চাঁদপুর, শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • --
নবী মোহাম্মদ (সাঃ)
মূল : অধ্যক্ষ রামাকৃষ্ণ রাও অনুবাদ : আবু জাফর
৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)



পৃথিবী সাক্ষী, প্রতি বছর হজ্ব মৌসুমে ইসলামী সাম্যের কী বিস্ময়কর আন্তর্জাতিক দৃশ্যই না ফুটে ওঠে, যেখানে বর্ণ, গোত্র ও মর্যাদার সকল ভেদরেখা নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেবল ইয়োরোপীয়রা নয়, আফ্রিকান, আরবি, ইরানী, ভারতীয়, চৈনিক সবাই এক স্বর্গীয় পরিবারের সদস্য হিসাবে মিলিত, সবার একই পোশাক, দুই প্রস্থ সাদা সেলাইবিহীন কাপড়, একটি কোমর পেঁচিয়ে পরা ও অন্যটি কাঁধের উপর দিয়ে ছড়িয়ে রাখা, সম্পূর্ণরূপে সাজসজ্জাহীন, নগ্ন মস্তক, মুখে একই উচ্চারণ, 'প্রভু আপনার আদেশ পালনার্থে আমি উপস্থিত। আপনি এক এবং অদ্বিতীয়, প্রভু, আমি উপস্থিত'। এইভাবেই সেখানে উচ্চনীচের কোনো ভেদ আর অবশিষ্ট থাকে না। এবং তারপর সকল তীর্থযাত্রী, স্ব স্ব গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, সঙ্গে নিয়ে যান ইসলামের এক তাৎপর্যময় আন্তর্জাতিক মহিমা ও সৌরভ।



প্রফেসর হার্গরোন্জ (ঐঁৎমৎড়হলব)-এর বিবেচনা মতে 'ইসলামের নবী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (খবধমঁব ড়ভ ঘধঃরড়হং) তা আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সর্বমানবিক ভ্রাতৃত্বকে এমন এক বৈশি্বক ভিত্তিভূমির উপর দ-ায়মান করে, যা অন্য বহু জাতির কাছে আলোকবর্তিকা স্বরূপ'। এই অধ্যাপক আরো বলেন, 'আসলেই বহুজাতিক ঐক্যের যে বৈশি্বক ধারণা ও উপলব্ধি ইসলাম উপহার দিয়েছে, তার তুল্য কোনো উদাহরণ পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে নেই। সন্দেহ নেই, গণতন্ত্রের যে সর্বোৎকৃষ্ট রূপ তা ইসলামের নবীই পৃথিবীকে প্রদর্শন করেছেন। খলিফা ওমর (রাঃ), মোহাম্মদ (সাঃ)-এর জামাতা খলিফা আলী (রাঃ), খলিফা মনসুর, আব্বাস মামুনসহ বহু খলিফা এবং বাদশাহকে একজন সাধারণ অপরাধীর মত বিচারকের সম্মুখীন হয়ে ইসলামী আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। আমাদের কারো অজানা নয়, আজকের দিনেও কালো নিগ্রোদের প্রতি সভ্য সাদা মানুষদের কী আচরণ। অথচ আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর সময়ে একজন নিগ্রো ক্রীতদাস হযরত বেলাল (রাঃ) কী মর্যাদা পেয়েছিলেন, তা স্মরণ করলে বিস্মিত হতে হয়। ইসলামের প্রথম যুগে মুয়াজ্জিনের কাজটা ছিল অতীব মর্যাদাপূর্ণ। এই সম্মান লাভ করেছিলেন হযরত বেলাল (রাঃ)। মক্কা বিজয়ের পর নবী মোহাম্মদ (সাঃ) তাঁকে নামাজের জন্য আজান দিতে বললেন। কৃষ্ণবর্ণ পুরু ঠোঁটের এই নিগ্রো মানুষটি ইসলাম জগতের সর্বাধিক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ও পবিত্রতম কাবা শরীফের ছাদে গিয়ে যখন দাঁড়ালেন, কিছু গর্বিত আরব তখন আর্তনাদ করে উঠলো যে, 'কী নিদারুণ, কী বেদনাদায়ক। আজ এক কালো নিগ্রো ক্রীতদাস পবিত্র কাবাগৃহের ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আজান দেবার জন্য'! সেই মুহূর্তে মোহাম্মদ (সাঃ) কোরআন পাকের আয়াত থেকে ঘোষণা করলেন :



হে মানবজাতি,



নিশ্চয়ই তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে



বিভিন্ন পরিবার ও গোত্রে,



যাতে একে অপরকে তোমরা জানতে পারো।



নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে



সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত,



যে সর্বাপেক্ষা অধিক পুণ্যবান।



নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সুপরিজ্ঞাত।'



এবং কোরআন শরীফের এই ক'টি মাত্র পংক্তি এতই শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিল, সাধন করেছিল এমন মানসিক রূপান্তর যে, এমনকি ইসলামের খলিফারা পর্যন্ত, যাঁরা জন্মসূত্রে বিশুদ্ধ আরব, এই নিগ্রো দাসের হাতে নিজ কন্যা সম্প্রদান করতে আগ্রহী হন এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা সেই ইতিহাস-প্রসিদ্ধ আমিরুল মুমেনীন হযরত ওমর (রাঃ)ও এই নিগ্রো ক্রীতদাসের সঙ্গে দেখা হলেই দাঁড়িয়ে এই বলে সশ্রদ্ধ স্বাগত জানান, 'আসুন, আমাদের সর্দার, আমাদের নেতা'। সমসমায়িক জগতে যে আরব ছিল সর্বাপেক্ষা আভিজাত্য-গর্বিত, কোরআন সেই আরবদের মধ্যে কী অলৌকিক পরিবর্তনই-না সাধন করেছিল! এই হেতুই জার্মানের শ্রেষ্ঠতম কবি গ্যেটে কোরআন শরীফ সম্পর্কে নির্দ্বিধায় বলেন, 'এ এমন এক গ্রন্থ যার মহিমময় প্রভাব ও অনুশীলন যুগ যুগ ধরে একইভাবে অব্যাহত থাকবে' এবং বার্নার্ড শ বলেন, 'আগামী এক শতাব্দীর মধ্যে কোনো একটি ধর্মের দ্বারা যদি ইংল্যান্ড তথা ইউরোপ শাসিত হবার ঘটনা ঘটে, সে ইসলাম'।



এবং ইসলামের এই একই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নারীজাতিকেও পুরুষের নিগড় থেকে মুক্তি দিয়েছিল। স্যার চার্লস আর্চিবাল্ড হ্যামিলটন বলেছেন, 'মানুষ যে জন্মগতভাবে নিষ্পাপ এই কথা ইসলামই শিখিয়েছে। ইসলামই বলেছে, নারী পুরুষ একই উপকরণ থেকে সৃষ্ট, উভয়ে একই আত্মার অধিকারী, কোনো তারতম্য নেই উভয়ের মধ্যে। তারা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ও মানসিক উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে সমশক্তি ও যোগ্যতাসম্পন্ন। আরবজাতির একটা বড় ঐতিহ্য ছিল, যে-সন্তান অস্ত্রচালনায় দক্ষ সেই উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হবে। কিন্তু ইসলামের আগমনেই দুর্বল নারীজাতির সুরক্ষার ব্যবস্থা হলো এবং তারা লাভ করলো পিতামাতার সম্পদের উত্তরাধিকার। নারীদের যে সম্পদের মালিকানা, বহু শতাব্দী পূর্বে ইসলামই তা নিশ্চিত করেছে এবং বিস্ময়কর, যে-ইংল্যান্ড আজ গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে অভিহিত, সেই ইংল্যান্ড মাত্র একশ' বছর আগে ১৮৮১ খ্রীস্টাব্দে ইসলামের এই আদর্শ রূপায়ণে 'বিবাহিত মহিলা বিধান' নামে একটি আইন পাস করেছে। কিন্তু বহু শতাব্দী পূর্বেই ইসলামের নবী (সাঃ) স্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেছিলেন, 'পুরুষ ও নারী পরস্পরের পরিপূরক, একে অপরের অর্ধাংশ। অতীব পবিত্র নারীর অধিকার, লক্ষ রেখো তাদের জন্য সংরক্ষিত অধিকার যেন পূর্ণরূপে অক্ষত থাকে।'



রাজনীতি কি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ইসলামের যোগ খুব প্রত্যক্ষ নয়, কিন্তু এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি ইসলাম নির্ধারণ করেছে, যা মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। প্রফেসর ম্যাসাইনন-এর মতে, ইসলাম দুই চরমতম বিপরীতের মধ্যে রচনা করে হিতকারী ভারসাম্য এবং যে উন্নত চরিত্র সভ্যতার ভিত্তিস্বরূপ, তা গঠনে ইসলামের ভূমিকা খুবই সহায়ক। কিন্তু কী করে সম্ভব হয় এই লক্ষ্য অর্জন? সম্ভব হয় ইসলামের উত্তরাধিকার আইন ও বাধ্যতামূলক যাকাত-এর যে বিধান, তার ব্যত্যয়হীন প্রয়োগের মধ্য দিয়ে; এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সব ধরনের অপতৎপরতা, যেমন একচেটিয়া বাজার, সুদ, পূর্বনির্ধারিত অনর্জিত আয় ও মুনাফা, কৃত্রিম অভাবসৃষ্টির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, এ সব সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে। ইসলামে জুয়া বেআইনী। অন্যদিকে স্কুল, মসজিদ, হাসপাতাল, পানীয়জলের ব্যবস্থা এতিমখানা, এ-সকল ক্ষেত্রে অর্থব্যয় ইসলামে অত্যন্ত উঁচুমানের পুণ্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত। মহানবী (সাঃ) এর শিক্ষার মধ্যে দিয়েই এতিমখানার সর্বপ্রথম উদ্ভব। বস্তুত এতিমদের জন্য ব্যবস্থাপনার যে ধারণা, তা পৃথিবী এই নবী (সাঃ)-এর নিকট থেকেই লাভ করেছে, যিনি নিজেও ছিলেন একজন এতিম। এই মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে কার্লাইলের একটি বিখ্যাত উক্তি, 'যা কিছু উৎকৃষ্ট সেই সাম্য করুণা ও মানবতার এক স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর, যেন প্রকৃতির মধ্য থেকে উঠে আসা সন্তানটির জবানে প্রকৃতিগতভাবেই উচ্চারিত'।



একদা এক ঐতিহাসিক বলেছিলেন, কোনো মহামানবকে যদি বিচার করতে হয়, তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা করো। এক. তিনি কি তাঁর সমসাময়িক কালে পরিপূর্ণরূপে খাঁটি ও অকৃত্রিম বলে গৃহীত হয়েছে? দুই. তিনি কি এতটা বড় ছিলেন যে তাঁর আপন সময়ে প্রতিষ্ঠিত মানদ-ের ঊধর্ে্ব উঠে দাঁড়িয়েছিলেন? এবং তিন. কী এমন কোনো অবদান রেখে গেছেন যা পরবর্তী পৃথিবীর জন্য স্থায়ী সম্পদ? এই তালিকা আরো বাড়ানো যায় কিন্তু তা অনাব্যশক। কারণ মহত্ব নিরূপণের এই তিনটি পরীক্ষাই যথেষ্ট, যা দিয়ে নবী মোহাম্মদ (সাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করা সম্ভব। শেষোক্ত দুটি বিষয়ে ইতঃমধ্যেই কিছু আলোচনা হয়েছে; এখন প্রথম শর্তটির দিকে লক্ষ্য করি, নবী মোহাম্মদ (সাঃ) কি তার সমসমায়িক জনগণের কাছে অকৃত্রিম ও খাঁটি বলে গৃহীত হয়েছে? ঐতিহাসিক তথ্যাবলি থেকে এটা প্রমাণিত, শত্রুমিত্র নির্বিশেষে সবাই একমত যে, মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন উৎকৃষ্টতম গুণাবলি ও অনুপম চরিত্রের অধিকারী। তাঁর ছিল নিরঙ্কুশ সততা নিষ্কলুষ নির্মলতম চরিত্র, তিনি ছিলেন সর্ববিধ মহত্তম গুণের আধার, জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে পূর্ণতম বিশ্বস্ততার প্রতীক। এমনকি যারা তাঁর কথায় আদৌ বিশ্বাস করতো না, সেই ইহুদিরা পর্যন্ত তাঁর পূর্ণ পক্ষপাতহীনতার কারণে তাঁকেই নিজেদের যে-কোনো বিবাদ মীমাংসার জন্য বিচারক মেনে নিতো এবং যারা তাঁর কথায় কিছুমাত্র কর্ণপাত করে নি, তারাও বলতে বাধ্য হয়েছে 'ওগো মোহাম্মদ, আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলি না, আমরা কেবল তাকে অস্বীকার করি, যে তোমাকে কেতাব দান করেছে এবং যে তোমাকে ওহি প্রেরণ করে'। আসলে তারা ভাবতো, তিনি ছিলেন কোনো অশুভ ভূতগ্রস্ত এবং তারা তাঁকে এই অশুভ আত্মার আচ্ছন্নতা থেকে নিরাময় করবার জন্যই নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু সেই তাদেরই শ্রেষ্ঠতম অংশ কিছু মানুষ তখনই অবলোকন করেছিলেন, মোহাম্মদ (সাঃ)-এর মধ্য দিয়ে এক নতুন আলোর অভ্যুদয়, যে প্রভাত-আলোয় অবগাহন করবার জন্য দ্রুত ছুটে এসেছিলেন তাঁরা এবং ইসলামের এই নবী মোহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবন ও ইতিহাসের এটা একটা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য বিষয় যে, যাঁরা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে জানতেন, তাঁর সেই নিকট আত্মীয়, ভাই বন্ধু পরিজন কেউই তাঁর মহৎ উদ্দেশ্য কী কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছুটে আসেন নি, এসেছিলেন তার ঐশ্বরিক প্রেরণার যথার্থ অনুভব করে। যদি এই সকল মানুষ, যাঁরা ছিলেন শিক্ষিত বিজ্ঞ ও সম্ভ্রান্ত ছিলেন সর্বোপরি নবী-জীবনের সকল কিছু সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ওয়াকিবহাল, তাঁদের চোখে সামান্যতম বিচ্যুতি চালাকি ফাঁকিবাজি, কিঞ্চিৎতম জাগতিক লোভ কি বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষুদ্রতম লক্ষণও ধরা পড়তো, মোহাম্মদ (সাঃ) এর যে আশা, মানুষের মধ্যে নবজন্ম নবপ্রেরণার সঞ্চার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের যে প্রচেষ্টা, সমাজ সংস্কারের যে কার্যক্রম, তা সবই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতো, তাঁর স্বপ্নসৌধ খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়তো, সব কিছু ধূলিসাৎ হয়ে যেতো মুহূর্তের মধ্যে। অথচ কী দেখি আমরা? দেখি, তাঁর অনুগামীদের ভক্তি ও আনুগত্য এতই অপরিমেয় যে, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আপনাপন জীবনের একমাত্র পরিচালক হিসেবে গ্রহণ করেছেন মোহাম্মদ (সাঃ) কে। সকল বিপদ ও নিগ্রহকে তাঁরা বরণ করে নিয়েছেন তাঁরই জন্য; অত্যাচারের কঠিনতম মুহূর্তে, শারীরিক-মানসিক পীড়নের দুঃসহতম অবস্থায়ও, এমনকি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, তাঁরা তাঁদের আস্থায় ও শ্রদ্ধায় ও আনুগত্যে অটুট অবিচল। আর এইরকমই যদি হয়, ইতিহাস যদি এই কথাই বলে, তাহলে এটা কি সম্ভব যে, তাঁরা তাঁদের অধিনায়কের মধ্যে কখনো সামান্যতম স্খলনও লক্ষ্য করেছেন। ইসলামে যাঁরা নবদীক্ষিত, সেই তাঁদের ইতিহাস যদি লক্ষ্য করি, দেখবো কী মর্মস্পর্শী দৃশ্য, কী নির্মমতম পীড়নই না জর্জরিত করেছে সেই সব নিরপরাধ-মানব-মানবীকে। সুমাইয়া (রাঃ) নাম্নী এক নির্দোষ মহিলা, তাকে বল্লমের আঘাতে আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।



 



ইয়াসির (রাঃ) যাঁর দুটি পা দুই উটের সঙ্গে বেঁধে উট দুটিকে দুইদিকে তাড়া করা হলো। খাব্বাব (রাঃ)কে জ্বলন্ত কয়লার উপর শোয়ানো হয়েছে, তারপর অত্যাচারীরা তার বুকের উপর এমন সজোরে পা তুলে দাঁড়িয়েছে, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন, তাঁর অগি্নদগ্ধ পিঠের চামড়া ও চর্বি পুড়ে গলে গেছে। খাবান বিন আদীর (রাঃ) শরীরের মাংস কেটে কেটে এমন নৃশংস অত্যাচার করা হয়েছে, যা লোহমর্ষক। এই অত্যাচারের এক পর্যায়ে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তুমি কি চাওনা, তোমার স্থলে মোহাম্মদকে এই শাস্তি প্রদান করা হোক'? খাবান (রাঃ) আর্তনাদ করে উঠলেন, 'অসম্ভব! মোহাম্মদ (সাঃ)কে রক্ষার জন্য আমি নিজে, আমার পরিবার, আমার সন্তান-সন্তুতি সবকিছু হাসিমুখে উৎসর্গ করতে আমি বদ্ধপরিকর'। একটি দু'টি নয়, এ-রকম শত শত হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। কিন্তু এই সকল ঘটনা কী প্রতিফলিত করে, কোন্ সত্য প্রমাণিত হয় এখানে? প্রমাণিত হয়, ইসলামের এই প্রথমকালের সন্তানেরা কেবল নিছক আনুগত্যই প্রকাশ করেন নি, মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পদপ্রান্তে তাঁরা তাঁদের সমগ্র প্রাণমন, হৃদয় আত্মা ও অন্তর নিঃশেষে উৎসর্গ করেছিলেন। অনুগামীদের এই-যে গভীর বিশ্বাস, এই-যে প্রস্তরকঠিন আস্থা, এ-থেকে কি প্রমাণিত হয় না যে, মোহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন কতো ঐকান্তিক ও বিশ্বস্ত, ছিলেন অর্পিত দায়িত্বের প্রতি কত সৎ ও নিষ্ঠাবান!



বলা বাহুল্য, এই সকল নবদীক্ষিতরা কেউই নিম্নবংশের কি নিম্নমানের ছিলেন না। ইসলামের সেই উন্মেষকালে যাঁরা মোহাম্মদ (সাঃ)-এর পাশে সমবেত হয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন মক্কার সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ও সম্ভ্রান্ত মানুষ; অর্থ সম্মান ও সামাজিক অবস্থান, রুচি ও আভিজাত্যে তাঁরাই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অনেকে তাঁর নিকট-আত্মীয়ও বটে, যাঁরা তাঁকে আদ্যোপান্ত আপাদমস্তক চিনতেন। উল্লেখযোগ্য, সুউচ্চ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ইসলামের যে প্রথম চারজন খলিফা, তাঁরা সকলে এই সময়েরই মুসলমান। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে আছে, 'পৃথিবীর সকল নবী ও ধর্মবেত্তার মধ্যে মোহাম্মদ (সাঃ)ই সর্বাপেক্ষা সার্থক ও সফল'। এই উক্তি নিঃসন্দেহে যথাযথ। কিন্তু উল্লেখ করা আবশ্যক, এই সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এই সাফল্যের প্রকৃত কারণ, তাঁর সমসাময়িক কালের মানুষ তাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছিল নিখাদ অকৃত্রিমতা ও খাঁটিত্ব। এই সাফল্য তাঁর উচ্চ-প্রশংসিত ও বিস্ময়কররূপে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বেরই ফসল। সত্যিই কী অলৌকিক অসাধারণ ও বিস্ময়কর এই মোহাম্মদ (সাঃ)-এর ব্যক্তিত্ব, যার সঠিক পরিচয় তুলে ধরা বাস্তবিকই অত্যন্ত দুরূহ। আমরা কিঞ্চিৎ আলোকপাত করতে পারি মাত্র, কিন্তু এটাই সমধিক সত্য যে, এই ব্যক্তিত্বের অতি সামান্যই কারো পক্ষে প্রতিফলিত করা সম্ভব। সত্যই তাঁর জীবন ও চরিত্রের মধ্যে কী নাটকীয় বহুবর্ণ দৃশ্যের সমাহার, জীবনের সর্ববিধ ঐশ্বর্যের কী চিত্রোপম সুষমা। একাধারে তিনি আল্লাহর সংবাদবাহী পয়গাম্বর, তিনি সেনাধ্যক্ষ, তিনি বাদশাহ, তিনি যোদ্ধা, ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারক, তিনি বাগ্মী, সমাজসংস্কারক, তিনি অসহায় এতিমের আশ্রয়স্থল, উৎপীড়িত ক্রীতদাসের রক্ষক, নারী সমাজের মুক্তিদাতা, তিনি আইনপ্রণেতা বিচারক ও জাগতিক মোহমুক্ত এক আধ্যাত্মিক তাপস এবং আশ্চর্য, সকল ভূমিকা ও জীবনের সববিধ ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের শ্রেষ্ঠতম প্রতীক, এক অদ্বিতীয় মহানায়ক।



এতিম মানেই অসহায়ত্বের চূড়ান্ত, এই ভূপৃষ্ঠে এতিম অবস্থায়ই তাঁর জীবনের শুরু; বস্তুগত ক্ষমতার উচ্চতম শীর্ষ হলো বাদশাহী, এই বাদশাহী দিয়েই তাঁর জীবনের সমাপ্তি। এতিম বালক কি নশ্বর-জাগতিক সকল ক্ষেত্রেই মোহাম্মদ (সাঃ) একটি জাতির অবিসংবাদিত অধিনায়ক ও ভাগ্য নিয়ন্তা, যিনি সকল পরীক্ষা ও প্রলোভন, জীবনের সব উত্থান পতন ও পরিবর্তন, আতঙ্ক কি উজ্জ্বলতা সবকিছুর মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন জগৎসমক্ষে এক অনির্বাণ দীপশিখা; এবং তিনি বেরিয়ে এলেন বিজয়ীর বেশে সার্বিক মানবজীবনের অক্ষত অনাহত এক আদর্শরূপে। তাঁর সাফল্য জীবনের কোনো একটি ক্ষেত্রে কেবল সীমাবদ্ধ নয়, মানবজীবনের সর্ববিধ ক্ষেত্রেই তিনি অত্যুত্তম আদর্শ। দৃষ্টান্তস্বরূপ, নিরঙ্কুশ নৈতিক অন্ধকার ও সর্বপ্লাবী বর্বরতা থেকে কোনো জাতিকে মুক্ত ও পবিত্র করে তোলা যদি মহত্বের একটি পরিচয় বলে বিবেচিত হয়, তাহলে মোহাম্মদ (সাঃ) অবশ্যই মহৎ। কারণ তাঁর প্রখর ও অনবদ্য ব্যক্তিত্বের স্পর্শই আরবদেরকে অধঃপাতের নিম্নতম স্তর থেকে তুলে এনে পবিত্র পরিশুদ্ধ উন্নত এক মহান জাতিতে পরিণত করলো, যারা উঠে দাঁড়ালো গভীর অন্ধকূপ থেকে শিক্ষা ও সভ্যতার এক আলোকবর্তিকা হাতে। মহত্ব বলতে যদি একটি বহুধাবিভক্ত মানবম-লীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও করুণা, প্রেম ও সখ্যের বন্ধনে এক নিবিড় ঐক্যরচনা বোঝায়, উষর মরুভূমির বুকে আবির্ভূত এই নবী মোহাম্মদ (সাঃ) নিঃসন্দেহে মহত্বের মুকুট পরিধানের যোগ্য। মহত্বের অর্থ যদি হয় অন্ধ কুসংস্কার ও অহিতকর সকল কর্মধারার সমূল উৎখাত ও সংস্কারসাধন, তাহলে বলতেই হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের অন্তর থেকে তিনি নিঃশেষে উৎপাটন করেছিলেন এই কুসংস্কার, এই অলীক ও অতিপ্রাকৃতিক শঙ্কা। যদি বলি মহত্ব এক উচ্চতর নৈতিক মান, তাহলেও স্মরণ করতে পারি, মোহাম্মদ (সাঃ) শত্রুমিত্র নির্বিশেষে সবার কাছেই ছিলেন আল-আমিন অর্থাৎ পরম বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী। যদি ধরা যায়, দেশবিজয়ী কোনো রাষ্ট্রনায়কই 'মহৎ' অভিধায় আখ্যায়িত হবার যোগ্য, তাহলে উল্লেখ করতে পারি, নিতান্তই করুণার পাত্র সহায় সম্বলহীন এতিম অবস্থা থেকে মোহাম্মদ (সাঃ) মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন সমুদয় আরবের শাসনদ-ের অধিকর্তারূপে; যিনি ছিলেন যুগপৎ খসরু ও সিজরের যে-যোগফল তার সমতুল্য, যিনি এমন এক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা যা চৌদ্দশ বছর ধরে এখনো অক্ষত। নেতার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য, তাকেও যদি মহত্বের অভিজ্ঞান বলে বিবেচনা করি, দেখবো এই নবীর নামের মধ্যেই কী ঐন্দ্রজালিক শক্তি ও মহিমা, যা আজো পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি হৃদয়কে সম্মোহিত ও অভিভূত করে রেখেছে। এই নবী মোহাম্মদ (সাঃ) এথেন্স কি পারস্য, ভারতবর্ষ কি চীনের কোনো বিদ্যাপীঠে দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন নি, কিন্তু কী বিস্ময়কর, তিনি যা ঘোষণা করলেন তা মানবজাতির জন্য অনন্তকালের প্রেক্ষাপটে চিরকল্যাণকর এক মহাসত্যের বাণী। নিরক্ষর, কিন্তু তাঁর বাকশৈলীতে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে এমন সৌরভ ও শিল্প ও বাগ্মিতা, যা শ্রোতার বিমুগ্ধ চোখ দুটিকে করে তোলে অশ্রুসজল। জাগতিকভাবে একেবারেই রিক্ত এক এতিম কিন্তু সকলেই প্রিয়পাত্র সবার প্রাণের মনিকোঠায় তাঁর স্থান। তিনি কোনো সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন নি, কিন্তু তাঁর সৈন্যদেরকে তিনি ভয়াবহতম অবস্থা, ক্রূরতম বৈরিতার বিরুদ্ধেও নিপুণ ও নির্ভুলভাবে সুবিন্যস্ত করতে জানেন, এবং তাঁর অধিনায়কত্বে শুধু নৈতিক শক্তি ও দৃঢ়তার কারণে জয়ও পুনঃ পুনঃ করায়ত্ত হয়। (চলবে)



 


হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৮২-সূরা ইন্ফিতার


১৯ আয়াত, ১ রুকু, মক্কী


১৬। এবং উহারা উহা হইতে অন্তর্হিত হইতে পারিবে না।


১৭। কর্মফল দিবস সম্বন্ধে তুমি কী জান?


১৮। আবার বলি, কর্মফল দিবস সম্বন্ধে তুমি কি জান?


১৯। সেই দিন একে অপরের জন্য কিছু করিবার সামর্থ্য থাকিবে না; এবং সেই দিন সমস্ত কর্তৃত্ব হইবে আল্লাহর।


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


assets/data_files/web

আমার মুক্তি আলোয়...।


-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।


 


 


 


 


 


 


যার দ্বারা মানবতা উপকৃত হয়, মানুষের মধ্যে তিনি উত্তম পুরুষ।


 


ফটো গ্যালারি
করোনা পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিশ্ব
আক্রান্ত ৪,৩৬,৬৮৪ ৫,৫৪,২৮,৫৯৬
সুস্থ ৩,৫২,৮৯৫ ৩,৮৫,৭৮,৭০৩
মৃত্যু ৬,২৫৪ ১৩,৩৩,৭৭৮
দেশ ২১৩
সূত্র: আইইডিসিআর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৮৩৭৪৬
পুরোন সংখ্যা