চাঁদপুর। মঙ্গলবার ২১ আগস্ট ২০১৮। ৬ ভাদ্র ১৪২৫। ৯ জিলহজ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু’মিন

৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৫৭। মানুষের সৃষ্টি অপেক্ষা নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের সৃষ্টি কঠিনতর। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ বোঝে না।

৫৮। অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়, আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং কুকর্মী তোমরা অল্পই অনুধাবন করে থাকো।

৫৯। কেয়ামত অবশ্যই আসবে, এতে সন্দেহ নেই; কিন্তু অধিকাংশ লোক বিশ^াস স্থাপন করে না।

৬০। তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।      

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


যার বশ্যতার মধ্যে তোমার স্বার্থ নিহিত, তার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ো না।        

-এরিস্টিটল

 


যে নামাজে হৃদয় নম্র হয় না, সে নামাজ খোদার নিকট নামাজ বলিয়াই গণ্য হয় না।


ফটো গ্যালারি
ঈদ স্পেশাল
সাইফুল ইসলাম জুয়েল
২১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


এবার কোরবানির আগে থেকেই ঈদের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে পান্না। একেতো শ্বশুর বাড়িতে প্রথম ঈদ, তার উপর বিয়ের দেড় বছর পর এবার দেশে আসছে সেলিম। সেলিমের সাথে পান্নার বিয়ে হয় এক বছর সাত মাস আগে, বিয়ের দুইমাসের মাথায়ই পান্নাকে রেখে সুদূর সৌদি আরবে পাড়ি জমায় সেলিম। এরপর দুইবার আসি আসি করেও শেষ মুহূর্তে আর আসতে পারেনি সেলিম। তবে এবার সব নিশ্চিত, অগ্রিম টিকিটও কেটে রেখেছে সেলিম। তাইতো ঈদ নিয়ে এতটা খুশিতে আছে পান্না। হানিমুনটাও এই ছুটিতে সেরে ফেলবে বলে, মনে মনে ঠিক করে রেখেছে পান্না। সব প্লানও করে রেখেছে ও, সেন্টমার্টিনেই যাওয়ার ইচ্ছা ওর। রাতের গল্পে সেলিমকেও সব বলে রেখেছে পান্না। এক কথায় এবার ঈদে পুরো আদাজল খেয়েই নেমেছে ও। এক মাস আগে থেকেই তাই রান্নাঘরে আনাগোনা বেড়ে গেছে পান্নার। রান্নায় গোপনে গোপনে টমি মিয়ার বইয়ের দু-একটা আইটেম যে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে না তাও নয়। হাজার হোক শ্বশুর বাড়িতে প্রথম ঈদ। নতুন বৌয়ের খোলসে আর কয়দিন।



শ্বশুর বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ি ছাড়াও এক ননদ নিয়েই ঝড়ের বেগে সময় কেটে যায় ওর। ননদটাও একটা শয়তানের একশেষ। জীবনেও রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় না। আর কাজের বুয়ার হাতে রান্না সহ্য করতে পারে না ও। তাই বাধ্য হয়েই সব একহাতে করতে হয় পান্নার। পান্না মনে মনে বলে, যাও মহারাণী, একবার বিয়ে হয়ে বিদায় হও। তারপর দেখবো তোমার আয়েশগিরি। এভাবেই দিন কাটে পান্নার, খুনসুটি আর সংসারটাকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টায় সময়ের খেয়াল থাকে না ওর। দিনের ক্লান্তির শেষে রাতে তো আছেই মহারাজ, রাতের ঘুম হারাম করে সেলিমের সাথে জমে ওঠে রাতগল্প, কখনোও বা কম্পিউটারের স্ক্রীনে আবেগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তাতে কি আর আশা মিটে...! সামনে থাকার আবেগটাই অন্যরকম, আলাদা এক অনুভূতি, আলাদা এক শিহরণ লাগে অস্তিত্বে। রাতজুড়ে চলে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথার খই ভাজা, কখনোও বা ফজরের ওয়াক্তে গিয়ে শেষ হয় খইয়ের স্টক। দূরত্বের এই প্রতিযোগিতাও হার মানে কাছে থাকার আকুলতার কাছে।



দিন গুণে পান্না, অপেক্ষার শেষ বা খুশির আগমনের। দেখতে দেখতে ঈদের আর পনরো দিন বাকি, যতো দিন যায় ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালিতে তারিখের ঘরে ছোবল বসায় পান্না। অপেক্ষার মাঝেও এক ধরনের ভালো লাগা আছে। বেঁধে দেয়া সময়ের অপেক্ষা যেনো অসীম অপেক্ষা থেকেও ভয়ঙ্কর। এই অপেক্ষায় এক ধরনের মুগ্ধতা, এক ভালোবাসা যে মিশে থাকে। এর মধ্যেই শপিং শুরু করে দিয়েছে পান্না। পুরো লিস্ট করে শপিং, বাবা মা, শাশুড়ি, ননদ, মামা, বড় আপা, ভাগ্নে, ভাগ্নী কেও বাদ যায়নি লিস্ট থেকে। সবার দিকেই ষোলআনা খেয়াল রেখেছে ও। এর মধ্যে আবার লুকিয়ে সুকিয়ে হানিমুনের শপিংটাও সেরে ফেলতে হচ্ছে। ওর ননদটাও কেমন যেনো, খালি ছুঁক ছুঁক করে। বারবার গিয়ে শপিংয়ের ব্যাগ খুলে এক চোরা দৃষ্টিতে তাকায়। ওর কাছ থেকে লুকিয়েই হানিমুনের শপিংটা করছে পান্না। এখনি কি শ্বশুর বাড়িতে বলা যাবে হানিমুনের ব্যাপারে, নতুন বৌ হলে না হয় একটা কথা ছিলো। এতোদিনে তো একটু লজ্জা করাই উচিত। সেলিম আসলেই সব জানানো যাবে।



উফ্, সময় যত ঘনিয়ে আসছে দম বন্ধ হয়ে আসছে পান্নার, এইতো আর মাত্র সাতদিন। ঈদের চারদিন আগে আসবে সেলিম। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে পান্না, নিজেদের জন্যে কেনাকাটা সেলিমকে সাথে নিয়েই করবে। দোকানে শাড়িও দেখে এসেছে ও, নীল জমিনের উপর সাদা সাদা পাথর বসানো। কিন্তু কিনেনি ও, সেলিমের সাথে কিনবে বলে রেখে এসেছে। সেলিমের জন্যে পাঞ্জাবিও দেখে এসেছে গোটা কয়েক। অবশ্য সেলিম বলেছে সৌদিআরব থেকেই এবার শপিং করে আনবে। তারপরও প্রথম ঈদ বলে কথা। ইস্, বিয়ের আগেই কত ভালো ছিলো। কি সুন্দর পছন্দ হলেই ফট ফট করে কিনে ফেলা যেতো। এখন আবার আরেকজন লাগে। কীভাবে যেনো মিশে যায় মানুষগুলো, পুরোটা জুড়েই দখল করে নেয়। পুরোটা অস্তিত্বে যেনো জানান দিয়ে যায় আমি আছি। ভাল্লাগে না পান্নার। কত্ত দায়িত্ব, কত্ত ঝামেলা, চিন্তা, বৌ হয়ে আসলেই শান্তি নাই, দম ফেলারও সময় নাই, মনে মনে ভাবে পান্না। ঠোঁটের কোণে এক ঝলক বাঁকও খেলে যায় অজান্তেই।



কাল রাতেই প্লেনে উঠবে সেলিম, তারপর আর ২২ ঘণ্টা। কেমন একটা ছটফট করছে পান্না। আজকে রাতে প্লেনে উঠার আগে ফোন দিয়ে উঠবে সেলিম। পান্না সেই সাতটা থেকে ফোন নিয়ে বসে আছে, রান্না করার সময় একবারের জন্যেও ফোনকে চোখের আড়াল হতে দেয়নি ও। এতক্ষণে তো ফোন আসার কথা, দুশ্চিন্তা হয় পান্নার। কিছু হলো না তো আবার। এর আগেও এভাবে দুইবার শেষ মুহূর্তে টিকিট বাতিল করেছে সেলিম। দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে পান্নার। অজানা শঙ্কা, অজানা ভয় নিয়ে বসে থাকে মেয়েটা। ওই, ওই তো ফোন বাজলো। দৌড়ে ফোনটা ধরে পান্না। সেলিমের গলাটা স্তিমিত লাগছে, ভয় হয় ওর। এবারো কি তাহলে... হুম, এবারো আসতে পারবে না সেলিম, অফিসের একজনের ছুটিতে কাজ করে দিতে হবে সেলিমের। এতো কিছু বুঝতে চায় না পান্না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে ওর। গলাও ধরে আসে খানিকটা। চেষ্টা করে স্বাভাবিক থাকতে, তবুও পারে না। হুট করে ফোন রেখে রান্নাঘরের দিকে যায় ও। সব প্লান, সব শপিং, সব স্বপ্ন, ভালো লাগার অনুভূতি সবই যেনো বৃথা। এতো সাজিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো আবারো ভেঙ্গে গেলো। এরকম কেনো মানুষ, এতো দিন এতো কষ্ট করে এত্ত কিছু করলো ও, আর সেলিম কিনা এক পলকে বলে ফেললো আসতে পারবে না। এরকম কেনো হয় বারবার। রাতেও কিছু খায় না পান্না। রান্না করতেও ইচ্ছে হয় না ওর, লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা একগাদা স্বপ্নকে ভিজিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে পান্না।



সেলিমের সাথে তারপর আর কথা হয়নি। একবারের জন্যেও ফোন দেয়নি সেলিম, পান্নাও খোঁজ নেয়নি আর।



আজ কিছু ভালো লাগছে না পান্নার, শয়তান ননদটাও যেনো সুযোগ পেয়েছে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শুধু মার্কেটে যাওয়ার কথাই বলছে। পান্নার ইচ্ছা করছে শয়তানিটার দাঁতগুলা ভেঙ্গে দিতে। ঢঙ্গি একটা। তারপরও মার্কেটে যায় ও। হাজার হোক একটামাত্র ননদ, ভাবী যেহেতু সহ্য তো করতেই হবে। মার্কেটে দোকানের রঙিন আলোয় দেখে যাওয়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পান্না। এবারের ঈদটাও একাই কাটবে ওর, শাড়িটা আর ভালো লাগছে না পান্নার। নীল জমিনে বিষণ্নতার প্রলেপ লাগিয়ে দেয় ও। শ্বশুর বাড়ি থাকতে ইচ্ছেও করছে না ওর। মনে হচ্ছে ঈদটা যেনো আর না আসুক। ওর ঈদ না হলে আর কারোরই যেনো ঈদ না হয়।



বিষণ্ন দিনের শেষে মাত্র ঘুমাতে গেছে পান্না। সব কাজ শেষ করে, সকালের এলার্ম দিয়ে সবে একটু ক্লান্ত গা এলিয়ে দিয়েছে বিছানায়, এই সময় আবার কলিং বেল। ধুর, এক গাদা রাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ায় পান্না। খুলবে না খুলবে না করেও দরজা খুললো সে। এমন সময় ঢংগিলা ননদী পপিটা পিছনে থেকে বলে উঠলো ...ভাবি ...ভাবি বলেনতো দেখি দরজায় কে? কি পারলেন নাতো? এ যে আমাদের সেলিম ভাইয়া। পুরো জমে গেছে পান্না, নিজের চোখকেও বিশ্বাস হয় না ওর। মাথা দুলে উঠে বোধহয় পড়েই যাবে। কীভাবে সম্ভব, কথাও যেনো হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। চিমটির কারণেই সম্বি্যত ফিরে পান্নার।



-কি এখন বিশ্বাস হইছে?



-তুমি? তুমি না এবার আসবা না? তোমার অফিস?



-না এসেই পড়লাম আর কি, হাজার হোক হানিমুনে কি আর তোমাকে একা পাঠানো যায়?



-শয়তান কোথাকার।



বলেই কেঁদে ফেলে পান্না। এই মুহূর্তের জন্যে পৃথিবীর সব অপেক্ষাকে মেনে নেয়া যায়। সকল দুঃখকে এক নিমিষেই শুষে নেয় এই ভালোবাসা। পৃথিবীর সকল বিষণ্ন সময়কে ভাসিয়ে দেয়া যায় এই অশ্রু জলে, ভাসিয়ে দেয় পান্নাও। মুখ লুকায় সেলিমের মাঝে, গভীর থেকে গভীরে। পরম যত্নে সেলিমও জড়িয়ে নেয় পান্নাকে, একরাশ উষ্ণ ভালোবাসা নিয়ে। দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা এই দম্পতিকে একাই ছেড়ে দেই আমরা। খুনসুটি, অভিমান, ভালো লাগা, ভালোবাসার মুহূর্তগুলো একান্ত নিজেদেরই থাক।



উৎসর্গে : পান্না ভাবি ও সেলিম ভাইকে। পৃথিবীর সকল দম্পতিই অনেক বেশি অসাধারণ। তাদের অসাধারণ ভালোবাসার মুহূর্তগুলো বড্ড বেশি আবেগী। পৃথিবীর এই সুন্দরতম সম্পর্কগুলোয় এতো আবেগ আছে বলেই সম্পর্কের গভীরতা এতোটা। পরিবারের সাথে সবাই আনন্দ আর এই আবেগময় ভালোবাসা নিয়ে ঈদ কাটান_এই শুভ কামনা রইলো।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮০৬২২৪
পুরোন সংখ্যা