চাঁদপুর। সোমবার ২০ মার্চ ২০১৭। ৬ চৈত্র ১৪২৩। ২০ জমাদিউস সানি ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৭-সূরা নাম্ল 


৯৩ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৫৩। এবং যাহারা মু’মিন ও মুত্তাকী ছিলো তাাহদিগকে আমি উদ্ধার করিয়াছি।


৫৪। স্মরণ করো লূতের কথা, সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিলো, ‘তোমরা জানিয়া-শুনিয়া কেন অশ্লীল কাজ করিতেছ।’ 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

অন্যকে বারবার ক্ষমা করো, কিন্তু নিজেকে কখনই ক্ষমা করো না।              -সাইরাস।



অল্প আহারের অভ্যাস করিয়া অন্তরকে সজীব রাখো এবং জঠরানলে দগ্ধীভূত করিয়া হৃদয়কে পবিত্র করিয়া লও। এরূপ করিলে হৃদয় স্বচ্ছ এবং হাল্কা হইয়া কার্যপটু হইতে পারিবে।    


 

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবি মানস
মুহম্মদ খলিলুর রহমান
২০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


দুই



পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের মমতাবোধের উৎসধারায় একাধিক প্রবাহ কাব্যরসের ভা-ারকে বিস্ময়কর ভাবে সমৃদ্ধ করেছে-কাব্য আবেগে বিলোড়িত করেছে। বাংলার লোকসাহিত্যে এদেশের মানব-মানবী, সমাজজীবন বিচিত্র কৌশলে কাব্য উপকরণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বপ্লাবী মমতাবোধই প্রাধান্য পেয়েছে। এসব লোক সাহিত্যের সংগ্রাহক হিসেবে চন্দ্রকুমার দে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। প্রাচীন মহিলা কবি 'চন্দ্রাবতী'র উপর তাঁর লিখা অনেক সাহিত্য সাধককে আকৃষ্ট করে। এ পথ ধরেই 'মৈয়মনসিংহ-গীতিকা'র মাহাত্ম্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মর্যাদার আসন লাভে সক্ষম হয়। পুরো ময়মনসিংহ অঞ্চলে লোকসাহিত্যের রসাস্বাদনের ব্যাপারটি লক্ষ্য করে ড. দীনেশচন্দ্র সেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীনকে লোকসাহিত্য সংগ্রহে উৎসাহ প্রদান করেন। কবি এ সুযোগ লুফে নিয়ে হৃদয়ে মমতাবোধের ধারাকে প্রাবল্য দানের সুযোগ লাভ করেন; অন্যপক্ষে উচ্চশিক্ষার ব্যয়নির্বাহের অক্ষমতা তাঁকে যে হতাশার বেদনায় আহত করেছিল তারও উপশম লাভে সক্ষম হন।



পল্লীকবির পূর্ববঙ্গ তাঁর জীবনের হিরণ্ময় অধ্যায়কে গভীর মমতাবোধের সাথে জড়িত করে তৃপ্ত করেছে। কবি দেখেছেন, পাশাপাশি দুটো গ্রামের মানুষের মাঝে রয়েছে সুমধুর হৃদ্যতা। দু' গ্রামের মানুষের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকা যেমনি স্বাভাবিক ছিল, তেমনি হৃদয় হতে মমতাবোধ উৎসারণের অকৃত্রিম বহিঃপ্রকাশ আদৌ দুর্লক্ষ্য ব্যাপার ছিল না। নঙ্ীকাঁথার কাব্যের রূপাই-সাজু দু'টি ভিন্ন গাঁয়ের মানুষ। কিন্তু রূপাই বাঁশ কেটে নেবার জন্য সাজুদের গ্রামে এসে মায়া-মমতাশূন্য ব্যবসায়ীর নির্লিপ্ত মনের বিবর্ণ বোধে ব্যথাহত হয়নি, বরং সাজুর মা নিজেকে পরমাত্মীয়া ঘোষণা করে তাঁর বাড়িতে রূপাইকে সন্তানের আদরে সিক্ত করেছেন। গ্রামীণ-আত্মীয়তার সম্পর্ক পূর্ববঙ্গে যেমনি ব্যাপক ছিল, তেমনি প্রগাঢ় ছিল। এ মমতাবোধের কাছে স্বার্থচেতনা কোনো স্থানই করে নিতে পারেনি। মায়ের বোন খালা হয়ে বোনের সন্তানের মমতামেদুর দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে যেমনি তৃপ্ত হতেন, এমনটা পরিতৃপ্তি মা ভিন্ন অন্য কারো ভাগ্যে জোটেনি। খালা হয়ে মমতা উৎসারণের যে আত্মপ্রসাদ লাভ হতো অন্য কোনো কিছুর বিনিময়ে তাকে গ্রাম্য নারী হাতছাড়া করতে চাইতো না। রূপাই যাতে হৃদয়ে সাজুর মাকে খালার আসনে বসায় তার জন্য সাজুর মা নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি কোন্ গ্রামের কোন্ বাড়ির মেয়ে এবং মেয়ে হিসেবে তিনি কোন্ নামে আদৃতা এসব বিস্তারিত জানিয়ে শ্রদ্ধা-মমতা আকর্ষণের নেশায় বিভোর হয়ে যত কথার আবশ্যক আবেগ জড়ানো কণ্ঠে তার সবকিছুই ব্যক্ত করেছেন। নিচে উদ্ধৃত কবিতাংশ থেকে সাজুর মায়ের মমতাপিপাসু মাতৃহৃদয়ের গভীর উপলব্ধি অভিব্যক্ত হয়েছে-



(ক) "আমি যে তোর হইরে খালা, জানিস্নে তুই বুঝি, মোল্লা-বাড়ির বড়ুরে তোর মার কাছে নিস্ খুঁজি।'



(খ)'আমি হেথা থাকতে খালা, তুই থাকবি ভুখে, শুনলে পরে তোর মা মোরে দুষবে কত রুখে।



পূর্ববঙ্গে গ্রাম্য নারীর কাছে মায়ের কাছাকাছি আসন পাতার আনন্দ এতটাই মধুর ছিল, যার মাধুর্য পল্লীকবির 'নঙ্ীকাঁথার মাঠে' যেভাবে কবি উৎসারণ করেছেন তা একান্তই নির্ভেজাল ও অনিবার্য শব্দ যোজনার অকাট্য দলিল, যা বিশ্বসাহিত্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি পেরেছেন কিনা জানি না।



নানাবাড়িতে কবি যে মায়া-মমতার ছায়াবৃত থাকতেন সে কথা ব্যক্ত করতে মামাবাড়ির খেজুর গাছ, আমবাগান, পদ্মপুকুরের কথা কবিতায় উল্লেখ করেছেন। নানা তাঁদের বাড়ি বেড়াতে আসলে যাবার বেলায় কবিমাতা এবং নানার অশ্রুসজল বিদায় মুহূর্তের কারুণ্য কবিকে দারুণ ভাবে পীড়িত করত। নানা বাড়িতে তাঁর মা 'রাঙা ছুটু' নামে আদৃতা হতেন। পালকিতে করে মা নানাবাড়ি যেতেন। মায়ের এক ভাই মাকে নানাবড়ি নিয়ে যেতেন, যাকে কবি মামা না বলে 'মামু' বলতেন। মামা ডাকার চেয়ে মামু ডাকলেই মামা খুশি হতেন। মায়ের পালকির পেছনে পেছনে মামার সাথে কবিও নানা বাড়ি যেতেন। মা বাপের বাড়ি যাবার আনন্দে বিভোর হতেন আর কবি মামা বাড়ির নানা খাদ্য উপকরণের স্বাদ পাবার আনন্দের কথা ভাবতেন।



কবির দাদির বাপের বাড়ি ছিল ষোল সমুদ্দর নামের গ্রামে। গরীব দাদার ঘর করতে এসে দাদি মমতাবোধের তাগিদে অনেক কষ্ট সহ্য করেও পরমানন্দে স্বামীর ঘর করেছেন। দাদির বাড়ির লোকদেরকে যথাযথ সমাদর করার সামর্থ্য দাদার ছিল না। দাদা কৃষক ছিলেন। এসব সত্ত্বেও কবির দাদি যেমন তুষ্ট ছিলেন, কবিও দাদার মত কৃষকের ঘরে থেকে কৃষকের সন্তানের জীবনে যেসব আনন্দ উপকরণ রয়েছে সেগুলো ভোগ করার প্রচ- পিপসায় লালায়িত ছিলেন। কিন্তু কবির বাবা শিক্ষকের পেশায় নিয়োজিত থাকায় কবির সে আশা পূরণ হয়নি। এজন্য কবি আফসোস করে বলতেন, "আমার বাজান যদি কৃষাণ হতেন, কতইনা মজা হতো।" দাদি যখন মারা যান তখন কবি নিতান্তই অল্প বয়স্ক ছিলেন। এ দাদিই মমতার গভীর আকর্ষণ দিয়ে কবিকে আজীবন মমতার জ্যোতির্ময় পথপরিক্রমণের উৎসাহ যুগিয়েছেন।



গ্রামবাংলার নৈসর্গিক রূপ কবির মাঝে চরম উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে। স্বর্ণপ্রসবা ফসলের মাঠ কবিকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। নদী-খাল-বিল কবির মানসপটে মমতার প্লাবন সৃষ্টি করেছে। বাংলার বর্ষাকালীন ভরা নদীর মাঝির কণ্ঠে গান শুনে কবি বিভোর হতেন। কবির গানগুলোতে এই ভরা নদীর মহিমা এমন ব্যঞ্জনায় প্রকাশিত হয়েছে, যা বাঙালি হৃদয়কে পাগলপারা করে দিয়েছে। খাঁটি বাঙালি হৃদয়ের অকৃত্রিম ভালোবাসার সুগভীর উপলব্ধি কবিসত্তার সামগ্রিকতায় সঞ্চারিত হয়ে কবিকে মহান প্রেমিক, ব্যাকুল বিহ্বলতায় বিগলিত দরদী ও মরমী কবিমানসের অধিকারী করেছে। তাই কবির সংস্পর্শে আসার জন্য আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্তুতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সাহিত্যসাধকবৃন্দ ও গ্রামবাংলার আপামর জনসাধারণ অনির্বচনীয় সম্মোহনে সম্মোহিত হয়েছেন। পল্লীকবির কবিমানসের এ দিকটির জন্য কবি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য মহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকবেন চিরকাল।



পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিমানসে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিশ্বখ্যাত সাহিত্যসাধকবৃন্দের প্রভাব দুর্লক্ষ্য বিষয় নয়। তবে কবির ছাবি্বশ বছর বয়স অতিবাহিত হয়েছে অম্বিকাপুরের মত নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঋদ্ধ, মায়ামমতাপূর্ণ গ্রামবাংলার একটি জনপদে। যার ফলে আধুনিক বাংলা সাহিত্য অথবা পাশ্চাত্য সাহিত্য তাঁর মনে শুধুমাত্র মহিমার ছায়াপাত করেই সরে দাঁড়িয়েছে। মমতাবোধের দিক থেকে কবি জসীমউদ্দীনের কবিসত্তা অন্য কোনো কবির সাথে তুলনীয় নয়। ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শরৎচন্দ্র সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, "শরৎচন্দ্রের চোখ ছিল বুকে।" শরৎচন্দ্রের মমতাবোধ বাংলা কথাসাহিত্যকে যেমনি বিশ্বসাহিত্যের ব্যাপ্ত পরিম-লে অনন্য মহিমা দান করেছে, তেমনি পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কাব্য বিশ্বসাহিত্যের আসরে মহিমার আসন লাভ করে বিশ্ব পল্লীসাহিত্যে বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। এর পিছনে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের বেলায়ও এ কথাই সত্য যে, কবির চোখ ছিল তাঁর বুকে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের মমতাবোধে সার্বজনীনতা, ঔদার্য, হৃদয়ধর্মের সাথে ঐতিহ্যচেতনা, দেশাত্মবোধ মিশ্রব্যঞ্জনা সৃষ্টি করায় অম্বিকাপুরের মত নিভৃত পল্লীর টানে অনেক বরেণ্য ব্যক্তি ফরিদপুরে আসার আকর্ষণ বোধ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ফরিদপুরে এসে অম্বিকাপুরেও পদধূলি রেখে গেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম বহুবার অম্বিকাপুরে এসেছিলেন। কবি শেষবারে এলে 'কবর' কবিতায় উলি্লখিত দাদির কবরের ওপর ডালিম গাছের শাখাবিস্তার তন্ময় হয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন। বিদ্রোহী কবি দেশ স্বাধীনের প্রবল প্রেরণায় উদ্বেলিত হলেও জসীমউদ্দীনের দাদির জন্য মমতার স্মৃতিমাখা ডালিম গাছের দৃশ্যে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। দাদির জন্য যে কবির এত মমতা, যিনি নিতান্তই অল্প বয়সে দাদিকে হারিয়ে হৃদয়ে আজীবন হাহাকারপূর্ণ মমতাবোধে তাড়িত হয়েছেন, তিনি আত্মীয়-স্বজন, দেশবাসী, সমগ্র মানবসমাজকে মমতার দৃষ্টি দিয়ে তথা বুকের চোখ দিয়ে দেখবেন এটাই স্বাভাবিক। কবির জীবন ও জগৎ সম্পর্কীয় বর্ণনায় মায়া মমতার স্নিগ্ধ ও শ্যামল চিত্রকল্প যেভাবে বাণীরূপ লাভ করেছে তা বিশ্বসাহিত্যের ভা-ারে অমূল্য রতন হয়ে চিরকাল উজ্জ্বল প্রভা বিস্তার করবে। (চলবে)



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৬৫৩২
পুরোন সংখ্যা