চাঁদপুর। শনিবার ১৫ জুলাই ২০১৭। ৩১ আষাঢ় ১৪২৪। ২০ শাওয়াল ১৪৩৮

বিজ্ঞাপন দিন

বিজ্ঞাপন দিন

সর্বশেষ খবর :

  • শুক্রবার সকালে হাজীগঞ্জের সৈয়দপুর সর্দার বাড়ির পুকুর থেকে শাহিদা আক্তার মুক্তা নামের এক গৃহবধুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ॥ স্বামী হাছান সর্দার পলাতক || হাজীগঞ্জের সৈয়দপুর সর্দার বাড়ির পুকুর থেকে শাহিদা আক্তার মুক্তা নামের এক গৃহবধুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ॥ স্বামী হাছান সর্দার পলাতক
হেরার আলো
বাণী চিরন্তন
আল-হাদিস

২৮-সূরা কাসাস 


৮৮ আয়াত, ৯ রুকু, ‘মক্কী’


পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু  আল্লাহর নামে শুরু করছি।


 


৮৪। যে কেহ সৎকর্ম লইয়া উপস্থিত হয় তাহার জন্য রহিয়াছে উহা অপেক্ষা উত্তম ফল, আর যে মন্দকর্ম লইয়া উপস্থিত হয় তবে যাহারা মন্দকর্ম করে তাহাদিগকে তাহারা যাহা করিয়াছে উহারই শাস্তি দেওয়া হইবে।     


দয়া করে এই অংশটুকু হেফাজত করুন


 


হতাশা এবং অবিশ্বাস উভয়েই ভীতি দূর করে।


                 -উইলিয়াম আলেকজান্ডার।

মায়ের পদতলে সন্তানদের বেহেশত। 


ফটো গ্যালারি
স্বপ্নভঙ্গের দিন
জসীম মেহেদী
১৫ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+

এক.

মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছে ফাইয়াদ। এসে সে তার গার্মেন্টস ব্যবসায় বসলো। ভোলা রতনপুর বাজার মোল্লা মার্কেট। এই মার্কেটেই "ফাইয়াদ কালেকশন" নামের দোকানটাই ফাইয়াদের। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ফাইয়াদ তার দোকানে হরেক আইটেমের মাল উঠালো। বাচ্চাদের থ্রি পিচ, বাবা স্যুট, ফরাগ, মেয়েদের নতুন আইটেম টাপুর-টুপুর- ঝিলিক, মাজাক কালি।

সময়টা ছিলো পবিত্র রমজানের মাস।

ফাইয়াদ তার দোকানে বসা। ফাইয়াদের দোকানের ডিজাইনটা ও চমৎকার। সামনে অর্ধবৃত্ত আকারের গ্লাসকরা কাউন্টার। ফাইয়াদ কাউন্টারের ভেতরে বসা। নীল রঙের একটা স্টেপ শার্ট পরা। দোকানের কাউন্টারের জন্যে ফাইয়াদের বুক থেকে মাথা পর্যন্তই দেখা যায়। গায়ের রংটা শ্যামল হলেও মুখের গঠন অনেক সুন্দর। সব সময় হাস্যোজ্জ্বলই ফাইয়াদ থাকে। খুব সহজে একজন ক্রেতাকে ফাইয়াদ আকৃষ্ট করতে পারে তার হাস্যোজ্জ্বল কথাবার্তায়। কোনো ক্রেতা যদি একবার ফাইয়াদের দোকানে ঢুকে শুধু মালের সাইজে হলেই হল ওই কাস্টমারাকে এই দোকানের পণ্য দিয়েই ছাড়বে। কথায় এতো পটু। এজন্য মার্কেটের অনেকেই ফাইয়াদকে বলে তার সাথে নাকি জি্বন আছে। নইলে কোথা থেকে এতো ক্রেতা আসে। এই ধরনের কথা যখন পাশের দোকানদারদের কাছ থেকে শোনে। তখন ফাইয়াদের ভালোই লাগে। এতে সে মোটেও রাগ হয় না, বরং মজাই পায়।

এই তো সেদিন, ঈদের আর আছে পাঁচ দিন।

ফাইয়াদ তার দোকানে বসা। তার দোকানে ঝিলিক কেনার জন্যে তনি্নর মা ফিরোজা বেগম ও তনি্ন ঢুকলো। ঢুকেই দোকানের পূর্ব কোণে ডামি হিসেবে সাজানো খয়েরী রংয়ের মধ্যে সোনালী লেইস লাগানো ঝিলিকটাই তনি্নর পছন্দ হয়েছে। ফাইয়াদ তার কর্মচারী রকিকে বললো, ডামি পুতুল থেকে ড্রেসটা খুলে দেওয়ার জন্যে। রকি ডামি পুতুল থেকে ড্রেসটা খুলে ফাইয়াদের হাতে দিতেই তনি্নর মা বলে উঠলো, 'কতো?' ফাইয়াদ ২ হাজার ২শ' ৫০ টাকা দাম চাইলো। তনি্নর মা বললো, 'না। এতো টাকা নয়। ১ হাজার ৫শ' টাকা দেবো। দিলে দিতে পারো।

এবার তনি্ন একটা মৃদু হাসি হেসে বললো, 'ভাইয়া দাও। এটা ১ হাজার ৫শ' টাকার বেশি হতেই পারে না।

১ হাজার ৫শ' টাকা ঝিলিক বিক্রি করলেও ফাইয়াদের ২শ' টাকা ব্যবসা হবে। ফাইয়াদ এবার ঝিলিক ড্রেসটা হাতে নিয়ে তনি্নর দিকে একবার তাকালো। মনে মনে ভাবলো ড্রেসটা ওকে চমৎকার মানাবে। এই কথা ভাবতে ভাবতে বলে বসলো, 'দ্যান, টাকা দ্যান।'

ফিরোজা বেগম তার হাতের মুঠো ব্যাগটা থেকে চেইন খুুলে ১ হাজার ৫শ' টাকা দাম মিটিয়ে ড্রেসটা হাতে নিলো। তনি্ন বলে উঠলো, 'যদি ছোট-বড় হয় বদল করে নেওয়া যাবে তো?'

ফাইয়াদ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো, হ্যাঁ। বদল করে দেওয়া যাবে। দোকানের শপিং ব্যাগে দোকানের নাম ও মোবাইল নাম্বারটা দেখিয়ে দিয়ে ফাইয়াদ বললো, 'যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে এই নামে চলে আসবেন অথবা এই নাম্বারে কল দেবেন।'

তনি্ন বললো, 'ঠিক আছে। ভাইয়া আসি।' ফাইয়াদ তনি্নর চলে যাওয়া পথের পানে চেয়ে রইলো।

দুই.

তনি্ন বাসায় চলে আসলো। মার্কেট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তনি্নদের বাসা। দোতলা বিল্ডিং, আকাশি রং করা। সামনে দেয়াল ঘেঁষা ফুলের বাগান। গোলাপ, হাস্নাহেনা, জুঁই, চামেলী, বেলী ফুলের ঘ্রাণে বাড়িটা ভরে উঠেছে।

তনি্ন শপিং করা থেকে এসে ফুল বাগানে চলে আসলো। গোলাপ, হাস্নাহেনার সাথে চুপিচুপি বলে- জানো, আজকে আমি মার্কেটে একটা ভ্রমরের সন্ধান পেয়েছি। তোমাদের তার গল্প বলবো। শোনবা? দখিন বাতাসে গাছগুলো দুলছিলো। তখন মনে হয় তনি্নর কথা সায় দিয়ে বলছে- বলো।

তনি্ন ফের বললো- 'না, না এখন তো কিছুই হয় না। আগে হোক, তারপর তোমাদের কাছে তার কথা বলবো।' তনি্নর হঠাৎ খেয়াল পড়লো। ড্রেসটা যে এনেছি একটু পরে দেখি। ছোট হলো, না বড় হলো। তনি্ন চলে গেলো তার রুমে। গিয়ে মার্কেট থেকে কিনে নেওয়া ড্রেসটা পরলো। পরে সে ডেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। 'ওহ মাই গড' এতো বড়। দেখি দেখি শপিং ব্যাগটায় তো দোকানের মোবাইল নাম্বারটা আছে। সাথে সাথে তার হাতে থাকা সেলফোনটাতে মোবাইল নাম্বারটা উঠালো। উঠিয়ে কল দিলো। দুঃখের বিষয়, তনি্ন একে একে সাতটা কল দিলো। কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না।

তনি্নর মেজাজ বিগড়ে গেলো। মুখ ফস্কে একটা গালি বের হয়ে আসলো- 'শালায় রিসিভ করে না কেনো? যাহ, করবোই না।' এই বলে সেলফোনটা চার্জ দিয়ে বসে বসে 'নীল জোছনা' নামক একটা গল্প বই পড়ছিলো।

ঠিক এমন সময় তনি্নর মোবাইল করা রিসিভ না হওয়া মার্কেট ফাইয়াদ কালেকশন থেকে মোবাইল করলো- 'হ্যালো, কে বলছেন?' অপরপ্রান্ত থেকে তনি্নর কণ্ঠ, 'আমি তনি্ন বলছি। আপনি কে?'

'আমি ফাইয়াদ। কিছুক্ষণ আগে আপনি আমাকে সাতটা মিসড কল করেছেন।'

তনি্ন বলে উঠলো- 'না- না। আমি মিসড কল করি না। আপনিই কল ধরেননি।'

'সরি ম্যাডাম। আমি নামাজে ছিলাম। তাই মোবাইল সাইলেন্ট করে রেখেছিলাম। আচ্ছা বলুন, কেনো কল করেছিলেন?'

'আপনার দোকান থেকে যে ড্রেসটা এনেছি এটা ভীষণ বড়। বদল করে ছোট ২ ইঞ্চি ছোট ড্রেস দিতে হবে।'

'সমস্যা নেই। আপনি কাল ইফতারের পর নিয়ে আসবেন। আচ্ছা ম্যাডাম রাখি।' এই কথা বলে ফাইয়াদ তার সেলফোনটা রাখলো।

পরদিন ফাইয়াদ ইফতার শেষ করে দোকানে বসে অলস সময় কাটাচ্ছিল। ইফতারের পর তেমন ক্রেতা আসে না। তাই দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার খেলার পাতাটা দেখছিল সে। হঠাৎ ফাইয়াদের চোখ পড়লো ম্যারাডোনার কথাকে লীড করা একটা শিরোনামের ওপর। ব্রাজিল সবসময় গাদ্দারি খেলা খেলে। ফাইয়াদ হারিয়ে গেলো অতীতে।

একসময় ফাইয়াদ দারুণ ফুটবল খেলতো। পাড়ার অনেক ছেলেপুলে ফাইয়াদকে 'ম্যারাডোনা' বলে উপাধি দিয়েছিলো। রশিদ ভূঁইয়ার বিলে অগ্রহণের ধানকাটা শেষ। শুকনো বিলে 'বিয়াতি-আবিয়াতি' হা-ডু-ডু খেলা হতো। ফাইয়াদ পয়েন্টের সেই খেলায় বীরের মতো খেলতো...।

এর মধ্যে তনি্ন বাসা থেকে তার মাকে বলে বেরিয়ে আসলো। বাসার গেট পেরিয়ে আসতেই দেখা হলো সৈকতের সাথে। সৈকতকে সাথে নিয়ে রোডের একপাশে দাঁড়িয়ে একটা খালি রিকশাকে ডাক দিলো- এই রিক্শা যাবে?' রিকশাওয়ালা যখন দু'জনের সামনে এসে দাঁড়ালো সৈকত ও তনি্ন রিকশার সিট চেপে বসলো। সৈকত তনি্নকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। অল্প সময়ের মধ্যেই রিকশা এসে থামালো মোল্লা মার্কেটের দেবদারু গাছের তলে। তনি্ন রিকশাওয়ালাকে ১০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে সোজা মোল্লা মার্কেটের বি বস্নক ঘেঁষে এসে দাঁড়ালো। ফাইয়াদ কালেকশনে এসে দেখলো দোকানের কাউন্টারের ভেতর ফাইয়াদ বসা। তনি্ন ও সৈকত ভেতরে ঢুকে বলে উঠলো- 'কেমন আছেন? ওই যে ফোন করেছিলাম আমি।

ভাইয়া, একটু ২ ইঞ্চি ছোট চেয়ে দেন।' এই বলে শপিং ব্যাগ থেকে ড্রেসটা বের করে ফাইয়াদের হাতে দিলো। ফাইয়াদ ড্রেসটা কাউন্টারের ভেতরে রেখে ছোট সাইজের মালের বান্ডিল নিয়ে তনি্নর সাইজ মতো একই ডিজাইনের একটা ড্রেস বের করে দিলো। আর ক্যাশবাঙ্টা টান দিয়ে ৫০ টাকার একটা নোট তার দোকানের কর্মচারি রকির হাতে দিলো একটা প্রাণের জুস আর বোম্বে পটেটো চিপস্ আনার জন্য।

ফাইয়াদ দোকানের টুলটা তনি্নকে এগিয়ে দিলো বসার জন্য। রকি জুস ও চিপস নিয়ে আসলো। ফাইয়াদ রকির কাছ থেকে জুস এবং চিপ নিয়ে সৈকতের হাতে দিল। এবার ফাইয়াদ তনি্নকে বলে উঠলো, 'সৈকত কী হয়।' তনি্ন বললো, 'ও আমার চাচাতো ভাই হয়। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আমি ওকেই পড়াই। তাই একা না এসে ওকে নিয়ে চলে আসলাম। আচ্ছা, আপনার সাথে যে নাম্বারে কথা বলেছি ওই নাম্বারটা তো আপনার?' ফাইয়াদ বললো, 'জি্ব।' 'আচ্ছা, আপনার নাম ফাইয়াদ? 'দোকানের নাম আর আমার নাম একই।'

'আচ্ছা, আপনে বিয়ে করেছেন?'

খাইতে লইতে উঠেছি সবেমাত্র আবার বিয়ে!'

'আচ্ছা আপনাকে একটা কথা বলি?'

'হ্যাঁ, বলুন।'

'আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন?'

'দেখুন কালকে আমার কাছ থেকে একটা ড্রেস নিয়েছেন ওটা বড় হয়েছে বলে বদল করে ছোট সাইজ নিতে এসেছেন। কিন্তু বাবা, উকিলের মতো এতো জেরা করছেন কেনো?'

'আমার কথা আপনার খারাপ লাগে?'

'না। আপনার কথা আমার ভালো লাগে।'

'সত্যি বলছেন? যদি বলি আপনার কথা আমার ভালো লাগে?'

'যদি বলি আপনি আপনি বলে কথা বলতে খারাপ লাগে।'

'তাহলে আমরা তুমি তুমি বলে ডাকলে বড় মধুর লাগে। আচ্ছা শুনুন আমার নাম তনি্ন। কিছুক্ষণ আগে যে নাম্বারে আমাকে কল দিয়েছেন নাম্বারটা আমার যদি মনে লয় কল দিয়েন।' মোবাইলের মনিটরের দিকে তাকিয়ে দেখলো আটটা বেজে গেছে তাই বললো, 'ফাইয়াদ, আমি চলে যাই। মোবাইলে কথা হবে।'

তিন.

ফাইয়াদ দোকানে বসে বসে ভাবে এতো সুন্দর সোনার মেয়ে আমাকে ভালোবাসে। আমিও যে তাকে প্রথম যেদিন দেখেছি সেদিনই মনের গহীন অরণ্যে ঠাঁই দিয়েছি। তাইতো ইচ্ছে করেই বড় সাইজের ড্রেসটা দিয়েছি। ঠিকই সে চলে এসেছে। কিন্তু আমি তাকে আমার .... না না। তাহলে সে চলে যাবে। কিন্তু? সে যদি জানে। না ও খুব ভালো মেয়ে। ও কখনো আমাকে দূরে ঠেলে দেবে না। আমি এখন দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যাই। রাতে তার সেলফোনে কল দেবো। তাকে আমার সব কথা খুলে বলতে হবে।

ফাইয়াদ নিয়মিত যে রিকশাচালকের রিকশায় চড়ে ঠিক সময় মতো রিকশাচালক মিলন এসে হাজির। ফাইয়াদ রিকশায় চড়ে বাসায় চলে গেলো। বাসায় এসে হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসে রাতের খাবার খেয়ে নিজের রুমে ঢুকে সেলফোনটা হাতে নিয়ে তনি্নর মোবাইল নাম্বারে কল দিলো। তনি্ন মোবাইলটা রিসিভ করে বলে উঠলো, 'হ্যালো মিস্টার ফাইয়াদ। আমি তনি্ন বলছি।'

'তনি্ন কেমন আছো?'

'ভালো।'

'আচ্ছা, এখন যে ড্রেসটা নিয়েছো তা ঠিক আছো তো?'

'হ্যাঁ, চমৎকার। খুব সুন্দর ফিটিং হয়েছে।'

'আচ্ছা তোমাকে আমি একটা কথা বলবো।'

'তুমি কি কথা বলবা আমি জানি। যখন থেকে তুমি বলা শুরু হয়ে গেছে এর পরে আর ওই কথা বলা লাগে না। তা চোখের ইশারায় বুঝে নিতে হয় ওই যে আরেকটা গান আছে না ? চোখ যে মনের কথা বলে।'

'না তা তো হয়েই গেছে। কিন্তু আমি বলছিলাম কি?'

'থাক মিস্টার আর বলতে হবে না। আমি বলছি তুমি আমাকে বলবে তো আমি তোমাকে ভালোবাসি।'

'তার আগে আমিই তোমাকে বলছি, ফাইয়াদ আমি তোমাকে ভালোবাসি । আচ্ছা ফাইয়াদ কালকে ইফতারের পর আমি তোমার দোকানে আসবো। আমার সাথে দোকানের বাইরে প্রিয়জন চাইনিজে একটু সময় দিতে হবে।'

'না মানে আমি বলছিলাম কি?'

'না ফাইয়াদ তোমার ওই সময় ক্রেতা থাকে না। তুমি খরচ করা ভয় পেয়ো না। আমিই তোমাকে চাইনিজ খাওয়াবো।'

'না, মানে।'

'আর মানে মানে বলতে হবে না। ওকে মিস্টার তৈরি থেকো। আমি চলে আসবো। এবার রাখ।'

'ফাইয়াদ রাখ বলার সাথে সাথে সেলফোনটা রেখে দিয়ে চিন্তা করতে লাগলো। কাল তনি্ন আসবে। ফাইয়াদকে সে মূল কথা বলতেই দিলো না। কোনো মতে দুঃস্বপ্নে রাত কাটলো শুধু একটি কথা চিন্তা করে। কাল তনি্ন আসবে। তনি্নর সামনে সে কিভাবে দাঁড়াবে। রাতে তেমন ঘুম হলো না। সেহেরী খেয়ে শেষ করতে করতে মসজিদের মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের ফজরের আযান শোনে। ফাইয়াদ মসজিদে চলো গেলো নামাজ পড়ার জন্য।

চার.

নামাজ শেষ করে। চলে গেলো পৌর কবরস্থানে। সেখানে মৃত বাবার কার জিয়ারত করে চলে আসলো মার্কেটে। তখন সকাল ৮টা বাজে। বিসমিল্লাহ বলে দোকানের তালা খুলে সুগন্ধি আগর বাতি জ্বালালো। আর মনে মনে ভাবলো, তনি্ন আজ ইফতারের পর তার সাথে দেখা করবে। দেখা তো করবে ভালো। কিন্তু প্রিয়জন চাইনিজে তার সাথে যাবে। নিজেকে নিয়ে অনেক টেনশনে পড়ে যায় ফাইয়াদ। এর মধ্যে দিনের রবি ডুবি ডুবি শেষ করে ডুব দিল। ইফতারের জন্যে সাইরেন বাজলো। ফাইয়াদ ইফতার করে তনি্নর আসার প্রহর গুণছে।

পাঁচ.

আজ তনি্ন অনেক চমৎকার সেজেছে। ডেসিং টেবিলের আয়নার দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ফাইয়াদের সাথে সে আজ অনেক কথা বলবে। জীবনে এই প্রথম তনি্ন কাউকে ভালোবেসেছে। তার জীবনের সুপুরুষ ফাইয়াদ। তাই সাদা রংয়ের একটি থ্রি পিচ পরলো। মনে হয় যেনো এক ডানাকাটা পরী। ফাইয়াদের সাথে একান্তভাবে মনের কথা ব্যক্ত করবে। তাই একাকী ভাবে। রিকশা নিয়ে চলে আসলো ফাইয়াদেরর্ গামেন্টসের দোকানে। কেউ নেই ফাইয়াদের দোকানে। শুধু ফাইয়াদ একা। এসেই একটা মুচকি হাসি হেসে বললো, 'কেউ নেই দোকানে। চলো, প্রিয়জনে বেশি দেরি করা যাবে না। আম্মাকে বলে এসেছি। আমার বান্ধবী রত্নার কাছে যাচ্ছি। একটা ইংরেজি নোট নিয়ে আসি।'

ফাইয়াদ কাউন্টারের ভেতরে বসা। তনি্নকে সামনে থাকা টুলটা টেনে দিয়ে তার মুখামুখি বসলো। ফাইয়াদ ভেতরে আর তনি্ন কাউন্টারের বাইরে। তনি্ন বলে উঠলো, 'কোথায় তোমার দোকানের সেলসম্যান, কাউকে মোবাইল করো চলে আসার জন্য। দোকানে কথা বলবো না। তোমার সাথে তো আমার আগেই কমিটমেন্ট হয়েছে, আজ আমরা প্রিয়জন চাইনিজে কথা বলবো। কি তুমি খরচের ডরে যাবে না। আমিই তোমাকে চাইনিজ খাওয়াবো। ফাইয়াদ দোকানে একা থাকার জন্যে আগেই তার কর্মচারি রকিকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ইফতারের পর পরই সে বাসায় চলে গেছে। ফাইয়াদ প্রিয়জনে না যাওয়ার জন্যে মিথ্যে কথা বললো, ' আজ তো আমার দোকানে কর্মচারী রকি আসেনি। দেখো ঈদের বেচাকেনা কীভাবে যাই।'

তনি্ন বলে উঠলো, 'আর অজুহাত দেখিও না তো। মার্কেটে একটা মানুষও নেই। সব তারাবি নামাজে চলে যাচ্ছে তুমি উঠোতো।'

এমন এক মুহূর্ত এসে ফাইয়াদের সামনে ধরা দিলো, ফাইয়াদ উঠতে এখন বাধ্য। আর নিজের দেহটাকে লুকানোর কোনো রাস্তা নেই। খুব অসহায়ভাব নিয়ে কাউন্টারের নিচে লুকিয়ে রাখা ক্র্যাচ দুটো বের করলো। এবার আস্তে দু'বাহুর তলে ক্র্যাচ দুটো ঢুকিয়ে এবার মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে ক্র্যাচে ভর করে এক পা দিয়ে টপকিয়ে টপকিয়ে যখন মলিন অসহায় চেহারা নিয়ে কাউন্টারের ভেতর থেকে ফাইয়াদ বের হলো ঠিক তখনি তনি্নর চোখে পড়ে ফাইয়াদ ক্র্যাচে ভর করো দাঁড়িয়ে থাকা একজন পঙ্গু মানুুষ।

তনি্ন এমন দৃশ্য দেখে দাঁত গিজগিজিয়ে উঠলো। যেনো একটা হিংস্র বাঘীনি। ফাইয়াদকে চোখ রাঙিয়ে বলতে শুরু করলো, 'আমার এখন কি করতে ইচ্ছে হয় জানো? তোমার একটা পা তো নেই। আরেকটা পা তোমার হাতের ক্র্যাচ নিয়ে বাইরিয়ে ভেঙ্গে দেই। প্রতারক। লেংড়া বামন হয়ে চাঁদ ধরা ফাজিল কথাকার!'

অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করে জিদ ভাব নিয়ে চলে গেলো সে। অসহায় ভাব নিয়ে এক পা হারা ক্যানসারে হারানো ফাইয়াদ চোখের জল ফোঁটা বৃষ্টির মতো ফেলে দোকানের পশ্চিম কোণে ইফতারের সময়সূচির ক্যালেন্ডারে মক্কা শরীফের পানে চেয়ে চেয়ে বললো, 'খোদা তুমি কেনো আমাকে ক্যানসার রোগ দিলা। আমিও তো মানুষ। আর দশজনের মতো রক্ত, মাংস আমার শরীরেও তো আছে। শুধু একটা অঙ্গ হারিয়েছি। কিন্তু ভালোবাসতে তো মন লাগে, হায় খোদা। আমার তো সেই মন আছে। ভালোবাসা আছে তবুও কেন তনি্ন...

আজকের পাঠকসংখ্যা
১১১৫৭৯
পুরোন সংখ্যা