চাঁদপুর। সোমবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৬-সূরা শু’আরা

২২৭ আয়াত, ১১ রুকু, ‘মক্কী’

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১২৩। ‘আদ সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করিয়াছিল।

১২৪। যখন উহাদের ভ্রাতা হূদ উহাদিগকে বলিল, ‘তোমরা কি সাবধান হইবে না?

১২৫। আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল।’  

দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


বিশ্বাস এবং আস্থা ছাড়া বন্ধুত্ব হয় না।

-রবার্ট ক্লেয়ার। 


যার রসনা ও হস্তদ্বয় হইতে কোন মুসলমানের কোন প্রকার অনিষ্ট না হয়, সেই প্রকৃত মুসলমান এবং যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কার্য হইতে পলায়ন করে সে-ই প্রকৃত মহাজ্জির।


ফটো গ্যালারি
গুমট-ভাঙা নদী
রফিকুজ্জামান রণি
১২ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

বছর ঘুরলেই পাঁচ তারিখ পার হওয়ার আগেভাগে এ বাড়ির দরোজায় কুরিয়ার অফিসের কোনো না কোনো লোক এসে জিজ্ঞেস করবে_'আশা মির্জা নামের কেউ কি আছেন? একটা জরুরি পার্সেল আছে উনার!'

বিগত ১৯ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমায় এ রকম ঘটনার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। একবারও না। এবারই প্রথম ঘটলো। জানুয়ারি মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে। ঘরের দরোজায় এখনো কুরিয়ার বাহকের পদচিহ্ন্ পড়েনি। ম্যাসেজ কিংবা টেলিফোনও করেনি কেউ। ধীর লয়ে বছরের প্রথম মাসটা যে চলেই যাচ্ছে; এ বছরের পার্সেলখানি যে এখনো এসে পৌঁছলো না!

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হরতাল-অবরোধ, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঝামেলা কিংবা রাজনীতির ক্লান্তিকাল ছাড়াও যে কোনো ধরনের সমস্যা ছাপিয়ে পার্সেলটা ঠিকঠাক সময় মতনই চলে এসেছে এতোকাল। পাঁচ তারিখ গড়িয়ে ছয় তারিখও ছোঁয়নি কখনো। বর্তমান সময়ে দেশের মধ্যে তো তেমন উল্লেখযোগ্য সমস্যা-টমস্যাও দেখা যায় না, ভালোভাবেই চলছে সবকিছু; তারপরও এলো না!_ ব্যাপারটা কী?

বড় ছেলেকে পাঠিয়ে বার কয়েক কুরিয়ার অফিসে খোঁজ নিয়েছে আশা। না। তার নামে কোনো প্যাকেট-পুকেট আসেনি। আসলে অনেক আগেই বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হতো।

দেখতে দেখতে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহটাও চলে গেলো। প্রত্যাশিত কারো হাতের টোকা পড়েনি এ বাড়ির দরোজায়। যার ফলে আশা মির্জার মেজাজ-মর্জি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ইদানিং। স্বভাবতই প্রেরক বেটার প্রতি একটু জেদ চেপে বসলো। এতোটা বছর ধরে কুরিয়ার পাঠায় অথচ একবারের জন্যেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেনি সে। ফোন নম্বরটা পর্যন্ত প্যাকেটে উল্লেখ করেনি কৌশলী বাঁদরটা। এই প্রশ্রয়ে, আগুনমুখো অতীত উঁকিঝুঁকি মেরে আশাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আরো নাজেহাল করে দিচ্ছে। প্রেরক বেটা যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার না করে শ্বশুরবাড়ির লোকদের বাঁকা নজর থেকে আশাকে উদ্ধার করেছে_ সে কথা মাথায় এলে লোকটার প্রতি একটু দয়া-মায়া আর ক্ষমার কৃপাও উদ্রেক হয়। আজকাল কুরিয়ার পার্সেল এবং পার্সেল প্রেরক_দুজনের জন্যেই দিনরাত মনটা তার ভীষণ অাঁকুপাঁকু করে। যতোই চালাকি করুক কিংবা কৌশল খাটাক এতোদিনেও কি বুঝি আশা মির্জা টের পায়নি পার্সেল প্রেরক নেপথ্যচারী সেই ব্যক্তিটি কে?

ঊনিশ বছর আগে নতুন সংসারে ঢোকার পর যে পার্সেলটা প্রথমবারের মতো এসে আশাকে সীমাহীন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিলো, একেবারেই ভড়কে দিয়েছিলো তাকে, সেই পার্সেলটা বরং এখন না আসায় তারচে বেশি অস্বিস্তকর অবস্থায় পড়েছে সে। সেই কতকাল আগে থেকেই তো বছরের শেষ মাসটা এলে, বিশেষ করে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পার হওয়ার আগে আগেই তার দিন গোণা শুরু হয়_ কখন আসবে জানুয়ারি মাস, কখন আসবে কাঙ্ক্ষিত পার্সেল, কখন পাবে প্রিয়জনের গন্ধ। সামান্য; তারপরও, এটিই যেন পুরো একটি বছরকে সুন্দরভাবে কাটানোর জন্যে আশা মির্জার পথে অপরিসীম প্রেরণা যোগায়।

প্রথম যেদিন পার্সেলখানা এ বাড়িতে আসে, আশা মির্জা তখন সদ্যবিবাহিতা, লজ্জাতুর এক নববধূ। সে তো প্রায় দেড়যুগেরও অধিক সময়ের কথা। তখন তার শ্বশুর-শাশুড়িও জীবিত ছিলো। কোনো এক জানুয়ারি মাসের চার কি পাঁচ তারিখ হবে তখন। পার্সেলকে ঘিরে পুরো বাড়িতে হৈ-হুল্লোড় পড়ে গিয়েছিলো। কী যে হুলস্থ্থূল বেঁধে গিয়েছিলো সেদিন! চাইলেও যে সেদিনের দৃশ্যটা চোখ থেকে নামাতে পারছে না আশা_

আলমের সঙ্গে তার বিয়ে হওয়ার মাত্র সতেরো দিনের মাথায় পার্সেলটা প্রথম আসে। বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ একদিন কুরিয়ার অফিসের সুদর্শন এক যুবক এসে তার শ্বশুরালয়ের দরোজায় দাঁড়িয়ে সহাস্যে বলে উঠলো_'আশা মির্জা নামের কেউ কি আছেন? একটা জরুরি পার্সেল আছে উনার!'

সেই যে পার্সেলটা আসা ধরলো আর থামা থামানি নেই। নিরবচ্ছিন্নভাবে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে সে আসতেই থাকলো। এর মধ্যে কতো কিছুই না ঘটে গেলো_ শ্বশুর-শাশুড়ির মৃত্যু, দেবরের আত্মহত্যা, ননদির বিয়েশাদি, আশার দুই সন্তানের জন্ম, একাধিকবার কুরিয়ার বাহক রদবদল, সংসারের উত্থানপতন...কতো কিছু! তারপরও পার্সেল আসা যে কামাই ছিলো না। এতোগুলো বছরে এবারই কেমন উল্টে গেলো ইতিহাসটা।

আশার স্পষ্ট মনে আছে, প্রথমদিন পার্সেলটা আসার পর যদিও তার শাশুড়ি মা দরোজা খুলে দিয়েছিলেন সেদিন, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির সবাই এসে হাজির। নতুন বউয়ের নামে কুরিয়ার প্যাকেট! আশাকে ডেকে আনার আগে আগেই কানাকানি, চোখাচোখি, জিভকাটা আর কপালচাপড়ানোর পাশাপাশি শুরু হয়ে গেলো সব মনগড়া মন্তব্যও_'ঘটনা তো ভালো ঠেকছে না'! হাতের মেহেদী খসার আগেই নতুন বউয়ের নামে বাইরের লোকের জিনিসপত্র! তাও আবার কুরিয়ারে, শ্বশুরবাড়ির ঠিকানায়!

আশার প্রকম্পিত হাত কাগজে সই করে রিসিভ করার সময়ও আড়ালে আবডালে গুঞ্জরণ বন্ধ হয়নি। তৎসময়ে ঈর্ষাকাতর লোকদের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গির দিকে কোনো রকম খেয়াল-নজর না পড়লেও ভেতরে ভেতরে আশা নিজেও ভীষণ মুষড়ে গিয়েছিলো। প্যাকেটটি গ্রহণ করতেও সে ইতস্তত ভয় পেয়েছিলো। ফলে রিসিভ কপিতে সাইন করার পর, বাহক তার দিকে প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরা মাত্রই, আচমকা ননদি স্নেহা এসে ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো! উড়ন্ত চিল মুরগির বাচ্চা নিয়ে যেমনিভাবে ছুট দেয়, হুবহু যেন তারই অনুকরণ করতে বসেছিলো ননদি স্নেহা।

'ভাবীর জিনিস আর আমার জিনিসের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই'_এ কথা বলতে বলতে প্রথমেই উল্টিয়ে পাল্টিয়ে উপর-নিচে, সামনে পেছনে খুঁজে দেখলো কোত্থেকে এবং কার কাছ থেকে প্যাকেটটা এসেছে। আশ্চর্য! প্যাকেটের গায়ে শুধু প্রাপকের নাম ঠিকানা ছাড়া আর কিছু্ই লেখাজোখা নাই। প্রেরকের অংশে মোটা কালি আর অস্পষ্ট অক্ষরে একটি সিগনেচারই কেবল দেখা গেলো। ভয় পেলেও মনে মনে আশা এটাও ভেবেছিলো যে, হুট করে তার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বিয়েতে যে মামা আসতে পারেননি তিনিই হয়তো উপহার কুরিয়ার করেছেন। কিন্তু না। প্যাকেট ছিঁড়ে তন্নতন্ন করে খুঁজেও ডজনখানেক ক্যালেন্ডার ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেলো না। সেদিন প্রচ- লজ্জা পেয়েছিলো আশা। ছিদ্র হয়ে যাওয়া বেলুনের মতো গুটিয়ে নিয়েছিলো সে নিজেকে। শুকনো মরিচের মতন ভীষণ লাল হয়ে গিয়েছিলো তার চোখমুখ। এমন তাজ্জব ঘটনা বাড়ির সবার হাসির খোরাক যোগালো। এ নিয়ে সেকি হাসাহাসি, ঠাট্টা তামাশা! তারপর অনেকদিন আশার মন খারাপ ছিলো। এতে অবশ্য শ্বশুরপক্ষের কারো মনে খুব বেশি সন্দেহ দানা বাঁধেনি। তারাও ধারণা করেছে, এটা নিশ্চয়ই আশার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দুষ্ট কোনো বান্ধবীর কা-। আজকালকার শিক্ষিত মেয়েরা কতো কিছুই পারে! ঘটনার আকস্মিকতায় এতোটাই বিব্রত হয়েছিলো আশা, চিন্তায়ও আনতে পারেনি এরকম পার্সেল তাকে কে পাঠাতে পারে। ফলে শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে লজ্জা-শরমে আড়ষ্ট হয়ে রইলো সে। জেদ করে প্যাকেটির কাছেধারেও আর ঘেঁষেনি। ছুঁয়েও দেখেনি। লোকচক্ষুর অন্তরালে চোখের পানিও ঢেলেছে আশা। অভিসম্পাত দিয়েছিলো অজ্ঞাত সেই প্রেরক বেটাকে। এ নিয়ে বড় ধরনের অভাব-অভিযোগ না থাকলেও প্রথম কটা মাস যে কতো রকমের প্রশ্নের কাঁটা মাড়াতে হয়েছে তাকে_ তার কি আর হিসেবনিকেশ আছে? তবে আশার দাম্পত্য জীবনে এসবের ছিঁটেফোঁটাও প্রভাব পড়েনি। সময়ের সাথে সাথে ধীর পদে স্বাভাবিক হয়ে উঠে সব।

পরের বছর একই সময়ে, একই কায়দায় যখন আশা মির্জা নামে অবিকল আরেকটা পার্সেল-প্যাকেট হাতে নিয়ে বাহক ছেলেটা এসে ঘরের দরোজায় দাঁড়ালো, তখন বাড়ির অন্য সকলের চেয়ে আশা মির্জা নিজেই অনেক বেশি অবাক হয়েছিলো। প্যাকেটটি হাতে পেয়ে একেবারেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো সে। প্যাকেটের গায়ে প্রেরকের নাম ঠিকানা উহ্য থাকলেও আশা মির্জা ঠিকই চিনতে পেরেছে এটা কে পাঠিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত হাতের লেখা কি এতো তাড়াতাড়ি ভোলা যায়? তাছাড়া প্রেরকের সিগনেচারখানাও যে কতোদিনের চেনা! কতোকালের পুরনো ঘ্রাণ যে এতে মিশে আছে!

হাতের লেখা এবং প্রেরকের সিগনেচার এ দুটো জিনিসই মূলত আশাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিলো। মোচড় খেয়ে উঠলো তার সর্বাঙ্গ। চোখেমুখে নেমে এলো অদ্ভুত অন্ধকার। ঠোঁট দুখানা শুকনো পাতার মতন কাঁপতে কাঁপতে এই যেন খসে পড়লো। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠলো গরম জলের নহর। মুহূর্তের মধ্যে মনের ভেতরে অস্থির এক গুমট ভাব সৃষ্টি হলো। গত এক বছরে অবশ্য এ বাড়িতে তার অধিকার খাটানোর মতোন একটা পরিবেশও ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, তারপরও পার্সেলটি হাতে পেয়ে এখন চাইলেও শ্বশুরবাড়ির কারো সামনে সজোরে কাঁদতে পারছে না সে। শুধু নতবাকে বার কয়েক স্বগতোক্তি ঝাড়লো_শফিক! আমার শফিক বেঁচে আছে! বেঁচে আছে আমার শফিক...! হায় খোদা, এটা কীভাবে সম্ভব? নিজের চোখে দেখা লাশ! সেই রক্তমাখা আকাশি রংয়ের শার্ট, মলিন স্যান্ডেল আর আশার কিনে দেয়া নতুন জিন্স প্যান্ট, ঘাসের ডগায় আগুনের ফুলকির মতন রক্তের কণিকা! কী নির্মম পরিবেশ_ না, আর ভাবতে পারছে না আশা!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শফিকের সঙ্গে কতো স্মৃতি যে মিশে আছে আশার জীবনে, চাইলেও তা মন থেকে সে আর মুছে দিতে পারবে না। নির্বিরাম এক সাথে আড্ডা, বাদামের শরীর ফাটানো, ইচ্ছে মতন ঘুরে বেড়ানো। জীবনে এই একটা বিশ্বস্ত হাত খুঁজে পেয়েছিলো আশা। সেটাও ঝরে গেলো ছাত্ররাজনীতির হিংস্র থাবায়। কখনো রাজনৈতিক দলে ভেড়েনি শফিক। অথচ পিতৃহীন গরিব মায়ের এই অরাজনৈতিক সন্তানটিকেও কিনা একদিন রাজনীতির যূপকাষ্ঠের বলিতে পরিণত হতে হলো!

আশা এবং শফিক দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই হলের আলাদা বাসিন্দা ছিলো বটে কিন্তু তাদের মনের কোটরে কোনোরকম দেয়াল-টেয়াল ছিলো না। দুজনের জীবনের গতিধারা যেন একই সমুদ্রের মোহনায় এসে পৃথিবী সৃষ্টিরও অনেক আগ থেকেই মিলন খেলায় মত্ত ছিলো। ভালো দিনক্ষণ এলে প্রায়ই দুজন দুজনকে পছন্দসই উপহার তুলে দিতো। আশা অবশ্য দিতেই বেশি পছন্দ করতো, নিতে নয়। শফিকের আর্থিক সঙ্গতি ভালো ছিলো না। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতো সে। তবে প্রতি বছর একটা জিনিস আশা নিজেই শফিকের কাছ থেকে চেয়ে নিতো। সেটা হচ্ছে নতুন বছরের ক্যালেন্ডার। আশা বলতো, 'তোমার হাত থেকে এক বছরের যে পঞ্জিকা পাবো, ওটাই হবে আমার আগামী এক বছরের রুটিন।'

আশার এমন ছেলেমানুষি আচার-আচরণে শফিক কেবল মুখ কেলিয়ে হাসতো। এমন হাসি অর্থে কেনা যায় না, ভোট দিয়ে নির্বাচন করা যায় না কিংবা জোর করেও আদায় করা যায় না_ এই নির্মল হাসি যার মুখ থেকে উদিত হয়, তার অর্থের দীনতা থাকতে পারে কিন্তু মনের হীনতা থাকতে পারে না।

বড়ো বেখেয়ালি মন ছিলো শফিকের। নতুন বছর এলে প্রায়ই ভুলে যেতো ক্যালেন্ডারের কথা। অতঃপর আশার বকাঝকা খেয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাজারের দিকে ছোটা, ঘর্মাক্ত শরীরে ফিরে আসা, আশাকে সরি বলে কানধরা_এসব দেখে সজোরে হেসে উঠতো আশা। ভেঙে যেতো তার মিছে অভিমান। বড়ই মধুময় ছিলো সেই দিনগুলো। শফিকের হত্যাকারীরা যেন ধীরে ধীরে আশার শিক্ষাজীবনটাকেও হত্যা করে দিলো।

প্রথম দিকে অবশ্য কুরিয়ার-পার্সেলটা হাতে পেয়ে দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিলো আশা। তার ছায়াসঙ্গী শফিক রায়হান তো ছাত্ররাজনীতির বলি হয়ে কবেই না ফেরার দেশে চলে গেছে। নিজের চোখে তার লাশ দেখেছে আশা। কত রাত যে সে শফিকের স্মৃতিবুকে নিয়ে নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে আশা। শফিকের নাকমুখ থেতলে দিয়েছিলো দুর্বৃত্তরা। দীর্ঘসময় তার নিথরদেহ মাটিতে পড়েছিলো সেদিন; কী বীভৎস চেহারা! চেনার উপায় নেই বটে কিন্তু যার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মুখস্থ তাকে কি আর মুখ দেখে চিনে নিতে হয়। তাছাড়া বেঁচে থাকলে তো শফিক অবশ্যই ভার্সিটিতে আসতো, আশাকে কি আর না দেখে থাকতে পারতো সে? আসেনি তো। তাহলে...! মৃত মানুষ কীভাবে কুরিয়ার পাঠায়? এ যে অবিকল শফিকের হাতের লেখা, শফিকেরই হাতের সাইন!

প্রতি বছর কুরিয়ার-পার্সেলটা আসার পর পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কে কী মনে করলো আশা মির্জা সে দিকে থোড়াই কেয়ার করে। অন্তত শফিক বেঁচে থাকার ইঙ্গিতটাই তার মনটাকে ভীষণভাবে সান্ত্বনা দেয়। তাই ক্যালেন্ডারগুলো এলেই আশা তার ঘরের দেয়ালে সযত্নে ঝুলিয়ে রাখে। পুরোনো হয়ে গেলেও ফেলে দেয় না। প্রয়োজনে একটার উপরে আরেকটা বসিয়ে রাখে। বৈদ্যুতিক পাখার বাতাসে ক্যালেন্ডারগুলো যখন শরীর নাচায় তখন আশার ভেতরটা ছত্রখান হয়ে যায়। আরো বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে সে। ক্যালেন্ডারগুলোর নড়াচড়া দেখলে তার মনে হয়_ শফিক নিজেই যেন মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে তার সাথে কথা বলে যাচ্ছে।

আশা আশ্চর্য হয় এই ভেবে যে, প্রতি বছর একডজন ক্যালেন্ডার তার নামে আসে এবং প্রত্যেকটি ক্যালেন্ডারেই মার্কার পেন দিয়ে দুটো গুরুত্বপূর্ণ তারিখের উপর মার্কিং করা থাকে। মার্কিং করা তারিখ দুটো আশা এবং শফিক দুজনেরই ব্যক্তিগত জীবনের সাথে গভীরভাবে জড়াজড়ি করে আছে। ফলে আশা বহুবার, বহু উপায়ে শফিকের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবার কাছেই যে শফিক রায়হান মৃত একটি নাম ছাড়া আর কিছুই না! শফিকের পাঠানো ক্যালেন্ডারের কথা বললে আশার কথা কে বিশ্বাস করবে?

আশা হাল ছাড়েনি। তার ধারণা নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলার কারণে পার্সেলটি এখনো এসে পৌঁছে নি। অবশ্যই চলে আসবে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সে অপেক্ষা করতে থাকে। সংসার, ছেলেমেয়ে, কাজকর্ম কিংবা অন্য কোনো কিছুর প্রতি আজকাল খুব একটা মনোযোগী হতে পারছে না সে। সারাক্ষণ মাথায় দুশ্চিন্তা আর হাহাকার ঠোকাঠুকি করে। দিনে দু'তিনবার কুরিয়ার অফিসে খোঁজ নিতে নিতে সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরক্ত করে করে নিজেও হাঁফিয়ে উঠেছে। তারপরও কালেভদ্রে সে খোঁজ না নিয়ে থাকতে পারে না।

প্রায় ৮-৯ মাস চলে গেলো। পার্সেলটি আসেনি। আরো কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন তার দরোজায় টোকা পড়লো কুরিয়াস সার্ভিস অফিসের তরুণ এক পার্সেল বাহকের। 'জরুরি পার্সেল আছে!'

তীর্থের কাকের মতন অপেক্ষায় থাকা আশা মির্জার কষ্টময় দিন বুঝি আজ ফুরালো। তড়িঘড়ি করে পার্সেলটি রিসিভ করলো সে। ছেলেটার হাতে বখশিশ হিসেবে একশ টাকার একটা নোটও গুঁজে দিলো। প্যাকেটটা হাতে পেয়ে ভালোমত না দেখেই বুকে চেপে ধরলো আশা। প্রাণভরে শ্বাস নিলো কতক্ষণ। চোখ গলে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। তারপর, বড় আশা নিয়ে প্যাকেটখানা খুলে একবুক নিরাশা কুড়িয়ে আনলো সে। এটা তো কখনোই কামনা করেনি সে। এ-যে শফিকের পাঠানো ক্যালেন্ডার বোঝাই পার্সেল নয়! এতো বড়সড় একটা বিয়ের কার্ড!

আশার শৈশব-বান্ধবী রিয়া আহমদ পাঠিয়েছে এটা! আগামী মাসে রিয়ার একমাত্র মেয়ের মোহনার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে বিদেশের অনেক বড় ব্যবসায়ী। বিয়েতে আশাকে সপরিবারে দাওয়াত করে কার্ড কুয়িয়ার করেছে রিয়া।

আশা যেন বিদ্যুতের শক খেলো। ভীষণ মর্মাহত হলো সে। নিজের অজান্তেই হাত থেকে খসে পড়লো কার্ডটা। বান্ধবী মেয়ের বিয়ের খুশির সংবাদও এখন তার কাছে দুঃসংবাদের অবয়ব নিয়ে ছুটে এলো। ফলে প্রায় বিশ বছর আগেকার দেখা টগবগে যুবান সেই শফিক রায়হানের চেহারাখানি আজ হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠলে সজোরে কেঁদে উঠলো আশা। বিশটি বছর যে নদী নাব্যতাহীন নিশ্চুপ ঘুমিয়ে ছিলো বুকের ভেতরে, আজ হঠাৎ সে নদী পাড়ভাঙ্গা উত্তাল ঢেউ নিয়ে গর্জন করতে শুরু করলো।

অশ্রুসিক্ত নয়নে, পাহাড়প্রতিম দীর্ঘশ্বাস আর কিছু স্মৃতি-চিহ্ন বুকে জড়িয়ে আশা মির্জা পুনরায় পথের দিকে তাকিয়ে থাকে, অপেক্ষার প্রহর গুণে; তার অদৃঢ় বিশ্বাস, একদিন না একদিন ঘরের দরোজায় কুরিয়ার অফিসের কেউ এসে মিষ্টি করে হেসে, বলবে_'আশা মির্জা নামের কেউ কি আছেন? একটা জরুরি পার্সেল আছে উনার!'

আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৭৬৯৫২
পুরোন সংখ্যা