চাঁদপুর। শনিবার ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৭ পৌষ ১৪২৩। ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮
kzai
muslim-boys

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৬-সূরা শু’আরা


২২৭ আয়াত, ১১ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৫৯। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী পরম দয়ালু। 


১৬০। লূতের সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করিয়াছেন।


১৬১। যখন উহাদের ভ্রাতা লূত উহাদিগকে বলিল, ‘তোমরা কি সাবধান হইবে না? 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


একজন লোকের জ্ঞানের পরিধি তার অভিজ্ঞতা দ্বারা খন্ডায়িত করা যায় না। 


                                 -জনলক। 

যে সব ব্যক্তি নিন্দুক এবং যারা অপমানকারী, তাদের সর্বনাশ, অথাৎ তারা কষ্টদায়ক পরিণতি প্রাপ্ত হবে।       


ফটো গ্যালারি
স্বাধীনতা মানে একজন সমিরন বিবি
কেএমএইচ নাঈম
৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


 



সময় ১৯৭১। সমিরন বিবি সুন্দরপুর গ্রামের আর ৫জন মহিলার মতো আধবয়সী নারী। বয়স ৪০/৪৫। সংসারের ভারের আড়ালে বয়সের ভার মুখ ঢেকে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। তাই বয়সটা দ্বিগুণ মনে হয়। সমিরন বিবির ২ ছেলে ১ মেয়ে। স্বামী মারা গেছে নিউমোনিয়ায় গেলো মাঘ মাসে। তারপর থেকে পুরো সংসারের দায়িত্ব সমিরন বিবির আর বড় ছেলে হিরো মিয়ার উপর। রূপাই সমিরনের ছোট ছেলে, বয়স ১২/১৩ হবে। ক্লাস ৭ম পড়ে। আর একমাত্র মেয়ের নাম ফুল বয়স ১৬, ক্লাস ৯ম পর্যন্ত পড়ে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়েছে বাপের মৃত্যুর পরপরপই। গ্রামের মানুষ যুদ্ধ বুঝে না। তবুও যুদ্ধের ডামাডোলের প্রভাব গ্রামেও পড়লো। সমিরনের স্বামী গণি মিয়ার রেডিও শোনার ঝোঁক ছিলো। তাই সমিরন বিবি বিয়ের পর দীর্ঘ ৩ বছর টাকা জমিয়ে গণি মিয়াকে একটা রেডিও কিনে দিয়েছিলেন। এখনও তারা সবাই মিলে রাতের খাবার খাওয়ার সময় রেডিও শুনে।



 



৭ই মার্চ ১৯৭১।



ভরাট কণ্ঠস্বর ভেসে আসে রেডিওতে। ডাক আসে স্বাধীনতার 'এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, জয় বাংলা' এই ভাষণ শুনে হিরো জেনো একটু নড়ে-চড়ে বসলো। সে আজকাল একটু আধটু রাজনীতি বুঝে। '৭০ এ শেখ সাহেবের ইলেকশনও করেছে। রেডিওতে জয় বাংলা বলার সাথে সাথে হিরোও বলে ওঠে জয় বাংলা। হিরো মা হিরোকে জিজ্ঞাস করে, 'ও বাজান কিরে কি হইছে??'



মা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, নিজেদের বাঁচানোর যুদ্ধ দেশ রক্ষার যুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন মা। মা আমাকে যুদ্ধ যেতে হবে।



বাবা তুই কি কস্ এসব যুদ্ধ-টুদ্ধ, তুই কোন মারামারিতে যাইস্না বাবা।



মা যুদ্ধে আমাকে যেতেই হবে। এতো নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ মা। যুদ্ধে না গেলে ওরা আমাদের কাউকে বাঁচতে দিবে না, আমাদের না খাইয়ে মারবে।



সমিরন বিবি চুপ হয়ে যায়। তারপর থেকে যতবার রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারিত হতো ততবারই 'জয় বাংলা' বলে চিৎকার করে উঠতো সমিরন বিবি। আজকাল হিরোকে গ্রামের হালিম মাস্টারের বাড়িতে মিটিং করতে দেখা যায় প্রায়ই। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা-১টা বাজে। তাদের সাথে গ্রামের আরো অনেক ছেলে জড়ো হয় মিটিংয়ে।



 



২৬ মার্চ ১৯৭১।



কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। হিরো ঘরে এসে মাকে যুদ্ধে যাওয়ার কথা জানায়। বলে, এবার আর মা না করে না। শুধু বলে বাবা ভালোভাবে থাকিস। পরদিন সকালে ২৭ মার্চ হিরো চলে যায় দেশ রক্ষার যুদ্ধে।



এপ্রিলের প্রায় মাঝামাঝিতে সুন্দরপুর গ্রামের পাশের গ্রাম সোহাগপুরে পাক-বাহিনী আক্রমণ করে। জ্বালিয়ে দেয় মানুষের বাড়িঘর এপ্রিলের শেষের দিকে পাকসেনারা ক্যাম্প বসায় সুন্দরপুর স্কুলে। গ্রামে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। শোনা যায় এলাকার লম্পট নূরু নাকি রাজাকারের খাতায় নাম লেখিয়েছে। নতুন করে নাম রাখছে নূরু মোল্লা। একদিন দুপুরে নূরু ১০-১২ জন মিলিটারিসহ পুরো গ্রাম রেকি করতে বের হয়। জান্তাদের বুটের আওয়াজে কম্পিত হতে থাকে সুন্দরপুর গ্রামের মেঠোপথ। যাওয়ার পথেই সমিরন বিবির ঘর। নূরু সামরিক জান্তাদের জানায় এ বাড়ির একজন মুক্তিতে নাম লেখাইছে। মিলিটারি সাথে সাথে হিরোদের বাড়িতে ঢুকে পরে। দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকে হিরো কাহাহে? সমিরন বিবি ছেলে রুপাইকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছিলেন, আর মেয়ে ফুল রেডিওতে গান শুনছিলো।



রেডিওতে উচ্চকণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেশের গান প্রচার হচ্ছিলো 'জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে নিশ্চয়, কোটি প্রাণ এক সাথে জেগেছে মধ্য রাতে নতুন সূর্য ওঠার এইতো সময়।'



সমিরন বিবি কিছু বুঝে উঠার আগেই দরজার কপাটে জোড়ালো আঘাত পরলো। কপাট ভেঙ্গে যেতেই জান্তারা ঘরে প্রবেশ করলো। নূরু সমিরন কে জিজ্ঞাস করে 'ওই বুড়ি তোর পোলা কই?'



সমিরন বিবি ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। অস্পষ্ট করে শুধু বলে 'জানি না'



জানিস না মানে?



তোর ছেলে মুক্তিতে নাম লিখাইছে আর তুই জানিস না?



না আমি জানি না।



দুইজন সামরিক জান্তা ভাত পাত থেকে রূপাইকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হয়। সমিরন বিবি ছেলেকে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। পাক বাহিনী বার কয়েক লাথি মেরে সমিরন বিবিকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে সমিরন বিবির কোলেই ছেলে রূপাইকে ৩টি গুলি করে।



একটা গুলি সমিরন বিবির বৃদ্ধাঙ্গলি ভেদ করে গেঁথে যায় রূপাইয়ের বুকে। রূপাই শুধু একবার মা বলে চিৎকার করে। তারপর বার কয়েক কেঁপে নিথর হয়ে যায়। সমিরন বিবির নড়বার মতো শক্তি থাকে না। বিছানার এক কোণে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে কাঁপছে ফুল। তার হাত থেকে রেডিওটা পরে বন্ধ হয়ে গেছে।



নূরু এসে ফুলের চুলের গোছায় ধরে হেঁচকা টান দিয়ে বলে, জয় বাংলা শুনিস জয় বাংলা? বলজিয়ে পাকিস্তান বল। বলজিয়ে পাকিস্তান। ফুল স্পষ্ট কণ্ঠে বের হয়ে আসে জয় বাংলা। ইয়ে হারামজাদি, বলেই দুই চড় বসিয়ে দেয় নূরু।



পাকিস্তানি দুই জন মিলিটারি এগিয়ে আসে। ওড়না সরিয়ে হাত দেয় ফুলের গায়ে। ফুল এক ঝাড়ায় সরিয়ে দিয়ে খাটের এক কোণে চলে যায়। পৈশাচিক হাসি হাসতে থাকে জান্তা ২ জন। একজনকে বলতে শোনা যায়, 'ইয়ে মাল বহুত সুরত হেয়, আগার মে ইস্কো ক্যাম্প মে লে যাউ তো অফিসার বেহাত খুশ হোগি।' সাথে সাথেই ৪জন মিলিটারি এসে ফুলকে ধরে নিয়ে যায়। ফুল মাকে এসে জড়িয়ে ধরে। নূরু আবার চুলের গোছা ধরে টান দিলে একগোছা চুল উঠে চলে আসে। হায়েনার দল ফুলকে নিয়ে চলে যায় ক্যাম্পে। ফুলের কান ফাটা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।



 



১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১।



বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বাংলার জয় হয়। জয় বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত চারপাশ কিন্তু সে শব্দ সমিরন বিবির কানে গিয়ে পেঁৗছায় না। সর্ট গানের গুলির শব্দে তার কানের পর্দা ফেটে গিয়েছিলো। ফুলের লাশটিও পায়নি সমিরন বিবি। জানা যায় ১২ দিন ক্যাম্পে আটকে রেখে ফুলকে পৈশাচিক নির্যাতন করে হায়েনারা তারপর মেরে ফেলে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়। ফুলের উঠে যাওয়া একগোছা চুলকেই সমিরন সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে রূপাই এর কবরের পাশে দাফন করেন। দুই কবরের পায়ের দিকে দুইটি সুপারি গাছ লাগিয়ে দেন। প্রতিদিন সকাল বিকাল কোরআন পাঠ আর চোখের জলে শিক্ত করেন ছেলে মেয়েকে।



 



১লা জানুয়ারি ১৯৭২।



হিরো বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু দুই পায়ের উরু পর্যন্ত কাটা। পোতা মাইনের বিস্ফোরনে উড়িয়ে নিয়ে গেছে পা দুটি। সমিরন বিবি ছেলেকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। হিরো মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন মা ভাই-বোনের মতো জীবনতো আর দেইনি কিন্তু সেই শব্দ সমিরন বিবির কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। যতো দূর জানা যায়, নূরু মোল্লা যুদ্ধের পরপরই মুক্তি সেনাদের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালায়। কিন্তু ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে তাদের আবার সময় আসে। নূরু মোল্লা এলাকায় বীর দর্পে ফিরে আসে। বিশেষ এক রাজনৈতিক দল তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরন করে নেয়। তখন দেশে মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা। তিনি সার্টিফিকেট কিনে হয়ে যান মহান মুক্তিযোদ্ধা। আর হিরো পা হারিয়ে কোন কাজ করতে না পারায় এখন ভিক্ষাবৃত্তিই তার এক মাত্র অবলম্বন। সুন্দরপুর স্কুলটি এখনো আছে, প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর আসে, নূরু মোল্লা স্কুলের প্রধান অতিথি হিসাবে দাওয়াত পান। কালো হাতে জাপটে ধরেন লাখ শহীদের রক্তে রাঙ্গা লাল-সবুজের পতাকা। আর যখন হিরো মিয়া সেই দৃশ্য দেখে, তখন নিশ্চুপ হিরোদের কণ্ঠে জয় বাংলা ধ্বনি বড় বেমানান লাগে আজকে। হিরোরা স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকাকে বারবার ঘৃণ্য পশুদের হাতে ধর্ষিত হতে দেখে। যখন ঘরে বধির, অন্ধ, ক্ষুদার্ত মায়ের কথা মনে পরে তখন মনে হয় কখন এই ১৬ই ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। যদি না এক প্যাকেট বিরিয়ানি ভাগে পায়। তাহলে অন্তত মায়ের পেট পুরবে। হিরো চায় না এই স্বাধীন দেশে তার মা কানে শুনোক, চোখে দেখুক। নিজ চোখে নিজ কানে তার ছেলে মেয়ে হত্যাকারীদের মুক্তিযোদ্ধাদের কাতারে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলা তিনি সহ্য করতে পারবেন না। এদেশে বাঘাবাঘা রাজাকারের বিচার হয়। কিন্তু গ্রামের মেঠোপথ দেখিয়ে দেয়া রাজাকাররা এখনো গ্রামের মোড়লের চেয়ারে বসে আছে। আর বারবার হারিয়ে দিচ্ছে হিরো মিয়ার মতো যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আর সমিরন বিবির মতো সন্তান হারা মানুষদের। রূপাই আর ফুলের কবরের সুপারি গাছ দুটি ৪৫ বছরে ৩০ফুট লম্বা হয়েছে শুধুই কালের স্বাক্ষী আর সমিরন বিবির জড়িয়ে ধরে কান্নার একমাত্র অবলম্বন হিসাবে।



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৭৩৪৯১
পুরোন সংখ্যা