চাঁদপুর। সোমবার ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ২৩ মাঘ ১৪২৪। ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯
ckdf
jibon dip

সর্বশেষ খবর :

  • চাঁদপুরসহ দেশের বেশ কিছু জেলায় আজ ঈদ পালিত হচ্ছে
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

৩৪-সূরা সাবা

৫৪ আয়াত, ৬ রুকু, মক্কী

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

৪৯। বলূন, সত্য আগমন করেছে এবং অসত্য না পারে নতুন কিছু সৃজন করতে এবং না পারে পুনঃপ্রত্যাবর্তিত হতে।

৫০। বলুন, আমি পথভ্রষ্ট হলে নিজের ক্ষতির জন্যেই পথভ্রষ্ট হব; আর যদি আমি সৎপথ প্রাপ্ত হই, তবে তা এ জন্যে যে, আমার পালনকর্তা আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী।

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


এ পৃথিবীর বুকে নূতন বলতে কিছু নেই।

-সলোমন।


ধনের যদি সদ্ব্যবহার করা যায় তবে তা সুখের বিষয় এবং সদুপায়ে ধন বৃদ্ধির জন্যে সকলেই বৈধভাবে চেষ্টা করতে পারে।


ফটো গ্যালারি
গ্রন্থাগার ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা
মোঃ মনিরুল ইসলাম
০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


লাইব্রেরিকে আমরা বাংলায় গ্রন্থাগার বলি। সহজ ভাষায় গ্রন্থাগার হলো বই, পুস্তিকা ও অন্যান্য তথ্য সামগ্রীর সংগ্রহশালা। এখানে পাঠক গ্রন্থপাঠ, গবেষণা ও তথ্য অনুসন্ধান করতে পারে। এই গ্রন্থাগার সভ্যতার আলোকবর্তিকা স্বরূপ। মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে এটি সভ্যতার বিকাশে পালন করে আসছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মূলত জ্ঞানভিত্তিক সমাজগঠনে গ্রন্থাগার পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। অন্তহীন জ্ঞানের অাঁধার হলো গ্রন্থ, আর গ্রন্থের আবাসস্থল গ্রন্থাগার। হাজার বছরের লিখিত ইতিহাস ঘুমিয়ে থাকে গ্রন্থাগারের ছোট্ট ছোট্ট তাকে। জ্ঞানচর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে শব্দহীন এই মহাসমুদ্রের ভূমিকা অনন্য। বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমৃদ্ধিতে তথা মানবসেবার মহান কাজে গ্রন্থাগারের অবদান অনস্বীকার্য।



একবিংশ শতকের সূচনালগ্নে আমরা আজ এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে প্রযুক্তির ছোঁয়া সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। প্রযুক্তি নির্ভর এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রাত্যাহিক জীবনে আমরা বিভিন্নভাবে প্রযুক্তির প্রভাব অনুভব করছি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সহায়তায় চিকিৎসা প্রদান আজ অনেক সহজসাধ্য, নিখুঁত ও সময়সাশ্রয়ী হয়ে গেছে। প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে গ্রন্থাগারগুলোও নিজেদের আপডেটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে সহায়তা প্রদান করে পূর্বের চেয়ে আরো ফলপ্রসূ সেবা দিয়ে সকলক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলছে। বহু আগে থেকেই এটি জাতির মেধা, মনন, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারণ ও লালনপালনকারী হিসেব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সর্বসাধারণের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রয়েছে। তাইতো গ্রন্থাগারকে বলা হয় 'জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়'।



গ্রন্থাগারের ইতিহাস



গ্রন্থাগারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। প্রথম দিকে মানুষ নিজের ঘরের কোণে, উপাসনালয়ে ও রাজকীয় ভবনে গ্রন্থ সংরক্ষণ করতে শুরু করে। রোমে প্রথম গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতেই গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়। রোম ছাড়াও প্রাচীনকালে ব্যাবিলন, মিশর, চীন, ভারত ও তিব্বতে গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়েছিল। ইতিহাসখ্যাত গ্রন্থাগারগুলো হলো আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি, ব্যাবলিয়ন লাইব্রেরি, আসুরবানিপাল লাইব্রেরি, নালন্দা লাইব্রেরি, পারগামাম লাইব্রেরি, কর্ডোবা লাইব্রেরি ইত্যাদি। মুসলমানদের শাসন আমলে অনেক সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সভ্যতার ইতিহাসে স্পেনে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশটি বিশ্বের গুণী-জ্ঞানীদের তীর্থ ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আধুনিককালে এসে লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, বৃটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরি, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব কানাডাসহ প্রায় প্রতিটি দেশের জাতীয় লাইব্রেরিগুলো প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে তথ্যসেবা প্রদান করে জ্ঞান বিতরণে অনন্য অবদান রেখে চলেছে।



চিকিৎসা বিজ্ঞানে গ্রন্থাগার ও মুসলিম মনীষী



প্রকৃতপক্ষে ইসলামের আবির্ভাব ও বিশ্বের এক বিশাল অঞ্চলে এর বিস্তার বিশ্ব ইতিহাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই মুসলিম শাসকদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রতি শ্রদ্ধা ও জ্ঞানের পৃষ্ঠাপোষকতা লক্ষ্য করা যায়। ৬৬১ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উমাইয়া শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় দামেস্কে রাজকীয় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকে (৭৫০ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় আমলে বাগদাদ কেন্দ্রিক গ্রন্থাগার চর্চার বিকাশ ঘটে। বাগদাদের গ্রন্থাগারগুলো বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে আসা প-িতদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ধর্ম, বিজ্ঞান, কাব্য-সাহিত্য, চিকিৎসা-বিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে বাগদাদের গ্রন্থাগারগুলোতে অধ্যয়ন ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন এসব প-িতবর্গ। খলিফা আল মানসুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগার 'বায়তুল হিকমা' জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, কৃষি-বিজ্ঞান, চিকিৎসা-বিজ্ঞান এবং দর্শনের উপর রচিত শত শত গ্রন্থ সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে অনবদ্য অবদান রাখে। একাদশ শতকে সেলজুক তুর্কীদের হাত ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা বিশেষ করে ধর্মতত্ত্ব ও চিকিৎসা বিদ্যা প্রাধান্য পায়। নিজামুল মুলক-এর পৃষ্ঠপোষকতায় নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সমসাময়িক কালের অন্যতম সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারে পরিণত হয়। দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে ফাতেমীয় খিলাফত কালে কায়রোতে খলীফা আল আজিজ জ্ঞানী-গুণী ও সর্ব সাধারণের জন্য অসংখ্য গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় বিজ্ঞান বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান, কলা, স্থাপত্য বিদ্যার পাশাপাশি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এছাড়াও ৭১১ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমান কর্তৃক স্পেন বিজয়ের পর রাজকীয় গ্রন্থাগারের পাশাপাশি কর্ডোবা, সেভিল, মালাগা এবং গ্রানাডাসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চল জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ সকল গ্রন্থাগারের অপরিসীম দানে সৃষ্টি হয়েছেন মহা জ্ঞানী-গুণী। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একজন বিজ্ঞানী বিশ্ব জুড়ে সুনাম অর্জন করেছিলেন। তাঁর লেখা চিকিৎসা বিষয়ক গ্রন্থ 'আল-কানুনফিত-তিব'কে দীর্ঘকাল ইউরোপে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত করা হতো। মানব দেহের অঙ্গসংস্থান ও শরীরতত্ত্ব সম্বন্ধে তিনি যে তথ্য প্রদান করেন সেগুলো সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত পৃথিবীর সব দেশের চিকিৎকগণ অনুসরণ করেছিলেন। শল্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাঁর কালজয়ী অবদান উল্লেখযোগ্য। এই খ্যাতিমান বিজ্ঞানী হচ্ছেন আবুল আলি ইবনে সিনা। ইবনে সিনা নামে যিনি অধিক পরিচিত। ১০ বছর বয়সে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করা এ চিকিৎসা বিজ্ঞানী মূলত লাইব্রেরিতেই রীতিমত অধ্যয়ন শুরু করেন এবং লাইব্রেরির সব বই মুখস্থ করে ফেলেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিত, জ্যামিতি, চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ে অসামান্য পা-িত্য অর্জন করেন।



চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিভিন্ন মুসলিম মনীষীগণ লাইব্রেরি সহায়তায় বিশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আল-রাজী, আল-কিন্দি, আলী আত তাবারী, ইবনে রুশদ উল্লেখযোগ্য। ঔষধশাস্ত্রেও মুসলিম মনীষীগণ অনবদ্য ভূমিকা রাখেন। তারা নিজেরা বিভিন্ন রোগের ঔষধ তৈরি করতেন। তারা ঔষধ তৈরি এবং বিভিন্ন রোগের সমাধান প্রসঙ্গে বিভিন্ন গ্রন্থও রচনা করেন। যেমন, আল রাজী কিতাবুল মনসুরী, আল বেরুনী কিতাব আস সায়দালা প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়াও চিকিৎসা শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে তাদের অবদান অবিস্মরণীয়। যেমন :



মস্তিষ্কে ঝিলি্লর প্রদাহ : সর্বপ্রথম মস্তিষ্কে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ঝিলি্লর প্রদাহ নিয়ে গবেষণা করেন ইবনে সিনা। তিনিই প্রথম যক্ষ্মা রোগের সংক্রামক, প্রকৃতি, প্রাণি ও মৃত্তিকাদ্বারা রোগ বিস্তারের ধারণা ও কৃমি রোগ সম্পর্কে আলোচনা করেন। এ জন্যই তাকে আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক বলা হয়।



অস্ত্রপাচার : মুসলিম বিজ্ঞানী আল-রাজী সর্বপ্রথম অস্ত্রপাচার বিষয়ে আধুনিক ভাবনা উদ্ভাবন করেন।



চক্ষু চিকিৎসা : মুসলমানগণ চক্ষু চিকিৎসায় বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন। চক্ষু চিকিৎসাবিদ আম্মারের গ্রন্থ আল মুস্তাখাব-আল-আইন গ্রন্থে চক্ষুরোগ ও সেগুলোর চিকিৎসার বিবরণ পাওয়া যায়।



গ্রন্থাগারের ছোঁয়ায় যুগে যুগে সৃষ্টি হয়েছেন চিকিৎসা শাস্ত্রের মহামনীষীগণ। জাবির ইবনে হাইয়ান, খালিদ বিন-ইয়াজিদ, জাকারিয়া আল রাজী, আল জিলদাকী, জাফর আস-সাদিক, আবুল কাশেম আল ইরাকী তাদের মধ্যে জ্যোতির্ময় তারা। তাদের রেখে যাওয়া অবদান কিতাব কিতাবুল আসার, কিতাবুল মাওয়াহিদ, কাশফুস সুতুর, কিতাবুল হারাবাত প্রভৃতি আজো গ্রন্থাগারের সংগ্রহে অন্যতম অংশ হয়ে আছে।



বিশ্ব সভ্যতার অগ্রগতিতে মুসলিম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারের অবদান তুলনাহীন। ম্যাথিউ ব্যাটলস এজন্যই বলেছেন, 'পশ্চিমা বিশ্বের গ্রন্থভিত্তিক সংস্কৃতির পুরোটাই মুসলমানদের অবদান। গ্রিক ও রোমানদের কাছে বই ছিল একটি হাতিয়ার। কিন্তু মুসলমানদের কাছে বই ছিল সৌন্দর্যের আধার।'



 



লেখক : লাইব্রেরিয়ান, আর্মি মেডিকেল কলেজ চট্টগ্রাম।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
২২৫৪০৮৪
পুরোন সংখ্যা