চাঁদপুর। শনিবার ৩ জুন ২০১৭। ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪। ৭ রমজান ১৪৩৮
kzai
muslim-boys

সর্বশেষ খবর :

  • -
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৪২। এই পৃথিবীতে আমি উহাদের পশ্চাতে লাগাইয়া দিয়াছি অভিসম্পত এবং কিয়ামতের দিন উহারা হইবে ঘৃণিত। ৪৩। আমি তো পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করিবার পর মূসাকে দিয়াছিলাম পথনির্দেশ ও অনুগ্রহস্বরূপ, যাহাতে উহারা উপদেশ গ্রহণ করে। 


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


দারিদ্র্যই পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ।                      


 -ইন্দিরা।


পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।


 

ফটো গ্যালারি
দোলনা বিষয়ক গল্প
কাদের পলাশ
০৩ জুন, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+
১.

গত চব্বিশ বছরে এভাবে কাঁদতে দেখিনি তাকে। অথচ আজ তার কান্না যেন থামবার নয়। চিৎকার থামলেও দুচোখ যেন প্রতিজ্ঞাবব্ধ শ্রাবন ধারায়। থোকা থোকা কষ্টরা সমবেত মহাপ্রলয় সৃষ্টিতে। গত তিন দিন একটা দানাও মুখে তোলেনি লুৎফর চৌধুরী। কারো সাথে একটা কথাও নয়। এ এক ভিন্ন অভিমান। জীবন যুদ্ধে পদে পদে হোঁচট খাওয়া মানুষটিকে কখনো কান্নার কাছে এভাবে নত হতে দেখিনি। জীবনের মসৃণ পথ, ক্রমেই জটিল হয়েছিল। কখনো ভঙ্গে পড়েননি। শেষ পর্যন্ত কঠিনকেই জয় করেছেন। ফোঁড় খেতে খেতে ভুলে গিয়েছিলেন কষ্ট কী? এই প্রথম সময় আর বাস্তবতার কাছে হেরেছেন তিনি।

শৈশবে বাবাকে হারিয়ে যুদ্ধ শুরু। সর্বংসহা মা রয়মননেছা কী ভাবে যে আট ভাইবোনকে মানুষ করেছেন শুধু সৃষ্টিকর্তাই জানেন। বাবা কৃষি কাজ করতেন। একদিন জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে অসুস্থ হয়েছিলেন। নামাজ শেষ হওয়ার আগেই জীবন প্রদীপ নিভে গিয়েছিল তার। একজন মানুষ এভাবে মরতে পারে, সে সময় তা মানুষের ভাবনাতেই ছিল না। লাল মিয়ার বন্ধুরা বলাবলি করছিল- “খুব বালা মানুষ আছিলো লাল মিয়া। মসজিদে মারা গেছে, তয় আল্লায় বেস্তের দরজা খুইলা রাহছে তার লাইগা। বালা মানুষ অচিলো দ্যাইখা আল্লায় কি সুন্দরে তার ঘর থেইকা উডায়া নিছে। ধনে গরির থাকলেও, মনে বড় আছিলো লাল মিয়া ” 

মসজিদে মারা যাওয়ায় ‘ভালো মানুষ’ খেতাব পেয়েছিলন তিনি। গ্রামের সহজ সরল মানুষের দেয়া এমন সম্মাননা এখন  আর কারো ভাগ্যে মিলে না বললেই চলে। বর্তমান সময়ে গ্রাম কি শহর সব জায়গায় মানুষের ভেতরটা হায়নায় রূপ নিয়েছে। যারা আছেন ভালো, তারা বড় অসহায়। কৃষি কাজের পাশাপাশি মাঝে মাঝে পণ্য ফেরি করতেন লাল মিয়া। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কাজ কম থাকায় ফেরি করে লবণ, মরিচ, হলুদ, আলু, তৈল, পান, সুপারী, বুট, বাদাম, চানাচুরসহ বিড়ি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতেন। গত দুই বছর আগেও গ্রাম থেকে বাজার ছিল অনেক দূরে। অবশ্য এখন প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশে দোকান, এক গ্রাম এক বাজার। শহরেতো প্রতি ভবনের নিজেই এক দোকান এক বাজার। এসব দোকানে নিত্য প্রয়োজনীয় এমন কোনো জিনিস নেই, যা পাওয়া যায় না। ফেরিওয়ালা হওয়ায় গ্রামের অনেক মানুষের কাছে টাকা পেতেন লাল মিয়া। সে পাওনা টাকা দিয়ে কয়েক মাস চলেছে সংসার। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই অভাব এসে হানা দেয়। শুধুমাত্র বড় মেয়ে রাহেলা বেগমকে বিয়ে দিতে পেরেছিলন লাল মিয়া। এরপর একেক করে রয়মননেছা সাত সন্তানতো মানুষ করেছেন। একজন মহিলা কীভাবে এতগুলো সন্তান বড় করেছেন, বর্তমান সময়ে অনেকের কাছেই তিনি শিক্ষণীয় হতে পারেন। অবশ্য সব ছেলে মেয়েই সংসার পেতেছেন। সবাই ভালো আছেন।

২. লুৎফর কলেজে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিন পরেই পনেরশ টাকা বেতনের একটা চাকুরি পায়। এ দিয়েই চলছিল পড়াশুনা। শহরের কেরাণী পাড়ায় এক বাড়িওয়ালার দোতলা ভবনের দুইটি অতিথি রুম ছিল। মাসে দুই একদিন অতিথি থাকলেও বাকি অন্যদিন খালি পড়ে থাকতো রুমগুলো। তাই বাড়ি মালিক ব্যাচেলর ভাড়া দেয়। গ্যাস ছিল না। শর্ত ছিল অন্য কোথাও থেকে খাবার ব্যবস্থা করতে হবে। অবশ্য অনেক কষ্টে এক বড় ভাইয়ের ম্যাচে খাবার ব্যবস্থা করা হলো। টিফিনকারীতে করে বুয়া খাবার দিয়ে যাবেন। তাও শুধু দুপুরের খাবার। মাঝে মাঝে কোনো বন্ধু কিংবা নিজের খরচে সন্ধ্যায় দুটো পরটা আর ভাজি-ই ছিল রাতের খাবার। আর সকালের নাস্তা দুইটা পরটা আর ভাজি, ম্যাসিয়ারের বকশিস দুই টাকাসহ মোট কুড়ি টাকা। রুম ভাড়া ছয়শ। কোনোভাবেই মাস পার করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক চেষ্টা করেও একটা টিউশনি মেলাতে পারেনি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত সকালের নাস্তা খাওয়া বন্ধ।

একদিন কাজের বুয়াকে লুৎফর বললেন- দুপুরের খাবারটা সকাল ১০টার মধ্যে এনে দিতে পারবেন?

বুয়া- ক্যান মামা?

লুৎফর- বলেন পারবেন কি না? যদি পারেন তবে মাসে একশ টাকা বকশিস পাবেন।

বুয়া- পারমু মামা, তয় আরো বিশ টেহা দিতে অইবো।

লুৎফর- আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে কাল থেকে সকাল ১০টার মধ্যে ভাতের টিফিনকারী নিয়ে আসবেন।

বুয়া- আইচ্ছা ঠিক আছেনে, টেহা কিন্তু একশবিশ টেহা।

সবসময় দুপুরের রান্না প্রায় ১২টার দিকে শেষ হয়। অথচ ইদানীং সকাল সকাল রান্না শেষ করে বুয়া দ্রুত চলে যায়। এ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় বুয়াকে। কোনো কথা না বলে খুব ভোরে ভোরে রান্না করতে চলে আসেন বুয়া। কথামতো ১০টার মধ্যেই টিফিন ভর্তি ভাত একটা তারকারি আর ডাল নিয়ে আসেন। লুৎফর বুয়াকে বিদায় করে রুমের ছিটাকারী আটকে টিফিনকারী থেকে কিছু ভাত আর ডাল দিয়ে সকালের নাস্তা সারেন। অবশ্য মাঝে মাঝে তাতেও সমস্যা দেখা দেয়। অন্য রুমমেটরা সকালে রুম থেকে বের না হলে সে দিন আর নাস্তা খাওয়া হতো না। তবে সেদিন দুপুরের খাওয়াটা ভালোভাবে করা যেত। আবার নাস্তা খেলে দুপুরে খাবার কম হতো। এভাবেই চলতে থাকে লুৎফরের জীবন সংগ্রাম। ইতোমধ্যে এইচএসসি ও বিএ’র পড়াশুনা শেষ। চাকুরির পেছনে অনেক ছুটোছুটি। সরকারি চাকুরিতে অন্তত বিশবার রিটেন পরীক্ষা দেয়া হয়েছে। অনেক ভালো পরীক্ষা দেয়া হলেও কখনো রিটেনে টেকা সম্ভব হয়নি। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেতো  ইন্টারভিউ’র জন্যই ডাকে না। 

চাকুরি দেয়া বা তদবির করার মতো মামা-খালু দুলাভাই নেই বলে ভাগ্যগুণে বহু কষ্টে চাকুরি মিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তাও জটিল সমস্যা। চাকুরি কনফার্ম করতে হলে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। ততদিন বেতন ছাড়া ফ্রি সার্ভিস দিতে হবে। কবে কনফার্ম হবে তা নিশ্চিত বলা যাবে না। লুৎফরের সান্ত¦ানা অন্তত কাজ করার অনুমতিতো পেলাম। এটাই যথেষ্ট। কাজ শুরু, একমাস দুইমাস তিনমাস একবছর দেড় বছর চলে যায় চাকুরি কনফার্ম হয় না। অফিসে যোগযোগ করা হলে বলা হয় আগামী সপ্তাহের মধ্যে হয়ে যাবে। প্রায় দুই বছর পর চাকুরি কনফার্ম হয়। বেতন পনেরশ টাকার প্রায় পাঁচগুণ।

অবশ্য চাকুরি হওয়ার মাস খানেক আগে জোর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মায়ের অনুরোধে বিয়ে করতে হয় লুৎফরকে। এ নিয়ে হতাশায় ভুগলেও গ্রামের ময়মুরব্বিদের কথা শুনে স্বপ্ন বুনে লুৎফর। মুরব্বিদের মুখে বলতে শুনা যায়, বিয়া অইলে কপাল খুইলা যায়। রিযিকের মালিক আল্লা।

বিয়ের দেড় বছরের মাথায় কন্যা সন্তানের বাবা হয় লুৎফর। বাবা হয়েছেন এ ভাবনায় কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেননা। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে যেটুকু সময় পান শুধু মেয়েকে নিয়েই কাটান। হাতের ওপর ধীরে ধীরে বড় হয় শত উপমার ‘ছোঁয়া’। মাঝে মাঝে বিভিন্ন কোম্পানী সন্তানকে নিয়ে মায়ের আদারমাখা ভাষা প্রতিযোগিতার কথা হতে শুনা যায়। যদি বাবার আদারমাখা ভাষা প্রতিযোগিতা থাকতো তবে নিশ্চিত তিনি সারাদেশে চ্যাম্পিয়ন হতেন।

সেদিনের ছোঁয়া আজ কত বড় হয়েছে। এইচএসসি পাস করেছে। প্রাণচঞ্চল মেয়েটা গত কয়েকমাস ধরে একদম নিরব আনমনা। উদাস উদাস। বাবা মায়ের কাছে ভিড়তে চায়না। মাস তিনেকের মধ্যে বাবা-মা আর মেয়ের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল উঠে গেছে নিভৃতে। সেই ছ্ট্টো মানুষটা বিছানা শুয়ে শুয়ে ক্লান্ত হয়ে যতো। বাবার কথার শব্দ শুনেই ঘুম ভাঙতো। মাথা আর পা বিছানায় পিঠের অংশ উচিয়ে দিয়ে বুঝাতে বাবা কোলে নাও। ছোট ছোট চোখে রঙিন স্বপ্ন দেখা ছোঁয়া আজ নবযৌবনা। কাগজের ফুলেই কত তুষ্ট ছিল, মাটির পুতুল ভেঙে গেলে শোকে কাতর। সেই ছোট্ট ছোঁয়া আজ অনেক বুঝে, অনেক জানে। তার কাছে জন্মাদাতার জানা অতি নগণ্য। জীবন কিভাবে সাজাতে হয়, তাও নাকি সে জেনে গেছে। সে জেনে গেছে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নাকি নিজেকেই নিতে হয়। তাই গত তিন দিন আগে ফাঁড়ি জমিয়েছে অজানা উদ্দেশ্যে।

শুধু যাবার আগে বলেছিল- দেখুন বাবা, আমি সাবালিকা, এখন আর নাবালিকা নই। তাই আমাকে খুঁজতে বের হবেন না। থানায় কোনো ডায়েরী করবেন না। আমি যদি ভালো না থাকতে পারি তবে ফিরে আসবে।

কথাগুলো শোনার পর থেকে হতবম্ব হয়ে যান লুৎফর। সান্ত¦না দেয় স্ত্রী সায়েরা বেগম। কোনো কিছুতেই যেন মন মানে না। শত বুঝানোর পরও আটকানো গেলোনা মেয়েটাকে। কোথা থেকে উড়ে আসা একটা মানুষ বুকটা শূন্য করে দিলো। এতো আদার এতো মায়া সব তুচ্ছ হলো একটা মানুষের কাছে। আঠার বছরের ¯েœাহময় ভালোবাসা বিলীন হলো ক্ষণিকের রংধনুতে। জীবনে একটা দোলনা ছাড়া মেয়েটাকে আর কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দেয়নি লুৎফর।

স্ত্রী সায়েরা বেগম ছোঁয়া জন্ম হওয়ার মাস দেড়েকের মধ্যেই বলেছিল-আমাদের ছোঁয়ার জন্যে একটা দোলনা কিনে এনো। পাশের ঘরের জামালের মেয়ে কত সুন্দরে দোলনায় দোল খেয়ে খেয়ে ঘুমায়। সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় কেনা দোলনা দেখতেও খুব সুন্দর। বলতে গেলে সারাদিন সে দোলনায় ঘুমায়। শুধু মাঝে মাঝে একটু খাওয়া দিলেই চলে। অনুনয় বিনয় করে অন্তত একশবার বলার পরও দোলনা কিনে দেয়নি। ছোঁয়ার পঞ্চম জন্মদিনে দোলনা না কেনার কারণ বলেছিল লুৎফর। সাধারণত লোহা, কাঠ, বাঁশ বা বেত দিয়ে তৈরি হয় দোলনা। শিশুদের দোলনায় রাখা বা ঘুমানোর ঘোর বিরোধী লুৎফর। কৃত্রিম দোলনা মায়ের কোলের প্রকৃত দোল বঞ্চিত করে শিশুদের। তারা বুক নামের দোলনায় দোলবে পরমতায়...

আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৭৪৩৩০
পুরোন সংখ্যা