চাঁদপুর। শুক্রবার ৩ নভেম্বর ২০১৭। ১৯ কার্তিক ১৪২৪। ১৩ সফর ১৪৩৯

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩১-সূরা লোকমান


৩৪ আয়াত, ৪ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৬। হে বৎস! ক্ষুদ্র বস্তুটি যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং উহা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মৃত্তিকার নিচে, আল্লাহ তাহাও উপস্থিত করিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত।


১৭। হে বৎস! সালাত কায়েম করিও, সৎ কর্মের নির্দেশ দিও আর অসৎ কর্মে নিষেধ করিও এবং আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ করিও। ইহাই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


একজন লোকের জ্ঞানের পরিধি তার অভিজ্ঞতা দ্বারা খন্ডায়িত করা যায় না।                


                                      -জনলক।


 


মানবতাই মানুষের শ্রেষ্ঠতম গণ।


 

রূপকুমার
মাহবুব রেজা
০৩ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

কখনো কখনো বাবাকে হিমালয় পাহাড়ের চেয়েও বড় মনে হয়। কখনো কখনো আবার মনে হয়, বাবা বুঝি তারও চেয়ে বড়। ধ্রুব বাবাকে সব সময় ও রকমই মনে করে। শুধু কি মনে করে! সে বলেও বেড়ায়। ধ্রুব মাকে বলে, জানো মা, আমার বাবা আকাশের চেয়েও বড়। ধ্রুবর কথায় মা কিছু বলেন না। হাসেন। মাথা নেড়ে সায় দেন, সে কথা কি আর বলতে! ধ্রুর ওর ছোট বোন সুখলতাকেও একই কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলে, জানিস, আমার বাবা না এত্ত বড় বলার সময় ধ্রুবর দুই হাত দুই দিকে চওড়া হয়। অনেক চ-ও-ড়া। ধ্রুবর কথা শুনে সুখলতা কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ কুঁচকে জবাব দেয় এই ছেমরা, আমার বাবাটা কি শুধু তোর একার? বলে সুখলতা ধ্রুবকে ভেংচি কাটে, আ-মা-র বা-বা না এ-ওডা ব-ড়, যা ভাগ। সুখলতা রেগে গেলে ধ্রুবকে ছেমরা বলে ডাকে। সুখলতার কাছে ছেমরা ডাকটা শুনলে ধ্রুবর মনে হয়, সে যেন রাতারাতি অনেক বড় হয়ে গেছে। সুখলতার কাছে এ ডাকটা শুনলে ধ্রুবর খুব ইচ্ছে করে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে সে তার বাবার মতো বড় হয়ে উঠবে আর বাবার মতো বড় হলে কী মজাই না হবে!বন্ধুদের সঙ্গে ধ্রুব বাবার বিষয়ে খুব একটা কথা বলে না। ধ্রুব বন্ধুদের হাবভাব বোঝে। মোস্ত ধ্রুবর খুব ভালো বন্ধু। ধ্রুবরা ওকে মোস্ত বলে খেপায়। মোস্তর মাথায় বুদ্ধিও ভীষণ। ক্লাসে সবাই ওকে চিকন মাথার মোস্ত বলে ডাকে।চিকন মাথা মানে? ব্যাপারটা ধ্রুব বুঝতে পারল না। মাকে চিকন মাথার ব্যাপারটা বলতেই মা বললেন, চিকন মাথা মানে শিয়াল মাথা।

শিয়াল মাথা মানে!

ওমা! এটাও বুঝিস না? এখন দেখছি তোরই মোটা মাথা!

তারপর ধ্রুবর কাছে চিকন মাথার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেছে।

সেই চিকন মাথার মোস্ত ধ্রুবকে একদিন ক্লাসের বাইরে নিয়ে গলা নামিয়ে বেশ বুঝিয়েছে। শেষে বলেছে, ধ্রুব ক্লাসে এসব নিয়ে অন্যদের সঙ্গে কোনো কথাটথা বলবি না, বুঝলি?

যে যা-ই বলুক, ধ্রুবর কাছে ওর বাবা অনেক বড়। বাবা যখন ঘরে থাকেন, ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। সবাই চুপচাপ থাকে। মায়ের গলা তখন শোনাই যায় না। ধ্রুব আর সুখলতা নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা করে। হাতের লেখা করে। ভূগোল পড়ে। পরিবেশ পরিচিতির পাতা চিবিয়ে খায়। বাড়িতে ছোট মামা কিংবা মেজো চাচা এলে তাঁরাও যেন একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মিনমিন করে কথা বলেন, যেন বাবার কাছ অবধি শব্দ না যায়। উনারা যখন কথা বলেন তখন ধমক দিয়ে বলেন, পুরুষ মানুষ, কথা বলবি স্পষ্ট করে, তা না, তোরা মিনমিন করে কী যে বলিস? কিছুই শুনি নাত্ম রেইজ ইউর ভয়েজ বলে বাবা ছোট মামা আর মেজো চাচাকে অভয় দেন। তাতেও কোনো কাজ হয় না। তাঁদের গলা চওড়া হয় না। তাঁরা আগের মতো মিনমিন করে কথা বলতে থাকেন। আর বাবা যখন অফিসে থাকেন, মা তখন পুরো বাড়িটাকে ফেরিওয়ালার মতো মাথায় তুলে রাখেন।

ধ্রুবর কাছে বাবা যে রকম অ-নে-ক বড় মানুষ, তেমনি বাবা আবার অ-নে-ক রাগী মানুষও। বাবা অবশ্য ধ্রুব আর সুখলতার সঙ্গে কখনো রাগ করে কথা বলেন না। অফিসে যাওয়ার আগে বাবা ধ্রুবদের আদর করেন। পড়াশোনার খোঁজখবর নেন। বাড়ি ফেরার পথে ওদের জন্য কিছু আনতে হবে কি না তা-ও জিজ্ঞেস করেন। ধ্রুবরা মায়ের শেখানো জবাব বাবাকে শুনিয়ে দিয়ে বলেত্মনা, না, আমাদের কিছু লাগবে না।

বাবা ঘরে না থাকলে মা ধ্রুবদের বুঝিয়ে বলেন, মাস শেষে তোদের বাবার গোনা টাকা-পয়সা। ছোট চাকরি, তার ওপর কত দিন হলো বেচারার প্রমোশনটাও হচ্ছে না। দেখিস না, তোর বাবা কত কষ্ট করে সংসার চালান। এর মধ্যে তোরা যদি এটা-সেটার বায়না ধরিস, তাহলে চলে!

মায়ের কথায় ধ্রুবর কষ্টও লাগে বাবাটার জন্য।

দুই.

ধ্রুবর আজ খুব খুশির দিন। কত দিন সে বাবার কাছে বায়না ধরেছে বাবার অফিসে যাবে। ধ্রুবর কথায় বাবা প্রথমটায় রাজি হননি। পরে মা কয়েকবার বলায় বাবা নরম হয়েছেন। মাঝেমধ্যে বাবা মায়ের কথা বেশ শোনেন। বাবা আজ ধ্রুবকে অফিসে নিয়ে যাবেন। বাবার অফিসে যাবেত্মএই আনন্দে গতকাল থেকে ধ্রুব প্রজাপতির মতো হাওয়ায় উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল, ভেসে বেড়াচ্ছিল।

বাবার সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে, বাসে চড়ে গুলিস্তানে এসে নেমে ধ্রুব ভারী অবাক বনে গেল। ধ্রুব দেখল, চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। সকালবেলার রোদ বেশ তেতে মাথার ওপর এসে পড়েছে। বাবার মুখে খানিকটা রাগ। বিড়বিড় করে বলছেন, আজ একটু দেরি হয়ে গেল। ঠিকমতো বাসও পাওয়া যায়নি।

বাবা ধ্রুবর হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে অফিসে এসে ঢুকলেন। বিশাল বড় বিল্ডিং। ধ্রুব গুনে গুনে দেখল আটতলা। বাবার অফিস এত বড়! বিল্ডিংয়ের নিচতলায় লিফটের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল ধ্রুব। বাবা বললেন, এটা লিফট। ওপরে ওঠানামা করে। যখন এর ভেতরে ঢুকবি তখন ভয় পাসনে। দরজার পাশে লাল রঙে দ্রুত নম্বর বদলাচ্ছে। ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক। দরজা খুলে গেল। বেশ কয়েকজন মানুষ গাদাগাদি লিফট থেকে বের হয়ে গেল। ধ্রুবরা দ্রুত লিফটের ভেতর ঢুকল। লিফটের দরজা আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেল। ধ্রুব তো ভীষণ অবাক! ছোট ঘরটা তরতরে করে ওপরে উঠে যাচ্ছে! লিফটের দরজা পাঁচতলায় এসে হাঁ হয়ে গেলে বাবা ধ্রুবকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন।

যে-ই ধ্রুবকে দেখে সে-ই মনে মনে ভাবে, অমলকুমার প্রামাণিকের সঙ্গে ফুটফুটে এই ছেলেটা কে? কেউ জিজ্ঞেস করলে অমলকুমার প্রামাণিক বিনীতভাবে জবাব দেয়, আমার ছেলে রূপকুমার প্রামাণিক। ধ্রুব মনে মনে বাবার ওপর রাগ করে, রূপকুমারের সঙ্গে ডাকনামটা বললে কী এমন ক্ষতি হয়!

বেশ বড় একটা ঘর। চারটা টেবিল। টেবিলের সামনে দুটো করে চেয়ার। আর টেবিলের ওপর রাজ্যের কাগজপত্র। দলিল-দস্তাবেজ। অফিসঘরে ঢুকতেই কালোমতো একটা লোক গলা চড়িয়ে দিয়ে প্রায় ধমকের সুরে অমলকুমার প্রামাণিক বলে উঠল। অমল, অফিসে এত দেরি করে এলে কি চলে? স্যার, তোমাকে খুঁজছেন। যাও, তাড়াতাড়ি স্যারের রুমে যাও।

অমলকুমার প্রামাণিক একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। তিনি ধ্রুবকে ঘরের কোনায় রাখা একটা টুলে বসিয়ে রেখে দ্রুত ছুটে গেলেন স্যারের ঘরের দিকে। যে লোকটা বাবাকে অমন করে কথাগুলো বলল, সে ধ্রুবকে দেখে। লোকটা ধ্রুবকেও একই সুরে জিজ্ঞেস করল, অমল তোমার কী হয়?

ধ্রুবর মনে হলো সে লোকটার কথার কোনো উত্তর দেবে না। ধ্রুব গলা নামিয়ে উত্তর দিল। লোকটা চোখ বড় বড় করে ধ্রুবর দিকে তাকিয়ে থাকল। লোকটার চোখমুখে একটা অবিশ্বাস।

ধ্রুব যতক্ষণ বাবার অফিসে ছিল ততক্ষণই সে খেয়াল করেছে। বাবা শুধু অফিসের সবার হুকুম পালন করে যাচ্ছেন। এক মুহূর্ত ফুরসত নেই বাবার। এই ফাইল নিয়ে ওই টেবিলে যাচ্ছেন। পাশের ঘর থেকে কেউ বাবাকে বলছেন, এটা লাগবে, ওটা লাগবে। অমনি বাবা হুড়মুড় করে দৌড়ান। আরও একটা ব্যাপার ধ্রুব খেয়াল করেছে, অফিসের কেউ বাবাকে কোনো কথা বললে বাবা মিনমিন করে তার জবাব দিচ্ছেন। বাবার মিনমিনে গলা শুনে ধ্রুবর ছোট মামা আর ছোট কাকার কথা মনে পড়েছে।

তিন.

অফিসে এর-তার হুকুম তামিল করতে করতে বাবা হয়রান হয়ে গেলেন। দুপুরের দিকে সবাই খেতে গেলে বাবা ধ্রুবর জন্য কলা, বিস্কুট আর একটা জুস নিয়ে এলেন। বাবা ধ্রুবকে বললেন, আজ অফিসে কাজের খুব চাপ বুঝলি। এই দেখ না সবাই শুধু আমাকে ডাকে। আমি এক দিন অফিসে না এলে সবাই অচল। বলে বাবা ধ্রুবকে দ্রুত খেয়ে নিতে বললেন।

ধ্রুব মন খারাপ করে মাথা নিচু করে টুলে বসে আছে। ফাঁকা অফিসঘর। অফিসঘরের সব ফ্যান ঘুরছে। ধ্রুব বাবাকে বলল, বাবা, আমার ভালো লাগছে না। আমি বাড়ি যাব।

আমি এখন তোকে নিয়ে কীভাবে বাড়ি যাব? আমার অফিস আছে না? বাবার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা।

ঠিক এমন সময় অফিসঘরের পেছনের দরজার কাছ থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। অমল সাহেব, আজ আপনার ছুটি। আপনি ছেলেকে নিয়ে বাড়ি চলে যান।

অমলকুমার প্রামাণিক দেখলেন, দরজা আগলে তাঁর বড় স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে একটা হাসি। সেই হাসিতে ধ্রুবর মন ভালো হয়ে গেল।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৮০৬২
পুরোন সংখ্যা