চাঁদপুর,মঙ্গলবার ১৯ মে ২০২০, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৫ রমজান ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৬৯-সূরা হাক্কা :


৫২ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


৮। অতঃপর উহাদের কাহাকেও তুমি বিদ্যমান দেখিতে পাও কি?


৯। ফির'আউন, তাহার পূর্ববর্তীরা এবং উল্টাইয়া দেওয়া জনপদ পাপাচারে লিপ্ত ছিল।


 


বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক শক্তি হ্রাস পাওয়াতে তারা তোষামোদপ্রিয় হয়ে ওঠে।


-স্যামুয়েল বিশপ।


 


 


মানবতাই মানুষের শ্রেষ্ঠতম গুণ।


 


আমার কলেজে পড়া
সরকার আবদুল মান্নান
১৯ মে, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)



কলেজে ভর্তি হয়েই ক্লাস করতে শুরু করলাম। গেট দিয়ে কলেজে ঢুকে হাতের ঠিক বাঁদিকে প্রিন্সিপাল স্যারের দপ্তর এবং তার উপরে দ্বিতীয় তলায় আমাদের প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্লাস। ওইদিন ক্লাসে ঢুকে আমি হতভম্ব। দুই থেকে আড়াইশ' ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে। ছাত্রী বললাম বটে, কিন্তু একদম সামনের বেঞ্চে কয়েকজনমাত্র ছাত্রী বসে আছে। দশ-পনেরজন হতে পারে। বাকি সবাই ছাত্র। আমি সবার পেছনে। একে কিছুতেই ক্লাসরুম বলা যায় না। পেছন থেকে শিক্ষকের একটি কথাও স্পষ্ট করে শোনা যায় না। সেদিকে স্যারেরও কোনো খেয়াল নেই। তিনি একদম সামনের কয়েক বেঞ্চের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত আছেন। পেছনে যার যার মতো কথা বলছে, হৈহৈ রৈরৈ করছে। এ নিয়ে স্যারের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। খাতা-কলম, বই-পুস্তক ছাড়া নিধিরাম সর্দার হয়ে একটি বা দুটি ক্লাস করে আমি বেরিয়ে গেলাম। থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।



 



নারায়ণগঞ্জে আমার পরিচিত বলতে কেউ নেই। কলেজে পরিচিত করো সঙ্গেই দেখাও হলো না। স্কুলে আমার সঙ্গে যারা পড়তো তাদের কেউই এই কলেজে ভর্তি হয়নি। এমনকি স্কুলে যারা আমার সিনিয়র ছিলেন, যাদের আমি চিনি, তাদের কারো সঙ্গেও আমার দেখা হয়নি। সুতরাং আজকের মতো আমাকে যেতে হবে আট থেকে দশ কিলোমিটার দূরে সেই বক্তাবলিতে, করিম মাস্টার জেঠাজির লজিং বাড়িতে। ওই বাড়িতে জেঠা থাকেন না। তিনি থাকেন খালের উত্তর পাড়ে প্রাইমারি স্কুলের পাশে একটি টং ঘরে। ওই ঘরেই তার খাবার আসে। বিকেলে অনেক শিশু শিক্ষার্থী আসে পড়তে।



 



বক্তাবলি ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবহমান ছোট নদীটির নাম এখন আর মনে নেই। বুড়িগঙ্গায় এসে মিলিত হওয়া এই স্বচ্ছতোয়া ছোট নদীটির পাড়ে ওই বাড়িটি যেখান থেকে মাস্টার জেঠাজির জন্য খাবার আসে।



 



নতুন টিনসেড বাড়ি। চারদিকে অসংখ্য নতুন গাছ। তার প্রায় সবই ফলের গাছ। কোথাও কোথায়ও শীতের ফুল ফুটে আছে পাগলের মতো। আমার দেখা বরুই গাছগুলো বিশাল এবং অধিকাংশ সময় ছোট ছোট টক বরুই খেয়ে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু ওই বাড়িটিতে ছোট ছোট বরুই গাছে বড় বড় বরুই ধরে আছে। নদীর তীর ঘেঁষে লাগানো ছোট ছোট পেঁপে গাছগুলোর গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত ধরে আছে প্রচুর পেঁপে। তার পাশেই নির্দিষ্ট দূরে দূরে লাগানো পেয়ারা গাছের ডালগুলো যেনো কিছুতেই বহন করতে পারছে না পেয়ারার ভার। পুব-দক্ষিণ কোণে, যেখানে অনেক রোদ, অনেক আলো, সেখানে পরপর তিনটি আমলকি গাছ। তার পাশে ডালিম গাছ কয়েকটি। থোকায় থোকায় এতো আমলকি ধরে আছে যে পাতা দেখা যায় না, গাছ দেখা যায় না। সবুজ পাতার ফাঁক গলিয়ে ডালিমের লাল রং বেরিয়ে আসছে স্বপ্নের মতো নির্জনতা নিয়ে। আর বারান্দা, করিডোর এবং বাগান ভরে আছে শীতের বিচিত্র ফুলে। নানা রকমের গাঁদা, চন্দ্রমলি্লকা, ডালিয়া আর গোলাপ ফুটেছে অকাতরে। গ্রিলে লতিয়ে রাখা হয়েছে নীলমণি লতা।



 



এ পরিবারটি যে খুবই বড়লোক তা কিন্তু নয়_সাধারণ মধ্যবিত্ত। কিন্তু রুচিবোধ অসাধারণ। ঘরের ভেতরে আসবাবপত্র, শীতবস্ত্র এবং পোশাকপরিচ্ছদ এবং এমনকি দরজা-জানালার পর্দা পর্যন্ত সবকিছুতেই পরিচ্ছন্ন রুচির পরিচয় অনুভব করা যায়। গৃহকর্ত্রী যুবতী। সুন্দরী নয়, তবে শোভন সুন্দর। যে কাউকে গ্রহণ করার একটি আনন্দিত অভিব্যক্তি সর্বদাই আচরণে লক্ষ্য করা যায়। গৃহকর্তা ব্যবসায়ী। ঔষধের ব্যবসা আছে। সুদর্শন যুবক। একবার মাত্র তার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো এবং কুশল বিনিময় হয়েছিল। তিনিও স্ত্রীর মতোই হাসিখুশি, সদালাপী ও আন্তরিক। থ্রি-ফোরে পড়ুয়া একটি কন্যা তাদের। বাবা আর মায়ের দেহসৌষ্ঠব মিলিয়ে তার গড়ন। আশ্চর্য সুন্দর। এ বাড়িটি আমার ভালোই লেগেছে। এখানে যেতে সংকোচবোধ করছি না। কমপক্ষে লজিং না পাওয়া পর্যন্ত দুই-চার দিন এ বাড়িটিতে থাকা যেতে পারে।



 



কিন্তু কলেজ থেকে দূরত্বের কথা ভাবলে গায়ে জ্বর এসে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু উপায় তো নেই! এমন যদি হতো যে, কলেজ থেকে রিকশায় চড়ে বালুরঘাট পর্যন্ত চলে যাওয়া যেত, তাহলে কথা ছিল না। কিন্তু ওই পথের রিকশা ভাড়া কমপক্ষে পনের থেকে বিশ টাকা। ওই পরিমাণ টাকায় আমার এক সপ্তাহের হাতখরচ হয়ে যায়। সুতরাং হাঁটা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।



 



কলেজে দুপুরের নিত্যদিনের খাবার ছিলো একটি ভেজিটেবল রোল কিংবা একটি বনরুটি ও একটি কলা। এর বেশি সামর্থ্য ছিল না। সুতরাং প্রায় অভুক্ত থেকে এতটা পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা খুবই কষ্টকর ছিল। তবুও হাঁটা শুরু করলাম। কলেজ থেকে বের হয়ে চাষাড়া। এখানে রাস্তার চা-সিগারেটের দোকানে বনরুটি আর কলা খেয়ে নিতাম। এইটুকুই মনে হতো অমৃত।



 



অনেকটা পথ। এখন যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আছে, তখন তা ছিল না। শুধু গোলচত্তর। হাতের ডান দিকে ঐতিহ্যবাহী সুধীজন পাঠাগার রেখে বঙ্গবন্ধু সড়ক দিয়ে হেঁটে হেঁটে শহরের একদম দক্ষিণ মাথায় চলে যেতে হবে। এখানেই আদি নারায়ণগঞ্জ। অতিক্রম করে যেতে হয় নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, দুই নম্বর রেলগেট ক্রসিং, ডিআইটি মার্কেট, ম-লপাড়া ফায়ার সার্ভিস, পানির ট্যাংক এবং আরও অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, অসংখ্য স্থাপনা। কখনো বা একটু আগেই মোবারকশাহ রোড দিয়ে ঢুকে দেওভোগ হয়ে বাবুরাইল খালের পশ্চিম ঠোঁটায় বালুরঘাটে চলে যাওয়া এবং কখনো বা বঙ্গবন্ধু সড়ক দিয়ে আরও দক্ষিণে এগিয়ে গিয়ে পাইকপাড়া ও পাইকপাড়া ভূঁইয়াপাড়া হয়ে ওই বালুরঘাটে গিয়ে নৌকায় ওঠা। এই পুরোনো নারায়ণগঞ্জ যে কী রহস্যময় শহর তা বলে শেষ করা যাবে না।



 



নির্দ্বিধায় বলতে পারি, নারায়ণগঞ্জ একটিমাত্র সড়কের শহর। এই সড়কটি হলো বঙ্গবন্ধু সড়ক। উত্তরে চাষাড়া থেকে দক্ষিণে কাশিমপুর পর্যন্ত নর্থ-সাউথ রোড। বিশাল প্রশস্ত এই রাস্তাটি ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিলনা নারায়ণগঞ্জে। যা ছিলো সেগুলো সবই চিকন গলি। আর যতোই দক্ষিণে যাওয়া যায় ততই এইসব অসংখ্য গলির বিস্তার।



 



বঙ্গবন্ধু সড়কেই প্রথম শুনতে পাই, "হ্যাঁ ভাই, সম্পূর্ণ রঙিন... সোশ্যাল অ্যাকশন ড্রামা আর সাসপেন্সে ভরপুর আজ থেকে ডায়মন্ড সিনেমা হলে শুভ মুক্তি।"



 



ভাবতে ভাবতে হাঁটতাম, "ডায়মন্ড সিনেমা হলটা কোথায়? কারো কাছে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেব। এই রঙিন সিনেমাটা দেখতে হবে।"



 



হলে গিয়ে সিনেমা দেখব কি, তখনো আমি টেলিভিশন দেখার সুযোগও পাইনি। সুতরাং হাতে অাঁকা বিশাল পোস্টারগুলোতে নায়ক-নায়িকাদের আবেদনময় ছবি দেখতে দেখতে কখন যেন বিশাল সড়ক অতিক্রম করে গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছি। পরে জেনেছি, নারায়ণগঞ্জে অনেকগুলো সিনেমা হল-গুলশান, মেট্রো, আশা ইত্যাদি। প্রায় দুই বছর নারায়ণগঞ্জ থেকেছি। কিন্তু কখনোই ওই সিনেমা হলগুলোর কোনোটিতে ঢোকা হয়নি। শুধু যখন হলগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যেতাম তখন পোস্টারগুলো পড়তাম, নায়িকাদের লাস্যময়ী ছবিগুলো দেখতাম আর ভাবতাম, "একদিন হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে হবে।"



এর মধ্যেই ভাবনায় আসে এখলাসপুর স্কুলে আমার দু-একজন বান্ধবীর কথা। এরা আমার চেহারা-সুরাত ও দারিদ্র্য দেখে এতটাই অভিভূত ছিল যে, আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে মুখ তুলে তাকানোর কথা ভাবতেও পারেনি। এসএসসি পরীক্ষার দিয়ে আমিই বরং প্রেমকাতুরে হয়ে পড়েছিলাম। এবং ভেবেছিলাম, কলেজে ভর্তি হয়ে এই কাতরতা বাড়বে। কিন্তু যে দু-তিনটি দিন অতিবাহিত করলাম, তাতে মনে হচ্ছে অনাগত দিনগুলো ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠবে। নিজেকে কোনো রকমে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রামটা বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নারী, প্রেম, প্রণয়নের কথা ভাববার সময় পাবো না কখনই।



 



বড় রাস্তা পেরিয়ে যখন গলিঘুঁজিতে ঢুকতাম তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। চা-সিগারেটের দোকান, মনোহারি দোকান, লন্ড্রি, মিষ্টির দোকান, দর্জিঘর এবং এর মাঝেই চিৎকার "ওই কুল্ফি, কুল্ফি মালাই।" পরেই দেখি ত্রিকোণাকার কাঠের একটি ফ্রেম কাঁধে নিয়ে ঘুরছে শানদার। ছুরি, দা, কাচি, খুন্তি এইসব ধার দেয় এই শানদার। এই পুরোনো নারায়ণগঞ্জে খোদাইকারীকেও দেখেছি চিৎকার করে ডাকতে "পাডা-পুতা খোদাই করবেন গো, পাডা-পুতা।"



 



এইসবের ভেতর দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিরন্তর হেঁটে যেতাম আমি এক কিশোর এবং সকল কোলাহল শেষে যখন বুড়িগঙ্গার তীরে গিয়ে দাঁড়াতাম তখন মনে হতো, রাজ্যের সকল প্রশান্তি নিয়ে এই নদীটি আমাকে নেয়ার জন্য কতকাল ধরে অপেক্ষা করছে। মনে হতো, ওর সকল আয়োজন আমার জন্য। ওর বুকের উপর দিয়ে প্রবহমান স্নিগ্ধ বাতাস আমার জন্য, ও বুকের উপর ছোট ছোট যে ঢেউ ধারণ করে আছে তার সুর-ছন্দ-তাল-লয় সব আমার জন্যে। ওর দেহে প্রবহমান পরিচ্ছন্ন যে স্রোতধারা নিয়ত প্রবাহিত হচ্ছে, তার উৎস-গতি-গন্তব্য সব আমার জন্যে। অসামান্য প্রশান্তিতে আমার দেহ-মন ভরে উঠত এবং আমি আমার সকল ক্ষুধা ও ক্লান্তি সমর্পণ করে কোষা নৌকার পাটাতনে পা গুটিয়ে বসে পড়তাম। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। একটু পরেই নেমে যেতে হতো জলকাদার চরে।



 



হেঁটে চর অতিক্রম করে মূল নদী বুড়িগঙ্গা। এখানে নদী অনেক তীব্র, খরস্রোতা। কচুরিপানাগুলো এখানে আনন্দে হেলেদুলে নিরুদ্দেশ জলভ্রমণ করতে পারছে না। মুহূর্তে মুহূর্তে খেতে হচ্ছে নাকানিচুবানি। স্রোতের প্রচ- তোড়ে কোথায় তলিয়ে গিয়ে কোথায় ভেসে উঠছে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আর যতটুকু চোখ যায়- যেদিকে শীতলক্ষ্যা মেঘনা আর এই বুড়িগঙ্গা মিলিত হবে, সেই পর্যন্ত জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। পশ্চিম আকাশের প্রায় অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আলো তখন বুড়িগঙ্গাকে কী যে রহস্যময় করে তুলেছে আর সেই রহস্যময় জগতের আশ্চর্যসব অভিনেতা-অভিনেত্রী হয়ে উঠেছে জেলে নৌকা আর তার মাঝিরা। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। নৌকার যাত্রীরা কত কথা বলে, তার কিছুই আমার কানে যায় না। আমি প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের মধ্যে নিরাম অন্বেষণ করি।



 



পাড়ে গিয়ে নৌকা ভিড়ে। কিছুতেই আমার নামতে ইচ্ছা হয় না। আমার মন ও দুর্বল শরীরজুড়ে তখন তন্দ্রাচ্ছন্নতা। তবুও আমি নামি এবং হাঁটতে শুরু করি। এক কিলোমিটার পথ হেঁটে আমি পেঁৗছে যাই আশ্চর্য সুন্দর ওই বাড়িটিতে। গিয়ে শুনতে পাই, মাস্টার জেঠাজি আমার জন্যে লজিং ঠিক করেছেন অদূরে মাংস ব্যবসায়ী একটি পরিবারে। অর্থাৎ, আমার ছাত্রের বাবা কসাই। নারায়ণগঞ্জে তার ব্যবসা।



 



জেঠাকে আমি বললাম, এতোটা পথ পায়ে হেঁটে গিয়ে_এসে কলেজ করা খুবই কষ্টকর। আমি চেষ্টা করছি, কলেজের কাছে লজিং-এর ব্যবস্থা করতে। কিন্তু জেঠা বললেন, ব্যবস্থা যখন হবে তখন চলে যেও। আপাতত ওখানেই থাকবে।



 



আমি কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু আর একটি কথাও বাড়ালাম না। কারণ আমি বুঝতে পেরেছি, এই বাড়িটিতে আমার এ দুই দিন থাকা পরিবারটির জন্য বিব্রতকর হোক বা না হোক, জেঠাজির জন্য অসম্মানজনক। সুতরাং ব্যবস্থা করে ওই রাতেই আমি কসাই বাড়িতে চলে গলা।



 



কসাই বাড়িটি ছোট ওই নদীটির উত্তর পারে। নদীর পারে একটি প্রাথমিক স্কুল তার পেছনে জলবিহীন খাল। তার পাড়ে এই বাড়িটি। একটি আলাদা দোচালা ঘরে আমার ব্যবস্থা। রতন মিয়া নামে আমার গৃহকর্তা কসাই। ভয়ের ব্যাপার। কিন্তু প্রথম পরিচয়েই আমি মুগ্ধ হলাম। কসাই সংক্রান্ত যে ভয়াবহ ধারণা আমাদের মাথার মধ্যে স্থায়ী হয়ে আছে তা একদম মিথ্যা, বানোয়াট। লোকটিকে আমার রীতিমতো সমাজের অন্য দশজনের চেয়ে মানবিক বলে মনে হলো।



 



আমি কথা বলেছিলাম আমার একমাত্র ছাত্র লাবুর সঙ্গে। তখন রাত প্রায় দশটা। এমন সময় তিনি ঢুকলেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। তার মোদ্দা কথা হলো, এখানে আমার কোনো অসুবিধা হবে না। কোনো অসুবিধা হলে আমি যেন লাবুকে বলি, ইত্যাদি। কিন্তু ছেলের পড়াশোনার বিষয়ে কিছুই বললেন না। গৃহকর্ত্রী মহিলাকে আমি কখনোই দেখিনি। ঘরের বাইরে বাঁশের আড়ায় কাপড় রোদে দেওয়ার সময় বা উলটে-পালটে দেয়ার সময় তাকে দেখেছি। কিন্তু সেই দেখা একেবারেই অস্পষ্ট। আমার সব কাজ করে দিত সেভেনে পড়ুয়া লাবু।



 



সপ্তাহখানেক সময় চলে গেলো। একটি খাতা আর একটি কলম আমার সম্বল। এই নিয়েই কলেজে যাই আসি। বইপুস্তক কিছুই কেনা হয়নি। বই-পুস্তক কিনতে হবে। তার জন্য বাড়ি থেকে টাকা আসবে_এ আশা একেবারেই দুরাশা। অন্য কারো কাছ থেকে একটি টাকা পাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং টাকার সংস্থান আমাকেই করতে হবে।



 



এই কসাই পাড়া ও তার আশপাশে সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে কারোরই কোনো ভাবনা নেই। তবুও আমি জেঠাজিকে অনুরোধ করলাম, কয়েকটি বাচ্চা পড়াতে পারলে ভালো হয়। জেঠা সেই ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি চারটা-সাড়ে চারটার দিকে একটি কাচারি ঘরে উপস্থিত হই আর বিচিত্র ক্লাসের পাঁচ-ছয়জন ছাত্র-ছাত্রী পড়তে আসে। এদের কারো নাক দিয়ে সর্দি ঝড়ে। সেই সর্দি হাত দিয়ে সরিয়ে পেন্টে মোছে। কারো পেন্ট ছিঁড়া। বসার পর বেরিয়ে পড়ত নুনুর মাথা। কেউ কেউ গায়ে সার্ট বা গেঞ্জি রাখতে পারত না একদম। কাচারি ঘরে ঢুকেই সার্ট-গেঞ্জি খুলে রেখে দিত চকির এক প্রান্তে। মেয়ে ছিল দুটি। কি যে লক্ষ্মী, কি যে লক্ষ্মী! তাদের আল্লাদের শেষ ছিলো না। এর একটি থ্রিতে অন্যটি ওয়ানে পড়ে। ছেলে মেয়ে একেকটা একেক চিজ।



 



আমি অবাক হয়ে দেখলাম, পড়তে চায় না কেউই। প্রত্যেকের পেটে অনেক কথা, অনেক গল্প। তারা সবাই কথা বলতে চায়, গল্প করতে চায়। তো বাতাসের গতির দিকে খেয়াল রেখে পাল তুলতে হয়। আমিও তাই করতে লাগলাম। খুব মনোযোগ দিয়ে তাদের আজব আজব সব গল্প শুনতে লাগলাম। একজনের পা মচকে যাওয়ার গল্প ইনিয়ে বিনিয়ে বলল, তো অন্যজন তার ছোট ভাই হিসু করে বই ভিজিয়ে দিলে টিনের চালে দিয়ে দিয়ে সেই বই কীভাবে তার মা শুকিয়েছিল সেই গল্প। আমি একটু একটু করে রাশ টেনে ধরতে লাগলাম। পড়ার একটি আনন্দিত পরিবেশ তৈরি করে ফেললাম এক সপ্তাহের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়ে হয়ে গেল দশজন। একদিন সবার বাবা অথবা মাকে আসতে বললাম। উদ্দেশ্য দুইটি। আমার বইপুস্তক কেনার জন্য টাক লাগবে। মাস শেষ হওয়ার অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তারা যে যা পারে, আমাকে টাকা দেবে এবং জানিয়ে দেওয়া যে, বাড়িতে এই ছেলে-মেয়েদের অনেক আদর করতে হবে। বকাবকি করা যাবে না। কিছুতেই মারা যাবে না।



 



তাদের ছেলে-মেয়েদের আমি অনেক প্রশংসা করলাম। বললাম, ওরা অনেক ভালো। ওদের উপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখা যায়। ওদের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই ইত্যাদি। অভিভাবকরা খুব খুশি হলেন। দু-একদিনের মধ্যে তারা পঞ্চাশ-একশ করে আমাকে পাঁচ-ছয়শ টাকা দিলেন। ওই টাকা দিয়ে আমি বইপুস্তক ও খাতাকলম কিনলাম।



 



একটু পশ্চিমে গিয়ে একটি অবস্থাসম্পন্ন বাড়ি। ওই বাড়ির একটি ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরনে পেন্ট, ফুল হাতা সার্ট, চোখে চশমা, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। মাথার চুলে ল্যাপ্টে তেল দিয়ে কাত করে অাঁচড়ানো। আদর্শ ভদ্র ছেলে যাকে বলে, দেখতে আরিফ ঠিক তাই। বয়সে আমার সামান্য বড় হবে। ও কী পড়ে, কোথায় পড়ে তার কিছুই আমার জানা নেই। পরিচয়ের পরে দু-একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বুঝতে পারছিলাম এ বিষয়ে ওর কোনো আগ্রহ নেই। সুতরাং পড়াশোনা নিয়ে আর আগ্রহ দেখালাম না। কিন্তু দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে, ওর আগ্রহের জগৎটা একান্তই মেয়েকেন্দ্রীক। নাইন-টেন পর্যন্ত পড়েছে। তারপর আর পড়াশোনা করেনি। এখন ভদ্র ছেলের বেশ ধারণ করেছে এবং ফুলবাবু হয়ে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। বাইরে খুব যে একটা শয়তানি করে তা নয়। তবে ভেতরে ভেতরে শয়তানের হাড্ডি। বুঝতে পেরে আমি আস্তের উপর পিছটান দিলাম। দু-একদিন দেখা হওয়ার পর আরিফ যখন বুঝতে পারল আমার তেমন আগ্রহ নেই, তখন সেও আর আসতো না। তবে আমাকে একটি ভয়ংকর সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে আরিফ, যেটা ইতঃপূর্বেই আমি অনুভব করছিলাম।



 



তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের একজন পাগল মহিলা এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। দু-একদিন আমিও এই মহিলাকে দেখেছি। আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়েছিল। আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কারো সঙ্গে আর বলিনি। আরিফ আমাকে বলে গেল যে, ওই পাগল মহিলা যদি বুঝতে পারে তুমি রাতে একা থাক, তা হলে মাঝ রাতে গিয়ে তোমার দরজায় ধাক্কা দেবে। খুব ক্ষীণ স্বরে তোমাকে অশ্লীল কথাবার্তা বলবে। ভুলেও তুমি দরজা খুলবে না।



 



আরিফের কথা আমি খুব একটা পাত্তা দিলাম না। কিন্তু রাতে যখন ঘুমোতে যাই তখন একটু একটু ভয় কাজ করে। ঘরের পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেও মনে হয় এই বুঝি পাগল মহিলা এলো।



 



এক রাতে দরজা ধাক্কাধাক্কির শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি নিঃশব্দে অনুভব করতে চেষ্টা করলাম যে, কী হচ্ছে। শুনতে পাচ্ছিলাম, খুব অশ্লীল কথাবার্তা বলছে। বুঝতে পারছিলাম না যে, আমি কি চিৎকার করে লাবুকে ডাকবো, নাকি রাতটা কোনো রকমে কাটিয়ে দিয় সকালে বিষয়টা ফয়সালা করবো। মনে হলো, এই রাতে সিন ক্রিয়েট করা ঠিক হবে না। এই বাড়ি সেই বাড়ির লোক জড় হয়ে যেতে পারে। বিষয়টা একেবারেই শোভন হবে না। সুতরাং সকালের জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয়।



 



কিছুক্ষণ দরজা ধাক্কাধাক্কি করে ও অশ্লীল কথাবার্তা বলে মহিলা চলে যায়। বিষয়টা টের পেয়েছেন আমার লজিং মাস্টার। তিনি এসে আমাকে ডাকলেন। আমি লাইট জ্বালিয়ে দরজা খুলে দিলাম। তিনি বললেন, "ভয় পাইছেন? এই পাগল মানুষ, এ রকম করে, কী আর করা যাবে। দরজা যে খোলেন নাই, খুব ভালা করছেন। আর কোনো দিন আইব না। নিশ্চিন্তে ঘুমান।"



 



আমার আর ঘুম আসে না। সারা রাত আমি ঘুমোতে পারলাম না এবং ওই রাতেই সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমি শহরে চলে যাব। যে ভাবেই হোক, ব্যবস্থা আমাকে করতেই হবে।



 



ওখান থেকে চলে আসার পেছনে ওই পাগল মহিলা নিঃসেন্দহেই আমার জন্যে প্রচ- একটা ধাক্কা ছিল। অবশ্য এর আগেই আমার মনে হয়েছে যে, কলেজ থেকে অনেক অনেক দূরে এই প্রত্যন্ত এলাকায় থেকে সত্যি আমার পড়াশোনা বলতে কিছু হচ্ছে না। সারাদিন চলে যায় পথে। তার পর সন্ধ্যায় বাচ্চাগুলোকে পড়ানো এবং রাতে অনেকটা সময় লাবুকে পড়ানো। এইসব করে করে আমার কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। সুতরাং আমাকে খুব শিগগিরই শহরে কলেজে কাছেপিঠে কোথায়ও চলে যেতে হবে। পাগল মহিলা আমার এই ইচ্ছাকে প্রচ- রকম বেগবান করে তুলেছে।



 



কলেজে গিয়ে প্রথমেই আমি দেখা করলাম জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গে। শেরে বাংলা হোস্টেলে আমার থাকার জন্য ব্যবস্থা করতে জাহাঙ্গীর ভাই তার ছেলেদের বলে দিলেন। ওরা আমাকে নিয়ে গেল ওই হোস্টেলে। তখন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে বাস যোগাযোগ ছিল বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে পাগলা হয়ে যাত্রীবাড়ি ইত্যাদি। বাইপাস ছিল না। কলেজ থেকে ওই পথে সামান্য এগুলেই সড়কে পাশে কলেজের মাঠ ঘেঁষে শেরে বাংলা হোস্টেল। দ্বিতল এই হোস্টেলটিতে সম্ভবত চারটি করে আটটি রুম আছে। দ্বিতীয় তলার রুমগুলোতে অনন্তকাল ধরে কারা থাকে তার কোনো খোঁজ থাকত না। নিচ তলার রুমগুলোতে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি ঢুকে পড়ে। এই রুমগুলো সম্পূণরূপে বাস অনুপযোগী। এখানে রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই, খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধু তাস খেলা, জুয়া খেলা, আড্ডা দেয়া ছাড়া এ রুমগুলো কখনো পড়াশোনার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। সুতরাং কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব অনুভব না করে ওই ছেলেদের সোজা জানিয়ে দিলাম, আমি এখানে থাকছি না।



 



এখন বিকল্প হলো লজিং-এর ব্যবস্থা করা। কলেজে এসে মতলবের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। কিছু লোক থাকে চিরকাল নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়ায়। রুহুল ভাই ছিলেন এই প্রকৃতির মানুষ। কাউকে উপকার করার জন্য এই লোকটি উদগ্রীব হয়ে থাকে। আমার সমস্যার কথা শুনে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। আমাকে বকলেন, "পাগল ছেলে, তুমি দেখেছ, বক্তাবলি থেকে কেউ এই কলেজে পড়তে আসে! এটা কি সম্ভব? তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?"



 



আমি বললাম, "রুহুল ভাই, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়ই তো হলো দুই দিন আগে। পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গেই কি সমস্যার কথা বলা যায়?"



 



তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, "একদম চিন্তা করো না। আশা করি দুই-এক দিনের মধ্যেই একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"



 



দু-একদিন লাগল না। রুহুল ভাই পরদিনই আমাকে খুঁজে বের করে বললেন, "চল, তোমাকে নিয়ে এক জায়গায় যাই।"



আমি বললাম, "কোথায় রুহুল ভাই?"



তিনি বললেন, "আরে! চল না, যাই। তারপর দেখা যাবে।"



 



চাষাড়ার উত্তর দিক দিয়ে একটি রেল লাইন চলে গেছে আদমজী জুটমিলের দিকে। মালগাড়ির রেল লাইন। এই রেল লাইনটি এখন আর চালু নেই। রেল লাইনের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে অনেকটা পথ শেষে রেল লাইনের সঙ্গে মেলানো একটি বাড়িতে গিয়ে আমরা উঠলাম। গৃহকর্তা ছিলেন না। সুতরাং গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হলো আগামীকাল আমি এই বাড়িতে উঠছি।



 



আমার সংসার ছিল অতি সামান্য। দুটি লুঙ্গি, একটি পেন্ট, একটি সার্ট, একটি গামছা, দুটি গেঞ্জি, দাঁত মাজার জন্যে নিমের একটি ডাল এবং আমি। আর কিছু বইপুস্তক ও খাতাকলম। সুতরাং সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছোট একটি ব্যাগে সবকিছু ঢুকিয়ে আমি রেল গাড়ির প্রায় নিচে চলে আসলাম। (চলবে)



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৯৬৯৭৭৭
পুরোন সংখ্যা