চাঁদপুর, বুধবার ৯ অক্টোবর ২০১৯, ২৪ আশ্বিন ১৪২৬, ৯ সফর ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৫৬ সূরা-ওয়াকি'আঃ


৯৬ আয়াত, ৩ রুকু, মক্কী


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


৮০। ইহা জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকট হইতে অবতীর্ণ।


৮১। তবুও কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ গণ্য করিবে?


৮২। এবং তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করিয়া লইয়াছো!


 


 


 


 


 


assets/data_files/web

হিংসা একটা দরজা বন্ধ করে অন্য দুটো খোলে।


-স্যামুয়েল পালমার।


 


 


নামাজ বেহেশতের চাবি এবং অজু নামাজের চাবি।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
শিশুর মানসিক বিকাশে মাতৃভাষা
সুধীর বরণ মাঝি
০৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মানসিক বিকাশ হলো বুদ্ধিবৃত্তির সৃজনশীল পরিবর্তন। মানসিক বিকাশ চোখে অনুমান করা যায় না। তা পরিলক্ষিত হয় ব্যক্তির কর্মের মধ্য দিয়ে। মানসিক বিকাশের জন্যে শিশু বয়স যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়স থেকেই শিশুর চিন্তার বিকাশ ঘটতে থাকে। শিশুর চিন্তার বিকাশের সাথে সাথে বুদ্ধি ও কীর্তি অর্জনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ সময় থেকেই ভাষার স্ফূরণ ঘটে। শিশুর মানসিক বিকাশের জন্যে মাতৃভাষার উপর সম্পূর্ণ দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিন্তা ও জ্ঞান আমাদের ভাষা বিকাশের উপর নির্ভর করে। শৈশব থেকে শিশুর চিন্তনের বহিপ্রকাশ ঘটে, তবে তা থাকে অত্যন্ত অবিন্যস্ত ও অপরিণত পর্যায়ে। ছোট শিশুরা যে চিন্তা করতে পারে তার প্রমাণ হলো তাদের ভাষার বিকাশ। শিশুর চিন্তার ও মানসিক বিকাশ ঘটে তার মাতৃভাষার মাধ্যমে। শিশু প্রথমে যেখান থেকে শিখতে শুরু করে তা হালো পরিবার। পরিবারের মধ্যেই শিশুর মানসিক বিকাশ। যখন থেকে শিশুর মধ্যে যৌক্তিক চেতনা সৃষ্টি তখনই তার মধ্যে বুদ্ধির বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। ভাষার বিকাশ মানব শিশুর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা হচ্ছে যোগাযোগের মাধ্যম ও ভাবের বাহন। শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ তার ভাষার বিকাশের উপর নির্ভর করে। শিশুর ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিযোজনে ভাষার গুরুত্ব অত্যধিক। ভাষার বিকাশ একটি জটিল ও বিলম্বিত প্রক্রিয়া। তাই শিশুর মানসিক বিকাশে মাতৃভাষার গুরুত্ব অধিক সহজ-সরল, প্রাঞ্জল ও হৃদয়াঙ্গম। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষাতে শিশুর মানসিক বিকাশ খুব সহজসাধ্য নয়। মাতৃভাষাতেই শিশুর মানসিক বিকাশ দ্রুত হয় এবং তার মধ্যে সৃজনশীল ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদগণ শিশুর মানসিক বিকাশে মাতৃভাষার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে মাতৃভাষাতেই শিশুর ৯৫ ভাগ শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। শিশুর মানসিক বিকাশের জন্যে সবচেয়ে সঙ্গত, স্বাভাবিক ও কার্যকরী মাধ্যম হলো স্ব স্ব মাতৃভাষা। এই সত্য শিশুর ভাষাশিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শিশুদের ভাষাশিক্ষা যথার্থ পথে বিকশিত হচ্ছে না। ফলে মানসিক বিকাশও ব্যহত হচ্ছে। যে কোনো ভাষায় শিশুর দক্ষতা অর্জন অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে কোনো অবস্থাতেই তার মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। আমরা জানি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনসূত্রে ইংরেজি ভাষা রাজভাষার মর্যাদা পাওয়ায় সেকালের উচ্চবিত্ত_মধ্যবিত্ত অনেকেই খ্যাতি, ক্ষমতা, অর্থনৈতিক লিপ্সায় ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাগ্রহণকে শিরোধার্য করে নিয়েছিলো। কিন্তু এই প্রবণতা প্রত্যক্ষ কিছু লাভ যুক্ত করলেও পরিণামে তা হয়ে উঠেছিল আত্মঘাতী। সেকালের নববাবুরা ইংরেজিয়ানার দাপুটে মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করতে শিখেছিল। বাংলা না জানাটা তাদের কাছে হয়েছিলো গর্বের বিষয়ে। ঔপনিবেশিত মনের এই বিভ্রম উপলব্ধি করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখেছিলেন, "যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যারে ফিরি ঘরে।" রবীন্দ্রনাথও সেই ঔপনিবেশিক শাসনকালেই শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সর্বাঙ্গে স্থান দিয়েছেন মাতৃভাষাকে। 'তোতা' কাহিনী রচনার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন ভিন্ন ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের পরিণাম আদতে মৃত্যু। শৈশবে ভিন্ন ভাষায় শিক্ষা লাভের ফলে ভাব ও ভাষার প্রকৃত সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে না। এর করুণ পরিণতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ 'শিক্ষার হেরফের' প্রবন্ধে লিখেছেন, "আমাদের বাল্যকালের শিক্ষায় আমরা ভাষার সহিত ভাব পাই না,আবার বয়স হইলে তাহার বিপরীত ঘটে,যখন ভাব জুটিতে থাকে তখন ভাষা পাওয়া যায় না।" ফলে ভাব ও ভাষার সুষম বিকাশের লক্ষ্যে প্রয়োজন শিশুকে তার মাতৃভাষায় যথার্থ শিক্ষিত করে তোলা। শিক্ষার শুরুতেই শিশুর ভাষা মাধ্যম সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন বাবা-মা ও অভিভাবকদের। কেনানা পরিবারের মাধ্যমেই শিশু শিক্ষার সূচনা ঘটে। শিশুরা ধাপে ধাপে ভাষাকে রপ্ত করে থাকে। বাবা-মা সচেতন থাকলে শিশুর ভাষা শিক্ষা এবং মানসিক বিকাশ সহজ হয়। বাবা-মা কী ভাষায় বই-পত্রিকা পড়ছেন সেটিও শিশু লক্ষ্য করে। তাই একটি শিশুর ভাষা-অর্জনের প্রারম্ভ থেকেই বাবা-মা সহ পরিবারের সকলের শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জনের যথার্থ পরিবেশ সৃষ্টি সম্পর্কে সজাগ থাকা জরুরী। শিক্ষকদেরও দায়িত্ব শিক্ষার্থীকৈ মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের বিবেচনাটিকে অগ্রাধিকার দেয়া। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিশুরা যে কোন শিক্ষা দ্রুত হৃদয়াঙ্গম করতে পারে অন্যকোন ভাষাতে তা সম্ভব নয়। আমার বিবেচনায় অন্য ভাষার এই আগ্রাসন রোধে নিজেদের মেধা-শক্তি নিয়োজিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও যার যার অবস্থানে থেকে সচেতন সুদৃষ্টিই পারে মাতৃভাষায় শিশুর সাফল্য বয়ে আনতে। আমার ভাষা আমার গর্ব, আমার ভাষা আমার অহংকার। মাতৃভাষা শুদ্ধভাবে চর্চা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মাতৃভাষা শুদ্ধভাবে না লিখলে, না চর্চা করলে ভাষার অমর্যাদা হয়, নিজেদের আত্মসম্মান লোপ পায়, মানসিক বিকাশ ব্যহত হয়। নিজের ভাষার শুদ্ধ চর্চা করা নিজের মর্যাদার মতো সম্মানের। মাতৃভাষার অমর্যাদা, অশুদ্ধ চর্চা শুধু মর্যাদাহানিকরই নয়, অপরাধেরও বটে। দেশপ্রেম যদি ঈমানের অঙ্গ হয় তবে মাতৃভাষার প্রতি সম্মান,শুদ্ধ চর্চা, শুদ্ধভাবে লিখাও দেশপ্রেম এবং ঈমানের অঙ্গ। শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য মাতৃভাষার শুদ্ধ চর্চা অত্যন্ত জরুরী। পৃথিবীতে একমাত্র আমরাই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি,জীবন দিয়েছি। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য, ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে, রক্ষা করতে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। আর আমরা সেই মাতৃভাষার শুদ্ধ চর্চা করবো না, শুদ্ধভাবে লিখব না এটা অন্যায়, অনৈতিক ও অমর্যাদাকর। ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য, ভাষার সমৃদ্ধির জন্য শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় শিক্ষা যতটা সহজ, সাবলীল, হৃদয়াঙ্গম ও প্রাণবন্ত হয় অন্য ভাষাতে তা কখনোই সম্ভব নয়। যে ভাষায় শিক্ষা সহজ-সরল, সাবলীল, হৃদয়াঙ্গম ও প্রাণবন্ত হয় সেই ভাষাতেই শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষাতে শিক্ষা বহু কষ্টে বহন করা বোঝার মত। মাতৃভাষায় শিক্ষার মধ্য দিয়ে ভাষার উৎকর্ষ সাধিত হয়, শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। শিক্ষার জন্য মাতৃভাষা এবং জ্ঞানার্জনের জন্য ভাষার প্রয়োজন আছে বৈকি কিন্তু তা কোনভাবেই মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। কোন ভাবেই আমার শিকড়কে অস্বীকার করে নয়। আমি আমার শিকড়কে কোন ভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। শিক্ষাকে ফলপ্রসূ করতে হলে ,মানসিক বিকাশকে কার্যকর করতে হলে শিক্ষার প্রাথমকি স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে মাতৃভাষা। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যম হওয়ায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বত্র অবাধে বিচরণ করতে পারছে। ধার করা ভাষায় মানসিক বিকাশ ব্যহত হয়। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্যভাষাতে মানসিক বিকাশ ঘটাতে হলে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। পরিশ্রমের ভয়ে শিশুর শিক্ষাদান, জ্ঞানার্জন ও মানসিক বিকাশ একটা অবস্থানে এসে আটকে যায় এবং শিক্ষার মূল লক্ষ্য ব্যহত হয়। আমাদের দেশের অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বত্র মাতৃভাষা (বাংলাভাষার) ব্যবহার নিজেদের মর্যাদা ও দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে। মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষার পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক বিকাশ বৃদ্ধি পায়। মাতৃভাষা ছাড়া শিক্ষার সম্পূর্ণ তাৎপর্য উপলব্দি করা যায় না। আমি যদি আমার ভাষাকে ভালোবাসতে না পারলাম,ভাষাকে সম্মান করতে না পারলাম, না শিখলাম তবে আমার পক্ষে দেশপ্রেম সমৃদ্ধ নাগরিক হওয়া সম্ভব নয়। দেশপ্রেম বর্জিত একজন নাগরিক কখনো শিশুর মানসিক বিকাশে আগ্রহ প্রকাশ করে না। আজকের শিশু আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক। তাই শিশু বয়সেই দেশপ্রেমের মধ্য দিয়ে মানসিক বিকাশ ঘটাতে হবে, মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতি তাকে আগ্রহী করে তুলতে হবে, মাতৃভাষায় চিন্তার জগৎকে প্রস্ফুটিত করতে হবে। মাতৃভাষা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এ ভাষাতেই মনের খোড়াকের পূর্ণতা দিতে হবে। তবেই আমরা উন্নতির সিঁড়ি নিরাপদে পার হয়ে যেতে পারব। মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যমে কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ও সাহিত্য সম্পর্কে স্বচ্ছ এবং পূর্ণ ধারণা লাভ করা যায়। যে ধারণাগুলো শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষাতে তা প্রায় অসম্ভব। শিক্ষা যেখানে সহজাত অধিকার, সভ্যতার ক্রমপ্রগতির অনিবার্য অঙ্গীকার, সেখানে কৃত্রিমতার কোন অবকাশ নেই। কোন শিক্ষাকে স্থায়ী করতে হলে, তাকে চির পরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয়। শিশু বয়স হইতে জ্ঞানের আলোক এবং ভাবের রস গ্রহণ করিবার জন্য ফুটিবার উপক্রম করিতে থাকে, সেই সময়েই অহরহ যদি তার উপর বিদেশি ভাষার ব্যাকরণ এবং মুখস্ত বিদ্যার শিলাবৃষ্টি বর্ষণ হতে থাকে তবে তা পুষ্টি লাভ করিবে কী করিয়া। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় সহজবোধ্যতার ভিত্তি নাই। পরভাষায় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষালাভে শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক শক্তির যথেষ্ট অপচয় হয়। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্যভাষায় জ্ঞানার্জন করতে গেলে বিষয় ও বাহন উভয়ের প্রতি সমান গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে বিদ্যার্জনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। ফলে মানসিক বিকাশ ব্যহত হয়। স্বদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা গড়ে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমে। তাই মাতৃভাষা বাংলা হউক আমাদের শিক্ষার ও শিশুর মানসিক বিকাশের অনিবার্য পরিণতি। মাতৃভাষার উন্নতির মধ্যেই দেশের প্রকৃত উন্নতি নিহিত। মাতৃভাষায় মানসিক বিকাশ ঘটে আর মানসিক বিকাশ ব্যক্তির উন্নতি ও দেশের উন্নয়নকে তরান্বিত করে। মাতৃভাষার ভীত যতটা মজবুত দেশের উন্নতির ভীত ঠিক ততটাই মজবুত। মাতৃভাষার ভীত মজবুত করার জন্য রাষ্ট্রকে প্রযোজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমেই রাষ্ট্র ও সরকার শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়ক ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও উদ্যোগ ছাড়া যেমন মাতৃভাষার ভীত মজবুত হয় না, তেমনি শিক্ষা ও শিশুর মানসিক ভীতও মজবুত হয় না। সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে জানা যায় মাতৃভাষার গুরুত্ব যত বেশি তারা উন্নয়নের ধারায় ততো বেশি এগিয়ে। শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও উন্নয়নে মাতৃভাষা বাংলাকে যেভাবে মূল্যায়ন করা দরকার তা আমাদের এখানে অনেক পিছিয়ে। শিশুরা আলোকোজ্জ্বল আগামীর নির্মাতা। আগামীতে কেমন হবে আমাদের প্রিয়তম দেশ-তা নির্ধারণ করবে আজকের শিশুরাই। তাই সবার আগে প্রয়োজন এই শিশুদের যথার্থ বিকাশ ও প্রকৃত শিক্ষার পথ-নির্মাণ। প্রকৃত শিক্ষার পথ-নির্মাণ শিশুর মানসিক বিকাশের পথকে মসৃণ করে তোলে। আর তা সম্ভব হয় মাতৃভাষ তেই (বাংলাভাষা)। মাতৃভাষায় শিক্ষা যেমন আনন্দ উদযাপনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে। তেমনি সম্পন্ন হচ্ছে বর্ণমালা, গণিত, বিজ্ঞান, পরিবেশ স্বাস্থ্য, জেন্ডার সমতা, সামাজিক আচরণ, সৃজনশীল ভাবনার প্রয়োজনীয় পাঠগ্রহণ। প্রচার মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব যেন হীন স্বার্থে বিলীন না হয়। প্রচার মাধ্যমে মাতৃভাষার সঠিক চর্চার মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব। আমাদের শিশু ও আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে মাতৃভাষার নব চেতনায়। তাদের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহ ভালোবাসা, আসক্তি। তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে মাতৃভাষার প্রকৃত ইতিহাস ও রক্তস্নাত জন্মকথা। মনে রাখা জরুরি যে, শিশু হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের একটি। এটি বাস্তব সত্য। প্রতিটি শিশুই সম্ভবনার বাতিঘর। শিশুদের প্রতিই আমাদেও মনোযোগ নিবিড় হওয়া উচিৎ সর্বাঙ্গে। শিশু শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের সবচেয়ে সঙ্গত, স্বাভাবিক ও কার্যকরী মাধ্যম হলো তাদের স্ব-স্ব মাতৃভাষা। মাতৃভাষাই হলো শিশু শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের মূলশক্তি ও মূলভিত্তি। শিশু শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার দ্বারা আজ এটি সুপ্রতিষ্ঠিত। শিশু বয়সে বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষা লাভের ফলে ভাব ও ভাষার প্রকৃত সেতুবন্ধন গড়ে উঠে না। এর করুণ পরিণতি সম্পর্কে বিশ্বকবি বলেছেন, 'ভাব ও ভাষার সুষম বিকাশের লক্ষ্যে প্রয়োজন শিশুকে মাতৃভাষায় শিক্ষিত করা।' আজকের দিনে বিশ্বযোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দের প্রয়োজনে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার কারর উপায় নেই। তার মানে এই নয় মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে অন্যভাষাকে নিয়েই সামনে চলতে হবে। এই বাস্তবতায় যে কেউ ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করতে পারেন। কেবল ইংরেজি কেন নিজেকে সমৃদ্ধ করতে বিশ্বের আরও বহুভাষা আয়তি্বকরণেও বাধা নেই। কিন্তু শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মাতৃভাষায় পরিপূর্ণ শিক্ষা। বাঙালি শিশুর জন্যে বাংলাভাষার গাঁথুনি মজবুত হলে অন্যান্য ভাষা শিক্ষায় তা বরং সহায়ক হবে। বহুতল অট্টালিকা তৈরির জন্য যেমন মজবুত ভিত্তির প্রয়োজন তেমনি বহুভাষাবিদ হওয়ার জন্যে সবার আগে মাতৃভাষায় যথার্থ দখল থাকা আবশ্যক। নিজ মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে ভিনদেশি ভাষার প্রতি যত্নবান হওয়া কিছুতেই বুদ্ধি মানের কাজ নয়। মাতৃভাষা একটি জাতির পরিচয় ও পরিচায়ক। মাতৃভাষার পরিচর্যায় যত্নবান হওয়া অত্যন্ত জরুরী। এর মধ্য দিয়েই শিশুর মানসিক পথ প্রশস্ত হয় এবং একটি জাতির উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকে। শিশুর মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে, তার শিক্ষার মাধ্যম নিশ্চত করতে হবে মাতৃভাষাতেই। আজ আমাদের এক শ্রেণির দ্বারা আমাদের মাতৃভাষা বাংলা চরমভাবে লাঞ্চিত। তারা বিদেশি ভাষা নিয়ে উল্লোসিত। ফলে মধ্যবৃত্তি ও নিন্মবৃত্ত মানুষের মাঝে হতাশা ও হীনমন্যতা তৈরি হচ্ছে। এত শিশুর মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানব জীবনে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। মাতৃভাষাতেই শিক্ষা সহজ ও পূর্ণাঙ্গ হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ,'শিক্ষায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ স্বরূপ।' মাতৃদুগ্ধ শিশুর পক্ষে যেমন পুষ্টিকর, বিদ্যাশিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা তেমনি সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। মাতৃভাষা মণ-প্রাণকে দেয় তৃপ্তি আরচিন্তাচেতনাকে দেয় দীপ্তি। মাতৃভাষা সহজাত ভাষা, আপন ভাষা,অন্যভাষা পরের ভাষা বিদেশি ভাষা শেখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। প্রতিদিনের ভাবে আলাপন সুখ-দুঃখ, আশা-নৈরাশ্য, আনন্দ-বেদনার প্রকাশ মাতৃভাষায়। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করলে শিশু ও শিক্ষার্থী সহজেই বিষয়টিকে আয়ত্ত করতে পারে। বিষয় আয়ত্ত করতে পারার মধ্য দিয়ে মূলত শিশুর মানসিক বিকাশ সাধিত হয়। দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য তথা সমৃদ্ধশালী করতে হলে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জন্মেও পর থেকেই মাতৃভাষার আশ্রয়ে ও পরিম-লেই একজন শিশু বড় হয়ে উঠে। সুতরাং মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। জীবন ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার একমাত্র পথ হচ্ছে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান। শিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য ও সর্বশ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে ব্যক্তিসত্তার পূর্ণতা সাধন। আর এর জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দানই হচ্ছে সর্বজন স্বীকৃত পদ্ধতি। শিক্ষার পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে চাইলে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান অপরিহার্য। এর মধ্যে কোন দ্বি-মত নেই। মায়ের সাথে, মাটির সাথে, প্রকৃতির সাথে, দেশের সাথে যোগসূত্র গড়তে হলে প্রয়োজন মাতৃভাষার। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে। মাতৃভাষায় প্রকৃতি নির্ভর শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যার মধ্য দিয়ে শিশুর মানসিক বিকাশ সম্ভব হবে। মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যমে শিশু মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিবান, শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে। শিশু মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যমে তার মধ্যে জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সাম্য, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে উঠে। শরীরচর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে যেমন শারীরিক শিক্ষা বিকাশ ঘটে তেমনি মাতৃভাষার মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ না আছে উচ্চ শিক্ষায়,না আছে উচ্চ আদালতে। পৃথিবীর সকল উন্নত দেশেই শিক্ষার মাধ্যম হলো তার মাতৃভাষা। ফলে মাতৃভাষা শিক্ষা ও চর্চার মধ্য দিয়ে শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। প্রতিটি শিশুই ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে,মাতৃভাষা তাকে জাগ্রত করে, বিকশিত করে। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় শিক্ষা অসম্পূর্ণ-অপূর্ণ শিক্ষা আর সেই শিক্ষায় কাঙ্খিত মানসিক বিকাশ ঘটে না। শিশু পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে মাতৃভাষাতে। মাভৃভাষাতেই শিশু প্রথম শুনতে শিখে, বলতে শিখে, জানতে শিখে, বুঝতে শিখে। এ ভাষাতেই সে আপনাকে খুঁজে, এভাষাতেই শিশুর পুণজন্ম হয়। মাতৃভাষায় শিক্ষার মধ্য দিয়ে শিশু তার নিজেকে খুঁজে পায় আপন সীমানায়। তারওপর ভর করে সে ছুটে চলে দিগন্ত পানে। আপনভাষাতে যে আনন্দ উপলব্ধি পাওয়া যায় অন্যভাষাতে সেই তৃষ্ণা মিটে না। অসম্ভব কর্ম সাধনের চেষ্টা আর শিশুর মানসিক বিকাশে মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষাতে চেষ্টা করার মতই নির্বোধের ব্যর্থ কর্ম। মাতৃভাষার বিকাশ যেখানে আরষ্ট শিশুর মানসিক বিকাশ সেখানে ক্ষীণ। শিশুর মানসিক বিকাশ আগামীর সমৃদ্ধি। পৃথিবীর এ যাবৎকালের সকল আষ্কিার ও অর্জন মাতৃভাষাতেই সৃষ্টি। মানসিক বিকাশের মাধ্যমেই শিশুর পরিপূর্ণতা ঘটে। যে দেশ মাতৃবাষার প্রতি যত যত্নশীল, সেদেশের শিশুরা মানসিকভাবে তত উন্নত। মাতৃভাষা পরিচর্যার মধ্য দিয়ে শিশুর মানসিক পরিচর্যা করা হয়। শিশুর মানসিক বিকাশ সর্বাঙ্গে মাতৃভাষাতেই ঘটে। মানসিক বিকাশে মাতৃভাষার প্রতি মানসিক তৃপ্তি থাকতে হবে। মাতৃভাষা রসবোধ সৃষ্টি করে, মাতৃভাষা সহসের সঞ্চার ঘটায় আর সাহস মানসিক বিকাশ ঘটায়। আমাদের শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষাতে শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ সম্ভব নয়। সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য মাতৃভাষাতেই শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটাতে হবে এবং এর জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পরিশেষে এইটুকু বলতে পারি একটি শিশুর মানসিক বিকাশের মাতৃভাষার বিকল্প নেই। মাতৃভাষাতেই তার সার্বিক কল্যাণ ও উন্নতি নিহিত। শিশুর মানসিক বিকাশের জন্যে, মাতৃভাষার বিকাশে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জনগণকে সচেতন করতে হবে। মাতৃভাষার বিকাশেল মাধ্যমেই শিশুর মানসিক বিকাশ প্রস্ফুটিত হবে। মাতৃভাষাতেই আমরা আমাদের শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটাতে চাই, আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠবে মাতৃভাষার চর্চা ও লালনের মধ্য দিয়ে।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৬৫৬৩২৪
পুরোন সংখ্যা