চাঁদপুর। মঙ্গলবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭। ৯ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • --
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৭-সূরা নাম্ল 


৯৩ আয়াত, ৭ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৬১। বরং তিনি, যিনি পৃথিবীকে করিয়াছেন বাসোপযোগী এবং উহার মাঝে মাঝে প্রবাহিত করিয়াছেন নদীনালা এবং উহাতে স্থাপন করিয়াছেন সুদৃঢ় পর্বত ও দুই দরিয়ার মধ্যে সৃষ্টি করিয়াছেন অন্তরায়; আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ আছে কি? তবুও উহাদের অনেকেই জানে না। 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 

assets/data_files/web

সংগীতের ভাষাই সকল মানুষের ভাষা। 


                     -লং ফেলো।


মানুষ যে সমস্ত পাপ করে আল্লাহতায়ালা তার কতকগুলি মাপ করে থাকেন, কিন্তু যে ব্যক্তি মাতা-পিতার অবাধ্যতাপূর্ণ আচরণ করে, তার পাপ কখনো ক্ষমা করেন না। 


 

বাংলা ভাষা, ত্যাগ-ভালোবাসা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
প্রকৌশলী মোঃ দেলোয়ার হোসেন
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


মায়ের মুখের ধ্বনি, আনন্দ বেদনায় অর্থবোধক প্রকাশ যে ভাষায় সে আমার মাতৃভাষা, বাংলাভাষা। এই মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাড়ে ছয় দশক আগে আত্মাহুতি দিয়েছে আমার পূর্বসূরিরা। আজ বাঙালি হিসেবে সম্পৃক্ত আমি, বিনম্র চিত্তে বাঙ্ময় করতে চেষ্টা করব বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষা নিয়ে আমার উপলব্ধিকে। আবর্তিত পৃথিবীর প্রান্তরে ছন্নছাড়া যুবক-যুবতী তাদের স্বপ্নের রাজ্য থেকে ফিরে আসতে চায় না বাস্তবে, তারপরও দেখা যায় নির্দিষ্ট একটি ভূখ- আর নির্দিষ্ট কিছু ধ্বনির জন্য প্রয়োজনে ওরাও প্রাণপাত করে থাকে। সেই নির্দিষ্ট ভূখ-টি ওদের স্বদেশ আর ঐ ধ্বনিগুলো ওদের মাতৃভাষা। যা ওরা অর্জন করেছে জন্মের অধিকারে মায়ের কাছ থেকে। মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা এতো প্রিয় সবার কাছে, তা ওরা ছন্নছাড়া হোক বা সুস্থির হোক। মায়ের ভাষা ও মাতৃভূমির জন্যে হৃদয়ের টান কারোই কম নয়, জীবনের চেয়েও বেশি। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। ভাষা আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলো আজও প্রতিটি বাংলাদেশীর মনে গভীর অনুভূতি জাগায়। আমরা উদ্বেল বাঙ্ময় হয়ে উঠি একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই। আমাদের স্বদেশ বাংলাদেশ আর মায়ের ভাষা বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে আজ খানিক আলোচনা করব।



বাংলাদেশী জাতিসত্তা ও ভাষা : রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি নির্দিষ্ট ভূখ-ের, একই সভ্যতা, সংস্কৃতির ধারক বাহক, একই আলো বাতাসে বেড়ে ওঠা একই ভাষা, একটি অভিন্ন পতাকা বহনকারী, হাসি, আনন্দ, উৎসব, জয়-পরাজয়ে সম অংশীদার, পরাজয়ে বেদনা ব্যথিত, জয় আর অর্জনে আনন্দ উদ্বেলিত জনগোষ্ঠীকে জাতি হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই কয়টি উপাদানের সাথে একই ধর্ম দর্শন যুক্ত হলে সে জাতিসত্তাকে চরম সম্পৃক্ত জাতিসত্তা বলে। আমরা বাংলাদেশীরা তেমনই একটি জাতি। ধর্ম জাতিসত্তার অপরিহার্য অঙ্গ নয়, তবে চরম সম্পৃক্ত জাতিসত্তার জন্য এর কোন বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে আধুনিক জাতিসত্তার জন্য ভাষাকেও অগ্রাহ্য করার একটা মত লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ বিষয়ে যথেষ্ট দ্বিমতও রয়েছে। প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি এগুলো প্রকাশ করার জন্যে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত ও অর্জিত ধ্বনির নাম ভাষা। যা হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়। মা, মাটি ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ থেকে লব্ধ এই অর্থবোধক ধ্বনি, যা প্রকাশে বাঙ্ময় তাকে মাতৃভাষা বলে। সেই ভাষাকে বাদ দিয়ে জাতিসত্তার সম্পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হয় না। সম্পূর্ণ জাতীয়তাবাদ ভাষাকে ঘিরেই রচনা করা যায়। ভাষাহীন জাতীয়তাকে অসম্পৃক্ত জাতীয়তা বলা যেতে পারে। যেমন এঙ্গলোইন্ডিয়ান, চীনামেরিকান, ইউরোশিয়ান, আফ্রোমেরিকান, আফ্রোশিয়ান এগুলো খ-িত তথা অসম্পূর্ণ জাতীয়তা। এদের স্থায়ী কোনো সত্তা নেই, অনেকটা পরগাছার মতো ভিন্ন আশ্রয়ে বেঁচে থাকার মত। যে পতাকার দোলায় আমি শিহরিত হই না, যে সঙ্গীত আমার অন্তরে মূর্ছনা তোলে না, যে ভাষায় আমি আমার মনের ভাব বা আবেগ প্রকাশ করতে পারি না, যে মাটির গন্ধ আমার মনকে উৎফুল্ল করে না, কাঙ্ক্ষিত নারীর (দুর্বোধ্য) বচন মধুর হলেও যদি তা আমার শিরায়, আমার রক্তে মাতন না ধরায় সে আমার নয়। আমি বাংলাদেশী সত্যি ভাগ্যবান। আমার একটি নির্দিষ্ট ভূখ- রয়েছে 'হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ'। একটি অভিন্ন জাতীয় ভাষা রয়েছে, জয় পরাজয়ে একই আবেগের রয়েছে একটি পতাকা, 'লাল সবুজের বাংলাদেশ'। হাজার বছর ধরে পদ্মা মেঘনার বিমল অববাহিকা জুড়ে আত্মায় আত্মায় মিলে আমরা আত্মীয়, আমরা বাঙালি। তুমি কে? আমি মুসলমান। তোমার পরিচয়? আমি হিন্দু। তুমি? আমি বৌদ্ধ। কে তুমি? আমি খ্রিস্টান। এবার প্রশ্ন তোমরা কারা? বাংলাদেশী। খ-িত পরিচয় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদি। সামষ্টিক পরিচয় আমরা বাংলাদেশী। পশ্চিম বাংলার জনগোষ্ঠী জাতি হিসেবে বাঙালি নয়, মুখের ভাষায় বাঙালি। জাতি হিসেবে ওরা ভারতীয়। এখানেই ওদের সাথে আমাদের পার্থক্য। বিশ্বপরিসরে বাংলা ভাষার পরিচয়, বাংলা ভাষার পতাকা আমরাই বহন করি। আমরা বাংলাদেশীরা যেমন স্বাধীনতার লাল সূর্য ওঠার আগে জাতি হিসাবে বাঙালি ছিলাম না, ছিলাম পাকিস্তানি ধূসর। অন্ধকারে ঢাকা ছিল আমাদের বাঙালি জাতীয়তা। স্বাধীনতার্জনের পর জাতিসত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশ হিসেবে এখন কোনো বিভেদ নেই। আমরা বাংলাদেশীরা অবশ্যই বাংলাদেশী। নতুন করে পরিচয় দেয়ার কোনো যুক্তি নেই যে, পদ্মা মেঘনা যমুনা বিধৌত এই অঞ্চলের অধিবাসীরা সম্পূর্ণ অর্থেই বাংলাদেশী। ভাষার পরিচয়ে আমরা বাঙালি। বাংলা ভাষা অন্য কোনো ভূখ-ের জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রভাষা নয়, কারণ তাদের জাতীয় পরিচয় ভিন্ন। হাজার বছরের বাঙালি পরিচয় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশীতে সম্পূর্ণ হয়েছে। এটাই অর্জন, হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে বাংলার বুকে দাঁড়িয়ে।



আমার স্বদেশের ভৌগোলিক পরিচয় : যার সীমানা ৫২ সালের মাতৃভাষা আন্দোলনের পথ ধরে একাত্তরে চিহ্নিত হয়েছে। ২০০.৩৪ অক্ষাংশ ৮৮০.০১ দ্রার্ঘিমাংশ জুড়ে বিস্তৃত জল স্থল অন্তরীক্ষের নাম বাংলাদেশ। এটি মৌসুমী অঞ্চলের একটি দেশ। মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১২৪ মিলিয়ন। ১৪-৩০ উত্তর অক্ষরেখার মধ্যে এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চল, মহাদেশীয় ভূ-ভাগের পূর্বাংশে অবস্থিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে মৌসুমী জলবায়ু দেখা যায়। শীত ও গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে বায়ু প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হয়। গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের ওপর দিয়ে স্থলভাগের দিকে এবং শীতকালে স্থলভাগের উপর দিয়ে জলভাগের দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়। ফলে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টিপাত হয় এবং শীতকালে বৃষ্টিহীন থাকে। এখানে শীত ও গ্রীষ্মের কোনোটাই এমন তীব্র নয়। জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র। বছরের বারটি মাসকে ছয়টি ঋতুতে ভাগ করা হয়। শীত, গ্রীষ্ম প্রকট হলেও অন্য চারটি ঋতুর অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তাই বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। এটাও বাংলাদেশের একটি বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশ মৌসুমী অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার কারণে চির সবুজ। নদী বাহিত পলিমাটি দ্বারা গঠিত হওয়ার কারণে খুবই উর্বর। তাই এমন সুন্দর শ্যামল দেশ পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশকে চির সবুজের দেশ বলা হয়।



বাংলা ভাষায় উদ্ভব, বর্তমান পরিচয় ও বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস : মানুষ মরণশীল। মানুষ তার সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করে ভাষার মধ্য দিয়ে। ভাষা মানুষের প্রয়োজনের তাগিদেই সৃষ্টি হয়েছে। ভাব প্রকাশের এক অসাধারণ মাধ্যম হলো ভাষা। পশু-পাখির মতো আকার ইঙ্গিত বা অর্থবিহীন প্রয়োগে ভাষা নয়। এই ভাষার জীবন রক্ষা পায় মানুষের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। মায়ের কাছ থেকেই সন্তান প্রথম এসব ধ্বনি ও শব্দ আয়ত্ত করে। তাই ভাষা হলো সদা প্রবহমান নদীর মতো। কেননা মানুষ ভাষাকে কখনো লিখে, আবার কখনো মৌখিক প্রয়োগে সচল ও সজীব করে রেখেছে। তবে ভাষার ধর্মই বদলে যাওয়া, মানুষের মুখে মুখে বদলে যায় ভাষার ধ্বনি। রূপ বদলে যায় শব্দের, বদল ঘটে অর্থের। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এ কথাটি যথার্থ প্রযোজ্য। বাংলা ভাষার উদ্ভব হওয়ার পর অনেক বদলে গেছে এর ধ্বনি ও শব্দ। এটা শুধু বাংলা ভাষা নয়, অন্য অন্য ভাষার ক্ষেত্রেও হয়েছে।



আজ থেকে ১০০ বছর আগেও কারো কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না বাংলা ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে। কেউ জানত না এই ভাষার বয়স কত? বাংলা ভাষার উৎপত্তি কোথায়, কবে হয়েছে তা নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যেই নানা রকম মত রয়েছে। এক দল মনে করতেন, সংস্কৃত হলো বাংলা ভাষার জননী অর্থাৎ সংস্কৃত থেকেই বাংলা ভাষার উদ্ভব। কিন্তু ঊনিশ শতকেই আর এক দল এই মতের বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করলেন যে, বাংলা ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতের সম্পর্ক খুব নিবিড় নয়। এই ভাষার উৎপত্তি হয়েছে অন্য কোনো ভাষা থেকে, সংস্কৃত থেকে নয়। সংস্কৃত ছিল হিন্দু সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষের ভাষা। তা কথ্য ছিল না। কথা বলত মানুষ নানা রকম 'প্রাকৃত' ভাষায়। প্রাকৃত ভাষা হল সাধারণ মানুষের ভাষা; সংস্কৃত বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে মাত্র। কিন্তু এখানেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। ভারতবর্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম প্রাকৃত ভাষা প্রচলিত ছিল। তাহলে বাংলা এলো কোন্ প্রাকৃত ভাষা থেকে?



আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের মতে, মাগধী প্রাকৃতের কোনো পূর্বাঞ্চলীয় রূপ থেকেই বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে হয়তো। বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে বিস্তৃত ইতিহাস রচনা করেন ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়। আমাদের চোখে বাংলা ভাষার ইতিহাস স্পষ্ট ধরা দেয় ডাঃ সুনীতি কুমারে রচনা থেকেই। ভাষা তাত্তি্বকদের মত অনুসারে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশে অনেকগুলো ভাষা শাখা আছে। যার একটি হলো ভারতীয় আর্য ভাষা। ভারতীয় আর্য ভাষার তিনটি স্তর। প্রথম স্তরটি হলো বৈদিক বা বৈদিক সংস্কৃত (১২০০-৮০০ অব্দ), তারপর পাওয়া যায় সংস্কৃত। বৈদিক ও সংস্কৃতকে বলা হয় মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা। প্রাকৃত ভাষাগুলোকে বলা হয় ভারতীয় আর্য ভাষা। প্রাকৃত ভাষাগুলোর শেষ স্তর হলো অপভ্রংশ অর্থাৎ যা খুব বিকৃত হয়ে গেছে। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় একটি অপভ্রংশের নাম বলেন মাগধী অপভ্রংশ। তার মতে, পূর্ব মাগধী অপভ্রংশ থেকে উদ্ভব হয়ছে বাংলার মাগধী অর্থাৎ মগধ থেকে উৎপন্ন। মগধ এক সময় বাংলার রাজধানী ছিল।



অবশ্য ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, গৌড়ীয় প্রাকৃতেরই পরিণত অবস্থা গৌড়অপভ্রংশ থেকে উৎপত্তি ঘটেছে বাংলা ভাষার। সে গৌড়ীয় হোক অথবা মাগধী হোক, দুই প-িতের রচনা পর্যালোচনা করে বুঝা যায়, বাংলা ভাষা নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। এই ভাষার অতীত ইতিহাস আলোচনা করে বোঝা যায়, প্রাকৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উদ্ভব ঘটেছে। আরবি, ফার্সি, ইংরেজি, ফরাসি, ডাচ ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে সত্যি, কিন্তু স্বকীয়তা হারায়নি। আর তাই পৃথিবীর ছয়-সাতটি সমৃদ্ধ ভাষার অন্যতম বাংলা ভাষা আমাদের। বিজ্ঞান ও ব্যাকরণ সমৃদ্ধ মাতৃভাষাটিকে রাষ্ট্রভাষার রূপ দিতে আমাদের পূর্বসূরিরা আত্মাহুতি দিয়েছেন। পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো জাতি মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষায় রূপ দিতে গিয়ে আন্দোলন করেনি, আত্মাহুতি দেয়নি। এজন্যেই আমাদের ভাষা দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে। আমরা পালন করেছি ভাষা আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী।



বাংলা ভাষা, আমাদের জাতিসত্তা ও গর্বিত উত্তরাধিকার : চরম সম্পৃক্ত জাতিসত্তার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান হচ্ছে ভাষা। আমরা খুবই ভাগ্যবান একটি জাতি, যাদের মায়ের মুখের ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বা আদেশের ভাষা বাংলা ভাষা। পাকিস্তানিদের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু তাদের বৃহৎ জাতি গোষ্ঠীর মাতৃভাষা নয়। ইন্দোনেশিয়ার জনগোষ্ঠী তাদের জাতিসত্তার বিকাশের জন্য রোমান বর্ণমালায় নতুন একটি ভাষার সৃষ্টি করেছে 'বাহাসা ইন্দোনেশিয়া' যা তাদেরও বৃহৎ জাতি গোষ্ঠীর মাতৃভাষা নয়। সরকারি ভাষা আর মাতৃভাষা এক নয় এমন অনেক জাতি ও রাষ্ট্র রয়েছে। বাংলাদেশী জাতিসত্তার অনুভূতি প্রকাশ ও আদেশের ভাষা এক, ফলে এশিয়ার এই অঞ্চলে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। ভাষার যুদ্ধ পরবর্তীতে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে-এটা একমাত্র বাংলাদেশী জাতির জন্য সত্যি। তাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে পৃথিবীর সকল জাতি স্বীকৃতি দিয়েছে, এটা আমাদের গর্বিত অর্জন। একটা কথা মনে রাখা দরকার, ভারতের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল সমূহের জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রভাষা হিন্দি, বাংলা নয়। ভারতের দ্বিতীয় দপ্তরীয় ভাষাও ইংরেজি, বাংলা নয়। ভারতীয়রা ভাষার ভিত্তিতে সম্পৃক্ত জাতি নয়। তাদের জাতিসত্তা, ভাষা, ধর্ম কোনটার ওপরই নয়, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ভূখ- নির্ভর জাতি ভারতীয়রা। একটি কথা মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি এমন এক বিষয় যার অবিচ্ছিন্ন সূত্রে সমগ্র জাতি সমাজ বন্ধনযুক্ত থাকে, যা মানুষকে এক সূত্রে গেঁথে রাখে, যা কোনো জাতির পরম গর্বের বিষয়। ভাষা সংস্কৃতির একটি বিশেষ অঙ্গ, বলা যায় অপরিহার্য অঙ্গ, তাই ভাষার অবদান এত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা মানুষের কৃষ্টি, আচার-আচরণ এক কথায় জীবনাচরণের সৃষ্টি করে, বাস্তবিক অর্থে উত্তরাধিকার সূত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ভাষা ছাড়া সংস্কৃতি গড়ে উঠে না।



জাতি হিসেবে বাংলাদেশীদের বিভেদ ও ঐক্য : ইংরেজ শাসন আমলে হিন্দু বাঙালিরা ছিল সুবিধাভোগী শ্রেণী, জমিদার, আমলা, ব্যবসায়ী। নেতাদের বেশির ভাগই ছিল শোষক সমপ্রদায়ভুক্ত। মুসলিম বাঙালিরা ছিল পরাজিত রাজশক্তির সুবিধা বঞ্চিত কৃষক, শ্রমিক তথা বঞ্চিত ও বেশির ভাগই শোষিত শ্রেণীভুক্ত। শোষক আর শোষিতের ধর্ম ছিল ভিন্ন। এই পার্থক্যকেই পুঁজি করেছে ধর্ম ব্যবসায়ীরা। এক শ্রেণী অপর শ্রেণীর প্রতি বৈরী থাকার কারণে উভয় ধর্মের কিছু সংখ্যক সুবিধাভোগী রাজনৈতিক নেতা ধর্মকে পুঁজি করে বিকাশিতব্য বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের অভিন্ন জাতিসত্তায় ফাটল ধরাতে সক্ষম হয় এবং বাঙালি জাতিয়তাবাদ চিরস্থায়ী অনৈক্যের বেড়াজালে আটকা পড়ে, যা নির্মীয়মান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উত্তরাধিকার। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর নির্ভর করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। ১৪শ' মাইল দূরের ভিন্ন ভাষার ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ হঠাৎ করেই এক জাতিতে রূপান্তরিত হয়। ঘরের, কাছের একই ভাষার, সংস্কৃতির ধারক বাহক স্বগোত্রীয় আত্মীয়রা পর হয়ে যায়। দাঙ্গার কারণে শঙ্কিত মানুষ ঘর ছেড়ে পরভূমিকে নিজের ভূমি বানাতে গিয়ে চিরস্থায়ী উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। তেইশটি বছর ফর্সা সবল দেহী পাঞ্জাবী পাঠানরা বাঙালিদের আপন করে নেয়নি। শঙ্কর বর্বর পাকিস্তানি জাতির বিরুদ্ধে বাঙালিরা সংগঠিত হয়, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পদ্মা পাড়ের বাঙালিরা নিজেদের ঠিকানা নির্ধারণ করে 'পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা'। এ কারণে বলতে দ্বিধা নেই, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট যুদ্ধে জয়লাভ করে আনন্দে যে জনগোষ্ঠী উদ্বেলিত হয়, পদ্মা পাড়ের সেই অধিবাসীরাই বাংলাদেশী। যাদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ভাষা নির্ভর ঐতিহ্য রয়েছে। পোখরানে আণবিক বোমা বিস্ফোরণে স্পর্ধিত হয় গঙ্গাপাড়ের যে জনগোষ্ঠী, তারা ভারতীয়, প্রাদেশিকতায় বাঙালি, বাঙালি হিসেবে কোন সম্পূর্ণ জাতি নয় বরঞ্চ খ-িত। বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় বাংলাদেশী। এই জাতীয়তাবাদকে কোনো কৃত্রিম মোড়কে জড়িয়ে জাতীয়তার অভিধা সম্পূর্ণ করার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। আমরা বাংলাদেশী আছি এবং থাকতে হবে। এ আমাদের অর্জন ও অধিকার, এরপর কি আর কোন কথা থাকতে পারে? মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে গিয়ে আমার পূর্ব প্রজন্ম রক্ত দিয়েছে, জীবন উৎসর্গ করেছে। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার স্বদেশের পরিচয় 'বাংলাদেশ' করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে অনেক স্বজন। তাই আজ আমরা মায়ের ভাষা আর মুক্ত স্বদেশ নিয়ে অহঙ্কারের সাথে উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। স্বদেশ আর মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের এ শির উঁচু রাখতে হবে। আজ সকল বিভেদ ভুলে যেতে হবে। বাংলাদেশ আর বাংলাদেশী জাতীয়তার সুদৃঢ় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। বাংলাভাষা বাংলাদেশীদের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। প্রয়োজনে মাতৃভাষা দিবসের অর্জনকে আমরা ব্যবহার করতে পারি। কারণ এই একটি বিষয়ে আমরা বাংলাদেশীরা ঐক্যবদ্ধ_ এখানে কোনো দ্বিমত নেই।



 



একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার এক টুকরো ইতিহাস :



আমাদের ভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গ্রহণ করা হয় ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ খ্রিস্টিয় সালে। বিষয়টি বাংলা ভাষার ইতিহাসে সবচে' গৌরবজনক ও সম্মানজনক অধ্যায়। এই দিন প্যারিসে বিশ্ব সংস্থার শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোর ১৮৮টি দেশ সর্বসম্মতিক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ভাষা শহীদদের আত্মাহুতির সাতচলি্লশ বছর পর প্রাপ্ত এ স্বীকৃতির পেছনে মাতৃভাষা প্রেমিক কানাডা প্রবাসী এক বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রফিকুল ইসলামের অবদান ছিল প্রশংসাযোগ্য। তিনি বাংলাদেশ ইউনেস্কো মিশনকে ২৩ জুন, ১৯৯৯ মাতৃভাষা দিবস সংক্রান্ত যে পত্র দেন সে পত্রের সূত্র ধরেই এ স্বীকৃতি আমাদের ঘরে আসে। সারা বিশ্বে জাতিসংঘভুক্ত দেশ সমূহে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হবে, অনেক প্রাপ্তির মধ্যে বাংলাদেশের জন্যে এটি অন্যতম মহান প্রাপ্তি। আবেগমথিত উদ্বেল হৃদয়ে আমি ও সকল বাংলাদেশী গর্বের সাথে উচ্চারণ করি 'মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা'।



অর্জন নিয়ে আরো কিছু কথা : বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে আর দুটি নাম ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকল। অর্থাৎ একুশের গান জাগরণীর রচয়িতা আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী ও বীর শহীদের গর্বিত প্রতিনিধি মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম (১৯৫৩-২০১৩)। কানাডায় সাত ভাষার ১০ ভাষাপ্রেমী নিয়ে সেদিন তিনি গঠন করেছিলেন গড়ঃযবৎ খধহমঁধমব খড়াবৎ ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ। যাদের পক্ষে বাংলাদেশের রফিকুল ইসলাম ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের কাছে যে চিঠি লেখেন তা হলো- t's a basic right of all human being to be able to practice their 'Mother Language' in their day-to-day life, but alas! Millions of people had been forced not to practice their 'Mother Language' many were forced to gorget their 'Mother Language', many unique languages are still facing serious crisis for their existence..... once upon a time 'Bangla' was also facing serious crisis, in early fifties, the then regime dominated by different language spoken leaders decided that 'the Bangalies' will not be allowed to use their mother language as 'official language' ' (দলিলপত্র, একুশে ফেব্রুয়ারি : জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক, কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা-২০০০)। তাঁর এবং তাঁর সাথীদের প্রচেষ্টায় ২১ ফেব্রুয়ারি দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পায়। জাগরণী গানের কয়টি লাইন-



 



"একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি.....



..... তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি



আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী



আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে



জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে আর ঘাটে বাটে



দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালব ফেব্রুয়ারি



একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।"



(আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী)



বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী : বাংলাদেশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, বিহার-ওড়িশ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান জনগোষ্ঠীও বাংলা ভাষায় কথা বলে। ভারতের আসামে এবং আফ্রিকার সিয়েরালিয়নে বাংলাকে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। রেডিও, টিভি ও ইন্টারনেটে সারা বিশ্বে বাংলা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে দেশে প্রতিদিন বাংলায় রেডিও অনুষ্ঠান সমপ্রচার করা হয় এবং সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দি ও ইংরেজির আগ্রাসন বাড়ছে। নতুন প্রজন্ম ইংরেজি ও হিন্দির প্রতি আগ্রহী হওয়ার পাশাপাশি বাংলার প্রতি এক রকম বীতশ্রদ্ধ। এতে ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার অস্তিত্বের সংকট দেখা দেওয়ার ভয়ও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই আমাদের প্রাণের ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৮৭৮৯
পুরোন সংখ্যা