চাঁদপুর। মঙ্গলবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭। ৯ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • ***
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৫। আমি ইচ্ছা করিলাম, সে দেশে যাহাদিগকে হীনবল করা হইয়াছিল, তাহাদের প্রতি অনুগ্রহ করিতে, তাহাদিগকে নেতৃত্ব দান করিতে ও উত্তরাধিকারী করিতে;  


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 

assets/data_files/web

দারিদ্র্যকে যে মাথা পেতে গ্রহণ করে, সে ব্যক্তিত্বহীন পুরুষ।               -লংফেলো। 



বিদ্যান্বেষণের জন্যে যদি সুদূর চীনেও যেতে হয় তবে সেখানে যাব।   


 

একুশে ফেব্রুয়ারি : জাতীয় দিবস থেকে আন্তর্জাতিক দিবস
এ. এস. এম. শফিকুর রহমান
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


এক সময় একুশে ফেব্রুয়ারির বাঙালির নিজের রাষ্ট্রীয় জীবনেই স্বীকৃতি ছিল না। তৎকালীন পাকিস্তানে ১৯৫৬ সালে পূর্ব বাংলায় আবু হোসেন সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়েছিল। এরপর পূর্ণ রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করার জন্য আমাদেরকে স্বাধীনতা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সাল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। তারপর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে শোক দিবস এবং জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়।



একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু আমাদের জাতীয় দিবস নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি এখন সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষির কোটি মানুষের দিবস। অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমাদের জাতীয় দিবসটি কেমন করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো সে ব্যাপারে আলোকপাত করাই এ লেখার উদ্দেশ্য। একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে বাঙালি জাতির প্রাণের আবেগ এবং উচ্ছ্বাস ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় নিয়ে যায়। দেশের বাইরে সর্বপ্রথম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ১৯৯২ সাল থেকে বাংলা ভাষা দিবস পালন শুরু করে। পরবর্তীতে পশ্চিম বাংলায় বেসরকারিভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে। তবে সরাসরি একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দানের প্রথম দাবি উঠে বাংলাদেশের গফরগাঁও থেকে। ১৯৯৭ সালের একুশের এক অনুষ্ঠানে গফরগাঁও থিয়েটার নামক একটি সংগঠন থেকে এ দাবি উঠে। 'অর্ঘ্য' নামে প্রকাশিত এক সংকলনের প্রচ্ছদে 'বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস চাই' এই শ্লোগানে গফরগাঁওয়ের নেতা-কর্মীরা একুশের বিশ্ব মর্যাদার দাবি তোলে।



এক্ষেত্রে কানাডার বহুভাাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা প্রেমিক গ্রুপের উদ্যোগ সবচেয়ে কার্যকর ফল বয়ে আনে। এই গ্রুপ প্রথম ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব বিবেচনায় লিখিতভাবে অনুরোধ জানায়। মাতৃভাষা প্রেমিক গ্রুপের এই অনুরোধপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন সাত জাতি ও সাত ভাষার দশ সদস্য। এরা হলেন ফিলিপিনো ভাষার এলভার্ট ভিনজন ও কারমেন ক্রিস্টোভাল, ইংরেজি ভাষার জ্যাসেন মোরিন ও সুসান হর্ড গিন্স, কান্তানিজ ভাষার ড. কেভিন চাও, কাচি ভাষার নাজনীন ইসলাম, জার্মান ভাষার রিানতে মাটির্ননম, হিন্দী ভাষার করুনা জোসি এবং বাংলা ভাষার রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম। জাতিসংঘের মহাসচিবের পক্ষ থেকে অনুরোধকারীদের বিষয়টি নিয়ে প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই পরামর্শ পেয়ে কানাডা প্রবাসী কুমিল্লার সন্তান মরহুম রফিকুল ইসলাম ইউনেস্কোর প্যারিসস্থ ভাষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্না মারিয়া মেজলোককে ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ তাদের প্রস্তাব বিবেচনার জন্য টেলিফোনে অনুরোধ করেন। ঐ বছর ৮ এপ্রিল জবাবে আন্না মারিয়া রফিকুল ইসলামকে জানান যে, বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই, তবে ইউনেস্কোর কোনো সদস্য ও সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে উত্থাপিত করতে হবে। ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের এই কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে ইউনেস্কো পরিচালনা পরিষদের কয়েকটি সদস্য দেশের ঠিকানা প্রেরণ করেন। যাতে বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, ফিনল্যান্ড এবং হাঙ্গেরির নাম ছিল। এই পর্যায়ে জনাব রফিকুল ইসলাম ১৯৯৯ সালের ২৩ জুন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠি পাঠান।



চিঠির সারমর্ম অনুযায়ী ইউনেস্কোতে প্রস্তাব পাঠাতে হলে বাংলাদেশ সরকারের কমপক্ষে ৮টি মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন। অথচ ১৯৯৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ইউনেস্কোতে অবশ্যই প্রস্তাবটি প্রেরণ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে প্রস্তাবটি প্রেরণ সম্ভব নয় বিধায় আমলাতন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে তথা বিধিমালা এড়িয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য প্যারিসস্থ ইউনেস্কো সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। প্রেরণের এই প্রক্রিয়ায় শুধু ধন্যবাদ নয়, আজীবন জাতির পক্ষে কৃতজ্ঞতার পাশে মনে রাখা উচিত তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী মরহুম এ.এস.এইচ.কে. সাদেককে এবং তৎকালীন ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।



বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর পক্ষে এর সচিব অধ্যাপক কফিল উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরে ১৭ লাইনের একটি প্রস্তাব পাঠানো হলো। ইংরেজি ভাষায় যার শেষ লাইনে ছিল, , Proposes that 21 February be proclaimed International Mother Language Day throughout the world to commemorate the martyrs who scarified their lives on this very date in  ১৯৫২.



তখন ছিল ইউনেস্কো নির্বাহী বোর্ডের ১৫৭ তম অধিবেশন এবং ৩০ তম সম্মেলন। কিন্তু বাধ সাধে ইউনেস্কোর তহবিলের অপ্রতুলতা এবং প্রস্তাবটি বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ কারণে ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের মহাপরিচালক বার্ষিক এক লাখ ডলারের প্রয়োজনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে একটি ঋবধংরনরষরঃু ঝঃঁফু-এর মাধ্যমে ইউনেস্কোর ১৬০ তম সভায় বিষয়টি উত্থাপনের প্রস্তাব দেন। এমন একটি পরিস্থিতিতে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভের শেষ আশা ধরে রাখেন প্যারিসে ইউনেস্কোর ১৫৭ তম অধিবেশনে যোগদানকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মরহুম এ.এস.এইচ.কে. সাদেক। তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা এ প্রসঙ্গে খুব কাজে এসেছিল। তিনি অধিবেশনে দীর্ঘ এক আবেগময় বক্তৃতায় ভাষার মর্যাদার জন্য বাঙালিদের আত্মত্যাগ-তিতিক্ষা অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী ১৮০ জাতির সামনে তুলে ধরেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সাথে ঘরোয়াভাবে আলাপ করে এর পক্ষে বিভিন্ন দেশের সমর্থন প্রাপ্তিতে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখান। তিনি ইউনেস্কোকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, দিবসটি পালনে সংস্থার এক ডলারও লাগবে না ও বিভিন্ন ভাষা-ভাষীর মানুষ নিজেরাই মাতৃভাষার জয়গান গাইতে নিজেদের অর্থে দিবসটি পালন করবে।



অবশেষে ১৬ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে এভাবে শেষ পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভে সক্ষম হয়। প্রস্তাব হিসাবে মূল অধিবেশনে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরব যুক্ত হয়। প্রস্তাবের সমর্থন করে ওমান, মিশর, সিরিয়া, শ্রীলংকা, বেলারুশ, ফিলিপিন, ভারত, হন্ডুরাশ, গাম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, পাপুয়া নিউগিনি এমনকি পাকিস্তান। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের সচিব ড. শাহাদাত হোসাইন, প্যারিসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে তাঁদের মেধা ও প্রজ্ঞাকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা তোফাজ্জল হক, যিনি টনি হক নামে বেশি পরিচিত, এ ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি। এভাবেই ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের অধিবেশনের আলোচনায় সকল সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় এবং প্রতি বছর তা সকল সদস্য রাষ্ট্র ও ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে উদ্যাপন করার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। সেই থেকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের ১৮০টি দেশের মানুষ নিজ নিজ ভাষার মর্যাদা রক্ষায় পালন করে। যে দুজন বাঙালি কানাডায় বসবাস করে নিজ মাতৃভাষার জন্য কাজ করেছেন তাঁদের নাম রফিক এবং সালাম। এ দুটি নাম কাকতালীয়ভাবে আমাদের ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের মধ্যে দুজনের নামের সাথে তথা রফিক ও সালামের নামের মিলে যেন সৃষ্টি করেছে এক অদৃশ্য হৃদয় বন্ধন। যাঁরা আমাদের মায়ের ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে জীবন দিয়েছেন, জাতীয়ভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আমাদের জাতীয় দিবস হিসেবে তাঁদের যেমনি আমরা সম্মান করি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে, তেমনি কানাডা প্রবাসী দুজন বাঙালি যাঁরা একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং পরবর্তীতে তৎকালীন ও আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মরহুম এ.এস.এইচ.কে. সাদেক সাহেবের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা। তাঁরা এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন বলেই একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় দিবস থেকে আজ আন্তর্জাতিক দিবসে পরিণত হয়েছে। আজ তাঁদের অবদানের জন্য গর্ব করতেই পারি। কারণ, বিশ্বের সকল মানুষ আজকের আন্তর্জাতিক দিবস পালনের মাধ্যমে আমাদের শহীদদের যেমন স্মরণ করে তেমনি এই দিবসের আন্তর্জাতিকতায় বাংলাদেশের পরিচিতি এবং ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একুশে ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করার ফলেই এই দিবসটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন করে প্রতিষ্ঠিত করা সহজতর হয়েছে। এই সত্য স্বীকার করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় শেষ করছি।



 



লেখক : এ.এস.এম. শফিকুর রহমান, ০১৬৭০-৮৭৯-৫৮৯।


আজকের পাঠকসংখ্যা
২৯১০৯৪
পুরোন সংখ্যা