চাঁদপুর, মঙ্গলবার ৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জিলকদ ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৭১-সূরা নূহ্


২৮ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


১৭। তিনি তোমাদিগকে উদ্ভূত করিয়াছেন মৃত্তিকা হইতে।


১৮। অতঃপর উহাতে তিনি তোমাদিগকে প্রত্যাবৃত্ত করিবেন ও পরে পুনরুত্থিত করিবেন,


১৯। এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য ভূমিকে করিয়াছেন বিস্তৃত


 


যুগ যতই নূতন হোক পুরাতনের অভিজ্ঞতা ছাড়া তা অচল।-ডেফে।


 


 


যিনি বিশ্বমানবের কল্যাণ সাধন করেন, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।


 


 


আমার কলেজ জীবন
সরকার আবদুল মান্নান
০৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)



নান্নু সর্দারকে প্রথম দেখে আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বিশাল দেহের মানুষ। যেমন তার উচ্চতা, তেমনি মোটা। গায়ের রং শ্যামলা। মুখে বসন্তের দাগ। পৃথিবীর সেরা মাস্তান, গু-া, সন্ত্রাসী কিংবা খলনায়ক হওয়ার জন্যে দৈহিক যতো গুণাবলি দরকার সবই ছিল নান্নু সর্দারের। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন মনে হতো, পৃথিবীর তাবৎ মানুষ, রাজা, মহারাজা কোনো ছার-নস্যি নস্যি।



অধিকাংশ সময় গায়ে হাফ শার্ট এবং পরনে দামি লুঙ্গি। খাটের উপরে বা মেঝেতে যখন তিনি বসতেন, তখন হাঁটু ভেঙে পায়ের উপর পা তুলে বসতেন এবং ওই বসাটার মধ্যে তিনি খুব আয়েশ বোধ করতেন। পরে হায়াৎ মামুদ স্যারকে ওইভাবে আরাম করে বসতে দেখেছি। যখন ঘর থেকে বের হতেন, তখন দীর্ঘ সময় নিয়ে তিনি প্রস্তুতি নিতেন। মাথাভর্তি বড় চুলে চুবিয়ে তেল মাখতেন এবং ভালো করে লেপটিয়ে অাঁচড়াতেন। প্যান্ট পরতেন, তার উপর ফুল হাতা শার্ট। কখনোই শার্ট ইন করতেন না। পায়ে দামি স্যান্ডেল। শরীরের পাউডার মাখতেন। গলার নিচে প্রয়াস পাউডার দেখা যেতো।



এমন পরিপাটি হয়ে তিনি যখন রাস্তায় বের হতেন, তখন তার সঙ্গে দু-একজন ছাপোষা লোক থাকতই। লোকজন তাকে সমীহ করে সালাম দিতো এবং সর্দার সাহেবের কুশলাদি জানতো।



এ বিপুল আয়োজন করে তিনি কোথায় যেতেন, তা কখনোই জানা হয়নি। তবে এলাকার কোনো চায়ের দোকানে কিংবা কোনো হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা দিতে তাকে কখনোই দেখা যায়নি।



 



এ মানুষটি দেখতে যেমন বিশাল ছিলেন, তার আত্মাটাও ছিলো তেমনি বিশাল। তিনি আমাকে ছোট ভাইয়ের মতোই গ্রহণ করেছিলেন। ওখানে যাওয়ার দু-এক দিনের মধ্যেই তিনি আমাকে বললেন, 'শোনো মাস্টর, এ বাড়ির কোনো কিছুকেই পর মনে কইরো না। নিজের মনে করবা। ছোড ভাইবোন থাকলে পড়াইতা না? ওগও নিজের ছোট ভাইবোন মনে কইরা পড়াইবা। নিজের পড়া নষ্ট কইরা না। আর আমি সাবুরে কইয়া দিতেছি, টেহা-পইসা যা লাগবো কল থিকা লইয়া যাইবা।'



 



প্রায় দেড় বছর এ বাড়িতে আমি ছিলাম। নান্নু ভাইয়ের এমন একটি আচরণ বা কথা স্মরণ করতে পারি না যাতে আমি কষ্ট পেয়েছিলাম।



 



ঘরের পাকা মেঝেতে পাটি বিছানো থাকতো। ওই পাটির উপর বসে আমরা সবাই এক সঙ্গে খেতাম। খাওয়ার সময় চলতো নানা রকম গল্পগুজব, ইয়ার্কি-ফাজলামি, ঠাট্টামস্করা। বিশেষ করে ভাবীর সঙ্গে তার নিত্যদিনের ঠাট্টার সম্পর্ক ছিল। সামান্য সুযোগ পেলেই যৌনগন্ধী ঠাট্টা শুরু হয়ে যেতো। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এ মধুর সম্পর্কটা আমার খুব ভালো লাগতো।



 



বাঙালি গড়পড়তা মেয়েদের চেয়ে ভাবী লম্বা মহিলা। একহারা গড়ন। একদম ফর্সা। অসাধারণ সুন্দরী এই মহিলার মুখে বসন্তের দাগ। খুবই আশ্চর্যের বিষয় এই যে, স্বামী-স্ত্রী দুজনের মুখেই বসন্তের দাগ। সেই বসন্তের ক্ষতচিহ্নগুলোকে অতিক্রম করে ভাবীর মুখের লাবণ্য ও পেলবতা এবং দেহসৌষ্ঠব একবার দেখলে কোনো দিন ভুলে যাবার মতো নয়।



স্বামী-স্ত্রী দুইজনই উৎফুল্ল মানুষ। সারাক্ষণ আনন্দে থাকতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে ভাবী হৈহৈ রৈরৈ করে বেড়ানো মানুষ। কিন্তু তার জগৎ ওই বাড়িটুকুর মধ্যেই। বাপের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ধারেকাছে কোথাও। কিন্তু ওই বাড়িতে আমি তাকে কখনোই যেতে দেখিনি। আমাকে তিনি ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন এবং এর মধ্যেই আবার একটা ঠাট্টার সম্পর্কও তিনি তৈরি করে নিয়েছেন।



 



এ দম্পতির দুটি ছেলে। ছোট ছেলেটি ক্লাস টুতে পড়ে। নাম সুমন। বড় ছেলেটির নাম লিটন। লিটন ক্লাস ফোরে পড়ে।



সুমন কি যে মায়াবী ছেলে! মাথা ভরা চুল। খুব সুন্দর করে ছেঁটে রাখা। ওই চুল কখনো বাড়েও না, কমেও না। সবসময় একই রকম থাকে। কয়েকদিন পর পরই চুল ছাঁটিয়ে আনা হয়। শৈশবে একটি সময় পর্যন্ত যেমন ছেলে ও মেয়েদের মুখের গড়নটা প্রায় একই রকম থাকে, সুমন যেনো সেই সময়টা তখনো পার করতে পারেনি। ওর মুখের গড়নের মধ্যে ছেলে শিশুর লাবণ্যের সঙ্গে মেয়ে শিশুদের একটি অস্পষ্ট লাবণ্যময়তার ছাপ তখনো বিদ্যমান। এসব মিলে সুমনের মধ্যে অদ্ভুত একটা মায়ার আবহ সর্বদাই বিরাজমান থাকতো। কিন্তু বড় ভাই লিটনের সঙ্গে যখন ঝগড়া করতো, তখন তার আসল রূপ দেখা যেতো। তার জিদের শেষ নেই। লিটনকে হারাতেই হবে এবং লিটনও হেরে কেঁদেকেটে আনন্দ পেতো। ছোট ভাইয়ের প্রতি তার দরদ এমনই ছিলো।



 



লিটন তার মায়ের মতো ফর্সা এবং লম্বা। জন্মসূত্রেই এজমায় আক্রান্ত ছিলো বিধায় তার শরীরে একটা খিটমিটে ভাব থাকতো। কিন্তু লিটনকে আমার খুব ভালো লাগতে শুরু করে। কারণ ওই বয়সে ও সর্বক্ষণ দায়িত্বশীল মানুষের মতো আচরণ করতো। কোনো কিছু নিয়ে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে লাগলে, ঝগড়া হলে সে-ই মার খেতো। কখনো কখনো নিজের অংশটুকুও ছোট ভাইকে দিয়ে দিতো। ওই বয়সেই লিটন নানা কাজে মাকে সাহায্য করতো এবং বাবার ফাই-ফরমাশ শুনতো।



পড়াশোনায় লিটন তেমন ভালো করতো না। কিন্তু তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলো না। ফলে ওর প্রতি সংসারের সবারই ছিলো আলাদা যত্ন, আলাদা দরদ। আর পড়াশোনা নিয়ে তাকে যেনো চাপ দেয়া না হয়, এ বিষয়ে নান্নু ভাই খুব সতর্ক ছিলেন।



 



লিটন খুব একটা হাসতো না। আবার সারাক্ষণই মুখ ভার করে আছে_তাও নয়। বেশ একটা দায়িত্বশীল মানুষের মতো সে চলাফেরা করতো। তবে পড়তে বসলে সে না হেসে পারতো না।



খুব ছোটবেলায় আমার ছোট চাচা আমাদের সঙ্গে রাজ্যের সব আজব গল্প ফাঁদতেন। কাকার ওইসব গল্প শুনে আমরা হেসে কুটিকুটি হতাম। কাকাকে আমাদের সবচেয়ে আপন মনে হতো। তখনও আমাদের মধ্যে সত্য-মিথ্যার বোধ তৈরি হয়নি, যৌক্তিক-অযৌক্তিক কিছু আছে বলেও আমরা জানতাম না। পৃথিবীর সবকিছুই আমাদের কাছে অফুরন্ত বিস্ময়। কাকা যেসব গল্প বলতেন, সেগুলো আমাদের খুব অবাক করে দিতো। হাতি আকাশে উড়ে বেড়ানোর গল্পও তখন আমাদের কাছে খুবই বাস্তব বলে মনে হতো। বিশাল কানের একটি হাতি কান দুটিকে ডানার মতো ব্যবহার করে একবার ওড়েও ছিল।



শিশুদের এ আনন্দিত জগতের ব্যাপারে আমি সর্বদাই খুব সচেতন ছিলাম। ফলে সুমন ও লিটনকে পড়াতে গিয়ে আমি আশ্রয় নিতাম গল্পের। ফলে লিটনের মতো শিশুও হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতো। ওর এই হাসির শব্দ শুনে ভাবী, খালাম্মা, মানে ওদের দাদি এবং আরও অনেকে বেড়ার ফাঁক গলিয়ে দেখতে আসতো।



 



পরে ভাবী আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, 'আচ্ছা ভাই, আমনে কী গল্প কন যে আমার গোমড়ামুখো ছেলে পর্যন্ত হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়?'



আমি বলতাম, 'ভাবী, এখন তো বলতে পারবো না। আপনি ওয়ান, টু বা থ্রিতে ভর্তি হয়ে আমার কাছে পড়তে আসেন, তা হলে বুঝতে পারবেন, আমি কী গল্প করি।'



ভাবী হতাশ হয়ে বলতেন, 'এই বয়সে কে আমার ভর্তি নেবে ভাই? দরকার নাই।'



'কেন, আমি আছি না। আমিই আপনার ভর্তি নেবো।' দুষ্টের মতো হেসে বলতাম আমি।



দুষ্টুমিটা ভাবী বুঝতে পারতেন। বলতেন, 'না রে ভাই। এ বয়সে মাস্টারের প্রেমে পড়ার কোনো ইচ্ছা নাই।'



ভাবীর ওই কথা কোথা থেকে নান্নু ভাই শুনে ফেলেছেন। তখন নান্নু ভাইয়ের সংলাপ : 'মান্নান, পটাইও না, পটাইও না। এই জিনিস সামলাইতে পারবা না। আমার জীবনই ছেঁড়াবেরা হইয়া গেছে।'



শুনে লজ্জায় আমি এক দৌড়ে নদীর পাড়ে।



 



ভাবীর একজন চাচাতো ভাই ধান-গম ভাঙানোর কলটা চালাতো। ছোটখাটো শ্যামলা যুবক। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে থাকতো, আর রাজ্যের গল্প বলতো। এর নাম সাহাবুদ্দিন সাবু। সাবু ভাইয়ের সঙ্গে আমার একটি মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। নান্নু ভাইও এ শ্যালোকটিকে খুব পছন্দ করতেন। সাবু ভাইয়ের সততা ও নিষ্ঠার কোনো তুলনা চলে না। ধান ও গম ভাঙানোর একটি টাকাও বেহাত করার রুচি তার ছিল না। পান-সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস ছিল। সেটা নান্নু ভাই জানতেন। তার জন্য টাকা বরাদ্দ ছিল। আর আমি যাওয়ায় পর প্রতিদিন আমার জন্যও চার-পাঁচ টাকা বরাদ্দ করা হয়। তবে সাবু ভাইয়ের কাছ থেকে আমি খুব কম দিনই টাকা নিয়েছি।



 



নবীগঞ্জ গিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই আমি একটি টিউশনি ঠিক করে নিই। কদম রসুল (সাঃ) মাজারে ঢুকতে হাতের ডান দিকের একতলা বাড়িতে। গৃহকর্তা একজন সরকারি কর্মকর্তা। নাম সম্ভবত ফরিদুর রহমান। সত্যিকার অর্থেই একটি শিক্ষিত ও রুচিশীল আধুনিক পরিবার। ছেলেটিকে দেখে আমি মুগ্ধ হই। ওর নাম ফয়সল। এইটে পড়ে। অত্যন্ত সুদর্শন কিশোর। মাথা ভরা অগোছালো চুল। পরনে দামি গেঞ্জি ও জিন্স প্যান্ট। ওই এলাকার আর দশটি ছেলে থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।



আমি খুবই আনন্দের সঙ্গে ফয়সলকে পড়াতে শুরু করলাম। অনেক স্নেহ করে, আদর করে এবং ওর ইচ্ছা ও আবেগকে যথেষ্ট মর্যাদা দিয়ে পড়াতে লাগলাম। কিন্তু ফয়সলের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ নেই। অধিকন্তু আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, ওর ব্যবহার, আচার-আচরণ এবং কথাবার্তা আর দশটি ছেলের মতো স্বাভাবিক নয়। কোনো কথা জিজ্ঞাসা করলে সে কোনো উত্তর দেয় না বরং কখনো কখনো খুব অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। কখনো বা রাগান্বিত হয়ে অপলক দৃষ্টিতে কোনো দিকে চেয়ে থাকে! পড়াশোনাও খুব একটা হচ্ছে না। এর মধ্যে বেশ কয়েক দিন আমি ফয়সলকে বলেছি, 'চল ফয়সল, তোমাকে নিয়ে নদীর পাড়ে ঘুরে আসি।'



কিন্তু ও একদিনও যেতে চায়নি।



 



একসময় আমার মনে হলো, বিষয়টি ওর বাবাকে জানানো দরকার।



ওইদিন আমার পড়ানোর কথা ছিলো না। আমি শুধু ফয়সলের বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্যে ওই বাসায় গেলাম। কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই ভদ্রলোক বললেন, 'কি ভাই, আর পড়াবেন না? অবশ্য আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না। ওকে আবার টঙ্গীতেই নিয়ে যেতে হবে।'



আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বললাম, 'ফয়সলকে কি টঙ্গীর কোনো স্কুলে ভর্তি করে দেবেন?'



আমাকে খুবই অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, 'না ভাই, ওর কপালে পড়াশোনা নেই। সম্ভবও নয়। ওকে পাঠিয়ে দেবো টঙ্গীর জাতীয় কিশোর অপরাধ সংশোধন ইনস্টিটিউটে।'



 



আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বললাম, 'এসব কী বলেন ভাই! ফয়সল কি কিশোর অপরাধী? এটা কিছুতেই হতে পারে না।'



 



ফরিদ ভাই আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমাকে বললেন : 'আপনি কিছুই জানেন না। আপনাকে কিছু বলা হয়নি। বলা উচিত ছিল। আপনি ওকে দুই সপ্তাহ ধরে পড়াচ্ছেন। এর মধ্যে ও বিভিন্ন লোকের দোকানে ও বাড়িতে দুই তিনবার চুরি করেছে। এলাকার লোকজন ওর মানসিক এ অসুস্থতার কথা জানে বলে মারপিট করেনি। পুলিশের কাছেও দেয়নি। বাড়িতে পেঁৗছে দিয়ে গেছে। এ যন্ত্রণা কত সহ্য হয়? আপনার ভাবী ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে।



ওর এই যন্ত্রণা যখন আর সহ্য করতে পারছিলাম না, তখন গত বছর ওকে ওই রিমান্ড হোমে রেখে এসেছিলাম। কিন্তু চোখের সামনে দেখলাম, কি যে অত্যাচার ওখানে করে! খাওয়া-খাদ্য নেই, কাউন্সিলিং নেই, সংশোধনের বালাই নেই। সারাক্ষণ অত্যাচার। ভাবলাম নিয়ে আসি।



ওখান থেকে নিয়ে আসতে গিয়ে দেখলাম, খুনের আসামীকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা বুঝি এতো কঠিন নয়। কত সচিব, এমপি, মন্ত্রীর দরজায় ধর্না দিতে দিতে আমি যখন আর পারছিলাম না, যখন ছেলের আশা বাদ দিয়ে দেয়ার পর্যায়ে, তখন ছেলে ছাড়া পেলো। কত দলিল-দস্তাবেজ, কত কাগজপত্র, কত দাসখত, নাকখত দিয়ে ওকে ছাড়িয়ে আনলাম। এখন আবার যেই লাউ সেই কদু। কী করবো, বলেন তো ভাই?'



 



অসাধারণ সুন্দরী মহিলা ওর মা। পোশাকপরিচ্ছদে আভিজাত্য। কথাবার্তায়ও রুচি ও মননশীল মানুষ। পাশে বসে তিনি স্বামীর আর্তনাদ শুনছিলেন।



 



আমিও তো কিশোর। ফয়সলের চেয়ে কত আর বড়। কী বলতে পারি আমি। শুধু এইটুকু বললাম, 'ভাই, ওকে যদি রিমান্ড হোমে পাঠাতেই হয় তা হলে কিছু দিন পরে পাঠান। এ সময়টা আমি ওর সঙ্গে থাকি।'



 



ভাবী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন।



আমাকে বললেন, 'ভাই, ও কোনো দিন কোনো শিক্ষকের কাছে পড়তে পারেনি। দু-একদিন পড়ার পরই বাদ দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আপনাকে ও খুব পছন্দ করে। ভাই, দয়া করে আপনি আসবেন। ওকে ছেড়ে যাবেন না। পড়াতে হবে না ভাই। ওকে শুধু একটু সঙ্গ দেবেন।'



 



এই অবস্থার জন্যে আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তবুও এই দম্পতিকে কথা দিলাম, আমি থাকবো।



 



এতদিন ফয়সলকে পড়ানোর একটা তাড়া ছিলো। বেতন বা সম্মানী যাই বলি না কেনো, সেটা জায়েজ করার একটা বিষয় ছিলো। এখন ওই বিষয়টা গৌণ।



আমি তো কিছুই বুঝি না। আমি মনোবিজ্ঞানী নই। মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। শিশুমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আমি অজ্ঞ আর অপরাধ বিজ্ঞানের অ-ও জানি না। তা হলে এই ছেলেটিকে নিয়ে আমি কী করি!



সুতরাং আমার মুখ্য বিষয় হলো, ফয়সলকে সঙ্গ দেয়া, অনেক অনেক স্নেহ করা, অনেক অনেক ভালোবাসা। এছাড়া খুব সতর্কতার সঙ্গে ওর ইচ্ছা, আবেগ ও বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেয়া। খুব মনোযোগ দিয়ে, খুব গুরুত্বের সঙ্গে ওর প্রতিটি কথা শোনা।



 



আর পড়ার সময় আমি আসলে তেমন কিছুই করতাম না। কোনো একটি অধ্যায়ের অনুষঙ্গে চলে যেতাম আড্ডায়, গল্পে, হাসিঠাট্টায়, ইয়ার্কিফাজলামিতে।



প্রথম দিকে ও একটু অবাক হয়েছে। আমার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে ওর সমস্যা হতো। কিন্তু আমি ওর আবেগের এতটাই অনুষঙ্গী ছিলাম যে, কিছুতেই যেনো ছন্দপতন না হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই ও আমার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে লাগলো।



 



আস্তে আস্তে ও আমাকে বিশ্বাস করতে শুরু করলো এবং আমার সঙ্গে নদীর তীরে বেড়াতে যেতে রাজি হলো। মানুষের ভীড় এড়িয়ে আমি ওকে নদীর পাড়ে নিয়ে যেতে লাগলম। নানা কথা আর গল্পগুজবের ভেতর দিয়ে ওর সঙ্গে আমার একটি নাড়ির বন্ধন তৈরি হতে লাগলো।



কিন্তু দুই মাস মাত্র। তার পরেই শুনলাম, ফয়সলকে ঢাকার কোনো একটি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়েছে। স্কুলটিতে খুব যত্ন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে।



 



ফয়সল ঢাকা চলে যাওয়ার পর ওই বাড়িতে আর কখনোই আমার যাওয়া হয়নি। অথচ কদম রসুল (সাঃ) মাজারের পাশ দিয়ে আমি বহুদিন যাতায়াত করেছি।



 



ফয়সলকে পড়াতে যাওয়ার পথে আলতাফ নামে একটি ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ফর্সা গোলগাল চেহারার এ ছেলেটির মুখে হালকা দাড়ি। অতি ভদ্র আচরণ। দেখতে একদম ইনোসেন্ট। সে নাকি তোলারাম কলেজে আমার ব্যাচমেট। আর্টসে পড়ে। কিন্তু কোনো দিন আমি তাকে কলেজে দেখিনি। এমনকি আসা-যাওয়ার পথেও ওর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি।



সে সময় আমি প্রচুর পড়াশোনা করি। সুধীজন পাঠাগার থেকে বই নিয়ে আসি। ধুমছে পড়ছি ফ্রিডরিখ নীটসে, সরেন কিয়ের্কের্গো, লুডউইগ ফয়েরবাক, মার্কস, এঙ্গেলস, জ্যাঁ-পল সার্ত্র। আর নিজেকে বিশাল একজন প-িত মনে করছি।



সেই সময় আলতাফ আমাকে বললো, তাদের নাকি একটি লাইব্রেরি আছে। আমি চাইলে সে আমাকে বই ধার দিতে পারে। সত্যি পরদিন সে আমার জন্যে তিনটি বই নিয়ে এলো এবং এই তিনটি বইয়ের লেখকই মাওলানা মওদুদী।



বইগুলো তার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে আমি আলতাফকে বললাম, 'ধর্ম নিয়ে আমার আগ্রহ আছে। কিন্তু মওদুদীবাদ নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নাই। আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছো।'



আর কোনো কথা না বলে ওইদিন চলে আসার পর আলতাফের সঙ্গে আর কোনো দিন আমার কথা হয়নি।



 



নবীগঞ্জে আমার একজন ক্লাসমেট ছিলো। এখন আর ওর নাম মনে নেই। সম্ভবত শফিক। বড় বোনের বাড়িতে থেকে তোলারাম কলেজে পড়তো। এইচএসসিতে ফিজিঙ্ প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় আমি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছিলাম। সম্ভবত ইসহাক তালুকদার স্যার এঙ্টার্নাল এঙ্ামিনার হিসেবে ঢাকা কলেজ থেকে এসেছিলেন। তিনি আমার প্র্যাকটিকাল খাতা নিয়ে যান। পরীক্ষা আমার প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং সবাই ব্যস্তসমস্ত হয়ে চূড়ান্তভাবে লেখাজোখাগুলো দেখে নিচ্ছে, আমি তখন দাঁড়িয়ে আছি। শফিক আমাকে জিজ্ঞাসা করে, 'মান্নান, তুই খাড়ইয়া আছিস কিলিগা? খাতা কই?'



বললাম, 'ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছিলাম। সেজন্য স্যার খাতা নিয়ে গেছেন। ক্যালকুলেটর নাকি ব্যবহার করা যাবে না।'



হাসতে হাসতে শফিক বলে, 'ওহ্, তাইলে তো তোরে এঙ্পেল করছে। এখন খাড়ইয়া থাইকা লাভ নাই। যা গা।'



কিন্তু আমি বের হয়ে গেলাম না। দাঁড়িয়েই থাকলাম। এর মধ্যে ওই প্র্যাকটিকাল ক্লাসেই স্যার ভাইভা নিতে শুরু করলেন। ডান দিক থেকে ভাইভা নিতে নিতে আমার দিকে আসছেন। আমার বুক ধড়ফড় করছিলো। ভাইভাতে কেমন করবো তার জন্য নয়, আমাকে বাদ দিয়ে স্যার চলে যান কি না তার জন্য।



এক সময় স্যার আমার সামনে এলেন এবং খুব রাগত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এই ছেলে, তোমার মাথার উপর ওটা কী।'



আমি বললাম, 'স্যার বাল্ব।'



'কত ওয়াট?'



খুব ভালো করে দেখতে চেষ্টা করলাম বাল্বটি কত ওয়াটের। কিন্তু দেখা যাচ্ছিল না। সুতরাং বললাম, 'স্যার, দেখা যাচ্ছে না। তবে ১৫০ ওয়াট হতে পারে।'



এর পর স্যার প্রশ্ন করলেন, 'ওয়াট কী?'



আমি উত্তর দিলাম এবং আরও কয়েকটি প্রশ্ন করে স্যার হাতে রাখা খাতায় কি একটু টুকে নিয়ে আমার পরের টেবিলে চলে গেলেন। আমার মনে হলো, স্যার আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।



 



কিন্তু আমার ওই বন্ধুটি নবীগঞ্জ এলাকায় রটিয়েছে যে, আমাকে এঙ্পয়েল করা হয়েছে। তবে ক্যালকুলেটর ব্যবহারের বিষয়টি মানুষের কাছে বোধগম্য না হওয়াতে দুর্নামটি ভালো বাজার পায়নি। তবুও ভাবী খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বের সঙ্গে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, ব্যাপারটা কী। আমি খুবই লজ্জিত হয়েছিলাম। এবং ভাবীকে নিশ্চয়তা দিয়েছিলাম যে, বিষয়টি ঠিক নয়।



 



আমাদের সঙ্গে বিজ্ঞান বিভাগে যারা ভর্তি হয়েছি সেই প্রায় তিনশ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একশ জনের উপরে এসএসসিতে প্রথম বিভাগ ছিলো। কিন্তু এইচএসসিতে তাদের মধ্যে মাত্র তিনজন প্রথম বিভাগ পেয়েছিল। আর পাসের হার ছিলো মাত্র ২১%। আমি কোনো রকমে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছিলাম। (কলেজের বিষয়গুলো নিয়ে পরে লিখবো)।



 



সত্তর ও আশির দশকে মতলব উত্তরের ছেলেরা নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়তে আসতো। নানাজনের বাড়িতে লজিং থেকে তাদের বিদ্যা আহরণ চলতো। পাশাপাশি চলতো ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় প্রণয়লীলা। লজিং মাস্টারের মেয়ে, চাচাতো বোন, জেঠাতো বোন, ফুফতো বোন, মামাতো বোন, শ্যালিকা ইত্যাকার কাছের-দূরের আত্মীয়াদের সঙ্গে এ প্রণয়লীলা অধিকাংশ সময় শুভ পরিণয়ের ভেতর দিয়ে সুখকর পরিসমাপ্তি ঘটতো। এর পরেও কারো পড়াশোনা হয়েছে, এমন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সংখ্যা বেশি নয়।



 



আমি নারায়ণগঞ্জ আসার সময় আমার বড় বোন পরিষ্কার বলে দিয়েছে, 'প্রেম-টেম যা ইচ্ছা করিস্, কিন্তু খবরদার বিয়ে করবি না। বিয়ে করলে তুই শেষ।'



আরেক চাচাতো বোন প্রতিবাদ করে বলেছিলো, 'আপা চিন্তা কইরেন না। এই কাউল্যারে পছন্দ করার মেয়ে এখনো হয় নাই।'



 



আমার এইচএসসি পরীক্ষা যখন দোরগোড়ায় তখন নান্নু ভাইয়ের দূর সম্পর্কের অসাধারণ সুন্দরী এক চাচাতো বোন ওই বাড়িতে এসে ওঠে। ওর নাম না বলি। আদ্দিকালের নাম। কিন্তু যৌবনের সেই উত্তাল সময়ে কোনো মেয়ের নাম যদি 'আরজিনা বেগম'ও হতো তা হলেও আমাদের মনে হতো, 'আহাহা, কি মিষ্টি নাম।' কিন্তু মনে করবেন না যেনো, আদ্দিকালের নাম বলে এ সময়ে এসে বলছি না। বরং কৌশলগত সমস্যা আছে। তবুও একটি নাম দিয়ে কথা বললে সুবিধা হয়। ধরা যাক ওর নাম কেয়া।



গায়ের রং দুধে-আলতায়। সেই রঙের সঙ্গে মিশে আছে বিস্ময়কর লাবণ্য আর পেলবতা। মাঝারি লম্বা মেয়েটির মাথার চুল বিপুল জলরাশির ঝর্ণার মতো নেমে গেছে হাঁটু অবধি। অধিকাংশ সময় উজ্জ্বল গোলাপি রঙের পোশাক পরে। পোশাকপরিচ্ছদে মার্জিত ও রুচিশীল। কিন্তু মুখে রা নেই। সারাক্ষণ বড় ঘরে থাকে। টুকটাক কাজ করে আর যতো কথা বলে সুমন ও লিটনের সঙ্গে। ওরা দুইজন ওর জান। দু-একবার আমি ওকে উঠানে হাঁটতে দেখেছি। আমার মনে হয়েছে, মেয়েটি খুব লাজুক, বিনম্র ও সংকোচপ্রবণ। পৃথিবীর কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস ওর নেই।



 



পরীক্ষা নিয়ে আমার 'আরজিনা-পাগল' অবস্থা। না পড়লে ভালোই থাকি। কিন্তু পড়লেই মনে হয় কিছুই পড়িনি। সুতরাং কেয়াকে নিয়ে চিন্তা করার বিন্দুমাত্র ফুরসৎ আমার নেই। সেও কখনোই আমার ঘরের সীমানার মধ্যে আসেনি। এবং অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এ যে, ওই মেয়েটির সঙ্গে আমার কুশল বিনিময় পর্যন্ত হয়নি। আমি জানি না যে মেয়েটির বাড়ি কোথায়, সে কেনো এখানে থাকছে, তার পড়াশোনার কী অবস্থা। এবং এসব নিয়ে কারো সঙ্গে আগ্রহ প্রকাশ কারার ইচ্ছাও আমার নেই। আমি আছি পরীক্ষা শেষ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার চেষ্টায়।



 



এই সময় ভাবীকে দেখি বেশ বিমর্ষ থাকেন। সারাক্ষণ হাসিখুশি মানুষটি চুপ হয়ে গেলেন। আবার অল্পতেই ছেলেদের সঙ্গে রেগে যান। নান্নু ভাই আগের মতোই হাসিঠাট্টা করেন। কিন্তু ভাবীর পক্ষ থেকে তেমন সাড়া পান না। ফলে তিনি বিব্রত হয়ে থেমে যান। দাম্পত্য জীবনে কত রকম ঝামেলা হতে পারে। ওইসব নিয়ে অন্য পক্ষের চিন্তা করা শোভন নয়। ফলে ভাবীর এই ভিন্নধর্মী অচরণের ব্যাপারে আমি কিছু জানতে চাইনি কখনোই। এভাবেই বেশ কিছুদিন চলে যাওয়ার পর একদিন ভাবী এসে আমার ঘরে বসে আলাপ করার পরিবেশ তৈরি করতে চাইলেন। কিন্তু দুদিন পরেই আমার পরীক্ষা শুরু হবে। সুতরাং দ্রুত বিদায় করার জন্য বললাম, 'ভাবী, কিছু বলবেন?'



ভাবী বললেন, 'ভাই একটা কথা বলি, আপনি কি কেয়াকে নিয়ে কিছু ভাবছেন?'



আমার তো আকাশ থেকে পড়ার যোগার।



আমি বললাম, 'না তো ভাবী। ওর সঙ্গে আজ পর্যন্ত আমার কুশল বিনিময়টুকুও হয়নি। ওকে নিয়ে আমি কী ভাববো। এছাড়া দুই দিন পরে আমার পরীক্ষা। এই সময় অপনি এ ধরনের কথা কেন বলছেন ভাবী?'



'মাপ করবেন ভাই। এমনিতেই বলছি। কিছু মনে করবেন না। আর আপনার ভাইকে কিছু বলবেন না।' বলে তিনি চলে গেলেন।



 



ওই ছোট্ট জীবনে কতরকম পরিস্থিতির মধ্যে আমি পড়েছি। চিন্তা করে করে সেই সব প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি এবং অতিক্রম করেছিও। কিন্তু এই পরিস্থিতিটা আমাকে প্রথম চিন্তার মধ্যে নয়_দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমি অনুভব করি যে, দুশ্চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পরীক্ষাটা শেষ করতে হবে এবং এই নতুন পরিস্থিতিটাকে কিছুমাত্র পাত্তা দেয়া চলবে না।



প্রত্যেকটি পরীক্ষা শেষ হচ্ছে আর আমি হাঁফ ছেড়ে যেনো বাঁচছি। আমার পরীক্ষা যখন একদম শেষ পর্যায়ে, ঠিক সেই সময় মেয়েটি আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে বললো, 'ভাই কেমন আছেন?'



আমি একটু অবাক হলাম এবং কিছুটা বিব্রত।



বললাম, 'জি, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?'



আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সে বলল, 'ভাই, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। শুনবেন?'



আমি বললাম, 'নিশ্চয়ই। তবে আমার আর দুটি পরীক্ষা আছে। শেষ হোক।'



কেয়া চলে গেল। ওর সঙ্গে আর কখনোই আমার কথা হয়নি।



 



তখন আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। আলবেরুনী হলের ২০৬ নম্বর রুমে থাকি। সেই সময় কেয়ার একটি চিঠি পেলাম। নান্নু ভাইয়ের বাড়ি থেকে বিদায় নেয়ার প্রায় ছয় মাস পরে। ওই চিঠিতে কেয়া আমার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছে এবং তার ওই ছোট্ট জীবনে কত বড় যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছিল, তার বিবরণ তুলে ধরেছে। চিঠিটি পড়ে কেয়ার প্রতি গভীর স্নেহ ও মমতায় আমার চোখে জল এসে পড়ে।



ওই চিঠিতে উত্তর লেখার কোনো ঠিকানা ছিলো না। ঠিকানা থাকলেও হয়তো কোনো দিনই উত্তর লেখা হতো না। দূর থেকে দেখে দেখে আমাকে কেয়া যতটুকু চিনেছে, তাতে ঠিকানা দিয়ে চিঠি না পাওয়ার কষ্টটুকু নিতে চায়নি। ওই বুদ্ধিটুকুর জন্যে আজও ওকে আমি স্মরণে রেখেছি। কেননা, উত্তর লেখার দায় থেকে ও আমাকে মুক্তি দিয়েছিলো।



 


করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ২,২৩,৪৫৩ ১,৬২,২০,৯০০
সুস্থ ১,২৩,৮৮২ ৯৯,২৩,৬৪৩
মৃত্যু ২,৯২৮ ৬,৪৮,৭৫৪
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪১৮৩১৭৯
পুরোন সংখ্যা