চাঁদপুর। মঙ্গলবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৬-সূরা শু’আরা

২২৭ আয়াত, ১১ রুকু, ‘মক্কী’

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১২৬। ‘অতএব আল্লাহ্কে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।

১২৭। ‘আমি তোমাদের নিকট ইহার জন্য কোন প্রতিদান চাহি না, আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আছে।  

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


সর্বদা তাই কর যা করতে তুমি পাও।

-ইমারসন।


অত্যাচারী শাসক কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা অধম হবে।


'নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া কে এলো মক্কায় আমিনার কোলে'
মুহাম্মদ মিলাদ শরীফ
১৩ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

আলহামদুলিল্লাহ! ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আ'লা রাসূলিল্লাহ। দুরু দুরু বক্ষে কম্পিত হস্তে ভয় ও আশার মাঝামাঝি অবস্থায় থেকে, দয়াময় আল্লাহর মাখলুকাতের মধ্যে এমন একজন মহান সত্ত্বার শানে কিছু লিখতে মসী হাতে নিয়েছি, যাঁর শানে বিন্দুমাত্র আদব আর তা'জিমের খেলাফ কিছু হলে দুনিয়াশ্রেষ্ঠ দরবেশেরও সারা জীবনের সব আমল মুহূর্তেই নিষ্ফল আর মূল্যহীনে পরিণত হবে। বরং পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে তাঁর প্রতি শর্তহীন আদব-তা'জিম আর সর্বোচ্চ মহব্বত প্রদর্শন করাই হচ্ছে সব ইবাদতের মূল ইবাদত। তিনি হচ্ছেন আল্লাহর প্রিয়তম নিখিল বিশ্বের পরম প্রেমাষ্পদ রহমত ও করুণার আধার হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অসীম ক্ষমতার মালিক মহান আল্লাহ সৃষ্টিকূলের মাঝে তাঁকে এমন সু-উচ্চ মর্যাদা ও শান দান করেছেন, কোনো সৃষ্টির পক্ষে তা কল্পনা করাও অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে তাবেয়ী সর্দার ছিরাজুল উম্মাহ ইমাম আ'জম আবু হানিফা রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শানে লিখিত দীর্ঘ কাসিদার দু'টি লাইন এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি-

'ওয়াল্লাহে লাও আন্নাল বিহারা মিদাদুহুম ওয়াশ শা'বু আক্বলামুন জুইলনা লি জা-কা

লাম ইয়াক্বদিরিছ ছাক্বালান ইয়াজমাউ নাজরাহু আবাদান ওয়া মাস তাত্বাউ লাহু আদরা-কা'

'পরিণত হয় লেখার কালিতে যদিও অসীম সাগরের পানি

তরু শাখাগুলো কাটিয়া কাটিয়া করা হয় যদি হাজারো লেখনী

পারিবে না তবু লিখিতে সকল মহিমা জি্বন-ইনসান

অনুভবও তারা করিতে পারে না যথার্থ মোর নবীজীর শান।' [কাসিদায়ে নু'মান]

সুবহানাল্লাহ! কি চমৎকারভাবে প্রিয়তম রাসূলের শান এখানে ফুটে উঠেছে! এ কথাগুলো যেভাবে ঈমানদারের ঈমানকে নূরে মুনাওয়ার করবে সেভাবেই মুনাফিকদের হৃদয়কে আরও হিংসাত্মক আর দুঃখে ভরিয়ে দিবে। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসা আর সুমহান মর্যাদার বিষয়টি কোনদিনই দুরাচার মুনাফিক আর কাফিররা মেনে নিতে পারেনি।

আসুন কলেবর বৃদ্ধি না করে আল্লাহর রহমত আর তাঁর প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাছ দয়ার দৃষ্টি লাভের আশা নিয়ে মূল আলোচনায় চলে যাই। শিরোনামে উল্লেখিত 'নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া কে এলো মক্কায় আমিনার কোলে' ছান্দিক লাইনটি আমাদের জাতীয় কবি, আশিকে রাসূল, প্রেম ও দ্রোহের তরজুমান কবি নজরুল ইসলামের একটি না'তিয়া থেকে নেয়া। বাস্তবিক অর্থে সময়ের বিরল প্রতিভা, খোদাপ্রদত্ত জ্ঞানে বিকশিত জাতীয় কবির এই একটি লাইন বিশ্লেষণ করতে দিস্তার পর দিস্তা কাগজ প্রয়োজন। বিশেষত: যখন বিষয় হয়ে যায় চির প্রশংসিত নূরাণী সত্তা পেয়ারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংশ্লিষ্ট কোন কিছু। স্থানের স্বল্পতা হেতু আমি গুণাহগার চেষ্টা করব আলোচ্য শিরোনামের আলোকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানিয়্যাত এবং আপাদমস্তক নূর হিসেবে ধরায় আগমনের বিষয়টি সংক্ষেপে দালিলিকভাবে পাঠক বন্ধুদের সামনে তুলে ধরতে।

প্রথমত: যে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই তা হলো, নবীজী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর সৃষ্টিকূলের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সর্বোত্তম সৃষ্টি। যখন এক আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো সত্তা ছিলেন না, আল্লাহর পরিচয় কেউ জানত না, আল্লাহর ক্ষমতা ও কুদরতের ব্যাপারে জানা ও মানার মতোও কেউ ছিল না, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্যে মহব্বতের প্রবল তাজাল্লী দিয়ে নূরের আকৃতিতে একজনকে তৈরী করলেন। এ মর্মে একখানা রেওয়ায়েত পাওয়া যায়, আল্লাহ তায়ালা হাদিসে কুদসীতে ইরশাদ করেন- অর্থাৎ- 'আমি ছিলাম সুপ্ত ভা-ার (কেউ আমার পরিচয় জানত না) অতঃপর আমি চাইলাম নিজের পরিচয় প্রকাশ করব, তাই এক সত্তাকে তৈরী করলাম নিজের পরিচয় প্রকাশ করার জন্যে।' [মিরক্বাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাত-১/৩৫৬, ছইদুল খাত্বের লি ইবনিল জওযী-১/১২৩] সনদের কারণে এই বর্ণনাটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ আপত্তি করলেও হাদিসের মূল বক্তব্য সহীহ। দেখুন- ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী, [মিরক্বাত-১/৪৪২], ইমাম ইসমাঈল আজলুনী- [কাশফুল খাফা-২/১৩২], ইমাম মুহাম্মদ বিন খলিল ত্বরাবলসী-[আল লুউ লুউল মারছূ'-১/১৪৩]

এখন প্রশ্ন হলো এই প্রথম সৃষ্টি কে ছিলেন? এই পর্যায়ে আমরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দু'টি হাদিস পেশ করছি যাতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

১। ছাহিবে ইসরা ওয়া মে'রাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মে'রাজ সফরে বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে ছিলেন, তখন একটি মনযিল অতিক্রম করার সময় তিনজনের একটি কাফেলা দেখতে পান যারা তাঁকে সালাম দিচ্ছেন এই বলে-

'আপনাকে সালাম হে সূচনাকারী, আপনাকে সালাম হে পরিসমাপ্তিকারী, আপনাকে সালাম হে একত্রকারী!

[তাফসীরে ইবনে কাছির-৩/১১, আহাদিসুল মুখতারাহ লি দ্বিয়া মাক্বদেসী- হাদিস নং ২২৭৭, তিনি বলেছেন এই হাদিসের সনদ সমূহ সহীহ]

জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন এই তিনজন হলেন যথাক্রমে হযরত ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা আলাইহিস সালাম। এই বর্ণনা দ্বারা ওই বিষয়টি আবারও প্রমাণ হলো যে, আল্লাহ চাইলে ইন্তেকালের পরও আল্লাহর নবীগণ কুদরতীভাবে যেথায় ইচ্ছা সেথায় গমন করতে পারেন এবং তাঁরা সক্রিয় থাকেন।

আমাদের আলোচ্য বিষয় এখানে 'আপনাকে সালাম হে প্রথম বা সূচনাকারী' অংশটুকু নিয়ে। এই প্রথম বা সূচনাকারী দ্বারা কে উদ্দেশ্য, তা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই অন্য হাদিসে ব্যাখ্যা করেছেন। নবীজী ইরশাদ করেন-আমি সৃষ্টিগত দিক থেকে মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম আর প্রেরণের দিক থেকে সর্বশেষ। [তাবাকাতে ইবনে সা'দ-১/১৪৯]

এখানে মানুষ বলতে নবীগণ উদ্দেশ্য। অপর একটি হাদিসে ইরশাদ করেন-

'আমি সৃষ্টির দিক দিয়ে নবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম আর (পৃথিবীতে) প্রেরণের দিক দিয়ে সর্বশেষ।' [ তাফসীরে তাবারী-২০/২১৩]

বর্ণিত হাদিসদ্বয় উসূলে হাদিসের মানদ-ে মুরসাল বা সনদের শেষ দিকে বিচ্ছিন্ন সনদ হওয়ায় কেউ কেউ আপত্তি করলেও যেহেতু হাদিসের মূল বক্তব্যের পক্ষে তিনজন নবী কর্তৃক নবীজীকে সালাম দেয়া সংক্রান্ত সহিহ রেওয়ায়েত একটু আগেই পেশ করা হয়েছে তাই সহযোগী হিসেবে এটি সহিহ লি গাইরিহী কমপক্ষে হাসান পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। [কাশফুল খাফা-২/১২৮ ও ১২৯, ফাওয়ায়েদে মাজমুআ' লিশ শাওকানী-১/১৫২]

উপর্যুক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ হলো যে, নবীয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি। এখন পেয়ারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে? এ বিষয়ে আলোচনা আমরা পরবর্তী পর্যায়ে উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।

দ্বিতীয়ত : নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরানিয়্যাতের ব্যাপারে একটু আলোকপাত করা যাক। ফিল হাল, অন্তরে নবী বিদ্বেষ এবং অজ্ঞতা হেতু কিছু নামধারী মুনাফিককে বলতে শোনা যায় নবীজীকে নূর বলা যাবে না। নবীজীকে আল্লাহর নূর বা নূরের সৃষ্টি বললে শিরক হবে! অথচ নবীজীকে পবিত্র কুরআনের এক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা মুত্বলাকভাবে নূর, দু্ই জায়গায় তাঁর (আল্লাহর) নূর এবং এক জায়গায় মুনীর বা আলোকবর্তিকা, আলো দানকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। আমি পাঠক বন্ধুদের বলবো ইনসাফের সাথে দলিলগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে।

১। সূরা মায়িদার ১৫নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট হতে তোমাদের কাছে নূর এবং স্পষ্ট কিতাব এসেছে।" আয়াতে কারীমায় 'নূর' দ্বারা অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এই নূর দ্বারা অনেক মুফাসসীর এ ভিন্ন অন্যান্য মুরাদও নিয়েছেন। কিন্তু কেউই নূর দ্বারা মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করেন নি। কারণ, পবিত্র কুরআনের এক একটি আয়াতের অসংখ্য তাফসীর বা ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে। পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশেষ দোয়াপ্রাপ্ত সাহাবি তরজুমানুল কুরআন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,

তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর অর্থাৎ- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন। [তানভীরুল মিক্বইয়াস পৃ. ৮৫]

এছাড়াও আরও যেসব তাফসীরে 'নূর' দ্বারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুরাদ নেয়া হয়েছে- তাফ: তাবারী-৬/৯২, তাফ: জালালাইন-পৃ. ৯৭, তাফ: খাজেন-২/২৩, বায়জাবী-২/৩০, মাফাতিহুল গাইব-৩/৩৯৫, রূহুল মাআ'নী-৩/২৬৯, রূহুল বায়ান-২/৩৭০ সহ অসংখ্য তাফসীর ও সিরাতের কিতাবে। সুতরাং নবীজীকে নূর বলতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।

২। (ক) সূরা তওবাহ-এর ৩২নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- "তারা (কাফিররা) চায় ফুৎকার দিয়ে আল্লাহর নূর নির্বাপিত করে দিতে।" এখানে 'নূরুল্লাহ' দ্বারা বিভিন্ন ব্যাখ্যার পাশাপাশি ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও উদ্দেশ্য নিয়েছেন। [তাফ: দূররূল মানসূর-৫/৫৫], এছাড়াও প্রায় একই ধরনের আয়াত সূরা ছফ-এর ৮নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- "তারা (কাফিররা) চায় ফুৎকার দিয়ে আল্লাহর নূর নির্বাপিত করে দিতে।" এখানেও 'নূরুল্লাহ' দ্বারা অনেক মুফাস্সির মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুরাদ নিয়েছেন। [তাফ: কুরতবী-১৮/৭৬, নুকাত ওয়াল উয়ূন-৪/২৬৯, তাফ: ইবনে আবদিস সালাম-৬/৪৫৭, ফাতহুল ক্বাদীর-৭/২১৪]

(খ) সূরা নূরের ৩৫নং আয়াতের প্রথমভাগে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- 'আল্লাহ আসমান ও জমীনের নূর (আলো দানকারী), তাঁর নূরের উপমা হলো এমনই যেমন একটা দীপাধার যার মধ্যে রয়েছে প্রদীপ।' বর্ণিত আয়াতে তাঁর (আল্লাহর) নূরের দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে নূরুল্লাহ দ্বারা অনেক মুফাস্সির ব্যাখ্যা করেছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। [তাফ: তাবারী-১৮/৯৫, মাআ'লিমুত তানযিল-৫/৬৩, দূররে মানছূর-৫/৪৯, শরহে শিফা মোল্লা আলী ক্বারী-১/৪৮]

সুতরাং পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং মুফাস্সীরদের ব্যাখ্যা দ্বারা বাহের-জাহেরভাবে প্রমাণ হলো নবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'নূর' এবং 'নূরুল্লাহ'। এখানে শিরকের কোনো বিষয়ই নাই। নবীজীকে নূরুল্লাহ তথা আল্লাহর নূর বললে যদি শিরক হয় তাহলে হযরত ঈসা (আঃ)কে 'রূহুল্লাহ' বললে অথবা পবিত্র কা'বাকে বাইতুল্লাহ বললে কেনো শিরক হবে না? আর প্রচ্ছন্নভাবে এটাও প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা নূর হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন এবং আপাদমস্তক 'নূর' হিসেবে পরিচয় দিয়ে জগতে পাঠিয়েছেন। সামনের আলোচনা দ্বারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। এছাড়াও হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসংখ্য সিফাতী নামের মধ্যে এক নাম হচ্ছে 'নূর'। ইমাম কাজী আয়াজ (রহঃ) বলেন- অন্যান্য নামের সাথে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে তাঁর নাম রেখেছেন 'নূর'। [আশ শিফা বিতা'রিফে হুকূকিল মুস্তফা-১/১৮]

ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা দ্বারা সাব্যস্ত করেছি আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি হলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এখন আলোচনার বিষয় হলো কী হিসেবে আল্লাহ তায়ালা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করেছেন। নিম্নের কিছু বর্ণনা দ্বারা বিষয়টি পরিষ্কার হবে আশা করি।

১। ইমাম বায়হাকী (রহঃ) বর্ণনা করেন- হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, 'আল্লাহ আয্যা ওয়া জাল্লা আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করে তাঁকে তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে সংবাদ দেন, তখন তিনি কতেক সন্তানের উপর অপর কতেকের মর্যাদা দেখতে পান। তিনি তাঁদের সর্বশেষে নিচের দিকে আমাকে একটি উজ্জ্বল নূর হিসেবে দেখতে পেয়ে বললেন, হে প্রভূ! ইনি কে? আল্লাহ তায়ালা বললেন, ইনি হলেন তোমার পুত্র আহমদ। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ এবং তাঁর সুপারিশই কবুল করা হবে।' [দালাইলুন নবুওয়্যাহ-হাদিস নং ২২২৫, কানযুল উম্মাল- হা: নং ৩২০৫৬, কিতাবুল আওয়ায়েল ইবনে আসেম- হাদি: নং-০৫] এই হাদিসের প্রত্যেক রাবী সিক্বাহ এবং সনদ হাসান বা উত্তম পর্যায়ের। মাউসুআতুল হাদিস :

যঃঃঢ়://ষরনৎধৎু.রংষধসবিন.হবঃ/যধফরঃয/ধংধহববফ.ঢ়যঢ়?নশথহড়=১১৮১্পরফ=৬৩১্ংরফ=৪৩৯৬ এই বিনংরঃব এ হাদিসটির সনদ বিশ্লেষণ করে এটাকে হাসান বা দলিলযোগ্য বলা হয়েছে। এমনকি সালাফী আহলে হাদিসদের মান্যবর ব্যক্তি শায়েখ আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। [জিলালুল জান্নাহ- হাদিস নং ২০৫] আমার অনুসন্ধান মতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরের ব্যাপারে অসংখ্য হাদিস থেকে এটি সবচেয়ে বিশুদ্ধ দলিল। এ হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বিষয় লক্ষ্যণীয়; এখানে স্বয়ং নবীয়ে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পরিচয় দিচ্ছেন 'আদম (আঃ) আমাকে নূর হিসেবে' দেখলেন। এত স্পষ্ট এবং বিশুদ্ধ দলিল থাকার পরও নবীজীকে নূর মানতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

২। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিস-

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত, "তিনি বলেন- আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আপনার উপর আমার পিতা মাতা উৎসর্গিত, আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম কোনো বস্তুটি সৃষ্টি করেছেন? উত্তরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-- "হে জাবের, আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম সমস্ত বস্তুর পূর্বে তাঁর আপন নূর হতে তোমার নবীর নূর পয়দা করলেন । তারপর আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী সেই নূর পরিভ্রমণ করতে লাগল । ওই সময় না ছিলো লওহে-মাহফুজ, না ছিল কলম, না ছিল বেহেশত, না ছিল দোজখ, না ছিল ফেরেশতা, না ছিল আকাশ, না ছিল পৃথিবী, না ছিল সূর্য, না ছিল চন্দ্র, না ছিল জিন জাতি, না ছিল মানবজাতী । .. .. (দীর্ঘ হাদিস)।" [মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক-১/৬৩] বর্ণিত হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের সৃষ্টি। কারণ তিনি তখনও নবী ছিলেন যখন মাটিরও অস্তিত্ব ছিল না। বরং এই মাটিও তাঁরই নূর থেকে পয়দা। উল্লেখ্য যে, এই হাদিসের ব্যাপারে প্রবল আপত্তি করা হয় যে, এটি উল্লেখিত মুসান্নাফে নেই। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাপক অনুসন্ধান করে পুরাতন নুসখায় হাদিসটির সন্ধান পাওয়া যায়। যার বিস্তারিত ডক্যুমেন্ট আমাদের কাছে আছে। এছাড়াও মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাকের বরাতে এই হাদিসটি ২০-এর অধিক বিভিন্ন সিরাত, তাফসীর ও হাদিসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং সবাই ভুল করেছেন এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। নবীজীর নূর সংক্রান্ত আরও অনেকগুলো বর্ণনা কলেবর বড় হয়ে যাওয়ার ভয়ে উল্লেখ করা হলো না। উপরোক্ত প্রথম বর্ণনাটি নি:সঙ্কোচে গ্রহণ করা যায়। তাই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূরের ব্যাপারে আর কোনো আপত্তি অগ্রহণযোগ্য। (চলবে)

লেখক : অনার্স ৩য় বর্ষ (আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ), ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৬৩১০৯
পুরোন সংখ্যা