চাঁদপুর। সোমবার ২০ মার্চ ২০১৭। ৬ চৈত্র ১৪২৩। ২০ জমাদিউস সানি ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ***
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৭-সূরা নাম্ল 


৯৩ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৫৩। এবং যাহারা মু’মিন ও মুত্তাকী ছিলো তাাহদিগকে আমি উদ্ধার করিয়াছি।


৫৪। স্মরণ করো লূতের কথা, সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিলো, ‘তোমরা জানিয়া-শুনিয়া কেন অশ্লীল কাজ করিতেছ।’ 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

অন্যকে বারবার ক্ষমা করো, কিন্তু নিজেকে কখনই ক্ষমা করো না।              -সাইরাস।



অল্প আহারের অভ্যাস করিয়া অন্তরকে সজীব রাখো এবং জঠরানলে দগ্ধীভূত করিয়া হৃদয়কে পবিত্র করিয়া লও। এরূপ করিলে হৃদয় স্বচ্ছ এবং হাল্কা হইয়া কার্যপটু হইতে পারিবে।    


 

আমিনুল ইসলামের কবিতায় শিল্প ও নন্দন উপচার
সৌম্য সালেক
২০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


অবলোকনের সার্বিক গুণ চূড়ান্তভাবে কবির দৃষ্টিতেই সম্পন্নতা লাভ করে। এ দৃষ্টির মধ্যে একই সাথে সক্রিয় থাকে চিত্ত, চক্ষু, রূপচিত্র, আলোক এবং ভাবরাশি। তারপর সে অভিজ্ঞতার সঞ্চিত স্ফূর্তি ভাষার মাধ্যমে বিমুক্ত হয় এবং পাঠের মাধ্যমে ঋদ্ধ চেতনার সেই মনন-কৃত্য আমাদের উপলব্ধিকে স্পর্শ করে ভাবে-বেদনায়, বিবিধ উদ্ভাসনে।



'আমার সব কথা প্রস্তুত ছিল ভালোবাসার মঞ্চে যৌথ/ ঘোষণা হওয়ার মুগ্ধ প্রতীক্ষায়/ তারা আহত বলাকা হয়ে পড়ে আছে বারান্দায়/ তাদের ডানায় বিদ্ধ হচ্ছে নীরবতার বুলেট/ অথচ আর্তধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে না/ তারা স্বপক্ষীয় ফায়ারে বিদ্ধ সৈনিক_ হতাশ ও হতবাক।'_ 'দাঁতাল স্তব্ধতা' শিরোনামের এই পাঠ আমিনুল ইসলামের কবিতা থেকে নেয়া। বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি বিশেষ আর্তি বা রোদনের সঞ্চার ঘটলেও, সমষ্টিকে ছুঁতে চায় না যেনো, কিন্তু যখন তা প্রাত্যহিকতাকে মারাত্মকভাবে মেরে যায় তখনি তা সবাক রোদনের সাথে ছুঁয়ে যায় সমগ্র পরিধি; এই হানা হাঙরের মতো নীরব ঘাতক। কবির চোখ তাকে উদ্ভাবনে নিয়ে আসে শিল্পের সূক্ষ্ম বুননে। এখানে প্রশ্ন হতে পারে, কবিতায় শিল্পের দৃশ্যরূপ বা প্রকাশ কেমন? অনুভূতি প্রতিটি স্বাভাবিক মানুষের মধ্যেই সক্রিয় থাকে। এমনকি কতক অনুভূতি জীব-জন্তুও অনুধাবনে সক্ষম। আসলে এখানে পার্থক্যটা হচ্ছে বর্ণনা বা উপস্থাপনগত। হাসি, কান্না, বিষাদ, বিসম্বাদ, বিরহ, বিয়োগ, উচ্ছ্বাস ও প্রাপ্তির অনুভূতি যখন চূড়ান্ত অভিব্যক্তি লাভ করে তার দৃশ্যায়ন বা শব্দ সজ্জার মধ্যেই শিল্পের বিস্তার ও প্রকাশ; এর মধ্যে ধ্বনি এবং শব্দ-বিন্যাসের নৈপুণ্য ভাব ও বক্তব্যের আবেশকে পরম রূপ শক্তি দেয় আর যখন সেই পঠন-ভাবনাকে আকর্ষণ করে সেটাই কবিতার শিল্পকীর্তি। তবে কবিতার শিল্পরূপ যে কেবল উচ্চকণ্ঠ তা কিন্তু নয় বরং অধঃনত বোলেও কবিতা উচ্চ-শিল্পের অধিগমনে উন্নীত হতে পারে। এমন কিছু শিল্প সার্থক কবিতা আছে যার উপলব্ধি ও অনুভবের জন্য বারবার চেষ্টা চালাতে হয়। তেমন মহৎ কবিতাও বিরল নয়, গ্যেটের ফাউস্ট থেকে সামান্য পাঠ :


'From the soul with elemental force

To hold its sway in every listening heart'

 


সাহিত্য শব্দের সমষ্টি এবং অনুভূতিশীল বক্তব্য পরিবেশন এর উদ্দেশ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাব এতই অন্তরীণ, নির্বেদ ও অণুআঙ্গিকে ধরা দেয় সেক্ষেত্রে কবি তাঁর শব্দসজ্জার প্রতিফলে একটা রূপকল্প তৈরি করেন সেখানে অর্থ বা বক্তব্যের অনুগামী না হয়ে পাঠকও অনুভূতিকে কাজে লাগান। তবে এ প্রেক্ষিত সর্বময় নয়। শিল্প-সাহিত্য নানাবিধ মূল্যমান বজায় রেখে যেহেতু সৃজিত, সেজন্য এর অর্থ এবং বক্তব্যর প্রয়োজন আবশ্যক। বর্তমান কাব্য প্রবণতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বক্তব্যর চেয়ে প্রকরণের দিকেই কবিদের মনোযোগ অধিক লক্ষ্যণীয়। বক্তব্যের স্পষ্টতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা এখানে বুদ্ধদেব বসুর কিছু পাঠ তুলে ধরছি,



"নতুন যাঁরা কবিতা লিখছেন আজকাল, তাঁরা অনেকেই দেখছি প্রথম থেকেই টেকনিক নিয়ে বড্ড বেশি ব্যস্ত, সেটা কোথা থেকে এসেছে, তা আমি জানি, যথাসময়ে তার সমর্থনও করেছি। কিন্তু এখন সেটাকে দুর্লক্ষণ বলে মনে না করে পারি না। 'চোরাবালি' বা 'খসড়া' লেখার সময় যেসব কৌশল ছিল প্রয়োজনীয়, আজকের দিনে অনেকটাই তার মুদ্রাদোষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে; তাছাড়া যখন ভঙ্গি নিয়ে অত্যধিক দুশ্চিন্তা দেখা যায়, যেমন চলতিকালে ইংরেজ মার্কিন কাব্যে, তখনই বুঝতে হয় মনের দিক থেকে দেউল হতে দেরি নেই। আমি এ কথা বলে কলাসিদ্ধির প্রাধান্য কমাতে চাচ্ছি না। কিন্তু কলাকৌশলকে পুরো পাওনা মিটিয়ে দেবার পরেও এই কথাটি বলতে বাকি থাকে যে কবিতা লেখা হয় স্বরব্যঞ্জনের চাতুরি দেখাতে নয়, কিছু বলারই জন্য, আর সেই বক্তব্য যেখানে যত বড়ো, যত স্বচ্ছন্দ তার প্রকাশ, প্রকরণগত কৃতিত্ব সেখানেই ততো বেশি পাওয়া যায়। মনে হয় এখন বাংলা কবিতায় নতুন করে স্বচ্ছন্দ সাধনার সময় এসেছে, প্রয়োজন হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তিকে ফিরে পাওয়ার।" আমিনুল ইসলাম, নব্বই দশকের এই কবি সেই 'স্বচ্ছন্দ এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশেরই অনুগামী। স্বচ্ছন্দ নদীর মতো বয়ে চলার ছন্দ যেখানে বহমান সেখানেই শিল্পের সম্পন্নতা। তাঁর 'ভালোবাসার সুপ্রীমকোর্টে দাঁড়িয়ে' শিরোনামের কবিতা থেকে পাঠ_ 'মানুষ কত প্রাণীকে হিংস্র, কত প্রাণীকে ইতর এবং/ কত প্রাণীকে আরও কত বাজে বিশেষণে বিদ্ধ করে/ কিন্তু রোদসত্য এই যে, মানুষের সমান নিষ্ঠুর নয় অন্য কোনো প্রাণী/ সুমির স্কুল থেকে উড়ে যাওয়া শিশুপাঠ্যের/ সেদিনের সেই বক সাক্ষী/ মানুষের মতো কৃতঘ্ন ছিল না গলায়-হাড় বিঁধে যাওয়া বাঘটি।'



মানুষই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং আগ্রাসী; মানুষ ব্যতিরেকে প্রাণী জগতের অন্য কোনো প্রাণী বা জন্তু তার নিজের সগোত্র বা স্বজাতির জন্য এতটা ভীতিকর বা রুক্ষ নয়। কবিতাংশে যেমন শিল্পের স্বচ্ছন্দ আছে তেমনি আছে বক্তব্যের দৃঢ়তা। বিদেশে প্রুস্ত, জয়েস, এজরা পাউন্ড, এলিয়ট, ফকনার-এঁরা আধুনিক সাহিত্যে সময় ও অনুভূতির সম্মিলিত গতিধারায় এক নতুন সম্ভাবনা আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের সেই আবিষ্কারকে খুব চমৎকার সমন্বয়ে তুলে এনেছেন সৈয়দ আলী আহসান। তাঁর 'আধুনিক সাহিত্য' শিরোনামের প্রবন্ধ থেকে সেই আবিষ্কারগুলো উপস্থাপন করছি_



 



১. সময় একটি অনুভূতকাল। সময় আমাদের চিন্তায় নয়, আমরা সময়ের মধ্যে বিকশিত। আমাদের মনোবিকাশ সময়কে নিয়ে।



২. আমাদের প্রতি মুহূর্তের কর্মে আমাদের সম্পূর্ণ অতীতের প্রভাব রয়েছে। আমাদের চরিত্র এবং কর্ম সর্বপ্রকার বিগত সত্তার দ্বারা লালিত।



৩. আমাদের চেতনা হচ্ছে স্মৃতি, আমাদের মন স্মৃতি, তাই আধুনিক কাব্য এবং উপন্যাস প্রধানত আত্মব্যাখ্যা।



৪. আমরা নিঃশেষ না হয়ে পরিবর্তিত হই। যতদিন আমরা জীবিত থাকি, প্রতি মুহূর্তেই আমাদের পরিবর্তন আসে, কিন্তু আমাদের অস্তিত্বে সর্বক্ষণ একইভাবে জড়িত থাকে সময় ও স্মরণ।



 



আধুনিক সাহিত্যে কাল, শিল্প ও স্মরণ সংক্রান্ত এই লক্ষণ থেকে আমরা পাই_ কবির অনুভূতকাল, অতীতের প্রভাব, স্মৃতি ও আত্মব্যাখ্যা এবং নিরন্তর পরিবর্তন। এসব অনুষঙ্গ এবং প্রকরণ প্রভৃতি যখন কবির মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংক্রমিত হয় তখনই তিনি উচ্চারণ করতে পারেন মহার্ঘ্য বাক্যবন্ধ, যার গভীরে থাকে বোধ, বক্তব্য ও চৈতন্য এবং বহিঃপার্শ্ব সজ্জিত থাকে শিল্পের নিবিড় কুশলতায়; কবিতার শীর্ষনাম 'অপ্রস্ফুটিত দুপুর'_ 'হাতের তালুতে সূর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সময়/ অর্ধ-আবৃত পৈথানে/ ছোঁয়ামাত্র রাজকুমারীর চোখ মেলে জেগে উঠবেন পরী/ জেগে উঠেই হয়ে যাবেন স্রোত-ঢেউ-বাঁক/ কিন্তু কোথাও কোন নৌকার ছায়া নেই/ ভীরু সকাল হয়ে কাঁপছে অপ্রস্ফুটিত দুপুর।'



 



কবি কালিদাস পঞ্চম শতাব্দীতে শিল্পের চারটি প্রমাণ-লক্ষ্য স্থির করেন, সেগুলো হচ্ছে_ বন্দনা, শিল্পীর পরিপার্শ্ব, জীবন থেকে সৃজিত চিত্রকলা এবং নান্দনিক ইন্দ্রিয়বোধ বা রস। প্রতিটি শিল্প বা সৃজনকর্ম নির্ধারিত হয় শিল্পীর নান্দনিক দক্ষতার উপর। শিল্পীর অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টির সূক্ষ্মতাই মানুষকে নিত্য উপলব্ধির প্রতি আকাঙ্ক্ষী ও ভাবনাশীল করে তোলে। নন্দন এবং শৈল্পিকতার মধ্যে এক নিবিড় অন্তঃসম্পর্ক রয়েছে তবে শিল্পের পরিধিতেই এর প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে।



 



শিল্পের সীমা আজ কেবল চারু, লিখন ও প্রদর্শনক্রিয়ার মধ্যেই সীমিত নয়; পণ্যায়ন প্রক্রিয়ার এই যুগে শিল্পের বাণিজ্যিক মূল্যের পাশাপাশি এর ব্যাপ্তি বহুদূর সমপ্রসারিত হয়েছে। তবে পণ্যায়ন প্রক্রিয়ার সাথে শিল্পের এই সমপ্রীতির সবটাই যে নেতিবাচক তা কিন্তু নয়। কারণ এর সাথে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং ঐতিহ্যের যোগসূত্র থাকে। ইংরেজি অবংঃযবঃরপং এর পরিভাষা নন্দনতত্ত্ব, যেখানে সৌন্দর্য, শিল্প, স্বাদ, উপভোগ, মনোজগতের চিত্র ও সৌন্দর্য সৃষ্টি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। এটি আসলে দর্শন শাস্ত্রের একটি শাখা, তবে শিল্পকর্ম ও সাহিত্যমূল্য বিচারে এর যথেষ্ট প্রয়োগ রয়েছে। 'নন্দন' শব্দটির অর্থ করলে পাওয়া যায়-যা থেকে আনন্দ পাওয়া যায় বা যার দ্বারা আনন্দ দেয়া যায় তা-ই নন্দন। যেহেতু আনন্দের উৎস সৌন্দর্য, তাই নন্দন শব্দের বিশেষ অর্থ হবে 'সৌন্দর্য প্রদায়ক'। নন্দন শব্দের সাথে আনন্দের যোগ থাকলেও সাহিত্যে আনন্দ বলতে কেবল উচ্ছ্বাস, আবাহন, উল্লাস ও প্রাপ্তি নয়_ এখানে আনন্দের অর্থ বেদনা, আকুতি, আর্তি এবং বিষাদের অর্থকেও ব্যাপকভাবে তুলে ধরে। আমরা প্রমথ চৌধুরীর কাছে শুনেছি, 'কাব্য জগতে যার নাম আনন্দ তার নামই বেদনা। তবে এই আনন্দ বা বেদনা যখন গভীরভাবে পাঠক মনকে স্পর্শ করবে তবেই সেই সাহিত্যকর্মের সার্থকতা। ইংরেজ রোমান্টিক কবি শেলীর কাছেও আমরা খুব সংশ্লিষ্ট একটি মন্তব্য পাই_ 'ঙঁৎ ংবিবঃবংঃ ংড়হমং ধৎব ঃযড়ংব ঃযধঃ ঃবষষ ড়ভ ংধফফবংঃ ঃযড়ঁমযঃ'. কিছু মহৎ কবিতার মধ্যে বিষয় অন্তরীণ থেকে এমন প্রকাশ ফুটে উঠে যা স্পষ্টত না আনন্দের, না বেদনার; তবু কোথাও যেন সেখানে জীবনের আশ্বাস খুঁজে পাওয়া যায়। কবি আমিনুল ইসলামের শিল্পসম্মত তেমন একটি স্তবক তুলে ধরছি, কবিতার শিরোনাম- 'কাঁটা ভরা আলো ক্ষতবিক্ষত হাওয়া'



'হোমারে পাশে বসে বন্ধ দুটি চোখ দেখে



আলোর কাঁটা মেলে সূর্য এক মাতাল সজারু



নগ্ন পায়ে নেচে যায় আর



ভাঁজ খোলা হৃদয়ের দুই পাশে



ছড়িয়ে পড়ে ছিন্ন ভিন্ন শান্তিকামী সবুজের চারা।'



 



(দুই)



আমিনুল ইসলাম, নব্বই দশকের এই কবি বাক্বিন্যাসে শিল্প-রক্ষণের পাশাপাশি সমকালীন ও চিরকালীন অনুষঙ্গসমূহের সমন্বয় সাধনে ব্রতী; এটা যেমন তাঁর শব্দ ব্যবহারে স্পষ্ট তেমনি বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তা প্রমাণিত। আত্মগত ব্যষ্টিক পরিধির চেয়ে তিনি সামষ্টিক সমন্বয় বোধের প্রতি অধিক তাড়িত, যা তাঁর বক্তব্যকে স্পষ্ট করার সাথে সাথে সময়ের অন্যান্য কবির চেয়ে তাঁকে বিশেষভাবে প্রকাশ করে। শিল্প এবং বাক্ প্রবাহকে সমুন্নত রেখেই তিনি কাব্যশ্রমে লাগেন, তবে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ মার্গভেদ নেই। প্রাত্যহিক কথ্য শব্দ থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত শব্দ, ধর্মীয় থেকে আরম্ভ করে দাপ্তরিক শব্দ_ সবই তিনি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন; আর এই যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর মুন্সিয়ানা ফুটে উঠেছে। এ যাবৎ তাঁর প্রকাশিত কাব্যের সংখ্যা এগারোটি। যার মধ্যে নিজস্ব বক্তব্য এবং শিল্পঋদ্ধ ভাষা নির্মাণের দক্ষতা যেমন স্পষ্ট তেমনি স্পষ্ট হয়েছে তাঁর একান্ত যুগ-বীক্ষণের সূক্ষ্ম কারুকাজ। তাঁর কবিতার মূল সুর প্রেম হলেও এ প্রেমের মধ্যে গভীর প্রচ্ছন্নতায় যুক্ত আছে রাজনীতি সচেতনতা। এখানে প্রেমিকার রূপ কেবল সৌম্য ও সুন্দরে আবৃত থাকে না; কখনো তাদের দেখা যায় স্বৈরিণী, ঘাতিনী কিংবা দ্বিচারিণী রূপে; তবে এসব নেতিবাচকতার মূলে যে বক্তব্য আছে তার পুরোভাগে যে কোনো নারী নেই তা সচেতন পাঠক ঠিকই টের পাবেন। কবিতায় তিনি রাজনীতিকে প্রেমের আবহে নবায়িত করে উত্থাপন করতে চেয়েছেন তাঁর নিজস্ব সমাজ বীক্ষণ।



'চলছি তখন থেকেই মাথায় সোনালি বোঝা



চিনি-আতপের গন্ধে সুবাসিত ঘামের শরীর



কে যেন পেছন হতে ডাক দেয়।



ফিরে দেখি কেউ নেই



আমার মাড়ানো পথ মুছে দিচ্ছে উচ্ছেদের চাররঙ হাত।



(বিড়ম্বিত কিষাণ_কাব্য: তন্ত্র থেকে দূরে)



আমিনুল ইসলামের কবিতায় প্রেম ও রাজনীতির এই পরম্পরাকে চমৎকার কিছু মন্তব্যে তুলে এনেছেন প্রাবন্ধিক সরকার আব্দুল মান্নান, প্রসঙ্গ বিবেচনায় তার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি: 'আমিনুল ইসলাম মোহন প্রেমের প্রথাগত আখ্যান রচনা করেন না। সংঘাতময় জীবনের বিচিত্র ক্ষতকে তিনি তুলে ধরেন জীবন প্রেমিকের বিস্ময়কর অন্তর্লোক থেকে। ফলে নারী নয়, পুরুষ নয়, আটপৌরে প্রতিদিন নয়_ বরং এসব কিছু নিয়েই সৃষ্টি হয় তাঁর প্রেমের কবিতার প্রবল জীবন তৃষ্ণা। প্রচ- এক সংবেদনার মধ্যে কবি আমিনুল ইসলামের কবিতা প্রাণময় হয়ে উঠে। এই সংবেদনা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রেমের সীমা অতিক্রম করে যায় অবলীলায় এবং ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকজ্ঞান ও লোকজীবন তাৎপর্যপূর্ণ সফলতায় ধরা দেয় কবির প্রেমভাবনায় অবয়বে। ফলে পাল্টে যায় পরিচিত ডিকশন, প্রবল প্রতাপান্বিত ফর্ম। আর সেই বিচূর্ণ কবি ভাষার সমাধিস্থলে গজিয়ে উঠে আমিনুল ইসলামের প্রেমের কবিতার নতুন এক ভাষিক জগৎ, স্বতন্ত্র এক গঠনসৌষ্ঠব। জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ আমিনুল ইসলামের কবিতার অন্তর্গত শক্তি। ফলে সমকালের বিচিত্র দুর্দৈবের মধ্যেও তাঁর কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠে অবিনাশী জীবনের গান। বোধের এই সততা ও দায়বদ্ধতায় আমিনুল ইসলামের প্রেমসমগ্র হয়ে উঠে জীবনসমগ্র-আর্তনাদের মধ্যে আনন্দিত উত্থান।' কবির 'প্রেম' শীর্ষনামের কবিতা থেকে সামান্য পাঠ_ 'হায় ফিরে গেছে কত সঙ্গত সহস্য দাবি/ অপঠিত আধমেলা কত নেত্রঠার আজো/ কিশোরী মনের মতোন অজস্র আহ্বান/ চাপা পড়ে গেছে কত উদাসীন মধ্যাহ্নে।'



সাহিত্যের মূল্যায়ন হয় ভ্যালুর ভিত্তিতে। চষবধংঁৎব ঠধষঁব এবং অবংঃযবঃরপ ঠধষঁব পাশাপাশি শিল্প মূল্যায়নের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঠধষঁবং রয়েছে, এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মান ঝড়পরধষ ঠধষঁব। এই মূল্যমানে ধরা পড়ে কবির বা শিল্পীর সমাজ বীক্ষণ। কেউ কেউ কলাকৈবল্যবাদের এই ধারণা পোষণ করেন যে, 'শিল্পকলা সর্বপ্রকার উপযোগিতা বর্জিত' অর্থাৎ শিল্পের বা সাহিত্যের জন্য কোনই ভিন্ন উপলক্ষ বা উদ্দেশ্য থাকতে পারে না কেবল শিল্পশর্ত ছাড়া। এই মতকে অবশ্য সবাই অবলম্বন করে না, কেননা সমাজবদ্ধ মানুষের প্রয়োজনেই যাবতীয় সৌন্দর্য চর্চা। আর এসব ভাবনা না থাকলেও কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই সামগ্রিক একটি দায়বোধ প্রচ্ছন্নভাবে থেকেই যায়। আমিনুল ইসলাম মানবিক উপলক্ষ বা উপযোগকে সাথে রেখেই শিল্পশ্রমিক এবং এখানেই তাঁর নিষ্ঠার প্রকৃত উদ্ভাস, কবিতার শিরোনাম_'ফনা গুটানো চিত্রকল্প', 'দালানের নিচে মৃত্তিকায় মিশে যায় ফোঁটা ফোঁটা/ দষ্ট ঘাম রক্ত অশ্রুপ্রাণ/ রাজা যায় রাজা আসে/ এই দৃশ্য সর্বদর্শী টিকটিকির নজরে পড়ে না।' নদীর আকর্ষণ যেমন এঁকে বেঁকে সমুদ্রে বিলীন হওয়া তেমনি সকল শিল্প ও সাহিত্যের মূল আকর্ষণ অনিঃশেষ ব্যঞ্জনার মাধ্যমে লোক মনে অনাবিল চৈতন্য ও আনন্দ সঞ্চারণ। আর এই চৈতন্য ও আনন্দবোধ কেবল হর্ষ-বিলোল বা তৃপ্তির নয় বরং চিরকালীন দুঃখবোধ এবং বেদনারও। আমিনুল ইসলামের কবিতা তেমনি আনন্দ সঞ্চারি উপচারে ভরা যা কেবল ছুঁয়ে দেয় না, স্তব্ধও করে। এখানে কবির শিল্পসম্মত কিছু কবিতা থেকে সামান্য উপস্থাপন করছি:



 



ক) 'হে বেহুলা, আর ঘুম নয়, এইবার জেগে উঠো হাঙরমোহনা/ ফিরিয়ে আনো লখিন্দরের ভুলের ভাসান।' (ভুলের ভাসান)



খ) 'অথচ অনড় তুমি-লেলিয়ে রেখেছো/ রাতের জানালা আর দিনের দুয়ারে/ অাঁধারের রঙমাখা একগুঁয়ে কতিপয় নিষেধের র‌্যাব' (নিষেধাজ্ঞার মুখে)।



গ) 'তুমি ন্যাংটা চাঁদকে ছুঁয়েছো বলে/ পূর্ণিমায় আর সাগর হয়ে উঠতে পারো না/ তুমি অসুখী/ কারণ, তোমার চাওয়ার কিছু নেই/ আসলে গন্তব্যে একটি ভুল ঠিকানার নাম।' (গন্তব্য একটি ভুল ঠিকানার নাম)



ঘ) 'তোমার বুকে পড়েছিল-জানে সবাই



তথাপি তো উঠেনি অংকুর, (বীজ না ভূমি)



ঙ) 'যে বেদনা ভেসে যায় গোপন জোয়ারে



আমি লিখে যাবো তার স্রোতের শ্লোগান



হে বন্ধু, তুমিও খোলো চিরায়ত মন



অধিগম্য অন্ধকারে উঠুক সবিতা।' (খুলে দাও মন)



চ) 'দু পায়ে জড়িয়ে শস্যময়ী মাটির মমতা



অাঁচলে বিছানো সবুজের নিবিড় আসন



আর দুচোখে উদ্ভাসিত একগুচ্ছ শুভকামনা



ওই তো আমার মা, আমার ফেরার পথে লক্ষ কোটি চোখ মেলে উঠোনে।' (জননী আমার)



ছ) 'আমিও তেমনই এক ভূগোল/ তৃষ্ণাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে ছুঁয়ে যেও মাঝে মাঝে/ আর বুক উপচানো বন্যায়/ যদি পারো/ ভাসিয়ে দিও একটি বার নৈমিত্তিক ছুটি নেয়া রাতে'। (প্রণয়ী নদীর কাছে)।



'কাব্য রহস্য সৃষ্টি করতে পারে, মানব মনে অনুপ্রেরণা আনতে পারে, সাধারণের উপভোগের অতিরিক্ত একটা আনন্দবোধ জাগাতে পারে, কিন্তু কবিতা প্রধানত এবং মূলত ভাষার সম্ভাবনা নির্ণয় করে থাকে। এভাবে ভাষার সম্ভাবনা নির্ণয়ের মধ্যেই কবিতার ঐতিহ্য নিহিত থাকে।' কবিতার শিল্প ও সম্পন্নতা সম্পর্কে এই মন্তব্য সৈয়দ আলী আহসানের। এই নিক্তি মোতাবেক এবং ধ্বনিগত সৌকর্য বিবেচনায় আমিনুল ইসলামের কবিতা নানাস্থলে ও নানান ভাব-রূপ মর্মে মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছে। ভাব ও বক্তব্যের সাথে শব্দ ব্যবহারের যে ঐক্য প্রয়োজন তা রক্ষায় কবি গভীর নিষ্ঠা বজায় রেখেছেন। স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে তিনি যোগ করেছেন শিল্পের নিত্য-অনুষঙ্গ, বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার সারৎসার; যা তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র আলো দিয়েছে। অাঁধার বিনাশক হলেও আলোর তাৎপর্যে তা যেমন অস্তিত্ব রক্ষায় অপারগ তেমনি কেবল শিল্প ও সুন্দরের সক্ষমতাই উন্নত শিল্পকারের প্রতি স্বাভাবিক দৃষ্টি ফেরাতে যথেষ্ট। সেই উচ্চ-শিল্পকীর্তিই আমিনুল ইসলামের কবিতাকে আনন্দ সমাগমে উপযুক্ত স্থান দিবে। যুগের চলার সাথে অভিনবত্ব বজায় রেখে যে সকল কবিতা হাজার বছর অতিক্রম করে আমাদের হাতে পৌঁছেছে, আমিনুল ইসলামের কবিতা সেই ধারাবাহিকতারই সমকালীন স্বতন্ত্র সংস্করণ আর এই শিল্পগুণই তাঁর কবিতাকে কালোত্তর কালে পেঁৗছে দিবে বলে বোধ করছি।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
২৮৯৮৬৩
পুরোন সংখ্যা