চাঁদপুর। সোমবার ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ২৩ মাঘ ১৪২৪। ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯
redcricent
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৪-সূরা সাবা

৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৪৯। বলূন, সত্য আগমন করেছে এবং অসত্য না পারে নতুন কিছু সৃজন করতে এবং না পারে পুনঃপ্রত্যাবর্তিত হতে।

৫০। বলুন, আমি পথভ্রষ্ট হলে নিজের ক্ষতির জন্যেই পথভ্রষ্ট হব; আর যদি আমি সৎপথ প্রাপ্ত হই, তবে তা এ জন্যে যে, আমার পালনকর্তা আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


এ পৃথিবীর বুকে নূতন বলতে কিছু নেই।

-সলোমন।


ধনের যদি সদ্ব্যবহার করা যায় তবে তা সুখের বিষয় এবং সদুপায়ে ধন বৃদ্ধির জন্যে সকলেই বৈধভাবে চেষ্টা করতে পারে।


ফটো গ্যালারি
গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগারিকতা
তৃপ্তি সাহা
০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মানব সভ্যতার শৈশব থেকেই ভাব বিনিময়ের চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। কণ্ঠোচ্চারিত নানা ধ্বনি ও অঙ্গভঙ্গির দ্বারা আদিম মানুষেরা মনের ভাব প্রকাশ করতো। এও এক প্রকার ভাষা, তবে সংকেতমূলক ভাষা। কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই এই, সে নানা মনের মধ্যে নিজেকে অনুভূত করতে চায়। কথাটি রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথের 'সাহিত্য' গ্রন্থের 'সাহিত্য সামগ্রী' প্রবন্ধের একটি অনুচ্ছেদে লেখন সামগ্রীর সেই স্মরণীয় রূপরেখাটি হলো এই যে, 'এই একান্ত আকাঙ্ক্ষায় কত প্রাচীনকাল ধরিয়া কত ইঙ্গিত, কত ভাষা, কত লিপি, কত পাথরে খোদাই, ধাতুতে ঢালাই, চামড়ায় বাঁধাই-কত গাছের ছালে, পাতায়, কাগজে, কত তুলিতে, কলমে, কত প্রয়াস-বাঁ দিক হইতে ডাহিনে, ডাহিন দিক হইতে বাঁয়ে, উপর হইতে নিচে, এক সার হইতে অন্য সারে, কী? না, আমি যাহা চিন্তা করিয়াছি, আমি যাহা অনুভব করিয়াছি, তাহা মরিবে না : তাহা মন হইতে মনে, কাল হইতে কালে চিন্তিত হইয়া, অনুভূত হইয়া, প্রবাহিত হইয়া চলিবে, আমার শরীর মন, আমার সুখ-দুঃখের সামগ্রী সমস্তই যাইবে; কেবল আমি যাহা ভাবিয়াছি, যাহা বোধ করিয়াছি তাহা চিরদিন মানুষের ভাবনা, মানুষের বুদ্ধি আশ্রয় করিয়া সজীব সংসারের মাঝখানে বাঁচিয়া থাকিবে।'



 



প্রাগৈতিহাসিক যুগের গৃহচিত্রগুলোর মধ্যে মানুষের সেই ইচ্ছাই প্রতিফলিত হয়েছে। মিশরের পিরামিডের গায়ে, ভারতের বহু পর্বত ও স্তম্ভের গায়ে এরকম কত কথা একদা উৎকীর্ণ হয়েছিলো। কিন্তু প্রস্তরের গুরুভার তার গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। বহনযোগ্য লেখন সামগ্রীর প্রয়োজন অনুভব করলো মানুষ। লেখার কৌশল আয়ত্ত করার পর মানুষের কথা কালকে জয় করলো। এলো প্যাপিরাস, পার্চমেন্ড ভেলাম, তালপত্র, ভূর্জপত্র, তাম্রপত্র ইত্যাদি। কিন্তু স্থানকে জয় করলো যখন এই লিখিত সামগ্রীগুলি চলন ধর্মে হলো অঙ্কিত। গ্রন্থই হলো সেই সত্তা, এক সময় যা নরম হালকা দ্রব্যে লিখিত হয়ে চলন ধর্ম অর্জন করেছিলো। আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে গ্রন্থের জন্ম হয়। হাতের কথায় ফুটে উঠলো রসের কথা, জ্ঞানের কথা। কিন্তু মন্থরতার অভিশাপে বহুর ক্ষুধা পুঁথি মিটাতে পারলো না। এলো বস্নকে ছাপা বই। গতির রাজ্যে, অনন্ত তৃষ্ণার রাজ্যে তাও হয়ে গেল অপ্রতুল। এলো অপসারণযোগ্য একক হরফের সাহায্যে মুদ্রন কৌশল। সূর্যলোকের অজস্র কিরণ ধারার মত সর্বজনের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়লো। বই, পত্র-পত্রিকা, নানাভাবে রস ও খোরাককে মানুষ দুহাত বাড়িয়ে গ্রহণ করার সুযোগ পেলো। মানুষের মানুষ হয়ে ওঠবার পথে মুদ্রণ হয়ে গেল বড় আশীর্বাদ।



সর্বপ্রকার জ্ঞানকে একত্র করে স্থায়িত্ব দানের ইচ্ছা থেকে লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগারের সৃষ্টি। মানব সভ্যতার যুগে যুগে শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল, জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিরা তাঁদের সাধনা ও গবেষণালবব্ধ তথ্য অভিজ্ঞতা পুঁথি-পুস্তকে লিখে গিয়েছেন। এই পুঁথি-পুস্তকের একত্র সংগ্রহ-ই হলো গ্রন্থাগার। কথাগুলো বলেছিলেন কাজী মোতাহের হোসেন।



 



আর রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, 'মহাসমুদ্রের শত বছরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিতো যে, সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মত চুপ করিয়া থাকিতো। তবে সেই নীরব মহাশব্দের সহিত এই গ্রন্থাগারের তুলনা হইতো। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলো কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে।' প্রাচীন যুগে সু-প্রসিদ্ধ গ্রন্থাগারগুলোর ছিলো মধ্য এশিয়া মেসোপোটিমিয়ার নিনেভে এবং কিশনগরে, মিশরের আলেকজেন্দ্রিয়ায় এবং এশিয়া মাইনরের পারগেমন-এ।



আধুনিক গ্রন্থাগারে বই ছাড়াও ফ্লিম, স্নাইড, ফটোগ্রাফ, রেকর্ড এবং টেপ বইয়ের পাশাপাশি থাকে। একটি আধুনিক গ্রন্থাগার একটি ব্যতিক্রমধর্মী নিরীক্ষাকারী সেবা প্রতিষ্ঠান। এর উদ্দেশ্য পাঠকদের সর্বাধিক ফলপ্রসূ সেবা প্রদান করা। বর্তমানকালে গ্রন্থাগার হলো একটি তথ্য ভা-ার। সর্বসাধারণের জন্য তথ্য সংগ্রহ করে চাহিদা মাত্র তা পাঠকদের হাতে প্রয়োজনীয় তথ্যটি উপস্থাপন করা। গ্রন্থাগার সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর একটি উক্তি স্মরণীয় : 'এ দেশে গ্রন্থাগারের সার্থকতা হাসপাতালের চাইতেও কিছু কম নয় এবং স্কুল ও কলেজের চাইতে বেশি। আমার বিশ্বাস, শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। ...আমি গ্রন্থাগারকে স্কুল কলেজের উপরে স্থান দেই এই কারণে যে, এইখানে লোক স্বেচ্ছায় স্বাচ্ছন্দচিত্তে স্বশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়। প্রতিটি লোক তার স্বীয় শক্তি, রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের মেধা-মননকে, নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।'



যে কোনো সংগঠনকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে গেলে প্রথমেই কিছু বিধি বিধানের সীমাবদ্ধতা রচনা করতে হয়। কারণ বিধি-বিধান সর্বস্তরের শৃঙ্খলা আনে এবং কর্মপ্রবাহে আনে মসৃণতা। বিশেষ করে যেখানে জনসাধারণকে নিয়ে উঠা-বসা, সেখানে বিধি-বিধানেই



তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। গ্রন্থাগার যেহেতু জনসাধারণের প্রতিষ্ঠান, জনসাধারণকে লক্ষ্য করেই তার সমুদয় কর্মস্পন্দন, সেহেতু বিধি-বিধানের অপরিহার্যতা প্রত্যেক গ্রন্থাগারেই স্বীকার করে নিতে হয়। আতিশয্য সর্বদাই অনাকাঙ্ক্ষিত। গ্রন্থাগারের বিধি-বিধানেও তাই। বিশেষ করে গ্রন্থাগারের সর্বাঙ্গে যেখানে আমন্ত্রনী আকর্ষণ প্রত্যাশিত, সেখানে বিধি-বিধানের আতিশয্য গ্রন্থাগার ব্যবহার পরিপন্থী। কাজেই গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে যেটুকু না হলেই নয় সেটুকু মাত্র গ্রহণযোগ্য। আর তাও হবে স্বল্প, সরল এবং পরিবর্তনীয়। বিধি প্রণয়নের সময় মনে রাখতে হবে :



১) গ্রন্থগারের পূর্ণ সুযোগ পাঠকদের কাছে অবারিত করা।



২) গ্রন্থাগারকে বিনষ্টের হাত থেকে রক্ষা করে চলা।



৩) গ্রন্থাগারের উদ্দেশ্যগুলোকে পূর্ণভাবে সাধন করা।



৪) গ্রন্থাগারের কর্মপদ্ধতি ক্রমবিকাশশীল করা।



গ্রন্থাগারের প্রশাসনের ক্ষেত্রে নতুন চেতনার উন্মেষ হয়েছে। বর্তমান কাল বই ও পাঠকের মধ্যবর্তী দেয়ালকে ভেঙ্গে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টায় তৎপর। জটিল নিয়মজালে পাঠককে জড়িয়ে ফেলার চেয়ে দু-চারখানি বই হারানোর ক্ষতি স্বীকার করে নেয়া অনেক প্রগতিশীল গ্রন্থাগারিকদের কাছে এখন কম ক্ষতিকর বলে পরিগণিত হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে রচিত হওয়া চাই পাঠক ও গ্রন্থাগারিকের মধ্যে এক সুন্দর বিশ্বাসের বর্তাবরণ। সাধারণত গ্রন্থাগারের বিধি-বিধান প্রণীত হয় কয়েকটি দিকে লক্ষ্য রেখে। যেমন :



 



১) খোলা থাকার সময়



২) ছুটির দিন



৩) বয়সের সীমা



৪) বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অধিকার



৫) অনাকাঙ্ক্ষিতের প্রবেশ সম্পর্কে বিধিনিষেধ



৬) সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ



৭) পাঠকদের প্রবেশপত্র



৮) জরিমানা



গ্রন্থগারের প্রকারগত ভিন্নতা রয়েছে। স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার বা একাডেমিক গ্রন্থাগার যেমন আছে তেমনি আছে পাবলিক গ্রন্থাগার এবং বিশেষায়িত গ্রন্থাগার বা স্পেশাল লাইব্রেরি। এছাড়াও আছে একটি জাতির জাতীয় গ্রন্থাগার। বলাবাহুল্য প্রকারগত ভিন্নতা বিধি-বিধানের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা সৃষ্টি করে। তবে সর্বদাই অনুসৃত হবে পাঠকের সুবিধার জন্য বিধি-বিধানকে সংবদ্ধ করার নীতি। বিধি-বিধান বলতে আইনগত একটি অনুষঙ্গ এসে যায়। আইনগত শব্দাবলির মধ্যে এক অদ্ভুত ধরণের নিরুত্তাপ কৃত্রিমতা বয়ে যায়। যা সকলকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু গ্রন্থাগারের বিধি-বিধানের মধ্যে এইরকম বিকর্ষণ থাকলে চলে না। গ্রন্থাগারের সার্থকতা তার গ্রন্থাদির সম্যক ব্যবহারে। অতএব গ্রন্থ ও পাঠকের মধ্যে যত রকমের প্রাচীর আছে তা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। বাঁধভাঙ্গা আলোর প্লাবনে ভাসাতে হবে পাঠককে।



যেহেতু গ্রন্থাগার একটি সামাজিক সংস্থা। তাই সংশ্লিষ্ট সমস্ত মানুষকে গ্রন্থাগারের মধ্যে আকর্ষণ করে আনার দায়িত্ব গ্রন্থাগারের কর্মীদের। প্রত্যেককেই গ্রন্থাগারের পরিসেবা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। প্রত্যেককেই বারবার ছুটে ছুটে আসতে হবে গ্রন্থাগারে। সকলকেই বুঝিয়ে দিতে হবে যে, গ্রন্থাগারে সাজানো রয়েছে চিত্তের খোরাক। এখানেই আত্মার শান্তি, প্রাণের আরাম, এখানেই মননের অবিরাম সংবর্ধনা। এখানেই জ্ঞানের আলো পর্যাপ্ত আর তাই গ্রন্থাগারিককে অক্লান্ত পরিশ্রম ও অফুরন্ত প্রেরণা নিয়ে তাঁকে পাঠককে গ্রন্থাগারমনস্ক করার উদ্যোগ নিতে হবে। রঙ্গনাথনের বিপ্লবাত্মক সেই তিনটি কথাতেই জোর দিতে হয় নিজেদের মনে, পাঠকের মনে, 'বই ব্যবহারের জন্য', 'প্রত্যেকের জন্যই আছে বই', 'প্রত্যেক বইয়েরই পাঠক আছে'।



কেউ কেউ গ্রন্থাগার কর্মীর মধ্যে পণ্য বিক্রেতার আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রতিভা প্রত্যাশা করে। সুযোগ্য পণ্য বিক্রেতা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কথামালায় ক্রেতাকে সংবিষ্ট করবেন। তেমনি পাঠককে সংবিষ্ট করবেন গ্রন্থাগার কর্মী, আর তাই মাঝে মাঝে কিছু গ্রন্থকে টেনে আনতে হয় পাদপ্রদীপের আলোকিত বৃত্তের মধ্যে। তাতে কী বিষয় বর্ণিত, কেমন আকর্ষণীয় তথ্য উপস্থাপিত_এসব সম্পর্কে বিজ্ঞাপিত করে গ্রন্থাগারিক পাঠকদের আকৃষ্ট করবেন। পাশ্চাত্য দেশসমূহের গ্রন্থাগার চেতনার দ্রুত বিবর্তন বিষ্ময়কর।



একটি দেশের সুপ্রশাসনের জন্য সংবিধান অত্যাবশ্যক। গ্রন্থাগারে সংবিধান হল তার লিপিবদ্ধ নিয়মাবলী। প্রকৃতপক্ষে নিয়ম থেকেই প্রসূত হয় শ্রী ও সৌন্দর্য। আদর্শ নিয়ম চক্রের দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে যেসব কথা প্রাধান্য পায় তার প্রথমেই স্থান পায় খোলা বা বন্ধের সময় অর্থাৎ গ্রন্থাগারের কার্যকাল।



গ্রন্থাগার কখন খুলবে, কখন বন্ধ হবে এটি স্পষ্ট করে জানানো দরকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি নিরূপিত হয় স্থানীয় পরিস্থিতি, গ্রন্থাগারের কর্মীসংখ্যা ও তার আর্থিক সঙ্গতির দিকে নজর রেখে। গ্রাম্য গ্রন্থাগারের কার্যকাল আর জেলা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কার্যকাল নিশ্চয়ই এক প্রকার হবে এমন চিন্তাকে প্রশ্রয় না দেয়াই ভালো। গবেষণাভিত্তিক নয় এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের কার্যকালই হবে গ্রন্থাগারের কার্যকাল।



যেখানে রাষ্ট্র জনসাধারণ অত্যাধিক গ্রন্থাগার সচেতন ও পাঠানুরাগী সেখানে গ্রন্থাগারের ছুটি নেই বললেই চলে। জাপানের মায়েরা সন্তানকে স্কুলে ভর্তির করার আগেই নিয়মিত গ্রন্থাগারে নিয়ে আসে এবং বাচ্চাদেরকে শিশুতোষ বইয়ের সাথে পরিচিত করে তুলে। ব্রিটিশ মিউজিয়াম বছরে দুই কিংবা তিন দিন বন্ধ হয়। ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারও সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে বছরে মাত্র তিন দিন।



সব গ্রন্থাগার স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কোনো কোনো গ্রন্থাগার মূল প্রতিষ্ঠানের অংশ অথবা বিভাগ। মূল প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, কার্যধারা, আকার, কর্মীবৃন্দ ও কর্ম পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম স্বভাবতই গ্রন্থাগারকে প্রভাবিত করে। বেতন কাঠামো অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, ছুটি, দৈনিক কার্যকাল ইত্যাদি কর্মী সম্পর্কিত সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় মূল প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারে একই রকম হবে। কিন্তু গ্রন্থাগারের কাজকর্ম বিশেষ ধরনের বলে প্রতিটি গ্রন্থাগার কর্মীর নিজস্ব কর্মতালিকা, বিভাগীয় কার্যক্রম প্রস্তুত, বিভাগীয় কর্মীর সংখ্যা নির্ধারণ, কর্মতালিকা পরিবর্তন প্রভৃতি বিষয় বিশেষভাবে প্রস্তুত করতে হয় গ্রন্থাগার প্রধানকেই। যে কোনো গ্রন্থাগারিকের প্রয়োজন কর্মদক্ষ প্রশিক্ষিত উৎসাহী মনোযোগী, স্থায়িত্বজ্ঞানশীল, পরিশ্রমী সহযোগী মনোভাব সম্পন্ন কর্মীবৃন্দের। নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন, সমদর্শী, পরিকল্পনা ও সংগঠন বিষয়ে অভিজ্ঞ, প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পন্ন দুরদর্শী সহানুভূতি সম্পন্ন কর্মোদ্যোগী গ্রন্থাগারিক তবেই একটি গ্রন্থাগারের কার্যক্রমকে গতিশীল সচল ও সজীব রাখতে সক্ষম হন।



একটি সভ্য সমাজের প্রত্যাশা সাংস্কৃতিমনস্ক সভ্য মানুষ বুদ্ধিদীপ্ত, সুশিক্ষিত, পক্ষপাতমুক্ত এবং সময় পেলেই অবসরে যাদের সঙ্গী হবে বই। এল জে জাস্ট মন্তব্য রাখেন :  Whenever there is Civiliæation there must be books and when ever there are books there are libraries . উন্নত দেশগুলোতে যারা অর্থনীতির দিক থেকে স্বাবলম্বী, শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত তাদের মানসিক বিকাশও তদ্রুপ পক্ষপাত মুক্ত। 'কল্যাণ সমাজ' বলতে যাদের বোঝানো হয়, সামাজিক শান্তি-শৃংঙ্খলা বলতে যে 'আনন্দ'কে বোঝানো হয় তার জন্য পূর্বশর্ত মানসিক বিকশিত সমাজ। তাহলে 'অাঁতেলেকচুয়াল হ্যাপিনেস' অর্জন করা সম্ভব। গণগ্রন্থাগার সকলের জন্য উন্মুক্ত, ধর্মীয় সামপ্রদায়িকতা নেই সেখানে, নেই হানাহানি কলহ, সুতরাং জাতির মর্যাদাবোধের উন্নয়নে প্রতিটি নাগরিকের উচিত নিয়মিত গ্রন্থাগারে উপস্থিত হওয়া। পড়াশোনা করা এবং সমাজ গড়ায় সহায়ক রাজনৈতিক জ্ঞানার্জন করা।



একটি পক্ষপাতমুক্ত সমাজ গড়ার সহায়ক শক্তি লেখক, প্রকাশক ও গ্রন্থাগারিক। গ্রন্থাগার তাদের সম্মিলন স্থান। লেখক ও প্রকাশকগণ তাদের প্রকাশিত বইপত্র যদি নিকটস্থ গ্রন্থাগারে উপহার দেন, পাঠকবৃন্দ তা থেকে ভালোটা গ্রহণ করবে। উপলব্ধিতে আনবে সমাজ গড়ার শক্তি সঞ্চয়ের উপায়। গ্রন্থাগারিক যথার্থ পুস্তক নির্বাচন করে তাঁর পাঠকদের পক্ষপাতমুক্তভাবে রচিত বই পড়তে দিয়ে সুনাগরিক গড়ায় অনুপ্রাণিত করবেন। গ্রন্থাগারিক এমন বই পছন্দ করবেন তাঁর পাঠকদের জন্য যাতে আছে সমাজ উন্নয়নের কথা, অর্থনীতি বা মুক্তির কথা, আছে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন, এভাবে পরিকল্পিত উপায়ে অগ্রসর হলেই পাঠকদের মধ্যে সত্যিকার অনুভূতি ও উপলব্ধির জগৎ সৃষ্টি হবে। চিন্তাজগৎ পাবে গণতন্ত্রের সন্ধান।



 



একজন মানুষের অন্তর্দৃষ্টি শক্তিকে প্রসারিত করার চাইতে মহত্ব আর কিছুই নেই। জীবনকে জানা এবং মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখাই প্রকৃত মনুষত্ব। তেমন মানুষই দেশ ও জাতীয় সম্পদ, গ্রন্থাগারই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা শিশু, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ কিংবা সকল স্তরের সকল বয়সের মানুষকে তাদের সময়ের এবং আগের ও পরের সকল কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।



 



লেখক : গ্রন্থাগারিক, চাঁদপুর সরকারি কলেজ।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৯১৮৪৬
পুরোন সংখ্যা