ষা হলো তাই যা মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত করে। মানুষের ভেতর একটা মানুষ বাস করে। শিক্ষা সেই ভেতরের মানুষটাকে টেনে বাইরে বের করে নিয়ে আসে। শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের অনেকের মনে একটা ভু্ল ধারণা প্রচলিত আছে। আমরা মনে করি, যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে পাস করে বের হয়ে আসেন তারাই বোধহয় প্রকৃত শিক্ষিত! আর যারা কখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি তারা বোধহয় শিক্ষিত নন! এই ধারণা থেকেই হয়ত আমরা জগতের সমস্ত শ্রমজীবী মানুষকে অশিক্ষিতের কাতারে ফেলে দেই। শুধু তাই নয়, আমাদের সমাজের অনেক পুঁথিগত বিদ্যায় বিদ্বান ব্যক্তিকে দেখেছি শ্রমজীবী মানুষের সাথে নির্মম আচরণ করতে। তখন আমার মনে সত্য সত্যই প্রশ্ন জাগে আসলে প্রকৃত শিক্ষিত কারা।



বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন নতুন ভর্তি হয়েছি। নতুন নতুন এলে সবকিছু কেমন যেন অন্যরকম লাগে। নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বলে মনে হয়। এটাই আসলে সত্যি। গায়ে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বাতাস লেগেছে। সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখতে ইচ্ছা করে। একদিন বন্ধুকে নিয়ে চারুকলা অনুষদের ওদিকে খেতে গেলাম। খাবার সময় তর্কাতর্কির আওয়াজ পেয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি একজন ভদ্রলোক রিকশাওয়ালার সঙ্গে তর্ক করছেন। ভদ্রলোককে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেই মনে হলো। সম্ভবত ভাড়া নিয়েই তাদের মধ্যে সমস্যার সূত্রপাত। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে ভদ্রলোক রিকশাওয়ালাকে বিশ্রি ভাষায় গালি দিয়ে বললেন, জানিস আমি বিশ্ববিদ্যালয় টিচার! রিকশাচালক কোনো কথা না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। আমার মনে হলো আমি যেন মাটির সাথে মিশে গিয়েছি।



নিজেকে আমার বড় ক্ষুদ্র বলে মনে হলো। হায়! তিনি কোনো না কোনো বিভাগের শিক্ষক। তিনি যেহেতু আমার প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক সেই হিসেবে তো তিনি আমারও একজন শিক্ষক! যাদের কাছ থেকে আমাদের মূল্যবোধ শেখবার কথা ছিল তাদের এমন আচরণ সত্যিই বড় পীড়া দিলো। আমি তো জীবনে বহু শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেছি। আমার প্রাথমিক জীবনের শিক্ষক রতন মিত্র বাবু, নিত্য বাবু এবং মাধ্যমিক জীবনের শিক্ষক আব্দুল ওহাব, দুর্গা বাবু, অমর বাবু এঁদের দিকে তাকালে সম্মানে মাথা এমনিতেই নুঁয়ে আসতো। তাঁদের অনুপম চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব আমাদের মন্ত্রমুগ্ধের মত আকর্ষণ করতো। তাঁদের মত মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক আজ বিশ্ববিদ্যালয় নামক সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে বড়ই অভাব।



আমার কথার মানে এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকই বুঝি খারাপ! এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। যেদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. শামসুজ্জোহার মত শিক্ষক আছেন; যিনি পাকিস্তানি সেনার সামনে বুক পেতে দিতে পারেন সেদেশের সকল শিক্ষক খারাপ হতে পারেন না। একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবদান ভুলে গেলে কখনোই চলবে না। তবে যখন আমরা দেখি, আমাদের এই পথপ্রদর্শকগণ অন্যের গবেষণা চুরি করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন, নিজেদের মধ্যে দলীয় কোন্দলকে প্রকাশ্যে টেনে আনেন, নিজেদের স্বার্থে ছাত্ররাজনীতিকে ব্যবহার করেন তখন আমরা হতাশ না হয়ে আসলে পারি না।



আমরা আসলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বহুদূরে সরে এসেছি। সমস্যাটা মূলত এজন্যই সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠা। কিন্তু শিক্ষা এখন হয়ে উঠেছে কেবলমাত্র চাকরি লাভের উপায়। অবশ্য আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা সেদিকে অগ্রসর হতেই প্ররোচিত করছে। আমাদের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন শিক্ষার পরিবেশ ঠিক কতটুকু বিরাজমান আছে আমরা সেটা নিয়ে সন্দিহান।



অসুস্থ ছাত্ররাজনীতি আমাদের শিক্ষার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে প্রতিনিয়ত। কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য হানাহানি এবং অসুস্থ এই প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রেখেছে। এটা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে শুভ ফল বয়ে আনবে না। আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলো মাদকের ভয়াল থাবায় আজ ক্ষতবিক্ষত। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে যখন মাদক ব্যবসায়ের মত জঘন্য কাজের সাথে জড়িত হতে দেখি তখন শংকিত না হয়ে পারি না। কোন্ অন্ধকারে গিয়ে নিমজ্জিত হচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম?



আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার চর্চা একেবারেই হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের কতটুকু সম্মান করে? একজন মাধ্যমিক পড়ুয়া ছাত্র যখন তার শিক্ষকের গায়ে হাত তুলবার মত দুঃসাহস দেখায় তখন আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতার চর্চা কতটুকু হচ্ছে। অথচ আমরা ছোটবেলায় আমাদের শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে কখনও কথা বলিনি। স্কুলে যাবার সময় বাবা বলে দিতেন, সাইকেল চালিয়ে যাবার সময় পথে মুরুবি্বদের দেখলে নেমে সালাম দেবে। আর যদি কখনও সামনে কোনো শিক্ষক থাকেন তাহলে সাইকেল নিয়ে কখনও তাঁর আগে যাবে না। আমার সমগ্র শিক্ষাজীবনে আমি বাবার দেওয়া এই উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছি। শিক্ষকরা যেমন আমাদের কাছে ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ঠিক তেমনি আমরাও ছিলাম তাঁদের চোখের মণিস্বরূপ।



এখন প্রশ্ন জাগতে পারে এখন তাহলে কেন এমন হচ্ছে না? একজন ছাত্র কেন তার শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার মত ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে? তবে কি আমাদের শিক্ষকরা এই প্রজন্মকে শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন? এটা যেমন ঠিক আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজ মূল্যবোধের চর্চা হচ্ছে না, আমাদের মানুষ হবার ছবক দেওয়া হচ্ছে না; ঠিক তেমনি আমাদের পরিবারের দায়ও এখানে কম নয়। আমাদের পিতামাতা তাদের সন্তানদের খোঁজ-খবর কতটুকু রাখেন? তারা আসলে তাদের সন্তানদের কতটুকু সময় দিচ্ছেন? সমপ্রতি ঢাকাসহ বেশকিছু জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তি হয়েছে। এইসব কিশোররা নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এর কারণ আসলে কী? পিতামাতার দায়িত্বহীন আচরণ কি এক্ষেত্রে একটুও দায়ী নয়? সন্তানের প্রাথমিক মূল্যবোধ শেখার জায়গা হলো তার পরিবার। এখান থেকে যদি মূল্যবোধের চর্চা শুরু না করা যায় তাহলে পরবর্তী জীবনে এসে শেখা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।



আমাদের শিক্ষা আসলে আজকাল সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। তা নাহলে নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট বিক্রি হবে কেন! আমরা অবাক হয়ে যাই মানুষের এমন মানসিকতা দেখে। সার্টিফিকেট দেখে আমরা যখন শিক্ষার মান বিচার করি তখন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য আমাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন দেশ, জাতি এবং সমাজকে নিয়ে না ভেবে শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবতে থাকে তখন সেটা জাতির জন্য কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই বয়ে আনে। প্রতিবছর হাজার হাজার গ্রাজুয়েট পাস করে এসে বেকার বসে থাকছে। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে। আমাদের প্রকৃত মানুষ হতে হবে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য যখন আমাদের বুকে জাগ্রত করা সম্ভব হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতার চর্চা শুরু হবে সেদিনই প্রকৃতপক্ষে আমাদের অগ্রযাত্রা শুরু হবে। নীতি-নৈতিকতাহীন একটা জাতি কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে?



 



লেখক : ফিচার লেখক, ইত্তেফাক।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
২৯৩৯৭১
পুরোন সংখ্যা