চাঁদপুর। মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ২০১৮। ৮ কার্তিক ১৪২৫। ১২ সফর ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪২-সূরা যূখরুফ

৮৯ আয়াত, ৭ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১০। যিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে করেছেন শয্যা এবং ওতে করেছেন তোমাদের চলার পথ যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার;

১১। এবং যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে এবং আমি তার দ্বারা জীবিত করি নির্জীব ভূ-খ-কে। এভাবেই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে।

১২। এবং যিনি জোড়াসমূহের প্রত্যেককে সৃষ্টি করেন এবং যিনি তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা আরহণ কর।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন



 


কোনো কিছু যদি পবিত্ররূপে সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে তা মানবদেহ।     


-ওয়াল্ট হুইটম্যান।


যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে তার ভালো ও পরিচ্ছন্ন কথা বলা উচিত অথবা নীরব থাকা বাঞ্ছনীয়। পরিচ্ছন্ন কথা হচ্ছে দান কাজের সমতুল্য।

 


ফটো গ্যালারি
যেভাবে চলে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার অনিয়ম : অনুসন্ধান-৮
পাশাপাশি দুই কেন্দ্রের মধ্যে হয় দুর্নীতির দ্বিপাক্ষিক চুক্তি
পাসের হার ঠিক রাখতে কতিপয় প্রধান শিক্ষকই চুক্তি বাস্তবায়ন করেন!
রাসেল হাসান
২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


'আপনারা আমাদের স্কুল দেইখেন, আমরাও আপনাদের স্কুল দেখবো।' এটি বেশ পরিচিত একটি বাক্য জেলার অনেক প্রধান শিক্ষকের কাছে। বিশেষ করে এক স্কুলের শিক্ষার্থী অন্য স্কুলে গিয়ে পরীক্ষা দিলে স্কুল দুটির মধ্যে চলে এ আপোষনামা। যে আপোষনামার শর্ত থাকে উভয় স্কুল উভয় স্কুলের শিক্ষার্থীদের দেখবে। এই দেখাদেখির মধ্যেই ঘটে যায় বহু অনিয়ম। যে অনিয়ম ধরা পড়ে না প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিদের চোখেও।



দুটি কেন্দ্রের মধ্যে প্রথম চুক্তিটিই থাকে হল পরিদর্শকদের নিয়ে। প্রথমত কোনো শিক্ষক পরীক্ষার হলে কড়া গার্ড দিতে পরবেন না। শিক্ষার্থীরা একজন অপরজনের সাথে সমন্বয় করে লিখবে। ২য় চুক্তিটি থাকে বিশেষ পরীক্ষার দিন বিশেষ শিক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণে। দুটি কেন্দ্রের স্কুলগুলোর শিক্ষকরাই গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাদের নিজ নিজ শিক্ষার্থীর কাছে যাওয়ার অলিখিত চুক্তিনামা থাকে। শিক্ষকগণ পরীক্ষার হলে নকল সাপ্লাইয়ের কথা বলে কখনোই প্রবেশ করেন না। পরীক্ষার হলে প্রবেশ করার প্রথম সুরটিই থাকে বাচ্চাদের সাথে একটু দেখা করতে চাওয়া। আর এই একটু দেখার মধ্যেই ঘটে যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংক্ষিপ্তি উত্তরপত্র বিনিময়। যদিও পরীক্ষার হলে কোনো বহরিাগত শিক্ষকের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ রয়েছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ আইনে।



হলে পরিদর্শনরত কোনো শিক্ষক যদি তাতে বাধা দেন বা কোনো শিক্ষার্থীদের দেখাদেখি করার সুযোগ না দেন তবে পরদিন আসে ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে হলে না যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা। যে স্কুলের শিক্ষার্থীদের হলে দেখাদেখি করার সুযোগ দেয়া হয়নি তারা পরীক্ষা দিয়েই নিজ স্কুলের শিক্ষকদের জানান তাদের আজ পরীক্ষা ভালো হয়নি। অনেক কড়া গার্ড দিয়েছেন একজন শিক্ষক। মুহূর্তে এ সংবাদ পেঁৗছে যায় স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে। শুরু হয় কড়া গার্ড দেয়া শিক্ষকের নাম ঠিকানা সংগ্রহের কাজ। প্রধান শিক্ষক ক্ষিপ্ত হয়ে ফোন দেন অভিযুক্ত সেই শিক্ষকের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে এবং জানিয়ে দেন এই শিক্ষককে আর যেন কখনও পরীক্ষার গার্ডে না রাখা হয়। অন্যথায় তাদের শিক্ষার্থীদেরকেও কাল থেকে দেখাদেখির সুযোগ দেয়া হবে না। যেই কথা, সেই কাজ। পূর্ব নির্ধারিত গার্ড থাকলেও পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে ঐ শিক্ষককে আর পরীক্ষার হলে আসতে দেয়া হয় না বা আসলেও তাকে শিক্ষক সঙ্কট নেই বলে বসিয়ে রাখা হয় অফিস কক্ষে। নীতি দেখাতে গিয়ে পরীক্ষার হলে পরিদর্শনের দায়িত্বটুকু হারানো বোর্ড পরীক্ষাগুলোর জন্যে যেন স্বাভাবিক একটি বিষয়। সেজন্যে জেলার বহু শিক্ষক আছেন যারা পরীক্ষার হলে গিয়ে নীরব দর্শকের মত দায়িত্ব পালন করেন।



পাশাপাশি দুটি কেন্দ্র যেহেতু তাদের শিক্ষার্থী বিনিময় করেছেন, তাই দুটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকই চান পাসের হার ঠিক রাখার জন্যে যে যেভাবে পারে লিখে যাক। জেলার যে সকল কেন্দ্রের শিক্ষার্থী স্থির থাকে, শুধুমাত্র শিক্ষক পরিবর্তন হয় সেখানেও থাকে অলিখিত একই চুক্তিনামা। দুটি কেন্দ্রের মধ্যে শিক্ষক বিনিময় হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে শর্ত থাকে, আপনারা আমাদের বাচ্চাদের কড়া গার্ড দিলে আমরাও একই গার্ড দিবো।



এখানেই শেষ নয়। 'যেখানেই গুড় সেখানেই পিঁপড়ে' এই প্রবাদটির মতই যে কেন্দ্রে যে স্কুলগুলো সুবিধা পাচ্ছে অর্থাৎ যে স্কুলগুলোর সাথে আপোষে যেতে পারছে সেখানেই ছুটে যাচ্ছে। যে কেন্দ্রে সুবিধা পাচ্ছে না সে কেন্দ্র নাকের ডগায় থাকলেও তাতে যাওয়া হচ্ছে না। একটি উদাহরণ না দিলে জেলার সকল উপজেলার চিত্রগুলো বুঝাটা কঠিন হয়ে পড়বে। কলেজ পর্যায়ের পরীক্ষায় চাঁদপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা নিকটস্থ চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজে পরীক্ষা দিলেও স্কুল পর্যায়ে দেখা যায় তার ভিন্ন চিত্র। চাঁদপুর সদরস্থ আল-আমিন একাডেমি নিকটস্থ উপকেন্দ্র ডিএন হাই স্কুলে পরীক্ষা দিলেও হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নিকটস্থ উপকেন্দ্র গণি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় রেখে তারা ডিএন হাই স্কুলে যাচ্ছে, যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে কারো কারো মনে। আবার মাতৃপীঠ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নিকটস্থ উপকেন্দ্র লেডী দেহলভী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে না গিয়ে গত বছর এসএসসি পরীক্ষা থেকে নিজ কেন্দ্রে নিজেরাই পরীক্ষা দিচ্ছে, যার কারণও খতিয়ে দেখার বিষয়। অতীতে জেএসসিতে মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় লেডী দেহলভী উপকেন্দ্রে পরীক্ষা দিলেও সেখানে নিজেদের স্কুলের দু'শিক্ষার্থী একই বেঞ্চে বসে দীর্ঘ বছর ধরে পরীক্ষা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যা বোর্ড নীতিমালা পরপন্থি।



সব কিছুর মধ্যেই একটি গোলক ধাঁধা কাজ করছে। এ গোলক ধাঁধা থেকে বের হতে পারলেই সদরস্থ স্কুলগুলো ফিরে পেতে পারে পরীক্ষার শতভাগ পরিবেশ-এমনটাই মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। এ-তো শুধু চাঁদপুর সদর উপজেলার চিত্র। জেলার বাকি সাতটি উপজেলার চিত্রও একই রকম। কচুয়া, মতলব, শাহরাস্তি, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর উপজেলার তথ্য নিয়ে জানা গেছে, সকল স্থানেই নিকটস্থ কেন্দ্র টপকিয়ে দূরবর্তী কেন্দ্রে যাওয়ার ঘটনা ঘটে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। আবার কয়েক গজের মধ্যে আরেকটি কেন্দ্র থাকলেও কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ দিন ধরে পরীক্ষা দিচ্ছে নিজেদের স্কুলেই। নিজ স্কুলে পরীক্ষা দেয়া এমন একাধিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বললে তারা বলেন, 'নিজ স্কুলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিলেও তাদের শিক্ষার্থীদের গার্ড দিতে আসেন অন্য স্কুলের শিক্ষকরা। তাই অনিয়ম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'



পরীক্ষার হলের পরিদর্শক না হয় অন্য স্কুল থেকে আসলো, কিন্তু প্রধান শিক্ষক, ৩য় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী যারা পরীক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকেন তারাও কি অন্য স্কুল থেকে আসেন? এমন প্রশ্নে নিশ্চুপ সেই প্রধান শিক্ষকগণ। এ বিষয়ে চাঁদপুর সদরস্থ আক্কাছ আলী রেলওয়ে একাডেমির প্রধান শিক্ষক গোফরান হোসেন জানান, আমি খুব লজ্জিত হই যখন শুনি একজন প্রধান শিক্ষক পরীক্ষার অনিয়মের সাথে জড়িত থাকেন। মাঝে মাঝে মন চায় চাকুরিটি ছেড়ে অন্য পেশায় নিজের নাম লেখাই। কতিপয় প্রধান শিক্ষকের এমন চুক্তিভিত্তিক কর্মকা-ের কারণে আজ আমরা সকল শিক্ষকই অপমানিত। আমি চাই এ ধরনের কাজের সাথে এ বছর যে সকল শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষক জড়িত থাকবেন তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করেন। যদি এ অনিয়মের সাথে আমি নিজেও জড়িত হই প্রশাসন যেন আমার বিরুদ্ধেই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেন। আমি বিশ্বাস করি প্রশাসন আন্তরিক ভাবে চাইলে কোনো অনিয়মই চলতে পারে না।



নিকটস্থ উপকেন্দ্র ডিঙ্গিয়ে ডিএন হাই স্কুলে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন জানান, আমার স্কুলের ছাত্রদের সিট কোথায় বসবে কি বসবে না তা নিয়ে আমার কোনো চাহিদা নেই। আমি প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করার সময় এ বিষয়টি তুলবো। বাকি প্রধান শিক্ষকরা মিলে যে স্কুলে আমাদের ছাত্রদের দিবেন বলে সিদ্ধান্ত নিবেন সেখানেই তারা এ বছর পরীক্ষা দিবে। এ নিয়ে আমাদের কোনো প্রকার অভিযোগ বা অনুযোগ থাকবে না। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সন্তানদের আমরা এত বছর যা পড়িয়েছি তারা সে অনুযায়ী ফলাফল করবে।



নিকটস্থ কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও যারা নিজেদের স্কুলে পরীক্ষা দেন তাদের বিষয়ে মোহাম্মদ হোসেন বলেন, সিট প্ল্যান সংক্রান্ত বোর্ডের একটি নির্দেশিকা রয়েছে। আমি সে নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। আশা করবো জেলার সকল কেন্দ্র সচিবও সে নির্দেশিকা পালন করবেন। তাহলে আর কোনো অনিয়ম হবে না।



যেহেতু শিক্ষকরাই পুরো পরীক্ষাটি পরিচালনা করেন তারা যে পর্যন্ত এ অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াবে সে পর্যন্ত প্রশাসন ও সরকারের অনিয়ম বিরোধী কোনো অভিযানই কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন সচেতন শিক্ষক মহল।



জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-৯ দেখার জন্যে চোখ রাখুন আগামীকালকের চাঁদপুর কণ্ঠে।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৫১৭৮১
পুরোন সংখ্যা