চাঁদপুর, রোববার ২১ এপ্রিল ২০১৯, ৮ বৈশাখ ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪০
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৪৯-সূরা হুজুরাত


১৮ আয়াত, ২ রুকু, 'মাদানী


৩। যাহারা আল্লাহর রাসূলের সম্মুখে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে, আল্লাহ তাহাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরীক্ষা করিয়া লইয়াছেন। তাহাদের জন্য রহিয়াছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।


 


 


 


assets/data_files/web

ভালোবাসার কোনো অর্থ নেই, কোনো পরিমাপ নেই।


-সেন্ট জিরোমি


 


 


নামাজ বেহেশতের চাবি এবং অজু নামাজের চাবি।


 


 


 


ফটো গ্যালারি
গুনাহ্ থেকে মুক্তির একটি পুণ্যময় রাত শবেবরাত
মুফতি মুহাম্মদ ফজলুল কাদের বাগদাদী
২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


শবে বরাত ফার্সি শব্দ। শব অর্থ রাত আর বরাত অর্থ ভাগ্য। আরবিতে বলা হয় 'লাইলাতুল বরাত' অর্থাৎ ভাগ্য রজনী। এ মুবারক রজনীকে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়। (১) লাইলাতুল মুবারক বা বরকতময় রাত। (২) লাইলাতুল রাহমাহ বা রহমত পাওয়ার রাত। (৩) লাইলাতুস সাক বা ছাড়পত্রের রাত। (৪) লাইলাতুল কিসমত বা বন্টনের রাত। (৫) লাইলাতুত তাকফীর বা গুনাহের কাফফারার রাত। (৬) লাইলাতুল ইজাবত বা দোয়া কবুলের রাত। (৭) লাইলাতু ঈদিল মালাইকা বা ফেরেশতাদের ঈদের রাত।(৮) লাইলাতুল জায়েযা বা পুরস্কারের রাত। (৯) লাইলাতুশ শাফায়াত বা সুপারিশের রাত। (১০) লাইলাতুল গোফরান বা ক্ষমার রাত। (১১) লাইলাতুত তাজীম বা সম্মানিত রাত। (১২) লাইলাতুল উতাকায়ে মিনান নীরান বা দোযখ হতে মুক্তির রাত। (১৩) লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা শাবানের মধ্যবর্তী রাত (চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাত)।



আল কুরাআনের আলোকে শবে বরাত :



মহাগ্রন্থ আল কুরআনে লাইলাতুল বরাত বা লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান কোনোটারই সরাসরি উল্লেখ নেই। লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদরের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ সম্পর্কে কুরআন শরীফে একটি স্বতন্ত্র সুরাও রয়েছে, 'সূরা আল কদর'-এ এরশাদ হয়েছে 'আমি শবে ক্বদরে কুরআন অবতীর্ণ করেছি' সুরা কদর আয়াত --১। আল কুরআনে আর একটি রাতের কথা উল্লেখ রয়েছে তাকে বলা হয়েছে 'লাইলাতুল মুবারাকা' তথা বরকত ও কল্যাণময়ী রাত। যেমন_ এরশাদ হচ্ছে হা মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের 'আমি একে (কুরআন মাজীদকে) নাযিল করেছি -এক বরকতময় রাতে, নিশ্চই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক হিকমতপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয় আমারই আদেশে' (সুরা দুখান : আয়াত ১-৪)।



 



লাইলাতুল মুবারাকা তথা বরকতপূর্ণ রাত সম্পর্কে মুফাসসিরগণের মতামত:-



(১)হযরত আবদুল্লহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত কাতাদা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মুজাহিদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর একমত অনুযায়ী "লাইলাতুল মুবারাকা" বলতে লাইলাতুল কদরকে বুঝানো হয়েছে।



(২) প্রখ্যাত মুফাসসির হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ইকরামা রাদিয়াল্লাহু আনহুসহ বহু সংখ্যক সাহাবী-তাবেয়ীগণের মতে "লাইলাতুম মুবারাকা" চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাত বা শবেবরাতকে বুঝানো হয়েছে। যেমন:-



হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন- "হামীম- অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেছেন, লাইলাতুম মুবারাকা হলো শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত আর তা-ই "লাইলাতুল বরাত" (আবদুর রহমান জালালুদ্দিন আস সুয়ুতী, তাফসীওে আদ্দুররে মানসুর, খন্ড ৭,পৃষ্ঠা: ৪০১)।



প্রখ্যাত তাবেয়ী ও মুফাসসির হযরত ইকরামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন__ "লাইলাতুম মুবারাকা" দ্বারা শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামকে ঐ রাতে প্রথম আকাশে প্রেরণ করেন, যেন লিখিত কুরআন পুনরায় আবৃতি করতে পারেন। এ রাতকে মুবারক নাম রাখার কারণ হলো, এতে অনবরত কল্যাণ ও বরকত নাযিল হয়। তখন আল্লাহর রহমত নাযিল এবং দোয়া কবুল হয়। (আবু আহমদ আবদুল্লাহ ইবনে আবু মানছুর মুহাম্মদ আনসারী, তাফসীরে কাশফুল আসরার। খন্ড-৯,পৃ:৯৫)।



সূরা আদ দুখান ও সূরা আল ক্বদর উভয়ই মক্কা মুকাররামায় অবতীর্ণ হয়েছে। উভয় সুরাতে "আনযালনা" শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ একসাথে নাযিল হওয়া বুঝায়। উভয় আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য এভাবে হতে পারে যে- লাইলাতুল কদর তথা ক্বদরের রজনীতে লৌহে মাহফুজ থেকে বাইতুল ইজ্জতে নাযিল হয়েছে অথবা লাইলাতুম মুবারাকায় লৌহে মাহফুজ থেকে বাইতুল ইজ্জতে, আর লাইলাতুল কদরে বায়াতুল ইজ্জত থেকে প্রথম আকাশে নাযিল হয়েছে। ইমাম বাগবী রাহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর "মায়ালিমুত তানজীল" গ্রন্থে উভয়ে মতের সমাধান এভাবে দিয়েছেন-শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত আল্লাহ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন আর কদরের রাতে সংশ্লিষ্ঠ ফেরেশতাদের নিকট অর্পণ করেন। আর এটাই অধিক যৌক্তিক। পৃথিবীতেও সব কাজ আমরা আগে সিদ্ধান্ত নেই, আর একদিনে তা বাস্তবায়ন করে থাকি। অতএব যারা বলতে চান কুরআন কি দুই রাতে নাযিল হয়েছে? তাদের এমন বক্তব্যের কোনো সুযোগ আর থাকে না।



আল হাদীসের আলোকে শবে বরাত ও এর আমল



* পাঁচটি রাতের দোয়া নিশ্চিত কবুল হয় : হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন _ পাঁচটি রাতের দোয়া ফেরত আসে না। তাহলো : ১. জুমার রাত ২. রজব মাসের প্রথম রাত ৩. সাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ তথা শবে বরাতের রাত ও ৪. দুই ঈদের দুই রাত। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক হাদিস নং ৭৯২৭)



* পাঁচ রাতে ইবাদতকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে :



হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বছরে পাঁচটি রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করবে তার জন্যে জান্নাত আবশ্যক। ১. তারাবীয়ার রাত ২. আরাফার রাত ৩. কুরবানির রাত ৪. ঈদুল ফিতরের রাত ও ৫. চৌদ্দ শাবান তথা শবে বরাতের রাত। (ইমাম মুনজেরী আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, হাদিস নং ১৬৫৬)



* নবীর মাস শাবান :



নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন _ শাবান আমার মাস। রজব আল্লাহর মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস। শাবান মাস অপরাধ মোচনকারী এবং রমজান পাক পবিত্রকারী (নুযহাতুল মাজালিছ ওয়া মুনতাখাবুন নাফায়িস ১ম খ- পৃষ্ঠা নং ১৪৬)



* শবে বরাত বান্দার গুনাহমাফ ও দোয়া কবুলের রাত :



হযরত ওসমান ইবনে আবুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে প্রথম আকাশে একজন ঘোষণাকারী অবতরণ করে ডাকতে থাকেন। কেউ ক্ষমা চাওয়ার আছো কি? চাইলেই ক্ষমা করা হবে। কেউ কিছু চাওয়ার আছো কি? তাকে দেয়া হবে। যা চাওয়া হবে তাই দেয়া হবে। শুধু জিনাকারী ও আল্লাহর সাথে শরীককারী ব্যক্তি এ সৌভাগ্য লাভ করে না। ( আবু বকর আহমদ ইবনে আলহুসাইনি আল বায়হাকী শুয়াবুল ঈমাম খন্ড _ ৩ পৃ : ৩৮৬।)



* শবে বরাতে কবর যিয়ারত করা সুন্নাত এবং এ রাতে অগণিত গুনাহগার ক্ষমা পান :



হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একরাতে আমি রাসুলুল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামকে হারিয়ে ফেললাম। আমি তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। খুঁজে তাকে দেখলাম তিনি মদীনা শরীফের জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে রোনাজারিতে মশগুল মুনাজাত অবস্থায়। অতপর তিনি বললেন তুমি কি আশঙ্কা করতেছিলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? (অর্থাৎ তোমার হক নষ্ট করবেন) আমি বললাম, হে আল্লাহর রসুল, আমি ভেবেছিলাম আপনি আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট গমন করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন, আল্লাহর রহমত-বরকত বা ফেরেস্তা শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। অতঃপর কালব গোত্রের ছাগল পালের পশমের সংখ্যারও অধিক ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন।



(তিরমিযী ১ম খ- পৃষ্ঠা নং ১৪৪ হাদিস নং ১৩৮৯)



* শবে বরাতের রাতে ইবাদত ও দিনে রোযা রাখা সুন্নাত :-



হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত , তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন _ যখন অর্ধ শাবানের রাত তথা শবেরাতের রাতে সূর্যাস্তের পরপরই আল্লাহর রহমত বা ফেরেস্তা দুনিয়ার আকাশে অবতীর্ণ হন এবং বলতে থাকেন কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো। কোনো, রিজিক প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে বিপদ মুক্ত করবো। এভাবে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা আসতেই থাকে।



(ইবনে মাজাহ পৃষ্টা নং ৯৯ হাদিস নং ১৩৮৮)



* শবে বরাতে আল্লাাহ তায়ালা তিনশত রহমতের দরজা খুলে দেন :-



হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত , মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ রাতে জিবরাঈল আমার কাছে আসেন এবং বলেন, হে মুহাম্মদ! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের দিকে মাথা উঠিয়ে দেখুন। আমি বলি এরাতে কী হচ্ছে, জিবরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমতের তিনশত দরজা খুলে দেন। আল্লাহ তায়ালা এ রাতে কয়েক শ্রেণীর লোক ছাড়া সকল গুনাহগারকে ক্ষমা করেন । তারা হলো যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে, যাদুকর, গণক, যিনার কাজে লিপ্ত, সুদে জড়িত, মদপানকারী। অন্য বর্ন্যনা মতে অপর মুসলিম ভাইয়ের সাথে ঝগড়া বিবাদকারী ও মাতা পিতার অবাধ্য সন্তান।



(নুজহাতুল মাজালিস ওয়া মুনতাখাবুন নাফাইস খন্ড _ ১ পৃষ্টা নং ১৫৬)



* শবে বরাতের রাতে জান্নাতকে সাজানো হয় এবং অগণিত পাপিকে ক্ষমা করা হয় :-



কাব আল আহবার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহান আল্লাহ চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাতে হযরত জিবরাঈল আমীনকে বেহেশতে প্রেরণ করেন। তিনি জান্নাতকে সুসজ্জিত হতে নির্দেশ দেন। আরো বলেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এ রাতে আকাশের তারকা এবং পৃথিবীর দিন রাত সংখ্যা গাছের পাতা পাহাড়ের বালুরাশির সমপরিমাণ মানুুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন।



(নুজহাতুল মাজালিস ওয়া মুনতাখাবুন নাফাইস খন্ড ১ পৃষ্টা নং ১৫৮ লাতাইফুল মাআরিফ পৃ: ১৯১)



* জান্নাতের দরজা খোলা হয়:



হয়রত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন - রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন _ এ রাতের এক চতুর্থাংশে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম এসে বলেন, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার মাথা উঠান। আমি মাথা উঠিয়ে দেখি জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হয়েছে।



প্রথম দরজায়: একজন ফেরেশতা ঘোষণা করছেন_ যে ব্যক্তি এ রাতে রুকু করবে তার জন্য সুসংবাদ ।



দ্বিতীয় দরজায়: অপরজন ঘোষণা করেন _যে ব্যক্তি এ রাতে সিজদা করবে তার জন্য সুসংবাদ।



তৃতীয় দরজায়: অপরজন ঘোষণা করেছেন _এ রাতে যারা দোয়া করবে তাদের জন্য সুসংবাদ।



চতুর্থ দরজায়: আরেকজন ফেরেশতা ঘোষণা করেন _ এ রাতে যারা আল্লাহর জিকির করবে তাদের জন্য সুসংবাদ।



পঞ্চম দরজায়: আরেকজন ঘোষণা করেন _ আল্লাহর ভয়ে যারা এ রাতে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে কাঁদবে তাদের জন্য সুসংবাদ।



ষষ্ঠ দরজায়: অপরজন ঘোষণা করেন _এ রাতে যারা আল্লাহর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পন (তওবা) করবে তাদের জন্য সুসংবাদ ।



সপ্তম দরজায়: আরেকজন ঘোষণা করেন কোন প্রার্থী আছ কি? যা চাইবে তাকে তাই দেয়া হবে।



অষ্টম দরজায়: অপরজন ঘোষণা করেন-কোনো গুনাহ ক্ষমা প্রার্থী আছ কি? তাকে ক্ষমা করা হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন _ আমি জিবরাঈলকে জিজ্ঞাস করলাম এ সব বেহেশতের দরজা কতক্ষণ খোলা থাকবে? তিনি বলেন, রাতের শুরু থেকে ফজর পর্যন্ত। এরপর তিনি বলেন, হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এ রাতে তার বিশেষ রহমতে কালব গোত্রের বকরীর পশম সংখ্যক জাহান্নামীকে মুক্তি দিবেন।



( গুনিয়াতুন তালেবীন পৃ: ৩৬৪ নুজহাতুল মাজালিস ওয়া মুনতাখাবুন নাফাইস খ- ১ পৃ: ১৫৭)



* শবে বরাতে অগামী একবছরের হায়াত- মউত লিপিবদ্ধ করা হয়।



হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ননা করেন। তিনি হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে উদ্দেশ্য করে বলেন _ তুমি কি জান শাবানের মধ্য রাতে তথা শবে বরাতের রাতে কী কী ঘটে? তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ ! তাতে কি ঘটে? তখন তিনি বললেন _ এ রাতে লিপিবদ্ধ হয় এ বছর যত আদম সন্তান জন্মলাভ করবে এ রাতেই লিপিবদ্ধ করা হয় এ বছর যত আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করবে - এ রাতেই মানুষের আমলসমূহ উঠানো হয় এবং এ রাতেই মানুষের রিজিক সমূহ বণ্টন করা হয়।



( ইমাম বায়হাকির আদদাআওয়াতুল কবীর, মেশকাত পৃ: ১১৫)



* শবে বরাতের জন্য হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর আকুতি :-



একদা হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম একটি বড় পাহাড় অতিক্রম করছিলেন। পথে একটি বড় আকারের সাদা পাথর দেখতে পান। পাথরটির আকর্ষণে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বারবার তা ঘুরে দেখছিলেন। পাথরটি তাঁর কাছে বিস্ময়কর মনে হচ্ছিল । এমন সময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে ওহী প্রেরণ করে বললেন, আপনি কি চান যা দেখলেন এর চেয়েও বিস্ময়কর কিছু আপনাকে দেখাব? হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন হ্যাঁ। তখনই সাদা পাথরটি ফেটে দু'ভাগ হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, সেখানে এক ব্যক্তি রয়েছেন এবং তাঁর হাতে রয়েছে সবুজ রংয়ের একটি লাঠি। তার পাশেই রয়েছে একটি আঙ্গুর গাছ। ঐ ব্যক্তি বললেন, এটা আমার প্রতিদিনের রিযিক। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন থেকে আপনি এ পাথরের ভিতর রয়েছেন? তিনি জবাবে বললেন, চারশত বছর ধরে এ পাথরের ভেতরে আছি। তখন হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে পরওয়ার দিগার! আমার মনে হচ্ছে আপনি আপনার এ বান্দার চেয়ে উত্তম আর কাউকে সৃষ্টি করেননি। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, উম্মতে মুহাম্মদীর যে কোনো লোক শবে বরাতের রাতে দু'রাকাত নামায আদায় করবে, এ ব্যক্তির চারশত বছরের ইবাদতের চেয়েও তা উত্তম হবে। (অর্থাৎ অধিক ছাওয়াবের অধিকারী হবে) তখন হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আকুতি জানালেন, হায়! আমি যদি উম্মতে মুহাম্মদীর অন্তর্ভুক্ত হতাম। (নুজহাতুল মাজালিস ওয়া মুনতাখাবুন নাফাইস, খন্ড-১ পৃ: ১৪৭)



মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর আকুতি কবুল করেছেন এবং তিনি কেয়ামতের পূর্বে এ দুনিয়াতে উম্মতি মুহাম্মদি হয়ে আগমন করবেন।



* শবে বরাতের রাতে যে সকল লোকের আমল কবুল হয় না :



১. মুশরিক অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে যে কোনো প্রকারের শিরকে লিপ্ত হয়।



২. যে ব্যক্তি কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে।



৩. যে ব্যক্তি অপরের ভালো দেখতে পারে না।



৪. আত্মহত্যার ইচ্ছা পোষণকারী।



৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।



৬. ব্যভিচারে লিপ্ত তথা জিনাকারী।



৭. মদ্যপানকারী।



৮. গণক।



৯. মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান।



১০. টাকনুর নীচে কাপড় পরিধানকারী পুরুষ। ইত্যাদি ব্যক্তির দোয়া তাওবা না করা পর্যন্ত কবুল হয় না।



তবে শবে বরাতের পূর্ণ ফযিলত ও শবে বরাতের রাতে আমল কবুল হওয়ার জন্যে উল্লেখিত কবীরা গুনাহ সমূহ থেকে খাঁটি দিলে তাওবা করলে আল্লাহতায়ালা বান্দার ইবাদাত-বন্দেগী কবুল করে নিবেন।



কীভাবে কাটাবেন শবেবরাত :



১। রোজা রাখা ৩টি (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ)। ২। সূর্যাস্তের সময় ৪০ বার "লাহাওলা ওয়ালাকুয়াতা ইল্লা বিল্লা হিলআলিউল আজিম" পড়া। যে ব্যক্তি এই আমল করবে তার ৪০ (চলি্লশ) বছরের সগীরা গুনাহ ক্ষমা করা হবে। ৩। মাগরীবের নামাজের পর গোসল করা (যে ব্যক্তি গোসল করে কিছু সময় কাপর পরিবর্তন না করে দাঁড়িয়ে থাকবে প্রতিটি পানির ফোঁটার সাথে তার সগীরা গুনাহ ঝড়ে পড়বে)। ৪। নফল সালাত আদায় করা (সালাতের নির্ধারিত কোনো রাকাত নেই, যে যত অধিক পড়বে তার সাওয়াবও তত বেশি হবে। তবে কমপক্ষে ১২ রাকাত পড়া উত্তম, ১শত রাকাতও পড়া যায়। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে শাবান মাসের ১৪তারিখ দিবাগত রাত বা শবে বরাতের রাতে ১২ রাকাত সালাত আদায় করবে, এর প্রতি রাকাতে ১ বার সূরাতুল ফাতেহা ১০ বার সূরা ইখলাস পড়বে আল্লাহ তায়ালা এর বদৌলতে তার জীবনের গুনাহ মাফ করে দিবেন "নুযহাতুল মাজালিস ওয়ামুনতাখাবুন নাফাইস খন্ড-১, পৃষ্ঠা -১৫৮"। (এই নামাজের নিয়ত -নাওয়াইতুয়ান উসালি্লয়া লিল্লাহিতায়ালা রাকাতাই সলাতিল লাইলাতুল বরাত নাফলে মোতাওয়াজিহান ইলাজিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহুআকবার)।



* শবে বরাতে একসাথে ১০০ (একশত) রাকাত নামাজ পড়া যায়। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতেহার পর সূরা ইখলাস ১০ বার। আর যদি ১০ রাকাত পড়া হয় তাহলে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতেহার সাহে সূরা ইখলাস ১০০ (একশত) বার পড়তে হয়। যে ব্যক্তি এভাবে ১০০ (একশত) রাকাত নামাজ আদায় করবে সে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার বিশেষ কল্যাণের ভাগীদার হবে। ইহাকে সালাতুল খায়ের বলা হয়। "এহ্ইয়াঊ উলুমিদ্দীন খন্ড-১, পৃষ্ঠা-২০৩"।



* সালাতুত তাসবীহ:



নিয়ম: প্রথমে নামাযের নিয়ত করে আল্লাহু আকবার বলে তাহরীমার পর যথারীতি ছানা পাঠ করবে। অতঃপর এই দোয়াটি (সুবাহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলি্ললাহি ওয়া লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার) ১৫ বার পাঠ করবে। এরপর সূরা ফাতেহা ও অন্য সূরা পাঠ করে রুকুতে যাওয়ার পূর্বে এই দোয়াটি ১০ বার, রুকুতে গিয়ে ১০ বার, তাসবীহ পাঠ করবে। রুকু হতে মাথা সোজা করে দাঁড়িয়ে ১০ বার, এরপর সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবীহ আদায় করে ১০বার, সিজদা থেকে বসে ১০ বার, ২য় সিজদায় গিয়ে তাসবীহ আদায় করে ১০ বার পড়বে। এভাবে প্রতি রাকাতে ৭৫ বার, ৪ রাকাতে ৩শ' বার তাসবীহ আদায় করে নামাজ শেষ করতে হবে। এই নামাযের নিয়ত "নাওয়াই তুআন উসাললিয়া লিল্লাহী তায়ালা আরবাআ রাকাতে সালাতিত তাসবীহ সুন্নাতু রাসুলিল্লা তায়ালা/নফলে মোতাওয়াজ্জিহান ইলাজিহাতিল কাবাতিশ সারিপাতি আল্লাহুআকবার"। (এছাড়াও আরও অন্যান্য নফল নামাজ পড়া যায়)।



৫। কোরআন তেলাওয়াত করা। ৬। আল্লাহর জিকির করা। ৭। দুরুদশরীফ পড়া (আল্লাহুম্মা সালি্লয়ালা সাইয়্যেদিনা মোহাম্মাদীন নাবিইল উম্মি ওয়ালিহি ওয়াসালি্লম)। ও কেয়াম শরীফ পড়া।



৮। কবর জিয়ারত করা। (মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারাত এবং আউলিয়াকেরামদের মাজার জিয়ারত করে বিশেষ ফজিলত লাভ করা)।



৯। দান খয়রাত করা। ১০। আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশির সাথে সাক্ষাৎ করা এবং গরিব, মিসকিনদের মাঝে খাবার (হালুয়া, রুটি, মিষ্টান্ন জাতীয়) বিতরণ করা। ১১। নিজের জন্য, দেশবাসী, আত্মীয়-স্বজন, সকল মুসলমান নর নারীর জন্য দোয়া করা।



* যাহা করা যাবে না : পটকা ফুটানো, আতসবাজি, বোমাবাজি, তারা বাজি, গোলা বারুত ইত্যাদি ফুটানো যাবে না।



পরিশেষে বলা যায় যে, এই শবেবরাতের রাত্রে মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত এবং বরকতের মাধ্যমে তাঁর অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন, পাপি, তাপি লোক আল্লাহর কৃপা লাভ করেন, যদি তারা মুক্তি লাভের জন্যে এই রাতে ইবাদত বন্দেগী, নফল নামাজ, জিকির, মিলাদ কেয়ামের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে তাদের প্রতি জীবনের কর্মকা- থেকে ফিরে এসে একজন নেককার-ঈমানদার বান্দায় পরিণত হয়ে তাদের জীবন ধন্য করতে পারে এর চেয়ে আর বড় নেয়ামত কি হতে পারে? তাই আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালা যেনো নবীর সুন্নাত তরিকা মোতাবেক জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুক। আমিন!



লেখক : খতিব, হযরত মাদ্দাহ্ খাঁ (রঃ) জামে মসজিদ, আলীগঞ্জ, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।



 



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৯৯৬৭১৮
পুরোন সংখ্যা