চাঁদপুর। শুক্রবার ১৪ জুলাই ২০১৭। ৩০ আষাঢ় ১৪২৪। ১৯ শাওয়াল ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • আজ ভোরে অ্যাডঃ এ.বি.এম. মোনাওয়ার উল্লা মৃত্যুবরন করেছেন (ইন্নালিল্লাহে.....রাজেউন)। তাঁর মৃত্যুতে চাঁদপুর রোটারী ক্লাব ও চাঁদপুর ডায়াবেটিক সমিতির পক্ষ থেকে গভীর শোক জানিয়েছেন
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৮৩। ইহা আখিরাতের সেই আবাস যাহা আমি নির্ধারিত করি তাহাদের জন্য যাহারা এই পৃথিবীতে উদ্ধ্যত হইতেও বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে চাহে না। শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।    


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


সৎ এবং চরিত্রবান নাগরিক দেশের গর্ব


                                    -ড্রাইডেন।

যে ব্যক্তির স্বভাবে নম্রতা নেই সে সর্বপ্রকার কল্যাণ হইতে বঞ্চিত


সত্যের পথিক খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)
১৪ জুলাই, ২০১৭ ১৯:১৭:৪৮
প্রিন্টঅ-অ+
প্রাথমিক জীবনী

ছুফি চিশতি খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর নাম সাইয়েদ মইনুদ্দীন হাসান। তিনি ১৪ই রজব ৫৩০ হি. মোতাবেক ১৮ এপ্রিল ১১৩৬ খ্রিঃ সোমবার দিন সিনজারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সাইয়েদ গিয়াসুদ্দীন (রহঃ) সিনজারের বিজ্ঞ আলেম ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)-এর বংশধর ছিলেন। তার মাতা সাইয়েদা বিবি উম্মুল ওয়ারা মাহে নূর ইমাম হাসান (রাঃ)-এর বংশধর ছিলেন। হুজুর গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) স্বীয় পিতার তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা পূর্ণ করেন এবং কুরআন শরীফ হেফজ করেন। অতঃপর মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি ফিকহ্, হাদীস ও তাফসীরের জ্ঞান অর্জন করেন। চৌদ্দ বছর বয়সেই তাঁর সম্মানিত পিতা হযরত সাইয়েদ গিয়াসুদ্দীন (রহঃ) ইন্তেকাল করেন। এর কিছুদিন পর তার সম্মানিত মাতাও দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।

তাঁর পিতা থেকে মিরাছ হিসাবে একটি পানচাক্কি ও খেজুরের বাগান পান। তিনি তা দেখাশোনা করতেন এবং তা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে গরিব, মুসাফির ও অভাবীদের খেদমত করতেন। তখন পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ ছিল। তাতারীরা চতুর্দিকে লুটতরাজ ও লুন্ঠন করে বেড়াতো এবং মানুষদেরকে গাজর ও মুলার ন্যায় কাটত। এই পরিস্থিতির ব্যাপারে অবগত হয়ে হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) আন্তরিকভাবে ব্যথিত ও শোকাহত হন। আল্লাহ তা’আলার স্মরণের সাথে সাথে আল্লাহ তা’আলার বান্দাদের খেদমতে নিয়োজিত থাকতেন। গরিব, মুসাফির ও অভাবীদেরকে নিজের বাগানে এনে আহারের ব্যবস্থা করতেন এবং তাদের প্রয়োজন পূর্ণ করতেন। এই ধারাবাহিকতা আজও খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর দরবারে অব্যাহত রয়েছে। দুনিয়াবি


একদিন তাঁর বাগানে এক বুযুর্গ মাহ্যূব হযরত ইবরাহীম কান্দুযী (রহঃ) আগমন করেন। তিনি তাঁকে গাছের ছায়ায় বসালেন এবং ঠা-া পানি ও আঙ্গুর ফল দ্বারা মেহমানদারি করালেন। হযরত ইবরাহীম কান্দুযী (রহঃ) তাঁর আপ্যায়নে খুশি হয়ে স্বীয় থলি থেকে চামড়ার একটি টুকরা বের করে নিজের মুখে নিয়ে চাবান এবং তা নিজের মুখ থেকে বের করে হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)কে দিলেন এবং তিনি খেয়ে ফেলেন। কিছুক্ষণ পর মাহ্যূব চলে গেলেন, কিন্তু হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর অন্তর দুনিয়া থেকে বিমুখ হয়ে গেল এবং তিনি দুনিয়াবি সকল কাজ কর্ম পরিহার করে আল্লাহ্ তা’আলার স্মরণে ইলম্ অর্জনের সিদ্ধান্তে উপনতি হন। তিনি স্বীয় বাগান ও পানচাক্কি বিক্রয় করে যে পয়সা হস্তগত হয়, তা থেকে কিছু নিজের কাছে রেখে বাকি সকল পয়সা গরিব ও অভাবীদের মাঝে বন্টন করে দেন। 

সত্য ও ইল্ম অন্বেষণে সফরে রওয়ানা

তিনি তৎকালীন বিপদ-সঙ্কুল পথ অতিক্রম করে ইল্ম অর্জনের জন্য দিক-দিগন্তে ছুটে বেড়ান। হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর অন্তরে ইল্ম অর্জনের প্রকৃত আগ্রহ ও উদ্দীপনা ছিল। এজন্য  নির্ভয়ে ও নির্দ্বিধায় সফর পুরা করেন। তৎকালীন ইল্ম ও আদবের কেন্দ্র সমরখন্দ ও বোখারায় ছিল। তিনি সেখানে পৌঁছে ফিকহ্, হাদীস, তাফসীর ও অন্যান্য দর্শন বিদ্যায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।  

হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর প্রসিদ্ধ উস্তাদ ছিলেন হযরত মাওঃ হুসামুদ্দীন (রহঃ)। তাছাড়াও তিনি ইরাক ও অন্রঅন্য পবিত্র ভূমিসমূহেও ভ্রমণ করেন এবং সে যুগের সকল বিজ্ঞ আলেমগণের কাছে ইল্ম অর্জন করেন। প্রয় বত্রিশ বছর বয়সে তাঁর শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তারপর তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন। 


সত্যের সন্ধান

সত্যের সন্ধান ও আল্লাহ তা’আলার গোপনীয় রহস্যাবলী জানার আগ্রহ হয়। তার জন্য পার্থিব জ্ঞান নয় বরং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রয়োজন। আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য আধ্যাত্মিক শিক্ষক অর্থাৎ পীর-মুরশিদের প্রয়োজন হয়। এই কারণেই হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) পীরের অনুসন্ধানে সফর শুরু করেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) ‘আনিসুল আরওয়াহ’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, প্রার্থনাকারী মঈনুদ্দীন হাসান সিনফি বাগদাদ শহরে খাজা জুনাইদ বাগদাদী (রহঃ)-এর মসজিদে হযরত কাজা উসমান হারুনী (রহঃ)-এর সাক্ষাতে ধন্য হন। তখন প্রসিদ্ধ ওলামাগণও উপস্থিত ছিলেন। যে ব্যক্তি-ই যমিনের উপর মাথা রেখেছে, সে-ই সৌভাগ্যবান হয়েছে। তিনি বলেন, হে মঈনুদ্দীন! নতুন অযু করে এইভাবে দুই রাকাত নামায আদায় কর যে, প্রথম রাকাতে সূরায়ে ফাতেহা একবার, সূরায়ে ইখলাছ এক হাজার বার এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরায়ে ফাতেহা একহাজার বার ও সূরায়ে ইখলাছ একবার পড়। হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) এইভাবে আদেশ পালন করেন। তারপর বলেন যে, একশতবার দুরূদ শরীফ উভয় জগতের সরদার মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নিকট হাদিয়া পাঠাও। 

তারপর হযরত খাজা তার হাত ধরে কেবলার দিকে মুখ করে বলেন, “হে মঈনুদ্দীন! আমি তোমাকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি এবং আল্লাহর দরবারে কবুল করিয়ে দিয়েছি।” মুরীদ হওয়ার পর খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) স্বীয় পীর ও মুর্শিদের আদেশ পালনে এক মুহূর্তের জন্যও গাফেল হননি এবং দিবারাত্র পীরের খেদমতের জন্য সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন। এমনিভাবে বিশ বছর পীরের খেদমতে অতিবাহিত হয়। যেখানেই পীর গমন করতেন তিনি তার সামান মাথায় রেখে পিছে পিছে চলতেন। তিনি নিজে কুতুবদ্দীন বখতিয়ার কাকি (রহঃ)-এর নিকট বলেছেন, “হে কুতুবুদ্দীন! যখন এই অধম স্বীয় পীর ও মুর্শিদের খেদমতে উপস্থিত হয়, তখন বায়াতের কালে দীর্ঘ বিশ বছর খেদমত ও সান্নিধ্যের দ্বারা সৌভাগ্যবান হয়। ঐ সময় ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও শান্তি নিজের উপর হারাম করেছি। দিবারাত এক বরাবর ছিল। সর্বদা নিবাসে ও সফরে বিছানা ও পাথেয় এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র মাথায় রাখেন ও উপস্থিত থাকেন এবং পীর ও মুর্শিদের আদেশ পালন করা নিজের দায়িত্ব মনে করেন আর এই খেদমতের উছিলায়-ই আল্লাহ তা’আলা এই নেয়ামত দান করেন যার কোন সীমা নেই। সুতরাং এই সকল নেয়ামত খেদমতের প্রতিদান।” হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) এক জায়গায় বলেন, “আমি মসজিদে জুনাইদে হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ)-এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেছি। 


খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) কয়েক বছর অযুর সাথে ছিলেন। তিনি তাঁর পীর ও মুর্শিদের যে খেদমত করেছেন, তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। হযরত খাজা উসমান হারুনী হুজুর (সাঃ) থেকে যে বরকতসমূহ চিশতিয়া খাজাগণের নিকট আসছিল, তা খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)কে দান করেন। এই বরকতসমূহ দান করে তাঁকে খলিফা ও গদিনশীন বানান। লাঠি ও জায়নামাজ তাকে দান করে বলেন, “এই বরকতগুলো আমাদের তরিকতের সম্মানিত পীরদের স্মৃতিস্বরূপ; যেগুলো রাসুল (সাঃ) থেকে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং আমি তোমাকে দান করছি। এগুলো নিজের কাছে রাখবে, যেমন আমরা রেখেছি। যদি কখনো কোন উপযুক্ত ব্যক্তি পাও, তাহলে তাকে দান করে দিবে।” 

এখানে কিছুদিন অবস্থানের পর স্বীয় পীর ও মুর্শিদের সাথে তিনি বাগদাদ চলে গেলেন। সেখানে হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) একটি কামরায় অবস্থান করলেন যেখানে হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) ব্যতিত অন্য কারো প্রবেশ ও সাক্ষাতের অনুমতি ছিল না। তিনি দৈনিক তার দরবারে আগমন করতেন এবং আপন পীর ও মুর্শিদের বাণী সংকলন করতেন। আঠাশ দিন পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। এমনিভাবে ‘আনীসুল আরওয়াহ’ কিতাবটি সংকলিত হয়। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) স্বীয় পীর ও মুর্শিদের সং¯্রবে থেকে দীর্ঘ বিশ বছর সফরে অতিবাহিত করেন এবং পীরের খেদমতে নিয়োজিত থাকেন। তিনি বুখারায় গমন করেন। যেখানে কয়েকজন ওলামায়ে কেরামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) বলেন, “তাদের মধ্যে থেকে একজন অন্য জগতের বুযুর্গ ছিলেন, তার প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করা সাধ্যের বাহিরে। 

তিনি হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) ও অন্য একজন দরবেশের সাথে ‘আউশ’ পৌঁছেন। সেখানে শেখ বাহাউদ্দীন আউশী (রহঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি অনেক বড় একজন বুযুর্গ ছিলেন। তাঁর খানকা থেকে কেউ খালি হাতে ফিরত না। বিদায়কালে তিনি এই উপদেশ দান করেন যে, ‘হে দরবেশ! তুমি যা কিছু পেয়েছ, আল্লাহ তা’আলার পথে খরচ কর। ধন-সম্পদ জমা করো না। আল্লাহর বান্দাদের জন্য আহার-খাদ্য ব্যবস্থা কর, তাহলে আল্লাহ তা’আলার প্রিয় পাত্র হয়ে যাবে। তারপর তিনি বদখশায় গমন করেন। সেখানে এমন একজন বুযুর্গের সাথে সাক্ষাৎ হয়, যিনি হযরত জুনাই বাগদাদী (রহঃ)-এর সমকক্ষ ছিলেন। তার বয়স প্রায় একশত বছর ছিল। তার এক পা কাটা ছিল। তার কারণ, তিনি নিজে বলেন যে, একবার আমি প্রবৃত্ততাড়িত হয়ে ঐ পাটিকে ‘সওমার’ বাহিরে রাখি। হঠাৎ অদৃশ্য থেকে আওয়াজ আসল, “হে প্রার্থনাকারী! এটাই অঙ্গিকার ছিল, যা তুমি ভুলে গিয়েছিলে। আমি তখন এই পা’টি কেটে ফেলে দেই। এই ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে চল্লিশ বছর পূর্বে। এখনও আমি ভাবছি, কেয়ামতের দিন আল্লাহর অলিদেরকে কিভাবে আমার চেহারা দেখাব। 


অতঃপর খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) স্বীয় পীরের সাথে বাগদাদে আসেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। ইতিমধ্যেই পীর ও মুর্শিদ সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) বলেন যে, “কয়েকদিন পর পীর-মুর্শিদ (রহঃ) পুনরায় সফরের ইচ্ছা পোষণ করেন। আমি আরো অতিরিক্ত দশ বছর সফরের বিছানা ও পানপাত্র মাথায় রেখে সাথে থাকি। যখন তিনি আউশ ভ্রমণ করেন, তখন তার ও খাজা উসমান (রহঃ)-এর আগমনের সুসংবাদ গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। তাদেরকে এক নজর দেখার জন্য লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) একবার হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ)-এর সাথে দামেশকে যান। ঐ সফর সম্পর্কে তিনি বলেন যে, একবার হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) ও শেখ আহাদুদ্দীন কিরমানী (রহঃ) মদীনা মুনাওয়ারার পথে যাচ্ছিলেন। যখন দামেশক শহরে পৌঁছেন, দামেশকের জামে মসজিদের সামনে বার হাজার নবীগণের মাজার আছে। তাদের মাজার জিয়ারতের উছিলায় আল্লাহ্ তা’আলা মানুষের মনোবাসনা পুরা করতেন। উভয় বুযুর্গ এই মাজারসমূহ জিয়ারত করেন এবং সেখানকার বুযুর্গদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই সফরেই শেখ নাজমুদ্দীন কুবরা (রহঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং কয়েকমাস সেখানে অবস্থান করেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) তার পীর ও মুর্শিদের সাথে বাগদাদে আসেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং বাইতুল্লাহ পৌঁছে হজের কার্যাবলী পূর্ণ করেন। হজের পর তাওয়াফ সমাপ্ত করে হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর হাত ধরে এই দুআ’ করলেন, “হে আল্লাহ! আমি আমার মুরীদ মইনুদ্দীনকে আপনার দরবারে পেশ করলাম। আপনি কবুল করুন এবং আমার থেকেও অধিক প্রসিদ্ধি দান করুন। যা কিছু আমাকে দান করতেন, তা তাঁকে দান করুন। অদৃশ্য থেকে আওয়াজ হলো, “আমি কবুল করেছি।” 


হজ সমাপ্ত করার পর খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) স্বীয় পীর ও মুর্শিদের সাথে মদীনা শরীফে রাসুলে পাক (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হন। তাঁর পীর ও মুর্শিদের আদেশে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর দরবারে সালাম পেশ করেন। উত্তর আসল, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম, হে জল-স্থলের বাদশাহ কুতুবুল মাশায়েখ! নবী করিম (সাঃ)-এর দরবার থেকে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর প্রতি হুকুম হয়, “হে মুইনুদ্দীন, তুমি ধর্মের সাহায্যকারী ও সহযোগী। যাও, হিন্দুস্থানের রাজত্ব তোমার অধিনে।” পরে ক্ষমতাবান আল্লাহ তা’আলার আদেশে হিন্দুল অলি উপাধিতে ভূষিত করেন এবং হিন্দুস্থানে তার প্রতিনিধি নির্ধারণ করেন। এই আদেশের পর তিনি স্বীয় পীর ও মুর্শিদ খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) থেকে সফরের অনুমতি নেন। তখন তিনি তার এক বিশেষ মুরিদ এবং খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর ফুফাতো ভাই হযরত খাজা ফখরুদ্দীন গারদীযি (রহঃ)কে সাথে

 

 

নিয়ে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)কে বলেন, ইহা আমার হাদিয়া, তাকে নিজের সাথে রাখবে। হযরত খাজা ফখরুদ্দীন গারদীযি (রহঃ)কে বলেন, “যেখানে আমার খেদমত করেছ, তেমনিভাবে মুইনুদ্দীনেরও খেদমত কর। উভয়ে পীরের আদেশ এমনিভাবে যথাযথ পালন করেছেন। যা আজমিরের খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর আস্তানার খাদেমদেরকে দেখে অনুমান করা যায়। হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)কে বিদায় দিলেন এবং তিনি নিজে মক্কায় অবস্থান করেন। সেখানেই তিনি আল্লাহ তা’আলার স্মরণে জীবন অতিবাহিত করেন এবং মসজিদের পাশে জান্নাতুল মুআল্লায় চিরনিদ্রায় শায়িত হন। 


তিনি যখন বাগদাদ পৌঁছেন, তখন শেখ শিহাবুদ্দীন উমর সোহরাওয়ার্দি (রহঃ) এবং কিরমানের বুযুর্গ শেখ আহাদুদ্দীন কিরমানী (রহঃ)ও বাগদাদে উপস্থিত ছিলেন। এই তিনজন বুযুর্গ একে অপরের সাহচর্যে থেকে পরস্পর আধ্যাত্মিক ফায়েয হাছিল করেন। বাগদাদে অবস্থানকালে তার প্রধান খলিফা হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহঃ) মসজিদে আবু লাইসে মুরিদ হন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) বাগদাদে এরূপ দয়া ও বদান্যতার সমুদ্র প্রবাহিত করেন, যা থেকে সকল ইলমে মা’রেফাতের তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিবর্গ তৃষ্ণা নিবারণ করেন। 

এরপর তিনি হিন্দুস্থানের সফরে রওয়ানা হলেন। তিনি জনবসতি ও লোকজন থেকে পৃথক থাকার চেষ্টা করতেন। সেখান থেকে তিনি হামদান পৌঁছেন। সেখানে হযরত শেখ ইউসুফ হামদানী (রহঃ) অবস্থান করতেন। তিনি বুযুর্গদের মধ্যে অন্যতম একজন বুযুর্গ ছিলেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) তার সাথেও সাক্ষাৎ করেন। কিছুকাল হামদানে অবস্থান করার পর তিবরীজ পৌঁছেন। সেখানে তিনি শেখ আবু সাইদ তিবরীজী (রহঃ)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। তিবরীজে অবস্থান করার পর ইসফাহান যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। সেখানে শেখ মাহমুদ ইসফাহানী (রহঃ)-এর সং¯্রবে থাকেন এবং কয়েকদিন সেখানে অবস্থান করেন। সেখান থেকে তিনি খোরাসান পৌঁছেন এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভ্রমণ করে হেদায়েতের কাজ আঞ্জাম দেন। যখন তিনি সেখান থেকে রওয়ানা হন, তখন উসতারাবাদ পৌঁছেন। তখন সেখানে শেখ নাসিরুদ্দীন উসতাবারাদী (রহঃ) অবস্থান করছিলেন। তিনি দুই মাধ্যমে হযরত বায়জিদ বোস্তামী (রহঃ)-এর মুরিদ ছিলেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ তার সাথেও কয়েকিদন আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। 


উসতারাবাদ থেকে রওয়ানা হয়ে তিনি হেরাত পৌঁছেন। সেখানে হযরত আবদুল্লাহ আনছারী (রহঃ)-এর দরগায় রাত্রিযাপন করতেন এবং ফজরের পরে আশেপাশের অঞ্চলে যাতায়াত করতেন। এই সফরে তিনি বেশিরভাগ সময় কবরস্থানে অবস্থান করতেন এবং লোকালয় থেকে দূরে থাকতেন। যখন আশেপাশের লোক তাঁর অবস্থা জেনে তাকে ঘিরে ফেলত এবং সর্বদা তার সাক্ষাৎ দ্বারা চক্ষু শীলত করত ও উদ্দেশ্যাবলী পূর্ণ করত। তখন তিনি সেখান থেকে প্রস্থান করে অন্য স্থানে গমন করতেন। হেরাত থেকৈ তিনি সাবযওয়ার পৌঁছেন। সেখানের শাসক অনেক অত্যাচারী ছিল। আকিদাগতভাবে শিয়া ছিল। গরিব ও অসহায় লোকদের উপর অত্যাচার করত। 

খাজা গরিবে নেওয়অজ (রহঃ) সবযওয়ার পৌঁছে সরাসরি এই শাসকের বাগানে প্রবেশ করেন। বাগানের পাহারাদাররা বলল যে, জনাব আপনি এখান থেকে চলে যান। এখানের শাষক শেখ মুহাম্মদ ইয়াগদার বড় যালেম। হতে পারে সে আপনাকে হত্যা করে ফেলবে। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) সেখানেই আরাম করেন। সন্ধ্যায় যখন শাসক আসল, খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর সাথে বেয়াদবিমূলক কথাবার্তার চেষ্টা করল। সে তাঁর চোখের উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। তিনি পানি চাইলেন এবং কিছু পরে দম করলেন। তারপর তার মুখের উপর ছিটিয়ে দিলেন। তখন তার জ্ঞান ফিরল। জ্ঞান ফেরার পর সে তাঁর পায়ের উপর লুটিয়ে পরে ক্ষমা চাইল। তিনি তাকে তওবা করালেন এবং বায়াত করিয়ে চিশতিয়া তরিকায় ও হানাফী মাসলাকে প্রবিষ্ট করান। তিনি যখন সেখান থেকে রওয়ানা হলেন তখণ শেখ মুহাম্মদ ইয়াদগার (রহঃ) খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) থেকে খেলাফত লাভ করেন। শেখ মুহাম্মদ ইয়াদগার (রহঃ) শাদমান দুর্গ পর্যন্ত এসে তাঁকে বিদায় জানান। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) ঐ এলাকার দায়িত্ব তার উপর অর্পণ করে সামনে অগ্রসর হন। 

১০

সেখান থেকে বিদায় নিয়ে তিনি বলখ পৌঁছেন। সেখানকার প্রসিদ্ধ খানকাহ- খানকাহ-এ আহমদ খাযরাখীতে অবস্থান করেন। হযরত ্হামদ খাযরাযী (রহঃ) অনেক প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ছিলেন। তিনি হযরত ইবরাহীম আদহাম বলখী (রহঃ) ও বায়জীদ বোস্তামী (রহঃ)-এর সাক্ষাৎ লাভে সৌভাগ্যবান হয়েছিলেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) বলখের পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে এক দার্শনিকের চিকিৎসা করেন। বাতাসে উড়ে তিনি গ্রামের বাইরে গমন করলেন। সেখানে শিকার করলেন এবং খাজা ফখরুদ্দীন গারদিঘী (রহঃ) কাবাব বানালেন। সে দার্শনিক- যার নাম যিয়াউদ্দীন ছিল নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত। বিশেষ করে সে ছুফিয়ায়ে কেরামদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করত। সে যখন ছুফিয়ায়ে কেরামের আগমনের সংবাদ শুনল, তখন খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর সাথে বাহাছ (বিতর্ক) করার জন্য এসে বসল। 

খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) এটি কাবাব খাওয়ালেন। তখন সে তার সকল দার্শনিক বিদ্যা ভুলে গেল এবং জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটে পড়ল। তারপর যখন জ্ঞান ফিরে আসল, তখন খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর পায়ে লুটিয়ে পরে ক্ষম চাইল ও মুরিদ হল এবং সে পরবর্তীতে খলিফাদের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) গযনিতে গমন করেন। গযনিতে তখন হযরত খাজ াআব্দুল ওয়াহেব (রহঃ) বড় প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ছিলেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিছুকাল হযরত খাজা আব্দুল ওয়াহেদ (রহঃ) খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর মেহমানদারি করেন এবং উভয় বুযুর্গ আধ্যাত্মিক ও নূরানী সভা প্রতিষ্ঠা করেন। 

আফগানিস্তান যাওয়ার পর খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) চিশতিয়া তরিকার বড় বড় চারজন বুযুর্গের মাযারে উপস্থিত হন এবং তাদের থেকেও আধ্যাত্মিক ফায়েয হাছিল করেন। অনেক কম লোক এই উপস্থিতি বর্ণনা করেছেন। সুতরাং সেখান থেকে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) মুলতান পৌঁছেন এবং কিছুকাল সেখানে অবস্থান করেন। তারপর সেখান থেকে লাহোরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সেখানে সাইয়েদ আলী হাজরাযী (রহঃ)-এর খানকায় অবস্থান করেন। তিনি লাহোরের অনেক বড় ও প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ছিলেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) সেখানে চিল্লাও পুরা করেন এবং তার প্রশংসায় একটি ফার্সী কবিতাও রচনা করেন। যার কারণে তাকে ‘দাতা ছাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। 

কবিতাটির অনুবাদ : 

পৃথিবীতে আল্লাহর নূরে প্রকাশিত হয় অনেক গুপ্তধন দানকারী 

অনেক হীনমন্য ব্যক্তিদেরকে পীরে কামেল পূর্ণাঙ্গ 

পথ প্রদর্শনকারী হয়। 

লাহোরে কিছুদিন অবস্থান করার পর এবং চিল্লা পূর্ণ করে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তার সাথে চল্লিশজন দরবেশও ছিল। পাঞ্জাব হয়ে তারা দিল্লীতে পৌঁছেন। দিল্লীতে আরাম করার পর তাঁর বিশেষ বাসস্থান আজমীরের দিকে অগ্রসর হন। 

১১

তৎকালীন শুধু আজমীরই নয়, পুরা ভারতবর্ষে অপবিত্রতা ও ব্যাপক বিশৃংখলার পরিবেশ ছিল। ভারতবর্ষে অনেক আল্লাহর অলি বিগত হয়েছেন, যারা একত্ববাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানকার লোকেরা এই শিক্ষা ভুলে একাধিক খোদার উপাসনা শুরু করেছিল। খাজা গরিবে নেওয়াজ ঐ অবস্থায় সেখানে আগমন করে দ্বীনের প্রচার প্রসার করেন। মানুষকে মানুষের সাথে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা দেন। দুঃখী ও ব্যথিতদেরকে সমবেদনা জানান। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) এসে জাদুকরদের মোকাবেলা করেন, যেমনিভাবে হযরত মুসা আ. ফিরআউনের জাদুকরদের মোকাবেলা করেছিলেন এবং তাদেরকে একত্ববাদের দিকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। আল্লাহ তা’আলার বিধানাবলী এবং নবী করিম (সাঃ)-এর নির্দেশিত পথে জীবন-যাপন করার জন্য ঐ জাদুকরদেরকে দাওয়াত দেন। মানবতা, ভ্রাতৃত্ব ও নিরপত্তার পয়গাম দেন। এখানে এসে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর জীবন হুজুর (সাঃ)-এর সুন্নাতের দ্বারা সুসজ্জিত হয়ে পেশ করেন। মানুষের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করেন এবং ভালোবাসার শিক্ষা দেন। হুজুর (সাঃ)-এর হিজরতের পবিত্র জীবন যদি দ্বিতীয়বার দেখতে চান, তাহলে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর আজমীরে হিজরত করে আসার পরবর্তী জীবন দেখুন। উভয়ের পবিত্র জিন্দেগী একই দৃষ্টিতে পরিলক্ষিত হবে। আর হবে না কেন, খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) তো হুজুর (সাঃ)-এর প্রতিনিধি হয়ে এসেছিলেন। তাঁর ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বাণীসমূহ, সাদাসিধে অনাড়ম্বর জীবন যাপন, আল্লাহ্ তা’আলার স্মরণ, আল্লাহ্ তা’আলার বান্দাদের মহব্বত ও শান্তি-শৃংখলার শিক্ষা দেয়। দুঃখী ও ব্যথিতদের প্রতি সমবেদনা জানান। স্বীয় আখলাক চরিত্রের ও ভালোবাসা দ্বারা মানুষের অন্তর জয় করে নেন। গরিব ও অসহায় লোকদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করেন। ক্ষুধার্তদের জন্য পানাহারের ব্যবস্থা করেন। অসহায় ও নিঃস্ব লোকদেরকে আশ্রয় দান করেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) সাদা পোশাক পরিধান করতেন এবং ছেঁড়া পোশাকে তালি লাগাতেন। তিনি অনেক কম আহার করতেন। শুধু যব পানি দ্বারা রান্না করে খেতেন। অথবা শুকনো রুটি পানিতে ভিজিয়ে ভক্ষণ করতেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর পবিত্র জীবন সীরাতে নবী (সাঃ)-এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিল। 

১২

আজমীর পৌঁছে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)  জঙ্গলে একটি গাছের নিচে আরাম করেন এবং তার সাথে কয়েকজন দরবেশও ছিল। ইহা ঐ স্থান, যেখানে বর্তমান দরগা শরীফের আওয়ালি মসজিদ অবস্থিত। তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে আল্লাহ তা’আলার স্মরণে মশগুল ছিলেন। সন্ধ্যা হতেই কয়েকজন লোক এসে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)কে কঠোর ভাষায় ওখান থেকে চলে যাওয়ার আদেশ দিয়ে বলল যে, এখানে আমাদের উটগুলো বসবে। 

খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) অত্যন্ত নরম স্বরে, ভদ্র ভাষায় বললেন, ঠিক আছে, তোমাদের উট এখানেই বসবে। তারপর তিনি তাঁর সাথীদেরকে নিয়ে আনা সাগরের নিকট ঐ পাহাড়ে চলে গেলেন। এই স্থানটি বর্তমানে ‘চিল্লা খাজা সাহেব’ নামে প্রসিদ্ধ। শিহাবুদ্দীন ঘুরী (রহঃ) এখানে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর কদমবুসি করেন। 

এখানেই আনাসাগরের পানি তাঁর এক বিশেষ মুরিদ সাইয়েদ ফখরুদ্দীন (রহঃ)-এর মাধ্যমে এক পেয়ালায় ভরে নিলেন। ঐ স্থানে বসে পানি বন্ধ হওয়ার পর বললেন, ইহা কারবালা নয়। এক যোগী যখন কালেমা পড়ল, তখন তাকে আবদুল্লাহ বায়াবানী নামে আবদালদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। যোগৗ মূর্তির নাম ভাগ্যবর্তী রেখেছিল। তারপর খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) পাহাড় থেকে অবতরণ করে আবদুল্লাহ বায়াবানীর বাড়ির পাশে একটি টিলায় একটি ঝুপড়ি বানালেন। এটা ঐ স্থান যেখানে তার মাজার অবস্থিত। সে স্থানে বসে তিনি পুরো হিন্দুস্থানে তাবলীগের কাজ পরিচালনা করেন। স্বীয় মুরিদ ও খলিফাদেরকে গ্রামে গ্রামে এবং শহরে শহরে পাঠান। আল্লাহ তা’আলার বান্দাদের সেবা করেন এবং সত্য পথ প্রদর্শন করেন। 

খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহঃ)কে দিল্লী, খাজা ছুফি হামিদুদ্দীন (রহঃ)কে নাগূর, কাকি শেখ কুদরতুল্লাহ কে উদ প্রেরণ করেন। শেখ মোহাম্মদ তরক যিনি তার পীর ভাই ছিলেন নারনুল পাঠান। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর প্রসিদ্ধি ও নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি সত্য-পিপাসুদেরকে একত্ববাদের শরাব পান করাতেন। গরিব-দুঃখী ও অভাবীদেরকে সাহায্য করতেন। যে ব্যক্তি একবার তাঁর দর্শন লাভ করেছে, তার সকল দুঃখ-কষ্ট দূর হয়েছে এবং তার অন্তর আলোকিত হয়েছে। 

১৩

নবী করীম (সাঃ)-এর আদেশে তিনি বিবাহ করেন। তার বিবির নাম আমাতুল্লাহ (রহঃ)। তার গর্ভে হযরত খাজা ফখরুদ্দীন (রহঃ), খাজা হিসামুদ্দীন 

 

 

(রহঃ) ও বিবি হাফেজা জামাল (রহঃ) জন্মগ্রহণ করেন। খাজা ফখরুদ্দীন (রহঃ)-এর মাজার ‘আনওয়ার সরাওয়াট’ 

শরীফে। তার উরস শরীফ ছ’য়ে শাবান উদ্যাপিত হয়। হযরত খাজা হিসামুদ্দীন (রহঃ) আবদালদের দলভুক্ত হয়ে গেলেন। অর্থাৎ জগতবাসীর বাহ্যিক দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছেন। হযরত বিবি হাফেজা জামাল (রহঃ)-এর মাজার শরীফ খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর চরণের পাশে। তিনি তার মায়ের গর্ভ থেকেই হাফেজে কোরআন হয়ে জন্মলাভ করেন। তার উরস মোবারক ন’য়ে রজব উদ্যাপিত হয়। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর দ্বিতীয় বিবাহ সাইয়েদ অযীহুদ্দীন মাশহাদী (রহঃ)-এর ছাহেবযাদী সাইয়েদা বিবি এছমতুল্লাহ (রহঃ)-এর সাথে অনুষ্ঠিত হয়। তার গর্ভে খাজা গরিবে নেওয়াজ এর এক পুত্র জন্মলাভ করেন। যার নাম হযরত খাজা জিয়াউদ্দীন আবু সাইদ (রহঃ)। তার মাজার উপরের দিকে খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর পায়ের দিকে অবস্থিত। ১৩ই জিলহজ তার উরস পালন করা হয়। 

হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) স্বীয় নানাজী হুজুর (সাঃ)-এর সুন্নত পালন করেছেন। সন্তান হয়েছে এবং তাদেরকে লালন-পালন করেছেন। তার ছাহেবযাদা হযরত খাজা ফখরুদ্দীন (রহঃ) আজমীর থেকে বিশ মাইল দূরে চাষাবাদ করতেন এবং এর মাধ্যমে নিজের ও পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং সঠিক পথে চলার আদেশ করতেন। হযরত খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) যে বরকতসমূহ হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহঃ) থেকে চিশতিয়া তরিকার বুযুর্গদের মাধ্যমে পেয়েছেন, সেগুলো নিজের প্রাণপ্রিয় খলিফা হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহঃ)কে দান করেন। তিনি তার ইনতিকালের কিছুদিন পূর্বে আদরের ছাহেবযাদা হযরত খাজা ফখরুদ্দীন (রহঃ)কে ডাকেন এবং নি¤œ নসিহত দান করেন-পৃথিবী ও পৃথিবীর মাঝে যা কিছু আছে সবকিছুই ধ্বংসশীল। সর্বদা আল্লাহ তাল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি কামনা কর এবং আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি ব্যতিত পৃথিবীর কোন কিছুর উপর ভরসা করো না। দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য্য ধারণ করো ও স্থির থাকো। 

১৪

খাজা গরিবে নেওয়াজ এর রীতি-নীতি এই ছিল যে, তিনি এশার নামাজ থেকে অবসর হয়ে স্বীয় হুজরা যুবারকে গমন করতেন। পুরো রাত তার হুজরা থেকে আল্লাহ তা’আলার কালামের তেলাওয়াত ও আল্লাহ তা’আলার যিকিরের আওয়াজ অবিরাম আসতে থাকতো। ৬৩২হি. সনে রজব মাসে যখন তাঁর বয়স আটানব্বই হয়, তখন ৫-ই রজব স্বীয় নীতি অনুযায়ী হুজরা বন্ধ করলেন। তাঁর যিকির ও তেলাওয়াতের আওয়াজ বিশেষ খাদেম শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু ফজরের কিছুক্ষণ পূর্বে সে আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। খাদেম দরজায় আওয়াজ দিল। কিন্তু ভিতর থেকে কোন সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না। তখন বিশেষ খাদেম হযরত খাজা ফখরুদ্দীন গরদীযী (রহঃ) অন্যান্য মুরিদদের ডেকে অপারগ হয়ে দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে দেখলেন, আল্লাহ তা’আলার ঐ নেক বান্দা যিনি আল্লাহ তা’আলার লাখো বান্দাদেরকে আল্লাহর পথ প্রদর্শন করেছেন, তিনি নিজেই আল্লাহ তা’আলার দরবারে পৌঁছে গেছেন। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর কপালে স্বর্ণাক্ষরে লিখা ছিল- 

......................

“এই আল্লাহর বন্ধু, যিনি আল্লাহর প্রেমে মৃত্যুবরণ করেছেন।” 

বিশেষ খাদেম খাজা ফখরুদ্দীন গরদীযী (রহঃ) তাকে গোসল দেন। তাঁর ছেলে হযরত খাজা ফখরুদ্দীন সারওয়াড়ী (রহঃ) নামাজে জানাজার ইমামতি করেন। হুজুর (সাঃ)-এর সুন্নতের অনুসরণে। তাঁর হুজরা মোবারকেই তাঁকে চিরন্দ্রায় শায়িত করা হয়। 

১৫

যেভাবে রাসুল (সাঃ)-এর পিঠ মোবারকে মোহরে নবুওয়ত ছিল, তেমনিভাবে আল্লাহ তা’আলার হাবীবের প্রতিনিধি এবং আল্লাহ তা’আলার বিশেষ বন্ধুর কপাল মোবারকে মোহরে ওয়ালায়েত ছিল। খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) সিনযার অঞ্চলে তাওহীদ, ইশকে রাসুল ও মানব সেবার যে প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন, স্বীয় পীর ও মুর্শিদের খেদমতে থেকে যে প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন, ঐ প্রদীপ সূর্যের রূপ ধারণ করে হিন্দুস্থানের অন্ধকারকে আলোকিত করে ভালোবাসা, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের পথ দেখায়। ঐ প্রদীপের আলোর তাঁর পরেও তাঁর মুরিদ ও আস্তানার খাদেমগণ উজ্জ্বল রাখেন। বর্তমানে এই আতঙ্কেরও যুগেও খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) ভালোবাসা, মানবতা ও মানব-সেবার পয়গাম চিশতিয়া তরিকার প্রদীপের আলো সর্বস্তরে পৌঁছানো জরুরি। এই ভালোবাসার প্রদীপ যা খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ)-এর আস্তানায় আজ পর্যন্ত আলোকিত হয়ে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার পয়গাম দিচ্ছে এবং মানুষ মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা দিচ্ছে। 

খাজা গরিবে নেওয়াজ (রহঃ) যে উপদেশসমূহ দান করেছিলেন, যে আদেশবলী করেছিলেন ওইগুলো খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহঃ) একটি কিতাব আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন। যার নাম ‘দলীলুল আরেফীন’। (চলবে)

আজকের পাঠকসংখ্যা
২৫৩২৬১
পুরোন সংখ্যা