চাঁদপুর। শুক্রবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

সর্বশেষ খবর :

  • ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় মোড়া, চাঁদপুরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৬-সূরা শু’আরা


২২৭ আয়াত, ১১ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১১৮। ‘সুতরাং তুমি আমার ও উহাদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করিয়া দাও এবং আমাকে ও আমার সহিত যেসব মু’মিন আছে, তাহাদিগকে রক্ষা করো।’  


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


মৃত্যুটা জন্মনোর মতোই স্বাভাবিক।


             -বেকন।   


 


আল্লাহর আদেশ সমূহের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি প্রদর্শন এবং যাবতীয় সৃষ্ট জীবের প্রতি সহানুভূতি ইহাই ইসলাম।     


  

ইসলামে নারী শিক্ষার গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
মাওলানা কাযী মুহাম্মদ মুঈন উদ্দিন আশরাফী
০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন বিধান। স্রষ্টা প্রদত্ত এ ব্যবস্থা তাঁর সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণেই মনোনীত হয়েছে। আর যাঁর মাধ্যমে এ জীবন বিধান প্রদত্ত ও প্রদর্শিত হয়েছে, সে শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছে 'সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণ' রাহমাতুলি্লল আলামীন। যেমন বলা হয়েছে ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতালি্লল আলামীন (আল-কোরআন)।

তাই ইসলাম কোনো নিকৃষ্ট জীবকেও অবহেলা করে না বরং তাদেরও অধিকার নিশ্চিত করে। তাইতো দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলেছিলেন, 'ফোরাতের ওই তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মরে তবে এ জন্যে কাল হাশরের ময়দানে আমি ওমরকে পাকড়াও করা হবে।'

আর মানুষতো সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাত। বাবা আদম আর মা হাওয়া আলায়হিস সালাম দিয়েই মানব জাতির ইতিহাস সূচিত হয়েছে। যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সুতরাং মানুষ শুধু নরসর্বস্ব নয়, নারী তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক নর ও নারী হতেই পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র মানব জাতি। তাই ইসলাম নর-নারীর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই বিশ্বজনীন হতে পেরেছে যা অনেক ধর্ম ও দর্শনে ইতোপূর্বে ছিলো অনুপস্থিত। আজ থেকে চৌদ্দশ' বছরাধিককাল আগের যে আরব ভূমিতে সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণ ও আদর্শ হিসেবে হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব ঘটেছিলো, সেখানে কন্যা শিশুর জন্ম ছিলো যেনো আজন্ম অভিশাপ ও অপমানের বিষয়। আর সে অপমান ঢাকতে গিয়ে জন্মদাতা নিজেই তার শিশু কন্যাকে জীবন্ত কবর দিতো। সমগ্র সৃষ্টির এ মহান কল্যাণ দূত এসেই তো সে নারী জাতিকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে বাঁচার এবং পুরুষের পাশাপাশি সকল ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণ করে পৃথিবীতে বিচরণের সুযোগ দান করেছেন। যে সমাজে বিধবা বিবাহকে নিষিদ্ধ করে রেখেছিল সেখানেই সে কুসংস্কার ভঙ্গ করা হলো বিধবা এবং অধিকতর বয়স্ক বিধবা খাদিজা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে শাদী করার মাধ্যমে। নারীরা লাভ করলো লুটের সম্পত্তির অবস্থান থেকে সম্মানিত স্ত্রীর মর্যাদা। লাভ করলো সম্পত্তিতে ন্যায্য অধিকার। ব্যবসায়-বাণিজ্যে, শিক্ষা-দীক্ষা, যুদ্ধ-বিগ্রহসহ সর্বত্র পুরুষের পাশাপাশি নারীর অধিকার নিশ্চিত হলো। শুধু তাই নয়, বলা হয়েছে, 'নারীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো'। (আল-হাদিস)।

সুতরাং যার মধ্যে আল্লাহর ভয় রয়েছে সে কখনো নারীর প্রতি সীমালঙ্ঘন করতে পারে না। একজন নারী কেমন স্বামীকে নিজের জন্য পছন্দ করবে-এ প্রশ্নের উত্তরে ইসলামের শিক্ষা হলো, যে আল্লাহকে বেশি ভয় করে। কারণ, যে স্বামী আল্লাহকে বেশি ভয় করবে সে পছন্দ না হলেও স্ত্রীর প্রতি অসদাচরণ করতে কখনো সাহস করবে না আর পছন্দসই স্ত্রী হলেতো কথাই নেই।

মোটকথা, ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য অকল্পনীয়। সুতরাং জ্ঞান অর্জন ও বিতরণের ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষের ন্যায্য অধিকার সংরক্ষিত।

ইসলামের প্রথম বাণী 'পড়'। এ নির্দেশ ইসলামের সকল অনুসারীর উপর সমভাবে প্রযোজ্য, হোক না সে পুরুষ কিংবা নারী। 'জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশেও যাও'। (আল-হাদিস)

এতেও নারী-পুরুষের পার্থক্য করে নির্দেশ দেয়া হয়নি বরং আরো পরিষ্কার করে বলা হয়েছে প্রত্যেক 'নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয' (আল হাদিস) এ উক্তির মাধ্যমে। সুতরাং যতটুকু জ্ঞানার্জন ফরজ তা আয়ত্ব করার পাশাপাশি অধিকতর জ্ঞানার্জন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই উৎসাহিত করা হয়েছে এ প্রগতিশীল ধর্ম ইসলামে। বলা হয়েছে 'দোলনা থেকে কবরে যাওয়া পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো।' (আল হাদিস)

আরো বলা হয়েছে, 'জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও শ্রেয়।' (আল-হাদিস)

এ সকল নির্দেশ শুধু উম্মতের জন্য বিতরণ করেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি বরং তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী, মুমিনদের মা হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহাকে সে যুগের শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানী গুণীদের পর্যায়ে উন্নীত করে যান যে, পরবর্তীকালে এ মহীয়সী রমণীর গৃহ আরবের এক খ্যাতনামা শিক্ষাঙ্গন হয়ে উঠেছিলো। উচ্চ মর্যাদায় পুরুষ সাহাবী এবং নারী নির্বিশেষে অসংখ্য জ্ঞান-পিপাসু তাঁর কাছে ধরণা দিতেন অজানাকে জানার জন্যে। সমসাময়িক আইন বিজ্ঞান, হাদীস শাস্ত্র, কাব্য সাহিত্য এবং কুরআনুল কারীমের একজন শীর্ষ প-িত হিসেবে তাঁর খ্যাতি সমগ্র মুসলিম জাহানে ছড়িয়ে পড়েছিল। মুসলিম ফরায়েজ তথা উত্তরাধিকার আইনে তাঁর কোনো তুলনা ছিলো না। অথচ এ ফরায়েজ সংক্রান্ত জ্ঞানে প্রভুত্ব করতে গণিত শাস্ত্রেও অগাধ জ্ঞান থাকা ছিলো অপরিহার্য। তাই সমসাময়িক কালের একজন গণিত শাস্ত্রবিদও ছিলেন মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা। যা বর্তমান সময়ের বিবেচনায় নেহায়েৎ ক্লাস ফোর-ফাইভ পাস পর্যন্ত লেখাপড়ার অশুভ মনগড়া নসিহতের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের আমির মৌলানা আহমদ শফি মেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষার পরিবর্তে ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া শেখার যে নসিহত করেছেন এবং যে তেতুল তত্ত্ব নারীদের ব্যাপারে অশালীন ও অমার্জিত উপমায় ঘোষণা করেছেন তা নারীদের ব্যাপারে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এটাকে বরং নারী বিষয়ক ওহাবী কওমী তত্ত্ব কিংবা তালেবানী নারী তত্ত্ব বলা যেতে পারে। এ তত্ত্বের প্রভাব মুসলিম সমাজে বড় ধরনের সঙ্কটের জন্ম দিতে সক্ষম। এ ওহাবী মোল্লারা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় ইংরেজি শিক্ষাকে হারাম ফতোয়া দিয়ে একবার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এমনভাবে পিছিয়ে দিয়েছিল যে, তারা শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলো। যার রেশ শত শত বছর পর্যন্ত মুসলমানদের টানতে হয়েছিলো অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে। আজ আবারও মুসলিম নারীদের উচ্চ শিক্ষা বন্ধ করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে; যা এ প্রতিযোগিতামূলক গ্লোবাল বিশ্বে মূলতঃ মুসলিম নারীদেরই সর্বনাশ ডেকে আনবে। আজ যদি জিজ্ঞেস করা হয় মৌং শফি সাহেব আপনার মেয়েকে, স্ত্রীকে কিংবা পুত্রবধূকে পুরুষ ডাক্তারের কাছে পাঠাতে আগ্রহী নাকি মহিলা ডাক্তারের কাছে? যদি প্রাইমারীতে মেয়ের লেখাপড়া সাঙ্গ করে দিতে হয় তবে নারী ডাক্তার পাবেন কোথায়? নাকি পুরুষ ডাক্তারের কাছে পাঠাতে চান আপনার হেরেমের (তথাকথিত তেতুলের চেয়েও খারাপ) নারীদের।

এ অবস্থায় পুরুষ ডাক্তারেরই বা কী অবস্থা হবে? সুতরাং এসব ওহাবী তত্ত্বের ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে ইসলামের মূলধারার শিক্ষা তালাশ করতে হবে, এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের দাবি। কুরআন-সুন্নাহ-ইজমা-কিয়াস ও ইজতেহাদ অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরাই সুনি্ন মুসলমান। আর ইজমা-কিয়াস-ইজতেহাদের সুযোগ রাখা হয়েছে পৃথিবীর যে কোনো ক্রান্তিকালের যে কোনো আধুনিক সমস্যার সহজ সমাধান কোরআন-সুন্নাহর আলোকে নিশ্চিত করতে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এ অগ্রসর বিশ্বে ইসলাম একশত ভাগ নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম উক্ত আইনি উৎস সমূহের চর্চার মাধ্যমে। তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মনে করে অবশ্যই নারী তাঁর সামর্থ্য এবং পরিস্থিতি বিবেচনা সাপেক্ষে, শালীন পোশাক ও পর্দা বজায় রেখে ঘরের বাইরে প্রয়োজনের তাগিদে, রিজিকের সন্ধানে এবং জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে বের হতে পারবে। তবে অবশ্যই নারীর জন্যে পৃথক পরিবেশ সর্বক্ষেত্রেই নিরাপদ, মানানসই এবং স্বস্তিকর। দেশে যত বেশি মহিলাদের জন্যে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ ইত্যাদি গড়ে উঠবে ততবেশি তারা উচ্চ শিক্ষার ব্যাপক সুযোগ লাভ করবে এবং আগ্রহী হবে, যা আজ বিবেচনায় রাখা সময়ের দাবিও বটে।

তাই, দেশের নারী সমাজকে বলবো, ওহাবীবাদী নারী তত্ত্বকে ইসলামের বাণী মনে করে ভুল করবেন না। তারা তো ইসলামের ধ্বংস সাধনের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে ইসলামের শক্রদের সাথে হাত মিলিয়ে। আজ ইসলামের বিরুদ্ধে ইউরোপ-আমেরিকায় যেসব মিডিয়া সন্ত্রাস শুরু হয়েছে তা আরো শক্তিশালী হবে নারী জাতিকে অপমান করে দেয়া আহমদ শফি সাহেবের 'তেতুল তত্ত্বে'র কারণে। তারা অহরহ চলচ্চিত্র, কার্টুনসহ নানা মাধ্যমে ইসলাম নারী বিদ্বেষী এবং মুসলিমরা সন্ত্রাসী বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে, আর এ দুই ভিত্তিহীন অভিযোগের যাবতীয় মাল-মসল্লা সরবরাহের দায়িত্ব নিয়ে বিশ্বব্যাপী সক্রিয় রয়েছে ওহাবী জঙ্গিরা। সুতরাং তাদের উগ্রতা এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে ইসলামের সঠিক অবস্থান ও ব্যাখ্যা ঘরে ঘরে পেঁৗছাতে না পারলে মানুষ এ বাতিল মতবাদকেই ইসলাম মনে করে ভুল করবে এবং ইসলামের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে নাস্তিক-মুরতাদ হয়ে যেতে পারে।

তাই আসুন, এসব ওহাবী জঙ্গীদের শিক্ষা ও নসিহতকে প্রত্যাখ্যান করি। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মতাদর্শের আলোকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা সর্বত্র ছড়িয়ে দেই। নারীর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা ইসলামের সুমহান আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করি।

লেখক : প্রধান মোহাদ্দেছ,

ছোবহানিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৬২৯২৪২
পুরোন সংখ্যা