চাঁদপুর । শুক্রবার ০৩ অাগস্ট ২০১৮ । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫ । ২০ জিলকদ ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • ফরিদগঞ্জের চান্দ্রার খাড়খাদিয়ায় ট্রাক চাপায় সাইফুল ইসলাম (১২) নামের ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী ও সদর উপজেলার দাসাদি এলাকায় পিকআপ ভ্যান চাপায় কৃষক ফেরদৌস খান নিহত,বিল্লাল নামে অপর এক কৃষক আহত হয়েছে।
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪০-সূরা আল মু’মিন

৮৫ আয়াত, ৯ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১৮। আপনি তাদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করুন, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। পাপিষ্ঠদের জন্যে কোন বন্ধু নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে।

১৯। চোখের চুরি এবং অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।

২০। আল্লাহ ফয়সালা করেন সঠিকভাবে, আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে, তারা কিছুই ফয়সালা করে না। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন, সবকিছু দেখেন।   

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


মনের নির্দেশ মানতে হলে দেহকেও শক্তিশালী করে তুলতে হয়।                   


-রুশো। 


যে ব্যক্তি সবুর করে আল্লাহ তাকে তার শক্তি দেন, সবুরের শক্তির মতো বড় নেয়ামত আর কিছু নেই।


ফটো গ্যালারি
জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও ইসলামী রাজনীতি
ড. মাওলানা একেএম মাহবুবুর রহমান
০৩ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


ইসলাম অর্থ 'গর্দান নেহাদান বতায়াত' যার মর্ম হলো আনুগত্যে ঘাড় ঝুঁকিয়ে দেয়া বা আত্মসমর্পন করা, আনুগত্য স্বীকার করা, নিজ ইচ্ছায় নিজেকে কারো নিকট সোপর্দ করা, শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা। আল কুরআনের দৃষ্টিতে দেহ, মন, মানসিকতা, নিয়ত ও দৃষ্টির সবটুকু দিয়ে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা ও তার প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আদেশ পালনে ও নিষেধ বর্জনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পন করা। ইসলাম শব্দের মূলধাতু সীন, লাম, মীম। সীন অর্থ সালামত শান্তি, সুস্থতা, সায়াদাত বা সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া। লাম দ্বারা লিনত বা নম্রতা, ভদ্রতা, বিনয়, লুতফ দয়া, অনুগ্রহ, অনুকম্পা, সুদৃষ্টি। মীম দ্বারা মুহাব্বত ভালবাসা, প্রেম, প্রীতি, প্রণয়। মাওয়াসাত সহমর্মিতা, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সৌজন্য, হৃদ্যতা, সুমধুর সম্পর্ক। এক কথায় 'যে জীবন ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মানব জীবনে সর্বক্ষেত্রে শান্তি ও প্রগতির পথে বিনয় ও নম্রতার মাধ্যমে, প্রেম-ভালবাসার পরিবেশে, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবন লাভ করা যায় এবং জমি, জীবন ও জীবিকার একমাত্র মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও আত্মসমর্পনের মাধ্যমে ইহলৌকিক শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি ও জান্নাত লাভ আর প্রিয়নবীর প্রতি ভালবাসার মাধ্যমে নূরের আয়নায় প্রেমময় স্রষ্টার দীদারে ধন্য হতে সক্ষম হয় তাই আদ-দীন আল-ইসলাম।' এ জীবন ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হলো ইনসানিয়াত তথা মনুষ্যত্বের উন্মেষ ঘটিয়ে মানবাধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। যার বাস্তব ঘোষণা মদীনার সনদ ও প্রিয়নবীর বিদায় হজ্বে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণ। মদিনা সনদের ৫৩টি ধারা এবং বিদায় হজ্বের ২৪টি ঘোষণা ইসলামকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানবপ্রেম, সৃষ্টিপ্রেম, উদারনীতি, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি তথা সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার ফলে অতি অল্প সময়ে দীন ইসলাম সমগ্র বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সর্বত্র যে বিপর্যয় ও ভয়ঙ্কর পরিস্তিতির সৃষ্টি হয়েছে, মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে পশুত্বের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে, তার কারণ হলো ঈমানের দূর্বলতা ও নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় এবং দীন সম্পর্কে সহীহ আকিদা বিশ্বাসের অনুপস্থিতি। জীবনের সকল ক্ষেত্রে একমাত্র দ্বীনের বিধান মানতে হবে, দ্বীনের বিধান ছাড়া কোনো কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, এ আকিদাগত বিষয়টি বর্তমানে সর্বত্র উপেক্ষিত। অথচ আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন অর্থাৎ-নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ইসলাম। (সূরা-আলে ইমরান-১৯)। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে-অর্থাৎ যে কেউ ইসলাম ছাড়া যে কোনো জীবন ব্যবস্থা অনুসন্ধান করবে, (জীবনের কোনো পর্যায়ে গ্রহণ করবে) কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না। (সূরা মায়েদা-৮৫)।



এ বজ্রকণ্ঠে ঘোষণার পরও মুসলমান নামধারী নীতি নির্ধারকগণ ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও যখনই বাদ-মতবাদ, তন্ত্রমন্ত্রের সাথে আপোষ করে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি পরিচালনা করেছেন বা করছেন তখনই নেমে এসেছে বিপর্যয়। আজকের সন্ত্রাস দুর্নীতি, ধর্মের নামে জঙ্গিবাদের উত্থান, কালোবাজারী, মুনাফাখোরী, মজুদদারী, রাজনীতির নামে শোষণ, জুলুম, দুর্নীতি, মানবাধিকারের ফাঁকাবুলি আওড়িয়ে মানুষ হত্যার মহড়া, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, মানুষ নামের হিংস্র পশুদের পাশবিক আচরণ এসব কিছুর কারণ মহান রবের সার্বভৌমত্ব না মেনে মানুষকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মনে করা। আল্লাহর ভয়, দলায় নবীর প্রতি ভালবাসা, সৃষ্টির প্রতি দয়া-মায়া মন থেকে উঠে যাওয়া। মানবিক মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার অনুপস্থিতি। যার ফলে মানুষ অপর মানুষকে পাখির মতো হত্যা করে আনন্দ উল্লাস করছে, রক্তনদীতে গোসল করে আত্মতৃপ্তি লাভ করছে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে ডগওয়াড দিয়ে তল্লাশী চালাচ্ছে। ভেতরে কেউ জীবিত আছে কিনা এবং উলঙ্গপনা, বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনাকে সংস্কৃতি মনে করছে। লুণ্ঠন, শোষণকে মনে করছে অধিকার। নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মের নামে বোমবাজী, সন্ত্রাসী কর্মকা- চালানোর জন্য ভাড়াটিয়াদের মোটা অংক দিয়ে শান্তির জগতকে জাহান্নামে পরিণত করছে। অথচ ইসলাম মানে শান্তি, সকলকে ভালবাসা ওঝখঅগ অর্থ ও ঝযধষষ খড়াব অষষ গধহ. আমি সবাইকে ভালবাসবো।



 



জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস



জঙ্গ শব্দটি ফার্সী এর অর্থ যুদ্ধ, আক্রমণ। উগ্রপন্থায় সংঘবদ্ধভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করার নাম জঙ্গিবাদ। যারা এ সকল অপকর্ম ও হারাম কাজে লিপ্ত তাদেরকে বলা হয় জঙ্গিবাদী।



সন্ত্রাস শব্দটির উৎপত্তি 'ত্রাস' শব্দ থেকে। ত্রাস হচ্ছে ভয়, ভীতি, আতঙ্ক ও ভীতিকর অবস্থা। সন্ত্রাসের ইংরেজী প্রতিশব্দ হচ্ছে ঞবৎৎড়ৎ, আর সন্ত্রাসী কার্যক্রম যে পরিচালনা করে তাকে বলা হয় ঞবৎৎড়ৎরংঃ, আরবীতে বলা হয় ইরহাব। আর যে কাজটি করে তাকে বলা হয় ইরহাবী। কুরআনের পরিভাষায় বলা হয় মুফসিদুন ফ্যাসাদ-বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। বিধিবদ্ধ আইন অমান্য করে ভীতি প্রদর্শন, ক্ষতিসাধন, হুমকি প্রদর্শন, নিরাপত্তা হরণ, পরিবেশে বিপর্যয় সৃষ্টি, ব্যক্তিগত ও জাতীয় সম্পদ ধ্বংস, এসবই সন্ত্রাসের অন্তর্ভুক্ত। যারা গ্রহণযোগ্য আদালতের বিচার ছাড়া সশস্ত্র হয়ে পথে-ঘাটে, ঘর-বাড়িতে, নদ-নদী, মরুভূমিতে, হাটে-বাজারে, মসজিদ, মন্দির, পেগোডায় নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা চালায় ও প্রকাশ্যে জনগণের জান-মাল হরণ করে তারাই মুফসিদ বা সন্ত্রাসী।



এ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও আতঙ্কগ্রস্থ করে রেখে পার্থিব সম্পদ অর্জন, ক্ষমতা দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে দেশ-বিদেশে পণ্যের বাজার সৃষ্টি করা। এ জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয় বিভিন্ন কারণে। যেমন :



 



১। দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা :



কুরআন ও হাদীসের সঠিক আকিদা, সঠিক চিন্তা দর্শন ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং কুরআন হাদীসের ভুল ব্যাখ্যাদানকারীরাই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে ধর্মীয় শ্লোগানে বৈধতা দানের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।



 



২। দুর্বল ঈমান ও তাকওয়ার অভাব :



জ্ঞানের দৈন্যতা ও তাকওয়ার অভাবে বহু লোক সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মনমগজে এ ভ্রান্ত বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, সমাজে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে হলে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। কাজেই তারা জীবনকে তুচ্ছ মনে করে সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং প্রয়োজনে আত্মহত্যা করাকে জিহাদ মনে করে, যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।



 



৩। নেতৃত্ব ও ক্ষমতার লোভ :



নেতৃত্বের অযোগ্যতা, সমাজের মানুষের প্রতি কর্তব্যবোধের জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্যে সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালিত করে থাকে।



 



৪। আর্থিক অসচ্ছলতা :



দরিদ্রতা ও বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত জনগোষ্ঠী অর্থ উপার্জনের নেশায় সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কর্মকা-ের সাথে যুক্ত হয়।



 



৫। চারিত্রিক ত্রুটি :



ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে চারিত্রিক ত্রুটির কারণে অনেকেই মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে এবং মাদকের অর্থ যোগানের জন্যে তারা কোনো নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে সন্ত্রাসের ক্রীড়নকে পরিণত হয়।



 



৬। দেশ ও জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য ধ্বংস করার বিজাতীয় ইন্ধন :



সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অপতৎপরতার একটি ক্ষেত্র হলো দেশ ও জাতির ঐতিহ্যের ধারক ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া। যার পেছনে ইন্ধন যোগায় ভিনদেশীয় কুচক্রী মহল। এ সকল ইতিহাস ঐতিহ্যের মূল সম্পর্কে জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসীদের সম্যক ধারণা না থাকায় তারা নিমিষেই এ সকল স্থাপনা ধ্বংস করতে কুণ্ঠা বোধ করে না।



 



ইসলামী রাজনীতি :



ইসলাম নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম নয়, ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম সুস্পষ্ট, আধুনিক, প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধ জীবন ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে। আরাফার ময়দানে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্বের ভাষণের সময় নাযিল হয়েছে : ১



'আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম (সূরা মায়েদা-৩)।



আল্লাহর হাবীব বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা দিলেন :



'ইসলামে জাতি, শ্রেণী ও বর্ণবৈষম্য নেই। আরবের উপর যেমন কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই তেমনি কোনো অনারবের উপরও শ্রেষ্ঠত্ব নেই কোনো আরবের। একই সাথে সাদার উপর কালোর এবং কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি হচ্ছে তাকওয়া।



'শুনে রাখ, মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। সাবধান, আমার পরে তোমরা একজন আরেকজনকে হত্যা করার মতো কুফুরী কাজে লিপ্ত হয়ো না।'



ইসলামের সকল বিধানের সাথে রাজনৈতিক দর্শন বিদ্যমান। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন:



'রাজ্য পরিচালনা ও দ্বীন (যমজ সন্তানের ন্যায়) ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইসলাম হলো ভিত্তি আর শাসক হলো তার রক্ষক, যার ভিত্তি নেই তা ধ্বংস প্রাপ্ত, যার রক্ষক নেই তা বিলুপ্ত হতে বাধ্য।'



নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত যেভাবে ফরজ ইবাদত, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত ও তাঁর রাসূল প্রদর্শিত বিধানসূমহ বাস্তবায়ন করা তেমনিই ফরজ ইবাদত। রব বা সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক



আল্লাহকে মানা হলো ঈমানের দাবি, নবুয়তী ধারার খিলাফত তথা নবী নন কিন্তু নবীর আদলে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হলো ইসলামী রাজনীতির মূল কর্মসূচী। এ রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের মাধ্যমে। স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি প্রেম-ভালবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও উত্তম চরিত্র হবে এ রাজনীতির চলার পথ। নেতৃত্বে থাকবেন ফহীহে মুজতাহিদ তথা কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামী আইনে যোগ্য, প্রশাসনে দক্ষ, আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ও আমলে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। আল্লাহর আয়াতসমূহের তিলাওয়াত, তাযকিয়া তথা পরিশুদ্ধি, আল্লাহর কিতাবের তা'লিম ও হিকমত তথা রাসূলের সুন্নাতের বাস্তবায়নের দিকে দাওয়াত প্রদান হবে এই নেতৃত্বের প্রধান কর্মসূচি। যে কর্মসূচির সাথে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই। বরং জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে দমন করার মাধ্যমেই ফিতনা ফাসাদ মুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই হলো ইসলামী রাজনীতির অন্যতম কর্মসূচি। যারা বলেন, ইসলামী রাজনীতি বন্ধ করতে হবে! তারা ইসলামের নামে অপতৎপরতা দেখেই অথবা ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব থেকে এ কথা বলেন। ইসলাম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। যারা ইসলামের লেভেল লাগিয়ে বিদেশী প্রভূদের এডেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যে বৈষয়িক স্বার্থে জঙ্গিবাদী তৎপরতা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তাদের এ সকল কর্মকা-ের সাথে ইসলামের নূন্যতম সম্পর্ক নেই। আজকে মুসলিম দেশসূমহে বিশেষ করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে শতকরা ৯০% ভাগ মুসলমানের ঈমান আকিদার দাবি হলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে রব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নিমিত্ত্বে সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ এ কথা স্বীকার করার সাথে সাথে এ দর্শনকে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এ কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করা যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন মেনে নেয়া যা প্রত্যেক মুমিনের জন্যে ফরয। এ ফরজ সম্পর্কেই কবরে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমার রব কে? অর্থাৎ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক তুমি কাকে মেনেছ? কোনো ব্যক্তি, দল, ইজমকে? না কি আল্লাহ কে। তোমার দ্বীন কি ছিল? অর্থাৎ তোমার জীবনের সকল ক্ষেত্রে কোন্ অনুশাসন মেনে ছিলে? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে দেখিয়ে বলবে তাঁকে চিনো কিনা? অর্থাৎ ঈমান-আকিদায়, জীবন ধারণ পদ্ধতিতে, সুরতে-সিরতে, নীতি-দর্শনে, আখলাক চরিত্রে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করেছ কি না? এ তিন প্রশ্নের জবাবদানের সামগ্রিক কার্যক্রমই ইসলামী রাজনীতি যা মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আজকের অশান্তি, নৈরাজ্য, জুলুম, অত্যাচার, হত্যা, গুম হানাহানি, কাটাকাটি, অর্থনৈতিক দৈন্যতা এ সকল কিছুর কারণ হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত বিধান মেনে না নেয়া ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করা। আল্লাহর দ্বীনের কিছু অংশ মানবে আর কিছু অংশ বাদ দিবে এটা কুরআনের দৃষ্টিতে কুফরী। যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে:



'তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ মানবে আর কিছু অংশ অস্বীকার করবে? তোমাদের মধ্যে যারাই এ কাজ করবে তাদের একমাত্র প্রতিদান হবে এ পার্থিব জগতে অপমান লাঞ্ছনা গঞ্জনা আর পরকালে তাদেরকে ভোগ করতে হবে কঠিন শাস্তি। (সূরা বাকারা-৮৫)।



তাই সকল ঈমানদার নিজের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর কিতাবের সকল বিষয় বাস্তবায়নের প্রয়াস চালানো ঈমানের দাবি।



 



জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের সাথে ইসলামী রাজনীতির সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা অমূলক :



ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বা ইসলামী রাজনীতিতে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসের স্থান নেই। বিনা বিচারে ইসলামী শরীয়তের আদালতের রায় ছাড়া মানুষ হত্যার পরিণতি সম্পর্কে আল কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা হলো :



'যে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে তার পরিণতি জাহান্নাম। সেখানেই সে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হবেন, তার উপর লা'নত করবেন এবং তার জন্যে মহা শাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন । (সূরা আন নিসা-৯৩)।



পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন:



'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে লড়াই এবং পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চায় তাদের শাস্তি হলো, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শুলিতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পাসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে। দুনিয়ায় রয়েছে তাদের জন্যে লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। (সূরা মায়েদা -৩৩)।



বর্তমান বিশ্বে ইসলামের আবরণে যে জঙ্গিবাদী তৎপরতা চলছে তার কারণ হলো-



১। মুনাফেকী বা বকধার্মিকতা :



মুনাফিকরা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে এ কাজকে শুধু বৈধই মনে করছে না বরং এ কাজ অতীব জরুরি মনে করছে।



২। আল-কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল ফতোয়া :-



আল-কুরআনের কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হলে যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান প্রয়োজন তা অর্জন না করেই বাহ্যিক তরজমা পড়েই ফতোয়া দানের ফলে সমাজে ফ্যাসাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মতো জঘন্য কাজকে বৈধ মনে করা হয়। যার ফলে সৃষ্টি হয় সমাজে হানাহানি, কাটাকাটি। যেমন-বর্তমান বিশ্বের জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনা, ধ্যান ধারণার বাইরের লোকদেরকে মুশরিক মনে করে। ঈমানদার, নামাজি, রোযাদার হলেও তাদেরকে হত্যা করা সওয়াবের কাজ ও জিহাদ বলে আকিদা পোষণ করে। অথচ মাক্কী জীবনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কোনো কাফেরকে হত্যা করাতো দূরে থাকুক কাউকে আঘাত করার অনুমতিও দেননি।



ইসলামের শত্রুরা সকল অপেচষ্টা চালিয়ে মুসলিম জাগরণ থামাতে না পেরে দেখতে পায় যে, দেশে দেশে ইসলামের নবজাগরণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখনই সুকৌশলে কিছু ভাড়াটে দালালদেরকে মোটা অঙ্কের ডলার দিয়ে, টুপি, দাড়ি, ইসলামী লেবাস, পাগড়ী পরিয়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটিয়েছে। তাদের প্রচার মাধ্যমে টুপি, দাড়ি, লম্বা জামা ও পাগড়ী রুমাল মাথায় দেয়া ঐ কুচক্রিদেরকে দেখিয়ে ইসলামকে সন্ত্রাসের ধর্ম, মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী, মানবতার দুশমন এই আকিদা বিশ্বাস ও ধারণা সমগ্র বিশ্বে সৃষ্টি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যার ফলে বর্তমান যুবসমাজ, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এদেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, টুপি, দাড়ি, ইসলামী লেবাস দেখলেই বাঁকা চোখে দেখছে। যে সম্মান, শ্রদ্ধা-ভক্তি, আলেমদের প্রতি ছিলো তা দিন দিন অপপ্রচারে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্যই হলো আলেম সমাজ, ঈমানদার মুসলিম জনগোষ্ঠী যেনো জনগণের নেতৃত্বে আসতে না পারে এ অপপ্রয়াস চালানো।



 



তাই এ মুহূর্তে প্রয়োজন :



০১. আল্লাহর কুরআন ও রাসূল প্রদত্ত সুন্নাহ সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্জনের পথে অগ্রসর হওয়া এবং জনগণের সামনে আল-কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা।



০২। ইসলাম যে জঙ্গিবাদ নয়, শান্তিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা তা ঘরে ঘরে মসজিদে মসজিদে ব্যাপকভাবে প্রচার করা।



০৩। যে সকল পরাশক্তি মুসলমানদের দুশমন এবং যারা জঙ্গিবাদের জন্ম দিয়েছে তাদের স্বরূপ উন্মোচন করা।



০৪। কালেমাগো মুসলমানদেরকে সুনির্ধারিত কর্মসূচির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করার আন্দোলন গড়ে তোলা।



০৫। যে সকল এনজিও সাধারণ জনগণকে টাকা পয়সা ও সুযোগ সুবিধা দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে তাদের স্বরূপ উন্মোচন করে বিকল্প এনজিও সৃষ্টি করা।



০৬। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সু-নির্ধারিত পরিকল্পনা ভিত্তিক প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া।



০৭। নেতৃস্থানীয় আলেম-ওলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদগণের সমন্বয়ে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া।



০৮। ইসলামী পোষাক, টুপি, দাড়ি, লম্বা জামার বিরুদ্ধে কথা বলা বা এ সকল লেবাস পোষাককে খারাপ মনে করা যে জঘন্য অপরাধ তা জনগণের উপলব্ধিতে আনার চেষ্টা চালানো।



পরিশেষে বলতে চাই, ইসলামের দুশমনরা ইসলামকে স্বমূলে উৎখাত করার সকল অপেচষ্টা চালিয়েছে, চালাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাবে। তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। মহান আল্লাহর ঘোষণা : 'আল্লাহই তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেন যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে' (সূরা আস সফ-৮)। কোনো অপ-প্রচার, প্রপাগান্ডাকে ভয় না করে যার যা কিছু আছে তা নিয়েই দ্বীন কায়েমের এ ফরয দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতিকে বুঝাতে হবে জিহাদ আর জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস এক নয়। জিহাদ ইবাদত আর জঙ্গিবাদ হারাম। স্পষ্ট করে দিতে হবে ইসলামে জঙ্গিবাদের স্থান নেই। কোনো মুসলমান বিনা বিচারে কাউকে খুন করার অনুমতি ইসলাম দেয়নি। অন্যায়, জুলুম ও হত্যা ইসলামের নামে যারা বৈধতা দান করে, তারা মুসলমানদের দুশমন, ইসলাম ও মানবতার শত্রু। আসুন, সবাই মিলেমিশে তাদের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই ও তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলি এবং ঐক্যবদ্ধ আপোষহীন আন্দোলনের মাধ্যমে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক পথ অবলম্বন করে ইসলামের প্রেমময় বিধান কায়েম করি আর জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন করি। নবুয়তী ধারার খেলাফত প্রতিষ্ঠাই আমাদের সকল সমস্যার সমাধান করতে পারে এ আকিদার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলি।



 



লেখক : যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন, অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল (এমএ) মাদ্রাসা, চাঁদপুর।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮০৭৯৪৮
পুরোন সংখ্যা