চাঁদপুর। শনিবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭। ১৫ আশ্বিন ১৪২৪। ৯ মহররম ১৪৩৯

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩০-সূরা রূপ 


৬০ আয়াত, ৬ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৬। ইহা আল্লাহরই প্রতিশ্রুতি; আল্লাহ তাঁহার প্রতিশ্রুতি ব্যতিক্রম করেন না, কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।


৭। উহারা পার্থিব জীবনের বাহ্য দিক সম্বন্ধে অবগত, আর আখিরাত সম্বন্ধে উহারা গাফিল।     


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


প্রত্যেক মানুষের ভিতরেই একটা শিল্পীমন ঘুমিয়ে আছে।


                                 -বেকন।


দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞনচর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করো।


 

শুভ শক্তির প্রতীক দেবী দুর্গা
হাশিম প্রধানীয়া
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


দুর্গা দেবীর আগমন বার্তাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় অধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম যুদ্ধ। এ যুদ্ধে দুর্গা অসুর বধ করে, অন্যায়কে দূর করে শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।



শরৎ আসে হালকা চপল ছন্দে। এসেই মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলায় মাতে। গাছের পাতায় পাতায় ঝকঝকে রোদের ঝিলিক, ভরা নদীর পূর্ণতা, নদী চরে ফুটে থাকা অজস্র কাশফুল, শিউলি ফুল। আর সারা আকাশ জুড়ে তুলোর মতো শুভ্রমেঘথএসবই জানিয়ে দেয় শরৎ এসে গেছে।



বছরে দুবার দুর্গোৎসব হয়ে থাকে। একবার ঋতুরাজ বসন্তের সময় শ্রী রামচন্দ্র কর্তৃক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের শরৎকালই শ্রেষ্ঠ ঋতু। প্রকৃতি এই সময়ে এক অপূর্ব শোভা ধারণ করে। কৃষি প্রধান দেশে তখন চাষের কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসে। সদ্যস্নাতা ধরণী যেন হাসতে থাকে, বাঙালির উৎসব করবার এইতো প্রকৃত সময়।



শরৎকালে প্রথম পূজা করেছিলেন রামচন্দ্র। ত্রেতা যুগে শ্রী রামচন্দ্র রাবণ নিধনের জন্য অকালে বোধন করে সে চ-িকার আরাধনা করেন, তা-ই লোক সমাজে বিশেষ রূপে পালিত হয়ে থাকে। মার্কন্ডেয় পুরাণে আছে, দুর্গাদেবী দানবরূপী অসুর বিনাশের জন্য পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। দানব অধিপতি মহিষাসুর তার প্রবল শক্তিধর সৈন্য সিপাহীবাগ সমূলে পরাজিত হয়ে নিধন হয়েছিলেন।



শরৎকালীন দুর্গাপূজা আমাদের দেশে সমধিক প্রসিদ্ধ ও পালিত। এই সময়ে প্রকৃতি অপরূপ সাজে সজ্জিত থাকে। নীল আকাশে সাদা মেঘ পাল তুলে যেন ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায়। সর্বত্র শ্যামল সবুজের সমারোহ থাকে। নদীগুলো ছোট ছোট ঢেউয়ের তরঙ্গ সাজিয়ে বয়ে চলে। বিশ্ব ঝুথিকা, শেফালিকা, কাশ প্রভৃতি কুসুম মালায় সজ্জিত হয়ে তার যৌবন মেলে ধরে যেন হাসতে থাকে। প্রভাতের শিউলি আর শিশির মনে জায়গা করে এক অপূর্ব সজীবতা। তারা যে মা আনন্দময়ীর আগমন বার্তা ঘোষণা করতে থাকে। প্রবাসী, ছাত্র, শিক্ষক, চাকুরে, সবাই গৃহে ফিরে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য আকুল আগ্রহে ছুটে আসে। স্কুল, কলেজ, অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যায়। সর্বত্রই যেন একটা আনন্দের কর্মচঞ্চলতা। দোকানে ভিড়। রাস্তায় যানবাহনে ভিড়। পত্র-পত্রিকাগুলো শারদীয় বিশেষ আকর্ষণ প্রকাশ করে। বাঙালি-হিন্দু এই উৎসবের আনন্দে নিজেকে উজাড় করে দেয়। সর্বত্রই আনন্দ আর আনন্দ।



 



ক্রমে শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নাময়ী রজনীর উদয় হয়। শরতের সানাই বেজে উঠে। বেজে উঠে অজস্র ঢাক-ঢোল। পুরুহিত ষষ্ঠী সন্ধ্যায় মায়ের বোধনকার্য সমাধা করে অধিবাস পূজা সমাপ্ত করেন। রজনী প্রভাত হলেই দেবীর সপ্তমী পূজা আরম্ভ হয়। দুর্গাপূজা পাঁচদিনে সমাপ্ত হয়। ষষ্ঠীতে মায়ের বোধন, তারপর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।



পূর্বে দুর্গা পূজায় বলিদানের প্রথা ছিল। আজিকার দিনেও বহুস্থানে ছাগল, মহিষ ইত্যাদি দেবীর নামে উৎসর্গ করা হয়। নবমীর দিনে প্রসাদের ঘণ্টা পড়ে যায়। বাঙালি ভোজন, নিমন্ত্রিত ভোজন প্রভৃতিতে চারদিক মাতোয়ারা হয়। এই দিনই শেষ পূজার দিন। দশমীর দিন দেবীকে বিদায় দেবার দিন। দিনান্তে শোভাযাত্রা করে মহানন্দে দেবীর বন্দনা গেয়ে বিদায়কালে দেবীকে সন্তুষ্টি করে ভক্তরা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে মহোল্লাসে নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে দেবীকে বিসর্জন দেয়। এই বিজয়ার দিনেই দেবী মহিষাসুর রূপী মহাদানবকে ধ্বংস এবং বধ করে বিশ্বকে শঙ্কা মুক্ত করে যান।



বিসর্জনের পর আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, শত্রু-মিত্র, হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ, পূর্ব বৈরিতা ভুলে গিয়ে পরস্পর আলিঙ্গনবদ্ধ হয়। নতুন করে সখ্যবন্ধনে পরস্পর পরস্পরকে বেঁধে লয়। তাকেই বিজয়া বলা হয়। বিজয়া পরম প্রীতির প্রতীক উৎসব। আবার এক বছর পর দেবীর পুনরুত্থান ঘটবে। এই এক বছরে যত দানব-দানবীর অশুভ আবির্ভাব ঘটবে, অশুভ শক্তির মহড়ায় পৃথিবী আবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠবে। এদের সব অত্যাচার সহ্য করে মানুষ দেবীর আগমনের অপেক্ষায় থাকবে। দুর্গোৎসবে মহামায়া মহাশক্তি পরিবার বর্গসহ মত্র্যে আগমন করেন। সর্বমূল দায়িনী কমলা, সঙ্গীত প্রিয়া বীণাপাণি, সিদ্ধিদাতা গজানন, গণেশ, দেবসেনাপতি কার্তিকের সহচররূপে সমাগম করে থাকেন। মধ্যস্থলে মা দুর্গা দশ হাত প্রসারিত করে দ-ায়মান। বাম পদতলে সিংহ ও দক্ষিণ পদতলে মহিষাসুর। মাথার উপরে চালচিত্রে অঙ্কিত থাকে মহাদেব। গণেশের পাশে কালা বউ। কার্তিকের বাহন ময়ূর, গণেশের বাহন মুষিক, লক্ষ্মীর বাহন ময়ূর, গণেশের বাহন মুষিক, লক্ষ্মীর বাহন পেচক ও সরস্বতীর বাহন সাদা হাঁস। দুর্গাদেবী দশহাতে প্রসারিত করে রণউন্মাদনায় রণরঙ্গিনীর বেশে দশ হাতে অস্ত্র নিয়ে পাপরূপী অসুরকে বধ করতে উদ্ধত হয়। অসুর বধ করে দেবী রণউল্লাসে ফেটে পড়েন। দেবী অসুর বধের মধ্য দিয়ে দেবতাদের স্বর্গ রাজ্য ফিরিয়ে দেন।



অবশেষে দেবীর বিদায়ের সুর বেজে উঠে। দুর্গার বিদায়ের সময় আসে। বিজয়া দশমীর দিনে মন বিষাদ কালিমায় আচ্ছন্ন হয়। আগমনী গানে যেমন করে চারিদিক মুখরিত হয়েছিল, তেমনি বিসর্জনের বাজনায় ভক্ত হৃদয় বিষাদে হুহু করে কেঁদে উঠে। বিদায়ের বেলায় বাঙালি দেবীকে বলে দেয়থ 'গুচ্ছ গুচ্ছ পরস্থানং পরমেশ্বরী।



সংবৎসর ব্যতিতে তু পুনরাগমনায়চ'।



পরমেশ্বরী তুমি পরম স্থানে যাও আবার সংবৎসরে ফিরে এসো। এই আশায় বাঙালি হিন্দু সমপ্রদায় একটি বছরের জন্য আশায় বুক বাঁধে। আজকের বিজয়ার এই দশমীর দিনে মুসলিম বিশ্বের মহররমের বিষাদময় স্মৃতির প্রাক্কালে দুর্গাদেবীর বিসর্জনের শুভক্ষণে আমি জানাই সর্বস্তরের পূজারী, দেবীর ভক্তবৃন্দ, সকল হিন্দু ভাই-বোনদেরকে আমার শারদীয় প্রীতি ও শুভেচ্ছা।



লেখক পরিচিতি : লেখক, সমালোচক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক, অধ্যাপক পাড়া, চাঁদপুর।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৯৫১৬
পুরোন সংখ্যা