চাঁদপুর। শুক্রবার ১০ নভেম্বর ২০১৭। ২৬ কার্তিক ১৪২৪। ২০ সফর ১৪৩৯

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ---------
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩১-সূরা লোকমান


৩৪ আয়াত, ৪ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


২৮। তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।


২৯। তুমি কি দেখ না আল্লাহ রাত্রিকে দিবসে এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত করেন? তিনি চন্দ্র-সূর্যকে করিয়াছেন নিয়মাধীন, প্রত্যেকটি বিচরণ করে নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত; তোমরা যাহা কর আল্লাহ্ সে সম্পর্কে অবহিত।


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


ভাষা হল চিন্তার পোশাক।


                               -জনসন।

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে (অথাৎ মুসলমান বলে দাবি করে) সে ব্যক্তি যেন তার প্রতিবেশির কোন প্রকার অনিষ্ট না করে।


স্মৃতিতে মক্কা ও মদীনায় সফর এবং হজ্ব
যাওয়াতা আফনান
১০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


 



ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত হজ্ব পালনের প্রস্তুতি ছিল অনেক আগ থেকেই; মহান আল্লাহ ২০১৭ সালে হজ্ব পালনের সুযোগ করে দিলেন। সেই জন্যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে লক্ষ্য কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। হজ্বব্রত পালন শেষে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতে পেরে আমি ভীষণ খুশি ও নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে করছি। এজন্য আবারও শোকর আলহামদুলিল্লাহ্।



১৫ আগস্ট, ২০১৭ তারিখে ২.৪০ মিনিটে (দুপুর) সোনার তরী লঞ্চে চাঁদপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। উদ্দেশ্য আমার ছোটবোন ঝুমা'র বাসা। ছোটবোন দীর্ঘদিন চাঁদপুরেই ছিল; ছেলেদের ঢাকার ভালো কলেজে পড়াশোনার জন্যে ২০১৬ সালের মাঝমাঝিতে ঢাকাবাসী হয়। ঢাকার কুচুক্ষেত এলাকায় ওদের বাসা। ওর হাজবেন্ড অর্থাৎ আমার ভগি্নপতি অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ; সরকারি চাকুরিজীবী। বিপদে আপনে সবসময় আমাদের পাশে থাকেন। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে আমাদের বাসা চিনিয়ে নেয়ার জন্য তার বাসা থেকে কিছুটা দূরে অর্থাৎ রজনীগন্ধ্যা মার্কেট। টাওয়ারের কাছে আসেন। অধিকতর ভারী লাগেজটা তিনি বহন করে কাঁদা ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমাদেরকে তার বাসায় নিয়ে আসেন। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। কি' যেন এক অজানা ভয় ও শংকায় রাত কাটিয়েছি। ওদের বাসা থেকে ভোর ৪.৪০ মিনিটে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। সকাল ১০টায় ফ্লাইট হজ্ব-এজেন্সির নির্দেশে তিন ঘন্টা পূর্বেই উপস্থিত থাকার কথা ছিল। আমাদের হজ্ব এজেন্সির নাম 'স্বজন ট্রাভেলস্ ইন্টারন্যাশনাল' হজ্ব লাইসেন্স নং ১১৭৯ এজেন্সির স্বত্বাধিকারী গাজীপুরের বাসিন্দা আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী। হজ্ব এজেন্সির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পতাকা চিহ্নত বড় লাগেজ, ছোট হাত ব্যাগ ও মহিলাদের জন্য স্কার্ফ ছিল। আমাদের কাফেলায় ১০১ জন পুরুষ ও ৫০ জন মহিলা সদস্য ছিলেন। উল্লেখ্য যে, মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের দেয়া বাংলাদেশের পতাকা চিহ্নিত ছোট ব্যাগটি আমি পাইনি। এমনকি আমার টিয়া কালার স্কার্ফে এজিন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর ও মোবাইল নম্বর কিছুই ছিল না। আমরা এখন বহির্গমন চেকিং পার করছি। আমার লাগেজ বিনা বাধায় পার হলো। কিন্তু আমার হাসবেন্ড-এর লাগেজ পার হবার পর উনার সাইড ব্যাগটা পার হতে গিয়ে আটকে যায়। আমি চিন্তিত হই। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায় তার ব্যাগে ছোট একটি কাঁচি ছিল। আমি উনাকে বার কয়েক মনে করে দিয়েছিলাম যে কাঁচি নিলে তা' কালো কাগজে ভালো করে পেঁচিয়ে নিতে হবে; নচেৎ চেকিং এ আটকে যাবে। উনি আমার কথা গুরুত্ব দেননি বা কানে তোলেন নি। যাই হোক আমার স্বামী এম.এ ইউসুফ ঢালী কেঁচিটা রেখেই চেকিং পার হন। সৌদি এয়ার লাইসেন্স ফ্লাইট নম্বর ৮৪৫ আরোহনকালে বিমানের পাইলট, সহকারী পাইলট ও ক্রু সকলেই আমাদেরকে সালাম দিয়ে স্বাগত জানান। এয়ার হোস্টেসরা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমাদের সিটে বসার জন্য অনুরোধ করেন। বলা বাহুল্য আমরা ও অন্য এজেন্সীর সহ মোট ৫৭০ জন হজ্বযাত্রী ছিল আমাদের বিমানে। ঠিক ১০ টায় বিমান উড্ডয়নের কথা থাকলেও বিমান রান শুরু করে প্রায় ১০ টা বেজে ৮ মিনিটের দিকে; কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে রানওয়ে চলার পর ও বিমানটি উপরে উঠতে অর্থাৎ উড়তে সক্ষম হচ্ছিল না। আমরা সবাই একটু চিন্তিত হয়ে পড়ি। এখন দেখলাম, বিমানের বড় মনিটরে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে যে, যার বাংলা অর্থ এমন, দয়া করে কেউ কথা বলবেন না। সবাই মহান আল্লাহকে স্মরণ করুন এবং উচ্চস্বরে, সমস্বরে, তালবিয়া পাঠ করুন। এখন আমি একটু আস্তে অর্থাৎ নিচুগলায় পুরুষ ভাইদের সাথে তাল মিলিয়ে পড়তে শুরু করলাম



লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক,



লাব্বাইকা লা-শারীকা-লাব্বাইক,



ইন্নাল হাম্দা ওয়ান্ নি'মাতা লাকা



ওয়াল মূলক, লা-শারীকা লাক



তালবিয়া পাঠে আওয়াজে পুরো বিমান মুখরিত হল। ভাগ্য ভালো হওয়ায় আমার সিটটা জানালার পাশে ছিল। লিফ্টে উপরে উঠছি এমন মনে হতেই জানালা দিয়ে বাহিরে তাকাতেই দেখি আমাদের বিমান অনেক উপর দিয়ে চলছে। নিচে তাকাতেই দেখি মানুষ যেন পিঁপড়ের মতো। মনে হচ্ছে আর গাড়ি-বাড়ি যেন ছোট ছোট খেলনার মতো মনে হচ্ছে। অবশ্য এটা মনে হওয়ার কারন হল, জীবনে আমার প্রথম বিমানে চড়া। প্রায় পৌনে ৭ ঘন্টা সময় লাগে আমাদের জেদ্দা এয়ার-পোর্ট পেঁৗছতে। এয়ারপোর্ট এ পেঁৗছে আমাদের বাসে এ দাঁড়িয়ে আসতে হয়। কারণ জেদ্দা এয়ারপোর্টের রানওয়ে বিশাল বড়। এয়ারপোর্ট পেঁৗছে আমরা জোহরের (কসর) নামাজ আদায় করি। জেদ্দা এয়ারপোর্টে আমাদের ছবি, টিপসই, ও পায়ের ছাপ সংরক্ষণ করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ২৫ আগস্টের পর যারা হজ্বে গমন করেন কাজের চাপের কারণে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের ছবি, আঙ্গুলের ছাপ ও পায়ের ছাপ সংরক্ষণ করতে পারেননি এই কারণে সৌদিতে অবস্থানকালীন সময়ে তারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারেননি। জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের গন্তব্য মদীনা। বাসে চড়েই যেতে হবে। আমাদের হজ্ব এজেন্সীর পরিচালক মোহাম্মদ আলী ভাই সৌদি মুয়ালি্লমের সাথে বাসের জন্য যোগাযোগ করেন। সৌদি মুয়ালি্লমের তত্ত্বাবধানে মোট ৪০০০ (চার হাজার) জন হজ্বযাত্রী ছিল। তাই পর্যায়ক্রমে হাজীদের নেয়ার জন্য কিছুটা বিলম্ব হয়; ফলে কিছুটা বিড়ম্বনার পড়তে হয় বৈকি। আমাদের কাফেলার একশত একান্ন জন হাজীর মোট চারটি বাস নির্ধারিত ছিল। ২ নং বাসে আমি হাসবেন্ডসহ উঠি। বাসের চালক মিশরীয়। ভীষণ গরমের কারণে আমরা সবাই ঘেমে অস্থির। বাসে উঠার পর স্বস্তি পেলাম। ড্রাইভার হাসিমুখে সালাম দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। উনার/ড্রাইভার কথা শুনে আমি আশ্চর্য্য বিস্মিত হই। কারণ তিনি আমাদের রাজনীতি সম্পর্কে ব্যাপক খবর রাখেন। আমরা বাংলাদেশের হাজী জানার পর তিনি আরবী, উর্দু, ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। বাংলাদেশ ও মিশরের রাজনৈতিক অবস্থার সাদৃশ্য রয়েছে। মিশর ও বাংলাদেশ দুই দেশেই ভোটারবিহীন সরকার। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসীকে সরিয়ে/উৎখাত করে সেনা প্রধান সি সি ক্ষমতায় বসেন। সি সি এর অভ্যুত্থানে সমর্থন ছিল ইসরাইল, ইউরোপ, আমেরিকা ও সৌদি আরবের । সৌদি আরবের আর্থিক সাহায্য ছিল ব্যাপক হারে। কারণ জনসমর্থন নির্ভর মুসলিম ব্রাদারহুড সফল হয়ে গেলে আরব-বসন্তের সেই ধাক্কা সৌদি রাজ পরিবারকে নাড়া দেবে নিশ্চয়ই। এই ভয়েই সৌদি রাজতন্ত্রের সরকার, ইসরাইল ও আমারেকিা এক যোগে ষড়যন্ত্র করে সফল হয়। যাই হোক বাসের চালকের কথায় অনেক হজ্বযাত্রী অস্বস্তি বোধ করলেও আমার কাছে স্বস্থি লেগেছে এবং তার কথায় আমি মুচকি মুচকি হেসেছি। আমরা তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনায় হোটেল নাবিল প্যালেস-এ গিয়ে পেঁৗছি। প্রায় ভোর রাত ৩.৪৫ মিনিটে পেঁৗছার পর কিছু সময় পার হবার পর আমরা ফ্রেস হয়ে অজু করে অন্য ভাবীরা সহ ফজর নামাজ পড়ার জন্য হেঁটে মসজিদে নববীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। দ্রুত গতিতে হাঁটলে প্রায় ১৮-২০ মিনিটের মতো সময় লেগে যেত আমাদের মূল মস্জিদে প্রবেশ করতে আমাদের কাফেলার অধিকাংশই গাজীপুরের। এর মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ছিলেন ৭-৮ জন। আমরা দু'জন ছিলাম চাঁদপুরের। মূলত চাকুরীর সুবাদে সেইখানকার হজ্ব এজেন্সীর সাথে যোগাযোগ হয়। তাই আমাদের পরিচিত মুখ কেউই ছিল না। মদীনায় আমার ৫ জন রুম মেটের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট, দিলরুবা বেগম, সাবেক সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তার স্ত্রী ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর এর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম উল্লেখযোগ্য ছিলেন। মসজিদে নববীতে যেতে তারা আমার সঙ্গী হতেন। তবে আমি দ্রুতগতিতে হাঁটায় তারা প্রায়শঃ ই আমার সাথে পেরে উঠতেন না। এগার দিন আমরা মদীনায় অবস্থান করি। মসজিদে নববীতে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য নামাজের জায়গা আলাদা। মসজিদের মূল জায়গায় একসাথে ১০ লাখ ১০ হজার মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন। ভিতরে অর্থাৎ মসজিদের মূল জায়গায় নামাজ পড়তে হলে জামায়াতের এক ঘন্টা আগে যেতে হয় কারণ এক ঘন্টা আগেই ভেতরের মসজিদ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আলহামদুলিল্লাহ্ আমি এগার দিন অবস্থানকালীন সময়ে দু'এক ওয়াক্ত ছাড়া বাকি সব ওয়াক্ত নামাজ মসজিদের ভেতরেই আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। ২৮ আগস্ট আমরা মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। আমাদের মুআলি্লম সব-সময় ভোর রাতেই রওয়ানা করতেন। উদ্দেশ্য হল, নির্বিঘ্নে তুলনামূলক কম-ভিড়ে সকল কর্ম সম্পাদন। রাত ২.১৫ মিনিটের দিকে আমরা কাবা ঘর তাওয়াফ করি। তাওয়াফ-শেষে সায়ীর পর আমরা যখন হেরেম শরীফ ত্যাগ করি তখন আমি তাহাজ্জুদ এর আজান শুনতে পাই। মোহাম্মদ আলী ভাই বললেন, হেরেম শরীফ হতে দেড়শত গজ দূরে আমাদের হোটেল। তাঁর কথায় আমরা ভীষণ খুশি হই। ঐঙঞঊখ ঝঞঅজ গওঝঋঅখঅঐ ২ উঠার পূর্বে আমরা একটি মাদ্রাসাতে অবস্থান করি। যেখানে থাকার ব্যবস্থা ছিল খুবই চমৎকার। আমি যে রুমএ অবস্থান নেই সেটি হল নিচতলার মাস্টার বেড রুম। ৬ সেপ্টেম্বর হোটেলে উঠার আগ পর্যন্ত আমরা ১৫১ জন হাজী এই মাদ্রাসাতেই থাকি। এখানে উল্লেখ্য যে, এই বাড়িটি এক সৌদি নাগরিকের। রোড এঙ্েিডন্টে বাড়ির মালিক মারা যাওয়ার পর মালিকের স্ত্রী যিনি অত্যন্ত পরহেজগার, ধর্মভীরু, একজন মধ্যবয়সী মহিলা। তার চারতলা বাড়ির ৩টি ফ্লোর অর্থাৎ একতলা, দুইতলা ও তিনতলা মাদ্রাসা তৈরি করেন। মাদ্রাসাটি পরিচালনাও করেন তিনি নিজেই। মাদ্রাসায় মোট প্রায় পঞ্চাশজন দেশী-বিদেশী ছাত্র পড়াশোনা করে। প্রতি বছর মাদ্রাসাটিতে হজ্বের সময় আগে-পরে মিলিয়ে মোট ৯০ দিনের ছুটি দেয়া হয়। ৬ সেপ্টেম্বর হোটেলে উঠার আগ পর্যন্ত আমরা মাদ্রাসাতেই অবস্থান করি। বলা বাহুল্য আরবী মাদ্রাসা মানে আমাদের দেশের স্কুল, কলেজ। আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন বিভাজিত সেখানে তেমন নয়। ৩০ তারিখে আমরা মিনায় যাই। মিনায় তাবুতে অবস্থান করতে হয়। মীনার উদ্দেশ্যে রাত রওয়ানা হই। মিনায় অবস্থানকালীন সব-নামাজই কসর পড়তে হয়। আমি অবাক হই এবার মিনায় ৭ ফুট প্রস্থ ও দেড় ফুট দৈর্ঘ্য ফোমের বিছানা দেখে; সুন্দর কভার দেওয়া। তবে ফোমের বিছানায় নামাজ পড়াতে অসুবিধা হওয়ায় আমি আমার বিছানা তাবুর এক সাইডে নিয়ে রেখে দিই। পরে আমার দেখা-দেখি বিছানা গুটিয়ে ফেলে। ৪-৫ জন বাদে বাকিরা। রাত ২.২০ মিনিটে আরাফাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। ভোর ৪.৫০ মিনিটে আরাফাতে পেঁৗছে ফজরের নামাজ আদায় করি। দুপুর ১২ টার আগেই আরাফাতে পেঁৗছার নিয়ম। আরাফাতের অবস্থার অনেক অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আরাফাতে বসে আমার মনে হয়েছে; এখানে বিশ্রাম নিচ্ছি কেন; একবারে আরাফাতে গিয়েই বিশ্রাম নেয়া যেত। এবার আরাফাতের তাঁবুতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উন্নত ম্যাটের ব্যবস্থা এবং খাদ্য পানীয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সূর্যাস্তের পর আমরা আরাফাত ত্যাগ করে মুজদালিফায় উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। রাত ৯.২০ মিনিটে মুজদালিফায় পেঁৗছাই। মুজদালিফার প্রথম কাজ হল মাগরিব ও এশা এই দুই ওয়াক্ত নামাজ একসাথে আদায় করা। এ বছর সেখানে ও খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা ছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নানাভাবে আমাদের সেবা দিতে সচেষ্ট থাকেন। পাথর রাখার ব্যাগ এ প্রায় এক ব্যাগ পাথর সংগ্রহ করে ক্লান্ত শরীরে খোলা আকাশের নিচে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। যখন ঘুম ভাঙ্গে দেখি অদূরে মোহাম্মদ আলী ভাই দাঁড়িয়ে, বললেন আমরা এখনই মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো। এখন আমার হাত ঘড়িতে দেখি ভোর ৪ টা। আমার বিছানো চাদর গোছাতে গোছাতে দেখি যে, আমার পাথরের ছোট ব্যাগটি নেই; যেটা আমার মাথার ব্যাগের নিচে ছিল। বুঝলাম আমার পাথরের ব্যাগটি চুরি হয়ে গেছে। যাই হোক ত্বরিৎ গতিতে আমরা হেঁটে পথে মুজদালিফার সীমানার ভিতরেই একটু নিরিবিলিতে ফজর নামাজ আদায় করি। মিনায় পেঁৗছে কিছুটা সময় নিয়ে বিশ্রামের পর নাস্তা সেরে আবার আমাদের ৭টি পাথর মারার জন্যে জামরায়ে যেতে হবে। আমরা দশটার দিকে রওয়ানা করে আকাবায় বেলা সাড়ে এগারটার দিকে সেখানে গিয়ে পেঁৗছি। পথিমধ্যে আমাদের সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জুস, ঠান্ডা পানি, ফল, আপেল, মালটা দেয়া হয়। অবশ্য আমি সেখান থেকে কোন খাবারই গ্রহন করিনি। সবসময় অজু রাখার কারণে আমি তেমন কোন খাবারই হজ্বের পাঁচদিন গ্রহণ করিনি। বলতে গেলে হজ্বের পাঁচদিন অর্থাৎ ৩০ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যম্যম পানি ও খেজুর ছাড়া তেমন কোন খাবারই খাইনি। দ্বিতীয় দিন ২১ টি ৩টি জামারায় ও তৃতীয় দিনও একইভাবে ২১ টি পাথর মারার কাজ সমাপ্ত করলাম। প্রথম দিন পাথর মারতে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে একজন হাজী পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। দেখলাম কেউ ভ্রুক্ষেপ করছে না। আমি এগিয়ে গিয়ে হাত উঠিয়ে পুলিশ পুলিশ ডাকতে থাখি। দৌড়ে পুলিশ এসে আমাকে বের হওয়ার সুযোগ দিয়ে বেরিকেড দিয়ে অন্যদের গতিরোধ করে। এবং দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রথম দিন পাথর মারতে আমাদের কাফেলার একজন ভাবী যেতে চাননি। তিনি তার স্বামীকে দিয়ে এ কাজ করাতে চেয়েছিলেন। আমি তাকে অভয় দিয়ে বুঝিয়ে সাথে করে নিয়ে যাই। পথে যাওয়া ও আসার সময়টাতে আমি তার খেয়াল রেখেছি। এতটুকু কষ্টও মনে করিনি। পুরো কাফেলা-কে পাঁচ মিনিট দাঁড় করে তার মাথায় ঠান্ডা পানি দিয়েছি এবং যমযম পানি পান করিয়েছি। ১০ জিলহজ্ব অর্থাৎ অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর কুরবানী করতে হয়। আমি,আমার হাসবেন্ড ও তাঁর তিনজন রুম মেট আমরা পাঁচজন একমত হয়ে পাঁচটি দুম্বা কুরবানী দিই। আমাদের পাঁচজনের পক্ষ থেকে একজন 'কুরবানী' স্থলে যান। দুপুরে উটের গোশত দিয়ে ভাত খেলাম। কিন্তু ঈদের আমেজ না থাকায় ঈদ মনে হল না। আমরা ১২ জিলহজ্ব অর্থাৎ ও ৩ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫.৩৫ এ রওয়ানা হয়ে মাদ্রাসায় ফিরে আসি। একটানা ৭২ ঘন্টা পরিশ্রমের পর মাদ্রাসায় দুইদিন তিন রাত বিশ্রাম নিই। এতে সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়। মাদ্রাসা থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ঐঙঞঊখ ঝঞঅজ গওঝঋঅখঅঐ ২ তে যাই। হোটেলে থাকাকালীন পুরে সময়টাতে নিয়মিত হেরেম শরীফে নামাজ পড়ি। কিন্তু মূল মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য আমাদেরকে কম পক্ষে জামায়াতের দেড় ঘন্টা আগে মসজিদে পেঁৗছাতে হতো। আমরা মক্কার দর্শনীয় বিভিন্ন স্থান সমূহ মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের নেতৃত্ব্যে দেখার সুযোগ পাই। ২ সেপ্টেম্বর বিদায়ী তাওয়াফ করি। ২৬ সেপ্টেম্বর ওমরাহ হজ্ব করি। ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১ জেদ্দা এয়ারপোর্ট এ আমি। ২৮ সেপ্টেম্বর বিশেষভাবে চেকিং পার করে আমরা সৌদি এয়ার লাইন্সে করেই দেশে ফিরে আসি। সাথে নিয়ে আসি কিছু দুর্লভ স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা। ২৯ সেপ্টেম্বর ভোর সোয়া তিনটায় আমি এবং আমার হাসবেন্ড মোহাম্মদ আবু ইউসুফ ঢাকা বিমান বন্দর থেকে সরাসরি টেঙ্-িক্যাব নিয়ে চাঁদপুর এসে পেঁৗছাই। আমার স্বামীসহ আমি নির্বিঘ্নে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরে আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করছি।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৩৩৯৪৮
পুরোন সংখ্যা