চাঁদপুর, রোববার ৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৪ শাওয়াল ১৪৪১
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৭২-সূরা জিন্ন্


২৮ আয়াত, ২ রুকু, মক্কী


 


১। বল, আমার প্রতি ওহী প্রেরিত হইয়াছে যে, জিন্নদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করিয়াছে এবং বলিয়াছে, 'আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করিয়াছি,


২। যাহা সঠিক পথনির্দেশ করে; ফলে আমরা ইহাতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি। আমরা কখনও আমাদের প্রতিপালকের কোন শরীক স্থির করিব না,


 


 


assets/data_files/web

প্রার্থনা ও প্রশংসা এই দুটো জিনিস স্বয়ং বিধাতাও পছন্দ করেন।


-সুইডেন বাগ।


 


 


 


 


 


ধর্মের পর জ্ঞানের প্রধান অংশ হচ্ছে মানবপ্রেম-আর পাপী পুণ্যবান নির্বিশেষে মানুষের মঙ্গল সাধন।


 


 


ফটো গ্যালারি
করোনাকালে চাঁদপুরের ক'জন চিকিৎসক : মানুষের সেবায় যারা অনন্য হয়ে থাকবেন
চাঁদপুর কণ্ঠ রিপোর্ট
০৭ জুন, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ডাঃ এএইচএম সুজাউদ্দৌলা রুবেল ও ডাঃ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এ দু'জন এখন বলতে গেলে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে করোনা রোগীদের একমাত্র স্বজন, আশ্রয়স্থল এবং আত্মার আত্মীয়। করোনা রোগীদের একটি ভরসার জায়গায় আছেন তাঁরা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে আসা অথবা উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের আইসোলেশনে পাঠানো এবং স্যাম্পল নেয়ার সকল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন ডাঃ রুবেল ও ডাঃ মিজান। একজন চাঁদপুর জেলার সর্ববৃহৎ হাসপাতাল আড়াই শ' শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ও করোনা ভাইরাস বিষয়ক ফোকালপার্সন এবং অপরজন হচ্ছেন একই হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার।



ডাঃ রুবেল ও ডাঃ মিজান একই মেডিকেল কলেজ তথা বরিশাল মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। তবে ব্যবধান পাঁচ বছরের। ডাঃ রুবেল ২০০৩ সালে, আর ডাঃ মিজানুর রহমান ২০০৭ সালে এমবিবিএস সনদ লাভ করেন। ডাঃ রুবেল ২৭তম বিসিএস'র।



ডাঃ রুবেলের গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলায়। আর ডাঃ মিজানুর রহমানের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়। চাকরির সুবাদে দুজনই এখন একই জেলা তথা চাঁদপুর জেলার বাসিন্দা। একই কর্মস্থলে তাঁরা দুজন চার বছর যাবত আছেন। এঁদের মধ্যে ডাঃ রুবেল ২০০৩ সাল থেকে চাঁদপুরের সর্ববৃহৎ এই হাসপাতালে। আর ডাঃ মিজান ২০১৬ সাল থেকে। মেডিকেলের সনদ লাভ এবং বয়সের মধ্যে ব্যবধান থাকলেও দুজনের মাঝে অপূর্ব মিল। আর এ মিল বা সখ্যতা এবং একে অপরের সহযোগী কর্মক্ষেত্রে। যতক্ষণ তাঁরা দুজন কর্মস্থল তথা আড়াই শ' শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে থাকবেন ততক্ষণ তাঁদেরকে কাজ নিয়েই থাকতে দেখা যায়। কাজ নিয়ে থাকাটাই যেনো তাঁদের ধ্যান জ্ঞান। কাজের মাঝেই যেনো তাঁরা আনন্দ খুঁজে পান। অসুস্থ, পীড়িত মানুষকে সেবা দেয়াই যেনো তাঁদের ব্রত। হাসপাতালে যতক্ষণ থাকেন শুধু ততক্ষণেই নন, নিজেদের বাসায় গিয়েও রোগীদের নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সকালে হাসপাতালে এসে একটানা ৪টা-৫টা পর্যন্ত এক রুমে বসে দুজন একেবারে বন্ধুর মতো কাজ করতে থাকেন।



হাসপাতালের নিচ তলায় আরএমও ডাঃ সুজাউদ্দৌলা রুবেলের চেম্বার। এখানেই বর্তমান করোনাকালে ডাঃ রুবেল ও ডাঃ মিজান দুজনে এক সাথে বসেন এবং একাগ্রচিত্তে কাজ করতে থাকেন। বর্তমানে হাসপাতালে যেদিনই যাওয়া হয়, সেদিনই এ দুজন চিকিৎসককে খুবই কর্মব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা যায়। কাজের প্রতি তাঁদের একেবারে নেশার মতো লেগে থাকার এ চিত্রটি এমন একটা সময়ে দৃশ্যমান, যখন সারাদেশের ন্যায় চাঁদপুরেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বলতে গেলে অনেকটা মহামারীর মতো। যে ক্রান্তিকালে কিছু কিছু ডাক্তার নিজেদের সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়েছেন, এমন দুঃসময়টাতে এ দুজন চিকিৎসককে দেখা যায় যে তাঁদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তাঁরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের চিকিৎসা সেবার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বিরামহীনভাবে। অবশ্য এ কাজের জন্য ডাঃ রুবেল ও তাঁর স্ত্রী সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সাজেদা বেগম পলিনকে জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে করোনাভাইরাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের থেকে ট্রেনিং নেয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়। তাঁরা দুজনই ঢাকা গিয়ে বিশ্বে নতুন আবির্ভূত বৈশি্বক মহামারী প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ নামে ভাইরাসের বিষয়ে এবং এতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার উপর এঙ্পার্টদের থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আসেন। সেই প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান দিয়েই ডাঃ রুবেল সদর হাসপাতালে এবং তাঁর স্ত্রী ডাঃ সাজেদা বেগম পলিন সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্রে অধীনে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা তো দিয়েই যাচ্ছেন,; উপরন্তু আক্রান্ত রোগীদের এবং উপসর্গ থাকা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া, উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়ে যাওয়া ও মারা যাওয়াদের স্যাম্পল কালেকশান করার কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাকেন।



এদিকে সদর হাসপাতালে সরজমিনে উপস্থিত থেকে দেখা যায় যে, মাঝেমধ্যে করোনা ছাড়া অন্য রোগীরাও তাঁদের কাছে চলে আসে। তখন খুব ব্যস্ততার সময় খানিকটা বিরক্ত হলেও পরক্ষণেই তাঁদেরকে রোগীদের সেবা দিতে দেখা যায়। এমন দৃশ্য দেখা যাবে বর্তমান সময়ে যে কোনো দিন হাসপাতালে আরএমও'র চেম্বারে গেলে।



শুধু যে দিনের বেলায়ই তাঁরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন তা নয়, রাতেও তাঁদের দুজনকে একইভাবে করোনা রোগীদের সেবা দিতে দেখা যায়।



ডাঃ রুবেল হাসপাতালের আরএমও তথা আবাসিক মেডিকেল অফিসার হওয়ায় তাঁর উপর রোগী দেখার চাইতে হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্বটি মুখ্য। কোভিড-১৯ তথা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ চাঁদপুরে শুরু হওয়ার পর জেলার সর্ববৃহৎ এ হাসপাতালটিতে আসা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেয়া, এ সংশ্লিষ্ট অফিসিয়াল কাজ এবং এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের ভর্তি করার সকল কাজ আরএমও হিসেবে ডাঃ রুবেলকেই দেখতে হচ্ছে। আর তাঁকে সার্বক্ষণিক পাশে থেকে একান্তভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তাঁদের কাজ এখানেই শেষ নয়। যারা কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্যে এ হাসপাতালে স্যাম্পল দিতে আসেন, তাদের জন্যে নির্ধারিত ফরম পূরণ করাসহ সকল ব্যবস্থাপনা কাজটি ডাঃ রুবেল ও ডাঃ মিজান করে থাকেন। অবশ্য মাঝে মধ্যে ডাঃ ফরিদ আহমেদসহ অন্য দু'একজন চিকিৎসক তাদেরকে সহযোগিতা করে থাকেন। চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তাঁদের করতে হয়। এখানেই শেষ নয়, যেদিন স্যাম্পল পরীক্ষার রিপোর্ট আসে, সেদিন এ দুজনকে হাসপাতালে যারা স্যাম্পল দিয়েছেন তাদের রিপোর্ট প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এতোসব ব্যস্ততার মাঝেও রোগীদের এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ফোন রিসিভ করে কথা বলতে হয় এবং নানা বিষয়ে তথ্য দিতে হয়। আরো যে কাজটি বিশেষ করে ডাঃ রুবেলকে করতে হয় সেটি হচ্ছে- করোনায় আক্রান্ত হয়ে অথবা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে কেউ মারা গেলে তাদের লাশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে স্বজনদের কাছে পৌঁছানো এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী বিশেষ ব্যবস্থায় দাফন করার ব্যবস্থা করা। এ কাজটির জন্যও তাঁদের অনেক বেগ পেতে হয়। এমনও দেখা গেছে যে, সন্ধ্যায় রোগী হাসপাতালে মারা গেছে, তার লাশ স্বজনদের হাতে তুলে দিতে রাত ২টা-৩টা পর্যন্তও হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। সে সময়কার দৃশ্য দেখে মনে হবে যেনো ডাক্তার লাশ পাহারা দিচ্ছে। এতোসব কাজ করতে গিয়ে তাঁরা অনেক সময় হাঁপিয়ে উঠেন।



তাঁদের দুজনের কাজের প্রতি এমন আগ্রহ, একাগ্রতা ও মনোনিবেশ দেখে এ কথাই বলা যায়, জাতির এই ক্রান্তিকালে চাঁদপুরের করোনা রোগীদের জন্য ডাঃ রুবেল ও ডাঃ মিজান যেনো আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন।



এদিকে মাঝেমধ্যে কেউ কেউ তাঁদের বিরুদ্ধে রূঢ় আচরণের অভিযোগ করলেও সেটি ঢালাওভাবে এবং শতভাগ সঠিক নয়। যদিও তাঁরা করেও থাকেন, তবে এটিকে রোগী এবং তাদের স্বজনরা ঠিক এভাবেই দেখছেন যে, রেগে যাওয়া বা কিছুটা রূঢ় আচরণ তো তাঁরাই করবেন। দিনের অধিকাংশ সময় যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের বিভিন্ন রকমের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরাই তো একটা সময় বিরক্ত হবেন, ইচ্ছার বিরুদ্ধেও রূঢ় আচরণ করবেন। আর যে সব চিকিৎসক এই ক্রান্তিকালে মানুষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাঁদের তো কোনো সুনাম-দুর্নাম কিছুই নেই। তবে তাঁদের মধ্যে যে মানবিকতা নেই, তা শত বছরের জন্য ইতিহাস হয়ে থাকবে। যেখানে সংবাদ কর্মীরা পেশাগত দায়িত্বের কারণেও হাসপাতালে যেতে ভয় পায় (হাতেগোণা ক'জন ছাড়া), সে জায়গায় সেসব চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), নার্স, আয়া ও ক্লিনাররা মৃত্যু ঝুঁকিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা জানানোটাই প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন সমাজের সচেতন এবং হৃদয়বান মানুষগুলো।



দীর্ঘ প্রায় ৬৫ দিন আড়াই শ' শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে করোনা নিয়ে কাজ করার বিষয়ে কথা হয় আরএমও ডাঃ সুজাউদ্দৌলা রুবেল ও মেডিকেল অফিসার ডাঃ মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সাথে।



ডাঃ রুবেল এ প্রতিবেদককে বলেন, আসলে আমরা যখন মেডিকেলের সনদ এবং বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন লাভ করি, তখন আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যে কোনো দুর্যোগ মহামারীকালে আমরা মানুষের পাশে থাকবো, তাদেরকে সেবা দেবো। তাই আমার বিবেক আমাকে বলছে, তুমি তোমার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মানুষের সেবা করো। তাছাড়া এর মাঝে একটা আনন্দও আছে। চিকিৎসা সেবা দিয়ে অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলা এবং তাদের মুখে হাসি দেখার মাঝে অন্য রকমের এক আনন্দ, অনুভূতিও ভিন্ন রকমের।



ডাঃ মিজান বলেন, এই যে কাজ করছি কোনো ক্লান্তি লাগে না। বরং আনন্দ পাচ্ছি এবং একই সাথে গর্বিত যে মেডিকেলের একজন সিনিয়র ভাইয়ের সাথে কাজ করছি। আমি খুন আনন্দিত। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি আমরা চিকিৎসকরা মুখ ফিরিয়ে নেই, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে?



চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ সাখাওয়াত উল্লাহ ডাঃ রুবেল সম্পর্কে বলেন, আসলে আমি চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ডাঃ রুবেল এবং সদর ইউএইচপিও হিসেবে তার স্ত্রী ডাঃ পলিনকে পেয়ে অনেকটাই স্বস্তিবোধ করছি। কোনো কাজ নিয়ে আমার তেমন কোনো টেনশন করতে হয় নসা। তাঁরা দু'জনই খুব কর্মঠ। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে তারা যে কোনো পরিস্থিতি ম্যানেজ করতে পারেন।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৫৫১২২
পুরোন সংখ্যা