চাঁদপুর, রোববার ২১ এপ্রিল ২০১৯, ৮ বৈশাখ ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪০
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৯-সূরা হুজুরাত


১৮ আয়াত, ২ রুকু, 'মাদানী


৩। যাহারা আল্লাহর রাসূলের সম্মুখে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাহাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করিয়া লইয়াছেন। তাহাদের জন্য রহিয়াছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।


 


 


 


assets/data_files/web

প্রতিভাবান ব্যক্তিরাই ধৈর্য ধারণ করতে পারে। -ই. সি. স্টেডম্যান।


যে শিক্ষিত ব্যক্তিকে সম্মান করে, সে আমাকে সম্মান করে।


ফটো গ্যালারি
কোরআন-সুন্নাহর প্রামাণ্য দলিলে সাব্যস্ত পবিত্র শবে বারাআত সম্পর্কে উত্থাপিত কিছু আপত্তি ও তার জবাব
মুহাম্মদ মিলাদ শরীফ
২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ তায়ালা যে কোনো উসিলায় বান্দাকে ক্ষমা করতে চান। কোরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতে মহান আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন 'গাফুর', 'গাফফার' ইত্যাদি নামে। যার অর্থ হলো অতীব ক্ষমাশীল, পরম মার্জনাকারী। বান্দা গুনাহ করে, বারবার নাফরমানী করে, তিনি ক্ষমা করে দেন। হাদিসে কুদসীতে স্বয়ং আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন-বান্দার গুনাহ যদি যমীন থেকে আকাশ পর্যন্ত ছেয়ে যায়; হতাশ হবার কারণ নেই, আন্তরিক দিলে ক্ষমা চাইলে সব গুনাহ তিনি এমনভাবে ক্ষমা করে দেন যেন সে ইতিপূর্বে গুনাহই করেনি। প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের খাতিরে আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুহাম্মদীর গুনাহ মাফের নিমিত্তে এমন অগণিত ব্যবস্থা করেছেন যা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। গুনাহ-খাত্বা মাফ হয়ে পঙ্কিলতা মুক্ত হওয়ার তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো পবিত্র শবে বারাআত। সারা পৃথিবীর মুসলিম সমাজে এই মহান রাত আড়ম্বরে-অনাড়ম্বরে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে। শবে বারাআত পালনের পদ্ধতি নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে কিছু এখতেলাফ থাকলেও শবে বারাআতের অস্তিত্ব, এ রাতের বিশেষ গুরুত্ব ও ফযিলতের বিষয়ে সবাই একমত। সাধারণ মানুষদের নেক আমলের প্রতি যে কোনো উপায়ে আকৃষ্ট করাই ছিলো পূর্ববর্তী ওলামা ও আউলিয়ায়ে কেরামের অনুসৃত নীতি। ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি বেশি বেশি নফল ইবাদত একজন মুসলমানকে আল্লাহর একান্ত নৈকট্যলাভে সাহায্য করে। আফসোসের বিষয় হলো, ইদানিং একশ্রেণির মানুষ যারা নিজেদের কখনো সালাফী, কখনো লা-মাজহাবী আবার কখনো আহলে হাদিস পরিচয় দেন, শরীয়তের নিক্তিতে প্রমাণিত পবিত্র শবে বারাআতকে তারা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। অসংখ্য বে-নামাজী, বে-আমল, উদাসীন মুসলমানদের নিয়ে ওনাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই, যত আপত্তি নামাজী, সাধারণ মুমিন-মুসলমানদের নিয়ে। শিরক-বেদআতের ভুয়া দাবি তুলে মুসলিম সমাজকে আমল আখলাক থেকে কৌশলে দূরে সরানোর হীন প্রচেষ্টায় রাতদিন নিমগ্ন তারা। ধৃষ্টতার সীমা পেরিয়ে ফেসবুক-ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়াতে তাদের এমন বক্তব্যও পাওয়া যাচ্ছে যে, শবে বারাআতে ইবাদত-বন্দেগী করলে সওয়াব নয় বরং মারাত্মক গুনাহ হবে!



শবে বারাআত সম্পর্কে তাদের একটি কমন আপত্তি হলো- শবে বারাআতের কথা কোরআন-হাদিসে কোথাও নাই। জবাবে বলতে হয়, তাহলে নামাজ-রোজার কথাও কোরআন-সুন্নাহর কোথাও নাই। শবে বারাআত আমাদের দেশের প্রচলিত ভাষা। যেমন নামাজ-রোজা ফার্সী ভাষা থেকে প্রচলন হয়েছে। কোরআন আরবি ভাষায় হওয়ায় নামাজ-রোজা ইত্যাদির কথা কোরআন-হাদিসে থাকার কথা নয়। বরং নামাজের আরবি পরিভাষা 'সালাত, রোজার ক্ষেত্রে 'সিয়াম' শব্দ কোরআন-হাদিসে আছে। এখন কেউ যদি বলে সালাতকে নামাজ বা সিয়ামকে রোজা বলা যাবে না তবে সে মূর্খতার পরিচয় দিলো। পবিত্র শবে বারাআতের আরবি পরিভাষা 'লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান' (শা'বান মাসের মধ্য রজনী) অসংখ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এরকম হাজার হাজার অবাঙালি শব্দ বাংলা ভাষায় মিশে আছে।



আর যদি তাদের আপত্তির কারণ হয় ভাষাগত সমস্যা নয় বরং শবে বারাআতের অস্তিত্বই কোরআন-হাদিসে নাই, তাহলে বলতে হয় অন্ধ যদি সূর্যকিরণ, চাঁদের আলো না দেখে এটা তার দোষ নয়, অক্ষমতা। সহিহ হাদিসের নাম দিয়ে নিজেদের মন মতো না হলে প্রমাণিত বিষয়কে অস্বীকার করা ওনাদের পুরানো অভ্যাস। বিস্তারিত দলিলে না যেয়ে পবিত্র শবে বারাআত সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু প্রামাণ্য দলিল, তার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় দিক নিম্নে আলোকপাত করা হলো।



* কোরআনুল কারীমের আলোকে পবিত্র শবে বারাআত:-



প্রথমতঃ সূরা রা'দের ৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ ফরমান-



'আল্লাহ তায়ালা যা কিছু চান তা বাতিল করে দেন এবং যা কিছু ইচ্ছা করেন তা বহাল রাখেন, মূল গ্রন্থ (তাকদীর) তো তাঁর কাছেই (মওজুদ) থাকে।'



এ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় হিজরী ১২ তম শতাব্দীর প্রসিদ্ধ মুফাসসির ইমাম আবুল আব্বাস আহমদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনুল মাহদী রহ. (যিনি ইবনে আজিবাহ নামে প্রসিদ্ধ) উল্লেখ করেন, আল্লামা আবুশ শায়েখ সহিহ সনদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, 'শা'বানের অর্ধরাত্রি তথা শবে বরাতে সারা বৎসরের কার্যাদি স্থিরকৃত হয়। তিনি (আল্লাহ তায়ালা) যা ইচ্ছা করেন তা মিটিয়ে ফেলেন। তা ছাড়া অন্যান্য যেমন সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্য, হায়াত, মওত ইত্যাদি ঠিক রাখেন।'



ইমাম সুয়ূতী (রহ.) বলেন, এর সনদ সহিহ। এর সনদে কোনো অপরিচ্ছন্নতা ও দোষ-ত্রুটি নেই। [তাফসীরে আল বাহরুল মাদীদ, শামেলা, খ--৫, পৃ. ৪৮৯] তাফসীর-হাদিস-ফিকহ তথা ইসলামী শরীয়তের সর্বজনমান্য ও নির্ভরযোগ্য ইমাম, হাফিজুল হাদিস ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) স্বীকৃতি দিয়েছেন রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এই হাদিস সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।



দ্বিতীয়তঃ সূরা আদ দুখানের প্রথম কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে ইশারা করেছেন মর্মে বেশ কিছু সংখ্যক মুফাসসিরীনে কেরাম উল্লেখ করেন। সূরা আদ্ দুখানে এরশাদ হচ্ছে -



"হা-মীম-শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের- আমি একে (কোরআন মজিদকে) নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়।" [সূরা আদ দুখান- ১, ২, ৩ ও ৪]



আয়াতে কারীমাগুলোর মধ্যে ৩ নং আয়াতে 'বরকতময় রাত' এবং ৪ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় কি বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে মুফাসসীরগণ প্রধাণত: দু'টি মতামত ব্যক্ত করেছেন।



প্রথমত: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, হযরত কাতাদা, হযরত মুজাহিদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর এক মত অনুযায়ী এবং অধিকাংশ মুফাসসীরের রায় হলো এর দ্বারা উদ্দেশ্যে হলো 'লাইলাতুল ক্বদর'।



দ্বিতীয়ত : প্রখ্যাত মুফাসসীর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা, হযরত ইকরামা রহমতুল্লাহে আলাইহিসহ বহু সংখ্যক সাহাবী-তাবেয়ীর মতে, বরকতময় রাত দ্বারা লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান তথা শবে বরাতকে বুঝানো হয়েছে। এ ছাড়াও কিছু সংখ্যক হাদিস ও আছার (সাহাবা ও তাবেয়ীদের বক্তব্য) এই মতকে শক্তিশালী করে। যেমন হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন- " এক শা'বান থেকে অপর শা'বান পর্যন্ত মানুষের হায়াত চূড়ান্ত করা হয়। এমনকি একজন মানুষ বিবাহ করে এবং তার সন্তান হয় অথচ তার নাম মৃতের তালিকায় উঠে যায়।" [ দূররে মানসূর- খন্ড-৭, পৃ. ৪০১] প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত আ'ত্বা ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত- "শা'বানের মধ্যবর্তী রাত অর্থাৎ শবে বরাতে মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করা হয় (অর্থাৎ জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের তালিকায় স্থানান্তর করা হয়)। এমনকি একজন মানুষ সফরে বের হয় অথচ তার নাম জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের তালিকায় রাখা হয়। এমনিভাবে একজন মানুষ বিবাহ করে অথচ তার নাম জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের তালিকায় স্থানান্তর করা হয়।" [মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক- খন্ড-৪, পৃ. ৩১৭] ইলমে হাদিসের উসূল মতে একজন তাবেয়ীর কথাও দলিল হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়াও এ ব্যাপারে আরও অনেক আছার বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং বিষয়টি একেবারে ভিত্তিহীন বলা বে-ইনসাফী হবে।



উল্লেখ্য, যারা বরকতময় রাত দ্বারা শবে ক্বদরকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন তারা কেউই লাইলাতুল বরাতের গুরুত্ব অস্বীকার করেন নি। যেমনটি বর্তমান সময়ের কিছু নব্য সালাফী পথভ্রষ্ট-গোমরাহরা করে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে যারা শবে বরাত ব্যাখ্যা করেছেন তারাও শবে ক্বদরকে গুরুত্বহীন বলে মত পোষণ করেননি। বরং তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ রাত বলেই সাব্যস্ত করেছেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন, সূরা আদ দুখানের সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসীর- (তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে বাগাভী, তাফসীরে খাযেন, তাফসীরে কাবীর, তাফসীরে রুহুল মাআনী, তাফসীরে কুরতবী, তাফসীরে রুহুল বায়ান, তাফসীরে ইবনে কাছীর, তাফসীরে দূররে মানছূর, তাফসীরে কাশফুল আসরার, তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে ইবনে আবি হাতেম, তাফসীরে ছা'লাবী, তাফসীরে মাজহারী, তাফসীরে নিসাপুরী, তাফসীরে কানযুল ঈমান) সহ পৃথিবীর প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থসমূহ।



* হাদীসে নববীর আলোকে পবিত্র শবে বারাআত:-



হাদীস নং-১ 'হযরত মু'আয ইবনে জাবাল (রা:) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তায়ালা শা'বান মাসের পনের তারিখ রাতে সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের (বিশেষ) দৃষ্টি দান করে সকলকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক এবং হিংসুক ছাড়া।' (মু'জামুল কবির লিত তাবরাণী-২০/১০৮, সহিহ ইবনু হিব্বান-১২/৪৮১, শুআবুল ঈমান-৩/৩৮২, হিলইয়াতুল আউলিয়া-৫/১৯১, মাজমাউয যাওয়ায়েদ-৮/১২৫, মুসনাদুল বাযযার-১/৪২৩)। আলোচ্য হাদীসটির সনদ পর্যালোচনা করে ইমাম হায়সামী, ইমাম বায়হাকী ও ইবনু হিব্বান সহিহ সাব্যস্ত করেছেন। এমনকি সালাফী মুহাদ্দিস শায়খ আলবানীও হাদীসটি সহিহ বলেছেন, দেখুন (সিলসিলাতু আহাদিসিস সহিহাহ-৩/১৩৮)



শবে বরাতের পক্ষে আর কোনো হাদীস না থাকলেও এ একটি হাদীসই যথেষ্ট ছিল। এ রাতের অধিক গুরুত্বের কারণে সিহা সিত্তার দুইজন মান্যবর ইমাম তিরমিযী ও ইমাম ইবনু মাযাহ (রহ.) নিজ নিজ সংকলিত সুনান গ্রন্থে 'বাবু মা জা-আ-ফি লাইলাতিন নিসফি মিন শা'বান' নামে আলাদা অধ্যায়, অগণিত হাদিসের ইমাম অসংখ্য বর্ণনা এনেছেন। এরপরও যারা এর গুরুত্বকে অস্বীকার করে তাদের জন্য আফসোস।



হাদীস নং-২ 'হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, শা'বান মাসের পঞ্চদশ রজনীর আগমন হলে মহান আল্লাহ পৃথিবীর আসমানে তাশরীফ আনেন (বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন) এবং স্বীয় বান্দাদিগকে মাফ করে দেন কিন্তু মুশরিক ও অপর ভাইয়ের সাথে হিংসা পোষণকারী ব্যতীত।' (শু'আবুল ঈমান-৩/৩৮০, মাজমাউয যাওয়ায়িদ-৮/১২৫, জামেউল আহাদীস-২৪/২৫৫, মুসনাদুল বাযযার-১/১৮, কিতাবুদ দু'আফা-৩/২৯)



বর্ণিত হাদীসটি ইমাম মুনযিরী, ইমাম হায়সামী, ইমাম উকায়লী, ইমাম তাবরাণী প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ সহিহ সাব্যস্ত করেছেন। ইমাম হায়সামী বলেছেন এই হাদিসের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য (মাজমাউয যাওয়ায়েদ- ৮ম খন্ড, পৃ. ৬৫)। শবে বরাতের ফযিলতের ব্যাপারে যদি আর কোনো হাদীস নাও থাকত, তবে এ দু'টি হাদীসই এর গুরুত্ব্ব এবং অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট ছিল। এমনকি সালাফীদের কথিত ইমাম শায়খ আলবানীও বিভিন্ন সূত্রের কারণে হাদিসটি গ্রহণযোগ্য বলে মতামত দিয়েছেন। (সিলসিলাতু আহাদীসিস সহিহাহ-৩/১৩৫)



* পবিত্র শবে বারাআতের ব্যাপারে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের দিক নির্দেশনা :-



'হযরত আলী বিন আবি তালিব (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শা'বান মাসের পনের তারিখ রাত আসলে তখন রাতের অংশে কি্বয়াম (ইবাদত) কর আর দিনের অংশে রোযা রাখো। কারণ ঐ রাতে সূর্যাস্ত যাওয়ার পর মহান আল্লাহ প্রথম আসমানে অবতরণ করে বলতে থাকেন, আছো কি কোনো মাগফিরাতের প্রত্যাশী? তাকে আমি ক্ষমা করে দিবো। আছো কি কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তি? তাকে আমি সুস্থতা দান করব। আছো কি অমুক আছো কি অমুক- এভাবে সূর্যোদয় পর্যন্ত ডাকতে ধাকেন।' (সুনানে ইবনে মাজাহ-১/৪৪৪, শু'আবুল ঈমান-৩/৩৭৮, তারগীব ওয়াত তারহীব-২/৭৪, ফাযাইলুল আওক্বাত লিল বায়হাকী-১/১২৪, লাতায়েফুল মা'আরিফ-১/১৫১, নুযহাতুল মাযালিস-১/১৪৬, এহইয়াউ উলুমুদ্দীন-১/৩৯৪, শরহুল মাওয়াহিব-৭/৩১২)



আলোচ্য হাদীসের একজন রাবী (ইবনে আবি সাবুরাহ) কে নিয়ে মুহাদ্দীসগণ বিভিন্ন মত পোষণ করলেও কেউই কিন্তু হাদীসটিকে জাল বলেননি। তবে হাদীসটিকে বড়জোর দ্বয়ীফ বলা যেতে পারে। জ্ঞাতব্য যে, ফযিলত ও নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে দ্বয়ীফ হাদীস দ্বারা আমল করা সর্বযুগের সকল মুহাদ্দিসের মতে মুস্তাহাব। ইমাম যায়নুদ্দীন আল ইরাকী এ হাদীসের সনদ বিশ্লেষণ করে এটিকে শুধুমাত্র দ্বয়ীফ বলেছেন। (তাখরীজে আহাদিসিল এহইয়া-২/১৩০)। কেউ হাদীসটিকে মওযু বা বানোয়াট বলেননি। এমনকি হাদীসকে মওযু সাব্যস্ত করণে সবচেয়ে কঠোর ইমাম ইবনুল জাওযী তার 'আল-মওযুআ'ত' কিতাবে ইবনে মাযাহ শরীফের যে সকল হাদীসকে তাঁর দৃষ্টিতে মওযু বা বানোয়াট সাব্যস্ত করেছেন সে সব হাদীসের মধ্যে এ হাদীসটি নেই। কিন্তু সালাফী-লা মাজহাবীরা এ সকল ইমামের মতামত অগ্রাহ্য করে বিদ্বেষপ্রসূত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে হাদিসটি মওযু বলতে চান, যা ইসলামী শরীয়ত নিয়ে তামাশা বৈ কিছু নয়। উপরোক্ত হাদিস দ্বারা শবে বারাআতের রাতে 'কিয়ামুল লাইল' তথা রাত্রিতে নফল ইবাদত ও পরবর্তী দিন রোজা রাখা প্রমাণিত হয়।



এ সকল দলিল পেশ করার পর সালাফী-নামধারী আহলে হাদিস শায়েখগণ বলতে চান, এ রাতের ফযিলত আছে, তবে কোনো ইবাদত-বন্দেগী করার দরকার নেই। আসলে শয়তান যাদের মন-মস্তিষ্ক কব্জা করেছে তাদের আপত্তির শেষ নেই।



* পবিত্র শবে বারাআতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাস এর আমল:-



'উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, এক রাতে আমি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে বিছানাতে পেলাম না। তাই তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। তখন দেখতে পেলাম তিনি জান্নাতুল বাকীতে মাথা মুবারক (অন্য বর্ণনায় দুই হাত মুবারক) আকাশের দিকে উত্তোলন অবস্থায় আছেন। আমাকে দেখে তিনি বলে উঠেন, তুমি কি এই আশঙ্কা করছ যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তোমার সাথে অবিচার করেছেন? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম! আমি ধারণা করছিলাম আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ নিয়েছেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বললেন, শা'বানের পনের তারিখ রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে তাশরীফ নেন এবং বনু কালব গোত্রের ভেড়া-বকরীর পশমগুলোর চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি মাফ করে দেন।' (সুনানে তিরমিযী-৩/১১৬, সুনানে ইবনে মাজাহ-১/৪৪৪, শু'আবুল ঈমান-৩/৩৭৯, মুসান্নাফে ইবনু আবি শায়বাহ-১০/৪৩৭, শরহুস সুন্নাহ-২/১৯৯, মুসনাদে আহমদ-৬/২৩৮, আন নুযূল-দারে কুতনী -হাদিস নং-৭৩)। র্বির্ণত হাদীসটি ইমাম তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম বায়হাকীসহ আরো অনেক মুহাদ্দিস সংকলন করেছেন। এ সকল বড় বড় ইমামগণ কেউই এটিকে জাল হাদীস বলেননি। বিভিন্ন সূত্রের কারণে হাদীসটিকে বরং হাসান (উত্তম) বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন ইমাম যুরকানী (শরহুল মাওয়াহিব-৭/৪৪১)। সালাফী শায়খ আলবানী বলেন, বিভিন্ন সূত্রের কারণে সম্মিলিতরূপ হিসেবে হাদিসটি নি:সন্দেহে সহিহ। (সিলসিলাহ সহিহাহ- খন্ড-৩, পৃ. ১৩৫)



অপর একটি বর্ণনায় আম্মাজান আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নামাজে দাঁড়ালেন, অতঃপর এত দীর্ঘ সেজদা দিলেন যে আমি মনে করেছিলাম তিনি বুঝি ইন্তেকাল করেছেন। এ অবস্থা দেখে আমি উঠে গিয়ে তাঁর পায়ের আঙ্গুলি মুবারক একটু নাড়া দিলাম, তিনি নড়ে উঠলেন, তারপর আমি ফিরে আসলাম। যখন তিনি সেজদা থেকে মাথা উঠালেন এবং নামাজ শেষ করলেন তখন বললেন, হে আয়েশা! অথবা হে হুমায়রা! তুমি কি মনে করেছ যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তোমার প্রতি অবিচার করেছেন? আমি বললাম আল্লাহর শপথ! জি্ব না ইয়া রাসূলাল্লাহ! বরং আপনার দীর্ঘ সেজদার কারণে আমি মনে করেছিলাম আপনার রূহ কবজ হয়ে গেছে। এরপর তিনি বললেন, তুমি কি জানো আজ কোন্ রাত? আমি বললাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন। তিনি বললেন, এটা হচ্ছে শাবান মাসের মধ্য রাত্রি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা এই রাত্রে তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন। যারা ক্ষমা চায় তাদের ক্ষমা করে দেন, যারা রহমত কামনা করে তাদের উপর রহমত নাযিল করেন এবং হিংসুকদের যে অবস্থায় আছে তাতেই রেখে দেন (অর্থাৎ হিংসুকদের ক্ষমা করেন না)।" (শুয়াবুল ঈমান-হাদিস নং- ৩৮৩৫, আয যাওয়াজের লিল হায়সামী-খন্ড-২, পৃ. ৬১২)। ইমাম আবু বকর বায়হাকী বলেছেন, হাদিসটি মুরসাল জায়্যিদ। অর্থাৎ মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত না হলেও হাদিসটি সনদ বিবেচনায় উত্তম যা দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। উপরোক্ত দুটি প্রামাণ্য হাদিস দ্বারা যে বিষয়গুলো সাব্যস্ত হয় তা হলো, শবে বারাআতের রাত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কবর জিয়ারত করেছেন, দুই হাত উত্তোলন করে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, নফল নামাজ আদায় করেছেন, দীর্ঘ সেজদায় আল্লাহর দরবারে অবনত হয়েছেন। দ্বিতীয় হাদিসের শেষ অংশে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- এ রাতে যারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন, যারা রহমত কামনা করে তাদের উপর রহমত নাযিল করেন। আলোচ্য হাদিসদ্বয় এবং উপরের আরও বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয় শবে বারাআতের রাতে- ইবাদত-বন্দেগী করা, নফল নামাজ পড়া, কবর যিয়ারত করা, আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুই হাত উঠিয়ে দোয়া করা, ইস্তেগফার করা, নিজের অভাব অভিযোগ ও বিপদ-আপদ মুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে আল্লাহর কাছে যাচনা করা ইত্যাদি সব বিষয় কোরআন ও সুন্নাহর বক্তব্যেরই প্রতিফলন। সাহাবা-তাবেয়ীদের যুগেও পবিত্র শবে বারাআতের রাতে ওনারা ইবাদত-বন্দেগী করতেন বলে প্রমাণিত। সাহাবীয়ে রাসূল হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিঃ), হযরত আবু উমামা বাহেলী (রাদিঃ) এবং হযরত ওয়ায়েল বিন আসক্বা (রাদিঃ) থেকে 'শবে বারাআতের রাতে দোয়া কবুল হওয়া এবং এ রাতে ইবাদতের বিষয়টি বর্ণিত রয়েছে । [মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক-হাদীস নং-৭৯২৭, তাইসীর শরহে জামেউস ছগীর-১/৫২০, ফুতুহুশ শাম-১/৯০] উম্মতের সকল ইমাম এ বিষয়ে একমত শবে বারাআতের রাত্রে নফল ইবাদত ইসলামী শরীয়তের আলোকে সম্পূর্ণ জায়েয বরং মুস্তাহাব। স্থান সঙ্কুলানের অভাবে তাদের বক্তব্য এখানে দিতে পারছি না। আরব দেশগুলোতে বিশেষত মক্কা-মদীনায় শবে বারাআত পালিত হয় না এটা সালাফীদের আরেকটি মিথ্যাচার। সেখানে অবস্থানরত অনেকের সাথে কথা বলে আমরা দেখেছি তারা হয়তো ব্যাপক আয়োজন করে এটা পালন করেন না, কিন্তু সেসব দেশেও ঘরে ঘরে শবে বারাআতের রাতে ইবাদত-বন্দেগী করা হয়। এ রাতে নিয়ত ঠিক রেখে গরীব-দুঃখী ও প্রতিবেশীদের মধ্যে হালুয়া-রুটি বিতরণ করা সওয়াবের কাজ, এতে সামাজিক সম্প্রীতি ও মহব্বত বৃদ্ধি পায়। তবে এটা করতে যেয়ে বেপর্দা হওয়া, ইবাদত-বন্দেগীতে গাফলতি করা চরম গর্হিত বিষয়। যে কোনো নফল ইবাদত যত গোপনে-নিভৃতে করা যায় ততই উত্তম। আমাদের ঘরগুলোতে উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় একান্তচিত্তে ইবাদত করতে সাধারণত মুসুল্লীরা মসজিদে ভীড় করে থাকেন। এটা কোনো দোষের বিষয় নয়।



তাই আসুন, কোনো ধরণের বিভ্রান্তিতে কান না দিয়ে কোরআন-সুন্নাহর দলিলে প্রমাণিত পবিত্র শবে বারাআতের রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হই, স্বীয় পাপরাশির জন্যে ইস্তেগফার করি, নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে, সমাজ ও দেশের জন্যে সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহর জন্যে হৃদয় উজাড় করে দয়াময় আল্লাহর কাছে দোয়া করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তওফীক দান করুন। আমিন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)।



লেখক : মাস্টার্স, আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
২১০৭১৬
পুরোন সংখ্যা