চাঁদপুর। বৃহস্পতিবার ১৮ অক্টোবর ২০১৮। ৩ কার্তিক ১৪২৫। ৭ সফর ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪২-সূরা শূরা

৫৪ আয়াত, ৫ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৫০। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা তাকে করে দেন বন্ধ্যা, তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।

৫১। মানুষের জন্য অসম্ভব যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করে, তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাবান।

৫২। আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি ওহী করেছি রূহ (কুরআন) আমার নির্দেশে; তুমি তো জানতে না কিতাব কি ও ঈমান কি পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি; তুমি অবশ্যই প্রদর্শন কর সরল পথ-

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


প্রতিভাবানদের আবিষ্কৃত জিনিস কখনো মৃল্যহীন হয় না।                           


-কুপ।


যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ^াস করে (অর্থাৎ মুসলমান বলে দাবি করে) সে ব্যক্তি যেন তার প্রতিবেশীর কোন প্রকার অনিষ্ট না করে।



 


ফটো গ্যালারি
মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য
ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন
১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কোরআনুল কারিমের প্রথম সুরায় তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন- 'আলহামদু লিল্লাহি রাবি্বল আলামিন' অর্থাৎ সব প্রশংসা সেই মহান রবের, যিনি জগতের পালনকর্তা। মহান আল্লাহ এই সুন্দর পৃথিবীসহ অপরাপর সব জগৎ ও সৃষ্টির একক স্রষ্টা। সুরা ইখলাসে তাঁর গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেন-'কুল হুয়াল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস্ সামাদ, লাম য়ালিদ ওয়ালাম য়ুলাদ, ওয়ালাময়া কুল্লাহু কুফুআন আহাদ' অর্থাৎ মহান আল্লাহ এক ও একক, তিনি স্বয়ংসম্পূূর্ণ, তিনি কাউকে জন্ম দেননি আর তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি, আকাশ আর জমিনে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। একত্ববাদের মহান শিক্ষা রয়েছে এসব বাণীতে; যদিও মহান স্রষ্টাকে নিয়ে নানা ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্ন ভ্রান্ত-ধারণার বশবর্তী হয়ে তাঁর তাওহিদের মর্যাদা ও অবস্থানকে কলুষিত করার অপপ্রয়াস পেয়েছে; কিন্তু আদতে সেগুলো সত্যের মানদ-ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বরং মহান স্রষ্টা যখন যা ইচ্ছা করেন শুধু বলেন, হয়ে যাও আর তা সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যায়। অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী প্রভু এই পৃথিবীতে আপন ইচ্ছায় অসংখ্য মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। পরিসংখ্যানের জটিলতা থাকলেও কমবেশি ১৮ হাজার বা কারও মতে, সেই মাখলুকের সংখ্যা ৪০ হাজার। কিন্তু আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব যে মানুষ সে বিষয়ে কোনো মতভেদ বা জটিলতা কারও কাছেই নেই, বরং এ মানুষই অসংখ্য সৃষ্টিকুলে মহান স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা লাভে সমর্থ হয়েছে। আর কোনো সৃষ্টিই তিনি অনর্থক করেননি, প্রতিটি সৃষ্টির পেছনেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মাহাত্ম্য, রয়েছে মাকসুদে হাসানা তথা সুন্দরতম উদ্দেশ্য। মানব সৃষ্টির পেছনেও মহান রবের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও রহস্য রয়েছে- আমরা এখানে সে বিষয়টিই বিশ্নেষণের প্রয়াস পাব।



মহান আল্লাহ ফেরেশতাগণের সঙ্গে পরামর্শের সুরে বললেন-'ইনি্ন জায়িলুন ফিল আরদে খালিফাহ' অর্থাৎ আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ সৃষ্টি করতে চাই। ফেরেশতাগণ একবাক্যে নেতিবাচক মন্তব্য করল- তাঁরা বলল, আপনি কি এমন এক সমপ্রদায় সৃষ্টি করবেন, যারা সর্বত্রই বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং রক্তারক্তিতে অবতীর্ণ হবে? বরং আমরাই তো আপনার প্রশংসা, গুণগান করছি আর আপনার পবিত্রতা বর্ণনায় নিয়োজিত আছি। তাহলে আর মানুষ সৃষ্টি করার কী দরকার? মহান আল্লাহ বলেন-'ইনি্ন আলামু মালা তালামুন' অর্থাৎ আমি যা জানি তোমরা তা জানো না। এই হলো মানুষের প্রতি মহান রবের দরদ ও দায়বদ্ধতা, সৃষ্টি রহস্যের সব বিষয়ে অবগত যেই মহান সত্তা, তিনিই মানব সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ নিলেন এবং তাকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। পৃথিবীর সব সৃষ্টি তাঁর তাৎক্ষণিক নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পন্ন হলেও মানব সৃষ্টিতে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ব্যতিক্রমী পদ্ধতির প্রয়োগ করলেন। আর তা হলো, মহান স্রষ্টা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে পরম মমতায় স্বীয় কুদরতি হাতের স্পর্শেই সৃজন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। আর তাতে রুহ ফুঁকে দিলেন এবং তাকে জীবন্ত করলেন। দৈহিক কাঠামোগত দিক থেকে সর্বোত্তম অবয়ব প্রদান করলেন এবং তাতে সংযুক্ত করে দিলেন উত্তম সব গুণ ও বৈশিষ্ট্য। আভিজাত্য আর মর্যাদাবোধের সব উপকরণ মানবের মাঝে সংযোজনের পরেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন- 'সুম্মা রাদাদনাহু আসফালা সাফেলিন' অর্থাৎ কর্মগুণে সেই উন্নত অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে দুর্ভাগ্যজনক পরিণতিতে অসম্মান ও অমর্যাদার সর্বনিম্ন স্তরে নিক্ষেপিত হতে হবে। মহান স্রষ্টার ঘোষণা-'ওয়ালাকাদ র্কারামনা বানি আদাম' অর্থাৎ আমি অবশ্যই সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী করেছি আদম সন্তানকে (মানুষ) আর তা কেবল এজন্য যে, 'মা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইন্সা ইল্লা লিয়াবুদুন' অর্থাৎ মানব আর দানব সবার সৃষ্টির মূলে আমার যে উদ্দেশ্য তা হলো, আমার ইবাদত করা। একমাত্র মহান রবের উপাসনার জন্যই মানবের মতো শ্রেষ্ঠ মাখলুক সৃষ্টি করা হয়েছে। মহান আল্লাহর যে বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁর একত্ববাদের যে মহিমা তার স্বীকৃতি ও গুণকীর্তন কেবল সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির পক্ষেই শোভা পায়- এখানেই মানব সৃষ্টির পেছনে মহান রবের প্রকৃত লক্ষ্য জড়িয়ে আছে।



মহান আল্লাহ কর্তৃক মানব সৃষ্টি করে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বানিয়ে ফেরেশতাদের ওপরে প্রাধান্য দিয়ে তাকে সম্মান জানাতে বলা হলো। কিন্তু সৃষ্টির প্রথমেই আধিপত্যবাদের কালো থাবা হিসেবে যে ঘৃণ্য উপকরণ যুক্ত হলো, তার নাম অহঙ্কার। সমবেত সব ফেরেশতা মহান রবের নির্দেশে অবনত মস্তকে বিনা শর্তে মেনে নিলেও একজন তা মানতে পারেনি। বরং সে সদম্ভে ঘোষণা করল- 'আনা খাইরুম মিনহু, খালাকতানি মিন্নার ওয়া খালাকতাহু মিনতিন' অর্থাৎ আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে আর তাকে সৃষ্টি করা হলো মৃত্তিকা থেকে। মৃত্তিকা আর অগি্নর এই যে অমূলক শ্রেষ্ঠত্বের বাহাদুরি, তাই তাকে নিঃশেষ করে চির অভিশপ্ত ইবলিশ শয়তানে রূপান্তরিত করে দিল। 'আবা ওয়াসতাকবারা ওয়াকানা মিনাল কাফেরিন'



সে নিজেকে অহংবোধের নেশায় আবৃত করে নিল আর চিরদিনের তরে অকৃতজ্ঞের কাতারে নিজেকে শামিল করল। সেই সঙ্গে পৃথিবীর প্রলয় অবধি সেই মানবের অবধারিত দুশমন হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখে সব ধরনের কুমন্ত্রণা আর বিভ্রান্তির অনলে মানুষকে ভস্মীভূত করারও ঠিকাদারি পেয়ে গেল। কিন্তু মহান দয়াময় প্রভু মানুষকে জানিয়ে দিলেন- 'ফামান তাবিআ হুদায়া ফালা খাউফুন আলাইহিম ওয়ালাহুম য়াহযানুন', যারা আমার দেওয়া হেদায়েত তথা নির্দেশনার অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই আর তাদের দুশ্চিন্তারও কোনো অবকাশ নেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষরা ক্ষতির মুখোমুখি হবে; কিন্তু যারা মহাসত্যে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করবে, সৎকর্মশীল হবে, সত্যের পথে অবিচল থাকবে এবং বিপদে-আপদে, দুঃখে-মুসিবতে চরম ধৈযের্র পরাকাষ্ঠা বহন করবে, তারাই হবে সফলকাম। জন্মগত সর্বোচ্চ মর্যাদার মাখলুক হওয়া সত্ত্বেও মানুষকে জীবন-মৃত্যু দেওয়া হয়েছে শুধু তাকে এটি পরীক্ষা করার জন্য যে, আমল তথা সৎকর্ম সম্পাদনের দিক থেকে তাদের মধ্যে কে সর্বোত্তম।



মহান স্রষ্টার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ তার মেধা-মনন, অন্তঃকরণ আর খোদা-প্রদত্ত সৃষ্টিশীল ভাবনা দিয়ে পরম রবের সৃষ্টি রহস্য উন্মোচন করবে, পৃথিবীর কল্যাণকর জিনিস স্বীয় চক্ষে প্রত্যক্ষ করে তা থেকে জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করবে আর সৃষ্টির সব বিষয় স্বীয় কানে শ্রুতিগোচর করবে এবং তা থেকে অভিজ্ঞতা অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ও সৃষ্টির কল্যাণে কাজে লাগাবে। যারা এ মহৎ কার্যাবলি সম্পন্নকরণে সফল হবে না, তাদেরই মহান আল্লাহর তিরস্কার ও ভর্ৎসনার পাত্র হতে হবে; পরিণামে ইহকালীন দুর্ভোগ আর পারলৌকিক অনন্ত জীবনের ব্যর্থতার খতিয়ান দেখে দেখেই যন্ত্রণাদগ্ধ হতে হবে। তাই মানব সৃষ্টির পেছনে মহান স্রষ্টার প্রকৃত লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদাকে সুরক্ষার দায়িত্ব আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদেরই নিতে হবে। কেননা, আমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাইকে তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হবে এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।



 



লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক,



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৫২৫১
পুরোন সংখ্যা