চাঁদপুর। শুক্রবার ১০ নভেম্বর ২০১৭। ২৬ কার্তিক ১৪২৪। ২০ সফর ১৪৩৯

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩১-সূরা লোকমান


৩৪ আয়াত, ৪ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২৮। তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।


২৯। তুমি কি দেখ না আল্লাহ রাত্রিকে দিবসে এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত করেন? তিনি চন্দ্র-সূর্যকে করিয়াছেন নিয়মাধীন, প্রত্যেকটি বিচরণ করে নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত; তোমরা যাহা কর আল্লাহ্ সে সম্পর্কে অবহিত।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


ভাষা হল চিন্তার পোশাক।


                               -জনসন।

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে (অথাৎ মুসলমান বলে দাবি করে) সে ব্যক্তি যেন তার প্রতিবেশির কোন প্রকার অনিষ্ট না করে।


"সহীহ হাদীস আমার মাযহাব"
মাযহাবের ইমামগণের বক্তব্য : এর সঠিক বিশ্লেষণ এবং এ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াসের প্রামাণ্য জবাব
বি.এম. মোস্তফা কামাল
১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


"সহীহ হাদীস আমার মাযহাব"



১. কথাটি ইমামগণ থেকে প্রমাণিত কিনা ?



২. কথাটির সঠিক অর্থ কি ?



৩. কী কী ভ্রান্ত অর্থে এ বাক্যটি ব্যবহার করা হচ্ছে ?



১. إذا صح الحديث فهو مذهبى এমন সমার্থবোধক কথা কোনো কোনো ইমামের কথা বলে ফিক্হের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যদি কেউ নির্দিষ্ট করে দাবি করেন যে, ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এ কথা এ শব্দে বলেছেন, তবে তাকে এর সনদ পেশ করতে হবে।



إذا صح الحديث فهو مذهبى                                         এর সঠিক অর্থ



যেহেতু ফিকহের কোনো কোনো কিতাবে কোনো কোনো ইমামের প্রতি সম্পর্কিত করে এ কথাটি বলা হয়েছে, এ জন্যে এ কথাটির সঠিক ব্যাখ্যা মুসলিম উম্মাহর যোগ্য আলিমগণ প্রদান করেছেন।



ইমাম যাহাবী (রঃ) বলেন,  إذا صح الحديث فهو مذهبى       কথাটির অর্থ এই নয় যে, কেউ কোনো হাদীসকে সহীহ বললো আর অমনি তার কথা মেনে নিয়ে আমার পূর্ব বর্ণিত ফিকহী সমাধান থেকে সরে আসলাম। বরং আমার এ কথার অর্থ হচ্ছে- যে হাদীস সকল শর্তসহ সহীহ এবং উক্ত হাদীসের অর্থও সুস্পষ্ট, আমার প্রদত্ত ফিকহী সমাধানের ক্ষেত্রে আমি এমন হাদীসই গ্রহণ করি। (অর্থাৎ, আমি যে ফিকহী সমাধান পেশ করি, ফতওয়া প্রদান করি-তা সহীহ হাদীস অনুযায়ীই করি।)



আরো স্পষ্ট করে বলা যায়- إذا صح الحديث فهو مذهبى  অর্থ হচ্ছে- আমি যে কথা বলি বা আমার প্রদত্ত ফিকহী সমাধান আমার নিজের কথা নয়; বরং এ কথাগুলো রাসূল (সাঃ)-এর সহীহ হাদীস মোতাবেকই। (ইমাম যাহাবী (রঃ) কৃত منا قب الامام ابى حنيفة و صا حبيه ابويوسف و  محمد بن الحسن এর টিকা, পৃঃ ৬৩)



# হাবীব আহমদ কাইরাওয়ানী (রঃ) বলেন, ইমামগণের এ কথা- إذا صح الحديث فهو مذهبى এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে-আমাদের প্রদত্ত প্রতিটি (ফিকহী সমাধান বা মাসয়ালার ) দলিল আমাদের কথা নয়; বরং রাসূল (সাঃ)-এর বাণীই মূল দলিল। অতএব, তোমরা এমন ধারণা করো না যে, আমাদের (মাযহাবের ইমামদের) কথা স্বতন্ত্র দলিল। (আল্লাহ মাফ করুন) রাসূল (সাঃ)-এর কথার বিপরীত আমাদের কোনো কথা হলে আমরা আল্লাহ তায়ালার দরবারে দায়মুক্তি ঘোষণা করছি। তবে এ বাস্তবতা এটি আবশ্যক করে না যে, কোনো ব্যক্তি যে কোনো হাদীসকে সহীহ বলবে আর সেটাই ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর মাযহাব হয়ে যাবে। (মুকাদ্দামাতু ইলায়ুস্সুনান ৬৪ পৃঃ)।



#আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রঃ) তাঁর জগদ্বিখ্যাত রদ্দুল মোহতার (শামী) কিতাবে ইমাম শা'রানী (রঃ) হতে ইমামগণের উক্ত কথা- إذا صح الحديث فهو مذهبى   উল্লেখ করে বলেন এটা কোনো গোপন কথা নয় যে, ইমামগণের এ নসীহত-  إذا صح الحديث فهو مذهبى ঐ সকল ব্যক্তির জন্যে যারা اهلا للنظر তথা কোরআন ও হাদীস ভা-রের উপর ব্যাপক গবেষণার সামর্থ্য রাখেন এবং যে সকল হাদীস আমলযোগ্য তাও তাঁদের নখদর্পণে থাকে। (রদ্দুল মোহতার-শামী)।



# আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রঃ) আরো বলেন, আমার কথা হচ্ছে- ইমামগণের বক্তব্য  إذا صح الحديث فهو مذهبى- শর্ত যুক্ত হওয়া উচিৎ। কেননা যে সমাধানের উপর মাযহাবের ইমামগণ একমত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো ব্যক্তিকে ইজতিহাদের অনুমতি প্রদান করা হয়নি। কারণ হচ্ছে- মাযহাবের ইমামগণের ইজতিহাদ উক্ত ব্যক্তির ইজতিহাদ হতে অধিক শক্তিশালী। এটা পরিষ্কার যে, মাযহাবের ইমামগণের সামনে এমন দলিল ছিল যা উক্ত ব্যক্তির সামনে প্রকাশিত দলিল থেকে অধিক শক্তিশালী। এ কারণেই উক্ত ব্যক্তির সামনে যে দলিল প্রকাশ পেয়েছে, মাযহাবের ইমামগণ সে দলিলের উপর আমল করেন নি।



ইমাম নববী (রঃ) বলেন-



# ইমাম শাফেয়ী (রঃ) যে বলেছেন - إذا صح الحديث فهو مذهبى>إذا صح الحديث فهو مذهبى- এ কথার অর্থ এ নয় যে, যে কোনো ব্যক্তি একটি সহীহ হদীস দেখে বলবে, এটি ইমাম শাফেয়ী রঃ এর মাযহাব এবং সাথে সাথে উক্ত হাদীসের বাহ্যিক অর্থের উপর আমল শুরু করে দিবে। বাস্তব কথা হলো- ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর এ কথা ঐ ব্যক্তির জন্যে-যে مجتهد فى المذهب    এর স্তরে উপনীত। আর তাঁর জন্যে শর্ত হলো-তার প্রবল ধারণা থাকতে হবে যে, ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এ হাদীস অবগত হতে পারেননি। অথবা ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এ হাদীসের বিশুদ্ধতা জানতে পারেননি।



আর এ বিষয়টি জানা যাবে ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর লিখিত সকল কিতাব, তাঁর নিকট থেকে ইল্ম শিক্ষাকারী সকল ছাত্রের লিখিত কিতাব এবং এ জাতীয় আরো যে সকল কিতাব লিখা হয়েছে তা অধ্যয়ন দ্বারা। (অর্থাৎ استقراء تام তথা পূর্ণ অনুসন্ধান প্রয়োজন।) মূলতঃ এ বিষয়টি কঠিন। কম সংখ্যক আলেমই এমন যোগ্যতা রাখেন। মাযহাবের যোগ্য অনুসারী আলেমগণ এমনই শর্ত করেছেন, যা এ মাত্র আমরা উল্লেখ করলাম। কারণ ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর সামনে এমন অনেক হাদীস ছিল যা তিনি দেখেছেন, জেনেছেন, তথাপি উক্ত হাদীসগুলোর বাহ্যিক অর্থের উপর তিনি আমল পরিত্যাগ করেছেন। এটা এ জন্যে হয়েছে যে, তিনি উক্ত হাদীসগুলোর দোষ, রহিত হওয়া, কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হওয়া অথবা এ জাতীয় অন্য কোনো কারণ সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। শায়খ আবু আমের ইবনু সালাহ (রঃ) বলেন-ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর বক্তব্য إذا صح الحديث فهو مذهبى এর বাহ্যিক অর্থের উপর আমল করা সহজ নয়। কেননা কোনো ফকীহ-এর জন্যে বৈধ নয় যে, নিজে স্বাধীনভাবে যে হাদীসকে দলিল মনে করবেন, তার উপর নিজে নিজেই আমল শুরু করে দিবেন।



এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, তা হচ্ছে-অবশ্যই হাদীসে রাসুলের ভিত্তিতেই আমল করতে হবে। তবে হাদীস অনুযায়ী আমল করার তরীকা ২টি :



১. .    الاستقلال بالعمل بالحديثস্বাধীনভাবে নিজে নিজে কোনো হাদীসের উপর আমল করা। ২. اتباع المجتهد للعمل بالحديثث فهو مذهبى কোনো মুজতাহিদের অনুসরণ করে হাদীসের উপর আমল করা।



الاستقلال بالعمل بالحديث যে সবার কাজ নয়-এটা ইলেমের সাথে নূ্যনতম সম্পর্ক আছে এমন সকলের নিকট স্পষ্ট। কারণ, এজন্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এ পরিমাণ যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, যা গ্রহণযোগ্য এবং আহলে ফন হযরতগণ তাঁর যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রদান করবেন। যার الاستقلال بالعمل بالحديث এর যোগ্যতা নেই তার জন্যে তো اتباع المجتهد للعمل بالحديث   তথা কোনো মুজতাহিদের অনুসরণ করে হাদীসের উপর আমল করা জরুরি তথা واجب -এজন্যই اتباع المجتهد للعمل بالحديث> ث فهو مذهبى এর ধারা মুসলিম উম্মাহর চৌদ্দশত বছর তথা সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে চলে আসছে।) {المجموع شرح المهذب للامام النبوى ج1/ث فهو مذهبى১/১০৪}



# ইমাম নববী (রঃ)-এর ওস্তাদ এবং ইমাম ইবনু সালাহ (রঃ)-এর ছাত্র ইমাম আবু শামা (রঃ) বলেন- যার মুজতাহিদ হওয়ার বিষয়টি সর্বজনবিদিত, ইমাম শাফেয়ী (রঃ) তাঁকেই ذا صح الحديث فهو مذهبى দ্বারা নসীহত করেছেন। তাঁর এ নসীহত সকলের জন্যে নয়।



# মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ইমাম আবুল আব্বাস আল কারাফী আল মাক্কী (রঃ) বলেন-



শাফেয়ী মাযহাবের অনেক ফকীহ إذا صح الحديث فهو مذهبى   উক্ত বক্তব্যের উপর নির্ভর করে বলেন, ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর মাযহাব এমন হবে, কেননা এ বিষয়ে হাদীস সহীহ। বাস্তব কথা হলো, এটা নিরেট ভুল। কেননা হাদীস সহীহ হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং হাদীসের মাঝে বৈপরিত্য না থাকাটাও আবশ্যক। আর হাদীসের মাঝে বৈপরিত্য না থাকার বিষয়টি তাঁর পক্ষেই জানা সম্ভব, যার পুরা শরীয়ত অনুসন্ধানের যোগ্যতা আছে। হ্যাঁ, যার এমন যোগ্যতা আছে, তিনি কোনো একটি হাদীসের ব্যাপারে বলতে পারেন এ হাদীসে কোনো বৈপরিত্য নেই। তবে মুজতাহিদে মুতলাক ব্যতীত استقراء الشريعة   তথা পুরা শরীয়ত অনুসন্ধানের কোনো মূল্য নাই। তাই শাফেয়ীদের মধ্যে যিনি ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর কথা إذا صح الحديث فهو  مذهبى দ্বারা ফতোয়া প্রদানে আগ্রহী, তার উচিত পুরা শরীয়ত গবেষণার যোগ্যতা অর্জন করা। (অর্থৎ নিজেকে মুজতাহিদ প্রমাণ করা।){শরহুত তানকীহ ৪৫০পৃঃ}



# শাইখ মুহাম্মাদ আওয়ামা ইমাম কারাফী (রঃ)-এর বক্তব্য  - استقراء الشريعة  কথাটিকে আরো স্পষ্ট করে বলেন, যার পুরা শরীয়ত অনুসন্ধানের যোগ্যতা আছে (শুধু হাদীস অনুসন্ধানের যোগ্যতা নয়)। (আসরুল হাদীসিস শরীফ /৭৪)



# শাইখ মুহাম্মাদ আওয়ামা-এর এ ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। কেননা, কেউ কেউ মনে করতে পারেন, শুধু হাদীস অনুসন্ধান করলেই استقراء الشريعة   তথা শরীয়ত অনুসন্ধান হয়ে যায়। অথচ ইলেমের সাথে যার কিঞ্চিত পরিচিতি আছে এমন ব্যক্তি মাত্রই জানেন, শুধু হাদীস অনুসন্ধান দ্বারা পুরা শরীয়ত অনুসন্ধান হয় না। (বরং সে সাথে কোরআন, তাফসীর, হাদীস, আসারে সাহাবা-তাবঈন, আমলে সাহাবা-তাবেঈন ইত্যাদি সব বিষয়ই অনুসন্ধান করতে হয়।)।



إذا صح الحديث فهو مذهبى" এ বাক্যের সঠিক ব্যাখ্যা কি ? এ বিষয়ে এতক্ষণ আমরা বিশ্বের সর্বজন মান্য শ্রদ্ধেয় ইমাম-ফকীহ আলেমগণের বক্তব্য হাওলাসহ উল্লেখ করলাম। আমাদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল যে, إذا صح الحديث فهو مذهبى ইমামগণের এ বক্তব্য "  لمن له اهلية استقراءالشريعة" তথা মুজতাহিদ দরজার লোকদের জন্য খাস ছিলো। আমভাবে সকলের জন্যে এ বক্তব্য নয়। (ইমাম যাহাবী (রঃ) তো বরং বলেছেন- ইমামদের এ কথার অর্থ হচ্ছে - আমি যে ফিকহী সমাধান দেই তা আমার নিজের কথা নয়; বরং আমার প্রদত্ত সমাধান তখনই আমি প্রদান করি যখন এ বিষয়ে সহীহ হাদীস আমার সামনে উপস্থিত থাকে।)



এখন কথা হলো, ইমামগণের উক্ত নসীহতের উপর আমল হয়েছে কিনা ? এর জবাব আমাদের সামনে এসে যাবে, যদি আমরা চার মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাবগুলো অধ্যয়ন করি। চার মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাবগুলো দেখার তাওফিক যাদের হয়েছে তারা দেখেছেন- প্রত্যেক মাযহাবেই ইমামগণের ফিকহী সমাধান নির্বিচারে গ্রহণ করা হয়নি। বরং এমন বহু মাস্য়ালা রয়েছে যেগুলোতে ইমামগণের মুজতাহিদ দরজার প্রসিদ্ধ ছাত্রদের মতামতই গ্রহণ করা হয়েছে। (চলবে।



 



লেখক পরিচিতি : উপাধ্যক্ষ, ওছমানিয়া ফাযিল মাদ্রাসা, পুরাণবাজার, চাঁদপুর। ০১৭১৮-৪৬৩৬৪৩



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৩৪২১৫
পুরোন সংখ্যা