চাঁদপুর, বুধবার ৮ মে ২০১৯, ২৫ বৈশাখ ১৪২৬, ২ রমজান ১৪৪০
jibon dip
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫০-সূরা কাফ্

৪৫ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৩। আমাদের মৃত্যু হইলে এবং আমরা মৃত্তিকায় পরিণত হইলে আমরা কি পুনরুত্থিত হইব? সুদূরপরাহত সেই প্রত্যাবর্তন।

৪। আমি তো জানি মৃত্তিকা ক্ষয় করে উহাদের কতটুকু এবং আমার নিকট আছে রক্ষিত কিতাব।


প্রতিভাবান ব্যক্তিরাই ধৈর্য ধারণ করতে পারে। -ই. সি. স্টেডম্যান।


যে শিক্ষিত ব্যক্তিকে সম্মান করে, সে আমাকে সম্মান করে।


ফটো গ্যালারি
পুরস্কার হিসেবে বই
রহিমা আক্তার মৌ
০৮ মে, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হছে। খেলা শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য টিফিনের আয়োজন একটা চিপস কিংবা একটা কেক। শিক্ষার্থীদের যখন এগুলো বিলি করছেন কজন শিক্ষক। অন্যদিকে অফিস সহকারীরা প্রধান অতিথি বিশেষ অতিথিদের সামনে রাখা টেবিলগুলো ভরে দিছেন ক্রোকারিজ আইটেম (চীনামাটির প্লেট, বাটি, বোল, হটপট, মগ ইত্যাদি) দিয়ে। এরপর ঘোষণা এলো, যারা যারা প্রতিযোগিতায় প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছ তারা স্টেইজের কাছাকাছি থাকো। নকশিকাঁথা সেলাই প্রতিযোগিতায় আমার ছোট মেয়ে ফারিহা প্রথম হয়েছে। ওকে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হলো চীনামাটির একটা ভাতের বোল। ওর বন্ধু লামিয়া হয়েছে দ্বিতীয়, ওকেও দেয়া হয়েছে একটু ছোট বোল। অভিভাবকদের খেলা হলো, তাও দেয়া হলো প্লেট, বাটি। শিক্ষকদের খেলা হলো, তাও প্লেট, বাটি।



আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, ২নং সেক্টরের অধীনে তিনি যুদ্ধ করেন। বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন ১৯৭০ সাল থেকে। সম্ভবত ১৯৮৮ সালে তখনকার এরশাদ সরকার বাবাসহ ৩৫-৩৬ জনের পদোন্নতি বন্ধ করে দেন। বাবাসহ অন্যরা স্বেছায় চাকরি ছেড়ে বয়স থাকতেই প্রাইভেট চাকরিতে প্রবেশ করেন। বাবার বয়স এখন প্রায় ৮০ বছর। ১৬ ডিসেম্বর এলেই বাবা গ্রামে যান, উনার স্কুলের আমাদের স্কুলের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বাবা যুদ্ধের স্মৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃৃতি শোনান এ প্রজন্মকে। ওনারা বাবাকে পুরস্কার দেয়, বাবা এগুলো গ্রামে রেখে আসেন। ২০১৭ সালে বাবা গ্রামে যান, আমি বাবাকে বলি, এবার যা দেবে কাউকে দেবেন না, আমার জন্য নিয়ে আসবেন।



 



বাবা আমার জন্য নিয়ে আসেন। উপহার হিসেবে বাবাকে দেয়া হয় একটা চীনামাটির প্লেট। প্লেটটি আমি যত্ন করে রেখেছি। বাবার হাত থেকে প্লেটটি নিতে আমার বুকে খুব কষ্ট অনুভব করি। এ চীনামাটির প্লেট কি বাবা পাওয়ার কথা। জানি এটা সম্মানের, জানি মূল্য দিয়ে সম্মান বিবেচিত হয় না, তবু একটা প্লেট? বাবা কিছুই বলেন না, বলবেন কী করে! বাবা তো আমায় আগেই বলে দিয়েছেন, মা দেশটার এমন হবে ভাবলে আমরা দেশটাই স্বাধীন করতাম না।



 



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুরস্কার হিসেবে ক্রোকারিজ বন্ধ ও মানসম্মত বই চালু করার জন্য দাবি অনেক দিনের। আর এ দাবি জানিয়ে আসছেন অনেকেই। সুখবরটি চলেই এলো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের পুরস্কার হিসেবে থালা, বাটি, মগ, জগসহ কোনো ধরনের ক্রোকারিজ সামগ্রী না দিতে নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রতি এ নির্দেশনা জারি করা হয়। এসবের পরিবর্তে পুরস্কার হিসেবে বই দিতে বলা হয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল ২০১৯, বুধবার এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে মাউশি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।



 



মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক আবদুল মান্নানের সই করা পরিপত্রে বলা হয়, বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে পুরস্কার হিসেবে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রোকারিজ সামগ্রী বিতরণ করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখনসামগ্রী হিসেবে এসব পণ্য আদৌ পরিগণিত হয় না। ছাত্রছাত্রীদের উপহার হিসেবে শ্রেণি উপযোগী বই দিতে হবে। শিক্ষকরা এসব বই নির্বাচন করবেন। এ ব্যাপারে অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, কোমলমতি শিশুদের ঘটি-বাটি পুরস্কার দেয়া কোনো গ্রহণযোগ্য বিষয় নয়। এসব পুরস্কার শিশুদের কোনো কাজে আসে না। তারা এ থেকে কিছু শিখতেও পারে না। শিক্ষার্থীর বয়স বিবেচনা করে তাই তাকে বই পুরস্কার দিতে বলা হয়েছে।



 



তাদের মাঝে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওনারা অভিনন্দন জানিয়েছেন এই প্রজ্ঞাপনকে আর নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। সংবাদটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করি শিশুসাহিত্যিক মোজাম্মেল হক নিয়োগীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সত্যিই খুব আনন্দের সংবাদ এটি। ভালো কিছুর ফলাফল ভালোই হয়। আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের কর্তৃপক্ষকে। আমাদের কোমলমতি শিশুরা উপহার হিসেবে বই পাবে, বইয়ের সঙ্গেই কাটবে ওদের সময়। এ সময়ে এমন একটা প্রজ্ঞাপন দরকার ছিল।



 



কথাসাহিত্যিক দীপু মাহমুদ বলেন, এ সময়ের একটা যুগোপযোগী পদক্ষেপ এটি। আমাদের শিশু-কিশোররা প্রতিযোগিতা দিয়ে বিজয়ী হয়, পুরস্কার হিসেবে থালা, বাটি, মগ, জগ, ক্রোকারিজ সামগ্রী দেয়া হয়; যা ওদের কোনো কাজেই আসে না। মাধ্যমিক ও উচশিক্ষা অধিদফতরের এ আদেশ আশা করি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। আগে থেকেও কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বই বা শিক্ষা উপকরণ দিয়ে আসছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে তা বয়স উপযোগী নয় আবার মানসম্মতও নয়। এতে করে শিক্ষার্থীরা বই পায়, যা ওদের মানস সংগঠনে কোনো কাজেই লাগে না। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যারা বই ক্রয় করতে বই লিস্ট করবেন তারা যেন বয়স-ক্লাস বিবেচনা করে মানসম্মত বই লিস্টে রাখেন।



 



শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক মোস্তফা হোসেইন বলেন, প্রজ্ঞাপনটা খুবই ভালো, আমাদের অনেক দিনের চাওয়া ছিল। সেটাই এখন সরকারিভাবে এসেছে সবার সামনে। এটা শুধু সরকারিভাবে এলেই হবে না, আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি ব্যক্তি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের বোধবুদ্ধির বিবেচনা বিষয় এটা। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, আরো অনেক ক্ষেত্রে বইকে উপহার হিসেবে দেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। কথা বলতে বলতে মোস্তফা হোসেইন ১৯৬৮ সালের স্মৃতিতে হারিয়ে যান। তিনি বলেন, তখন আমি আমার গ্রামের মফস্বল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হই। পুরস্কার হিসেবে একটা বই পাই। অনেক যত্ন করে রেখেছি বইটি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ঘরবাড়ি তছনছ করা হয়। অনেক পরে বইটি খুঁজে পাই। আজও যত্নে রেখেছি সেই উপহার।



 



ব্যাংকার জামিল রায়হান বলেন, খুব ভালো একটা প্রস্তাব পেশ হলো। বাস্তবায়ন হলেই ভালো। তবে খুব মনোযোগ সহকারে দেখতে হবে শিক্ষার্থীরা বয়সভিত্তিক বই হাতে পায় কি না। বইগুলো যেমন হতে হবে মানসম্মত; ঠিক তেমনি হতে হবে পুরস্কার উপযোগী। সুযোগ সন্ধানীদের বস্তা পচা বই যেন শিশুদের হাতে চলে না আসে। দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় আমি প্রবন্ধ লিখে প্রথম হই, পুরস্কার হিসেবে বই পাই, এটা খুবই আনন্দের ছিল। কিন্তু সে বই পড়ে বোঝার বয়স হয়ে আমার ভার্সিটিতে পড়তে এসে। এই প্রজ্ঞাপন আমাদের জন্য ভালো একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে তরুণ প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাস তুলে দেয়ার। পুরস্কার হিসেবে আমাদের সত্যিকারের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তুলে ধরা যাবে তরুণদের মাঝে।



 



মোহাম্মদপুর কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের



অধ্যক্ষ রহমতউল্লাহ বলেন, ভালো বই হওয়া উচিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পুরস্কার। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ দেয়া হয়। এ আদেশ পালনের ক্ষেত্র দেশব্যাপী ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। আদেশ বিলম্বে পাওয়ায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই তা দায়সারাভাবে পালন করে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার আয়োজনই করে না। প্রতিযোগিতায় পুরস্কার প্রদান করা হবে কি না কিংবা কী ধরনের পুরস্কার প্রদান করা হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আদেশে থাকে না। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাতৃভাষা দিবস/স্বাধীনতা দিবস/শিশুদিবস/শোক দিবস/বিজয় দিবসে ক্রোকারিজ পুরস্কার দিছে।



 



এমতাবস্থায় জাতীয় দিবস উদযাপন বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে প্রতিযোগিতার আয়োজন ও পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা থাকা আবশ্যক। যেমন : মাতৃভাষা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলন ও তৎসংশ্লিষ্ট বই, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ইতিহাস ও তৎসংশ্লিষ্ট বই, শিশু দিবস ও শোক দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও তৎসংশ্লিষ্ট বই উপহার দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া যেতে পারে। তদুপরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিযোগিতা এবং অন্য সব প্রতিযোগিতাই পুরস্কার হিসেবে বই প্রদানের আদেশ থাকা উচিত। বই ছাড়া অন্য কোনো উপহার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দেয়া যাবে না। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বেশি বেশি বই পাবে, বেশি বেশি বই পড়বে আর বেশি বেশি ভালো বই বিক্রি হবে। দেশ ও জাতি জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ হবে। অবশ্যই এ আদেশ হতে হবে স্থায়ী আদেশ। প্রতিবার যাতে আলাদা করে আদেশ দিতে না হয়। যাতে এ দিবসগুলো যথাযথভাবে উদযাপন করার জন্য সারা বছরই প্রস্তুত থাকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৯৫৪১৯
পুরোন সংখ্যা