চাঁদপুর। সোমবার ২০ মার্চ ২০১৭। ৬ চৈত্র ১৪২৩। ২০ জমাদিউস সানি ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৭-সূরা নাম্ল 


৯৩ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৫৩। এবং যাহারা মু’মিন ও মুত্তাকী ছিলো তাাহদিগকে আমি উদ্ধার করিয়াছি।


৫৪। স্মরণ করো লূতের কথা, সে তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিলো, ‘তোমরা জানিয়া-শুনিয়া কেন অশ্লীল কাজ করিতেছ।’ 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন

অন্যকে বারবার ক্ষমা করো, কিন্তু নিজেকে কখনই ক্ষমা করো না।              -সাইরাস।



অল্প আহারের অভ্যাস করিয়া অন্তরকে সজীব রাখো এবং জঠরানলে দগ্ধীভূত করিয়া হৃদয়কে পবিত্র করিয়া লও। এরূপ করিলে হৃদয় স্বচ্ছ এবং হাল্কা হইয়া কার্যপটু হইতে পারিবে।    


 

কাক-বৌ
এহ্তেশাম হায়দার চৌধুরী
২০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

নতুন বৌয়ের মুখ দেখে অাঁৎকে উঠে সবাই। ঘোমটার আড়ালে ওটা কি! কেউ যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। শামছুর মতো এমন সোনার টুকরো ছেলের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত জুটলো এমন বৌ! কালো কুচকুচে গায়ের রঙ, অনেকটা পোড়া কয়লার মতো। চেহারাও খুব সুন্দর নয়, তবে চোখ দুটো বড় বড়। চোখ দিয়ে কী হবে? এদের কাছে গায়ের রঙটাই আসল।

বৌ দেখে শুরু হলো টেপাটিপি, ফিসফিসানি, ঠোঁট বাঁকানো আর ঠাট্টা মশকরা। বয়সী দাদী তো মুখের উপর বলে বসলো-

_ শামছুর কপাল বালা, বৌ দিয়া হগল কামই চলবো। জ্যৈষ্ঠ মাসে বাঙ্গি খেতে কাকতাড়ুয়া অইতে পারবো।

বুড়ির কথায় সবাই খে খে করে হেসে উঠে। জুলেখার মা বৌয়ের ঘোমটা তুলে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,

_ বৌয়ের কি ছীরি। মাথার উপর খোদা আছে গো খোদা আছে। দেমাগের ফল আতে আতেই পাইছে।

শামছুর সঙ্গে জুলেখার বিয়ের প্রস্তাব ছিল। আশেক আলী মাস্টার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। সাফ জানিয়েছিল, "গেরামে পোলারে বিয়া করামু না।" এ জন্যই জুলেখার মার ক্ষোভ। উপস্থিত মহিলাদের এসব ব্যঙ্গ বিদ্রূপ শুনে ভীড়ের মাঝখানেই হঠাৎ হাউমাউ করে বিলাপ জুড়ে দেয় শামছুর মা গোলাপজান বিবি-

_ আমার এ আছিল কোপালে গো-- ও-ও । ঐ ছোড হারামজাদা কত কথা কইছে, বৌ-এমুন্না, বৌ-তেমুন্না। অহন কি অইলগো--ও-ও। তাইনের চোখে তো ছানি পড়ছে। বুড়া কালে ভীমরতি ধরছে গো--ও--ও।

উপস্থিত অনেকে আহা, উহু করে সমবেদনা জানায়। গোলাপজান বিবি অাঁচলে চোখ মুছে। ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ করে নাক ঝাড়ে। আবার ফুঁফিয়ে কাঁদতে যাবে এমন সময় বাইরে শোনা যায় আশেক আলী মাস্টারের হুঙ্কার,

_ এই ঘরে এত চিল্লাচিলি্ল ক্যান? ডাকাইত পড়ছেনি হ্যাঁই।

একেবারে মন্ত্রের মতো কাজ হলো।

পলকে গুঞ্জন থেমে যায়। আশেক আলী মাস্টারকে সবাই যমের মতো ভয় করে। তার হুঙ্কার শুনে এখন কে যে কোথায় পালাবে পথ খুঁজে পায় না। যে যেখান দিয়ে পারলো পালিয়ে বাঁচল। মাস্টার ঘরে ঢুকে সামনে পেল তার স্ত্রী গোলাপজান বিবিকে। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কট্মট্ করে বললো,

_ এই যে তুমি? কী অইতাছে এসব। তোমার শরম করে না পাড়ার মানুষ ডাইক্যা নতুন বৌরে লইয়া তামসা করতে? বেয়াক্কল কুনহানের।

গোলাপজান বিবি নাক টানতে টানতে বললো,

_ আপনে এইডা কি করছেন? দেইখ্যা হুইন্যা কী আনছেন?

এবার মাস্টারের মাথায় রক্ত উঠে যায়। মেজাজ একবারে সপ্তমে। মেজাজ উঠলে মাস্টারের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। হুঙ্কার দিয়ে উঠে,

_ কী কইলি তুই? তোর এত বড় সাহস? আমার বৌমারে লইয়া কথা কস্।

মাস্টার যেন গোলাপজান বিবির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

নতুন বৌ এতক্ষণ চুপ ছিল। এ অভাবনীয় কা- দেখে মাথার ঘোমটা টেনে খাট থেকে নামে। মাস্টারের পিঠে হাত রেখে বলে,

_ বাবা করেন কি, করেন কি, থামেন।

মাস্টার চমকে উঠে। চমকে উঠে গোলাপজান বিবিও। নতুন বৌ ধীরে ধীরে এসে গোলাপজান বিবির পা ছুঁয়ে সালাম করে তাকে জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বললো,

_ বাবা, মায়ের উপর রাগ করন ঠিক না। মার মনে তো কষ্ট অইবই। কোন্ মা চায় তার ছেলের জন্য আমার মতো এমন কালো কুৎসিত মেয়ে! মাগো আমারে তো আর আমি বানাই নাই। আল্লাহ বানাইছেন। তয় ক্যান এমুন কইরা বানাইছেন তিনিই জানেন।

নতুন বৌয়ের বড় বড় চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। মাস্টার বৌয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেই বৌ মাস্টারের বুকে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে উঠে,

_ বাবা!

মাস্টারের চোখও ঝাপসা হয়ে যায়। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো,

_ মারে। আমি বাঁইচা থাকতে এ বাড়িতে তোর কোনো অমর্যাদা অইতে দিমু না।

_ বাবা।

গোলাপজান বিবি স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। একটা অপরাধ বোধ তাকে অনুতপ্ত করে। এক সময় সে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কতক্ষণ পর মাস্টারও যাবার জন্য পা বাড়ায়। নতুন বৌ আস্তে আস্তে বলে,

_ বাবা, এ লইয়া কারো লগে বিবাদ কইরেন না। সব ঠিক অইয়া যাইব। আপনি আমারে দোয়া করেন।

মাস্টার হাসে।

_ আমি জানিরে মা, তুই পারবি। আমি যাই সালমারে পাঠাইতাছি!

মাস্টার চলে যায়।

সালমা মাস্টারের একমাত্র মেয়ে।

সবার ছোট, তাই ভীষণ আদুরে। পাশের স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ে। নূতন ভাবীকে দেখে তারও মন খারাপ। স্কুলের বান্ধবীরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে গেছে। তাই সালমাও মন খারাপ করে ঘরের দরজা দিয়ে বসে আছে চুপচাপ।

মাস্টারের বড় ছেলের বৌ জাহিদা। অবস্থাপন্ন বড় ঘরের মেয়ে। ক্লাস নাইন পাস, তার ওপর সুন্দরী। একটু দেমাগীও। ছয় বছরের মেয়ে টুনীকে নিয়ে ব্যস্ত। নতুন বৌ তারও পছন্দ নয়। কিন্তু শ্বশুরের সামনে তার মুখ খোলার জো নেই। সেও মুখে কুলুপ এঁটে নিজের ঘরে বসা।

শামছুর ঘরে একা বসে আছে নতুন বৌ কোকিলা।

রাত বাড়ছে নিঃশব্দে। কেউ এদিকে আসছে না। অন্য ঘরে শ্বশুরের বড় বড় কথা। হৈ চৈ ধমকা ধমকি, কান্নাকাটির শব্দ। কোকিলা বুঝল, এসব তাকে নিয়েই। এ বাড়িতে শ্বশুর আর ছোট দেবর আবুল ছাড়া কেউ তাকে পছন্দ করেনি। স্বামীর কথা জানে না। বিয়ের আসরে আয়না একনজর দেখাদেখি। স্বামী বেচারা তাকে ভালো করে দেখে থাকলে সেও তাকে পছন্দ করবে না। দুপুর বেলায় পালকি থেকে নামার পর কত হুড়-হাঙ্গামা। অথচ একবারও তার সঙ্গে কোকিলার দেখা হয় নি। কোকিলা ভাবলো, তিনিও হয়তো অন্যদের মতো মনের দুঃখে কোথাও লুকিয়ে আছেন। এ সংসারে কালো মেয়েদের কি বিড়ম্বনা! বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই কোকিলাকে নিয়ে কত হাসাহাসি, কানাকানি, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। যদিও এসব নিয়ে কোকিলার মনে কোনো দুঃখ বা কষ্ট নেই। গায়ের রঙ নিয়ে অনেক ঠাট্টা মশকরা সে ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছে। তাই সব সময় শুনে শুনে এ সব গা সহা হয়ে গেছে। এখন তার একটাই ভাবনা তার স্বামী শামছু তাকে কীভাবে নেবে। কালো কুৎসিত কোকিলাকে সে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে তো? (চলবে)।

আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৬৫১২
পুরোন সংখ্যা