চাঁদপুর। শনিবার ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৭ পৌষ ১৪২৩। ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮
ckdf

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৬-সূরা শু’আরা


২২৭ আয়াত, ১১ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


১৫৯। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী পরম দয়ালু। 


১৬০। লূতের সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করিয়াছেন।


১৬১। যখন উহাদের ভ্রাতা লূত উহাদিগকে বলিল, ‘তোমরা কি সাবধান হইবে না? 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


একজন লোকের জ্ঞানের পরিধি তার অভিজ্ঞতা দ্বারা খন্ডায়িত করা যায় না। 


                                 -জনলক। 

যে সব ব্যক্তি নিন্দুক এবং যারা অপমানকারী, তাদের সর্বনাশ, অথাৎ তারা কষ্টদায়ক পরিণতি প্রাপ্ত হবে।       


রক্তাক্ত একাত্তর
জাহিদ হোসেন
শফিক দৌড়ে এসে ঘরের ভিতর ঢুকলো। হাপাতে হাপাতে কি যেন বলতে লাগলো আবোল-তাবোল, যুদ্ধ মিলিটারি। দোকানের রেডিওতে নাকি শুনে এসেছে। আমরা কেউ ওর কথায় গুরুত্ব দিলাম না। শফিক আমার ছোট ফুফুর ছেলে। আমেনা ফুফু ওকে বকতে শুরু করল এসব কথা বলার জন্যে।
৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+


রাতে বাবা অফিস থেকে এসে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে বসে আছে, কি যেন ভাবছে আনমনে। অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক আচরণ করছেন না বাবা। মা জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে বাবার। বাবা সব খুলে বললেন, 'দেশের অবস্থা খুব একটা ভালো না। যেকোন সময় যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে। নির্বাচন নিয়ে দেশে ঝামেলা চলছে। মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে জয় লাভ করা সত্ত্বেও তাকে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে তুমুল গ-গোল চলছে। দেশে টায় এবার যুদ্ধ লেগেই ছাড়বে মনে হচ্ছে।' এরই মধ্যে বড় মামা বাসায় ঢুকলেন। মামাও বাবার সাথে এ নিয়ে কথা বলছেন। দুজনই চিন্তিত মুখ নিয়ে বসে আছে।



 



কিছুদিন বকুল মামা বাসায় আসে। মামা বাবাকে বললেন, শেখ মুজিব নাকি বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। যুদ্ধ বেঁধে গেছে। রাতে বাবা আর আশেপাশের মানুষ আমাদের বাসায় এসে ভিড় জমায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনার জন্যে। দেশজুড়ে আকাশ কালো করে শকুনেরা উড়ে।



অনেক দিন হলো বকুল মামা বাসায় আসছে না। বাবা গোপনে খবর পেয়েছে মামা নাকি যুদ্ধে গেছে। এখন পর্যন্ত শুনেই এসেছি যুদ্ধের কথা। কেন যুদ্ধ করছে, কারাইবা যুদ্ধ করছে, কাউকে দেখিনি? এখন আর স্কুলে পাকিস্তানি সংগীত গাওয়া হয় না। কিছুদিন পর স্কুল ও অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ হয়ে গেলো। স্কুল বন্ধ তাই আমি আর শফিক সকালে মক্তবে পড়তে যাই। হঠাৎ কোথা থেকে যেন শো শো শব্দ করে চার পাঁচটা যুদ্ধ বিমান আমাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো। চারপাশটা সব থমথমে হয়ে গেলো। এলাকার মানুষ তাদের ভিটে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এ রকম অবস্থা আগে কখনোই দেখিনি।



শুনেছি আমাদের স্কুলে নাকি পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প করেছে। আমি আর শফিক লুকিয়ে লুকিয়ে তা দেখতে গেলাম। খাকি পোশাকে তিন চারজন মোটা গোফওয়ালা সেনা। সেনাগুলো মোষের মতো বড় বড় চোখ করে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে অস্ত্র নিয়ে পাহরায় আছে। আমরা দৌড়ে বাসায় আসলাম। বাসায় এসে দেখি মা জামা-কাপড় সব গুছিয়ে নিচ্ছে। কোথাও যাবে মনে হয়। জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কোথাও যাবো মা? 'আমরা সবাই তোর নানার বাড়িতে চলে যাবো। এখানে পাকবাহিনী ক্যাম্প করেছে। এখানে থাকাটা আমাদের জন্য নিরাপদ না। একটু পর তোমার নানা আসবে আমাদের নিতে। তুমি তোমার দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও।' তাকিয়ে আছি মায়ের ব্যস্ত মুখের দিকে। কিছু বললাম না। নিজের খেলনাগুলো গুছিয়ে নিতে চলে গেলাম।



ঘাটে একটা বড় নৌকা বাধা। নানার নির্দেশে আমরা সবাই নৌকায় উঠলাম। এখানে শুধু আমরাই না আরোও কয়েকটা পরিবারও আছে। পাশের বাড়ির আলিয়া, মজিনরাও আছে। তারাও আমাদের মতো বাড়ি ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে জীবন বাঁচানোর জন্যে। অন্যান্য সময়ে নৌকা ভ্রমণ খুব আনন্দের হয় কিন্তু আজ কারো মুখে কোনো আনন্দ নেই। নৌকা ছাড়বে এরই মধ্যে আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হলো। আমরা সবাই পানিতে ঝাঁপ দিলাম। নানা আমাকে আর শফিককে শক্ত করে ধরে আছে। দূরের যুদ্ধ বিমানের দিকে তাকিয়ে আছি। এই প্রথমবারের মতো বিমানের পিছনে ছুটি নি আমি আর শফিক।



 



অবশেষে নানার বাড়িতে আসলাম। কয়েক দিন এখানে ভালোই ছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পর এখানেও পাকিস্তানি সেনারা টহল দেয়া শুরু করল। সবাই খুব ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। এখন আর পাখির কলতান শুনা যায় না, শুনা যায় শুধু গুলির আওয়াজ। গুলির আওয়াজে রাতে ঠিক মতো ঘুমও হয় না। সবার ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। কখন জানি পাক সেনারা এসে হামলা করে বসে। তাদের কালো ছোবলে রক্তাক্ত করে দেয় আমাদের।



অক্টোবর মাস। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নানা তার রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনছে। রেডিওতে সারাক্ষণ যুদ্ধের কথাই প্রচার করছে। পুরা ঘরটাতে মাত্র একটা মোমবাতি জ্বলছে। আমাদের ঘরেই নয়, আশেপাশের প্রায় সকল ঘরেই অন্ধকার। পাকসেনাদের ভয়ে সবাই দরজা জানলা বন্ধ করে রেখেছে। হঠাৎ দরজায়কে যেন খট খট আওয়াজ দিচ্ছে। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। পাক সেনারা নয়তো! নানা ভয়ে ভয়ে নিয়ে দরজা খুললেন। দরজায় একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে, মুখ ভর্তি দাড়ি, নোংরা জামা পড়া, হাতে একটা রাইফেল। নানার চিন্তে দেরি হয় নি, কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, বাবা তুই। চিনাই যাচ্ছে না মামাকে। নানা মামাকে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করল। মামা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলোনা ঘরে ঢুকলেন। ঘরে ঢুকার পর চোখ পড়লো তার পায়ে। গুলি লেগে আছে তাতে। মামা নানাকে বলছে পাক সেনারা তাকে খুঁজছেন। এলাকার কিছু মানুষ নাকি তাদের সাহায্য করছেন।



দূরে কয়েকজন পাকসেনার পায়চারি শোনা যাচ্ছে, তারা এদিকেই আসছে। নানা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মামাকে ভিতরের ঘরে লুকিয়ে রাখলো। আমাদের স্কুলের মাঠে দেখেছিলাম পাক সেনাদের। ঠিক একই রকম দেখতে। কালো বুট, মাথায় লোহার টুপি, কাধে অস্ত্র ভয়ঙ্কর দেখতে। আসতে আসতে আমাদের বাড়ির উঠনে এসে দাঁড়াল। পাক সেনাদের একজন উচ্চ স্বরে বলল, তুমহারা বেটা কাহা হে?



নানা ভয়ে ভয়ে বলে, আমার ছেলে বাড়িতে নেই। দুজন পাক সেনা নানাকে ধাক্কা মেরে হনহন করে ঘরের ভিতরে ঢুকে। তারা মামাকে খুঁজে বের করে নিয়ে আসলো। মামাকে বের করে আনার সময় মামা নানার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। গাছের সাথে বাধা হয় মামাকে। শকুনের দলগুলো মামাকে গুলি করে মেরে ফেলে। দরজায় আমেনা ফুফু দাঁড়িয়ে ছিলো, তাকে দেখে ক্যাপ্টেন টাইপের একজন মিচকি হেসে বলে, তুম ঘাবড়াও মাত, তুজে তো হামরা সোহাগ কারেঙ্গে। শকুনগুলো ফুফুকে তাদের সাথে নিয়ে যায়। পরে ফুফুর রক্তাক্ত লাশ খুঁজে পাওয়া যায় পাক সেনাদের ক্যাম্পের পিছনের ধান খেতে।



 



 


আজকের পাঠকসংখ্যা
১৯২৩৫৮৭
পুরোন সংখ্যা